কী করবে বিএনপি

ঢাকা, বুধবার, ১৪ নভেম্বর ২০১৮ | ৩০ কার্তিক ১৪২৫

কী করবে বিএনপি

সুলতান মাহমুদ ৯:২১ পূর্বাহ্ণ, অক্টোবর ২০, ২০১৮

কী করবে বিএনপি

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় আর বেশি দিন বাকি নেই। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরে সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। আর নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করা হবে বলে গত বৃহস্পতিবার নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানিয়েছেন।

নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, নির্বাচনের সময় হাতে খুব একটা বেশি না থাকলেও দেশের অন্যতম বৃহত্তম রাজনৈতিক দল বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, সে বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়নি।

যদিও বিএনপি নেতারা বারবার বলছেন, তারা নির্বাচনে অংশ নিতে চান।

এ জন্য তারা সরকারকে কয়েকটি শর্তও দিয়েছেন, খালেদা জিয়ার মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, নির্বাচনে সেনা মোতায়েন অন্যতম।

বিএনপি নেতারা আরও বলছেন, তারা নির্বাচনে অংশ নিতে চান বলেই জাতীয় ঐক্যে গড়ে তুলেছেন।

জানা গেছে, এ সরকারের মেয়াদ আছে আর মাত্র তিন মাস। এর মধ্যে আবার নির্বাচনকালীন সরকারও গঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের জন্য দ্রুতগতিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে।

এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি হিসাব মেলাতে পারছে না নির্বাচনে তারা অংশ নেবে কি না। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে সরকারকে যখনই কোনো শর্ত দেয়, সরকার তখনই তা প্রত্যাখ্যান করে।

বিএনপি সর্বশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিন সরকারকে চারটি শর্তজুড়ে দেয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ব্যাপারে। শর্তগুলো হচ্ছে- এক. নির্বাচনের আগে খালেদা জিয়াকে মুক্তি দিতে হবে। দুই. সংসদ ভেঙে দিয়ে নিরপেক্ষ সরকার গঠন। তিন. নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন। চার. নির্বাচনে সেনা মোতায়েন করতে হবে। দলটির নেতারা বলছেন, এ চার দফা দাবি মানা না হলে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না, জনগণ নির্বাচন হতে দেবে না।

আর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের নির্বাচনের ব্যাপারে একাধিকবার সাংবাদিকদের বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে। কেউ যদি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, তা হলে নির্বাচনের ট্রেন থেমে থাকবে না। বিএনপি যদি আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে, আওয়ামী লীগের তাতে কিছু করার নেই।

এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি কি করবে তা হিসাব মেলাতে পারছে না। দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারারুদ্ধ, ভারপ্রাপ্ত চেয়ারমান তারেক রহমান বিদেশে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন, দলের অনেক সিনিয়র নেতা বয়সের ভারে ন্যুব্জ, তারা ঠিকমতো চলাফেরাও করতে পারছেন না।

জানা গেছে, আওয়ামী লীগ নেতারা যেমন দলের যে কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানার জন্য দলের সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিকে তাকিয়ে থাকেন, তেমনই বিএনপির যে কোনো বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের ব্যাপারে দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার দিকে তাকিয়ে থাকেন। খালেদা জিয়া কারাগারে থাকায় বিভিন্ন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা।

বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলেও কে কোথায় থেকে নির্বাচন করবে, জোটের সঙ্গে আসন ভাগাভাগি নিয়ে হিসাব। এসব পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বিএনপিতে মুক্ত খালেদা জিয়ার বিকল্প নেই। এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি আসন্ন নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন।

দলের চেয়ারপারসন কারাগারে যাওয়ার পর বিএনপির একাধিক নেতা বিভিন্ন সময়ে বলেছেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া তারা নির্বাচনে যাবেন না। আবার খালেদা জিয়া নির্বাচনের আগে আইনগত প্রক্রিয়ায় মুক্তি পাবেন সেই ভরসাও ক্ষীণ। খালেদা জিয়া একটি মামলায় ৫ বছরের কারাদণ্ড নিয়ে বর্তমানে কারাগারে আছেন, আরেকটি মামলার রায় ২৯ অক্টোবর ঘোষণা করা হবে বলে আদালত তারিখ নির্ধারণ করেছেন।

জানা গেছে, বিএনপি টানা ১২ বছর ধরে ক্ষমতার বাইরে। ১৯৭৮ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে একনাগাড়ে এত দীর্ঘ সময় বিএনপি ক্ষমতার বাইরে ছিল না। সে ক্ষেত্রে বিএনপি কী করবে? তারা কি আন্দোলন করে সরকারের কাছ থেকে দাবি আদায় করতে পারবে? কিংবা দাবি পূরণ না হলে ২০১৪ সালের মতো নির্বাচন বর্জনের ডাক দেবে? নির্বাচন বর্জন বা প্রতিরোধ গণতন্ত্রের ভাষা নয়।

২০১৪ সালে বিএনপিসহ অনেকগুলো দল নির্বাচন বর্জন করেছিল। এমনকি বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা নির্বাচন ঠেকানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু পারেননি। এবার পারবেন তার নিশ্চয়তা কী? ১৫৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাহীন নির্বাচন নৈতিকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হলেও আইনের দৃষ্টিতে অশুদ্ধ নয়। বরং বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার অতীতের যে কোনো সরকারের চেয়ে কম বিরোধিতার সম্মুখীন হয়েছে।

সংসদের ভেতরে-বাইরে কোথাও তাদের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়নি। এর অন্যতম কারণ ২০১৪ সালে বিএনপির নির্বাচন বর্জন। বিএনপি নির্বাচনে গেলে রাজনৈতিক তথা গণতান্ত্রিক পরিবেশের এখন যতটা অবনতি ঘটেছে, তা ঘটত না।

গত ১৩ অক্টোবর বিএনপিসহ বেশ কয়েকটি দলের সমন্বয়ে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠিত হয়। বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে গত বৃহস্পতিবার ছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতাদের প্রথম বৈঠক।

বৈঠকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের নেতা ও গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের অনেক নেতা উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে কূটনীতিকদের করা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন ড. কামাল হোসেন এককভাবে।

কূটনীতিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তি ছাড়া আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কি না।

এমন এক প্রশ্নের জবাবে ড. কামাল হোসেন বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনমুখী একটি গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট। বাংলাদেশে এখন সুষ্ঠু নির্বাচনের ন্যূনতম পরিবেশ নেই। দলীয় সরকারের অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচনের কোনো সুযোগও নেই।

ফলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সুনির্দিষ্ট সাত দফা দাবি উত্থাপন করেছে। এগুলো পূরণের মাধ্যমে সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টি হলে অবশ্যই জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে যাবে। কীভাবে পরিবেশ পাব তা এসব দাবি ও লক্ষ্যের মধ্যে রয়েছে।

বৈঠক শেষে সাংবাদিকরা বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বৈঠকের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে বিভিন্ন দেশের কূটনীতিবিদদের মতবিনিময় সভা হয়েছে। তবে এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। এখনই এ বিষয়ে বলার সময় হয়নি।

এর কয়েকদিন আগে নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহণের বিষয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিতে চায়। কিন্তু সরকার সব ধরনের চেষ্টা চালাচ্ছে বিএনপি যেন নির্বাচনে অংশ নিতে না পারে। আমাদের সিনিয়র নেতাদের নামে যেসব মিথ্যা মামলা দেওয়া হয়েছে তা দ্রুত শেষ করার চেষ্টা করছে সরকার। যাতে তাদের নির্বাচন থেকে দূরে রাখা যায়।

গতকাল বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান একটি অনুষ্ঠানে বলেছেন, যে সরকারের শাসনামলে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন সুষ্ঠু হয় না, তাদের আমলে জাতীয় নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, এটা জাতি বিশ্বাস করে না। তিনি বলেন, সংবিধানে আছে নির্বাচন কমিশনকে সাহায্য করবে সহায়ক সরকার। কিন্তু দলীয় সরকার থাকলে তারা সহায়তা করবে না, প্রভাবিত করবে। বিএনপি সহায়ক সরকার চায়, প্রভাবিত করার সরকার চায় না।

কেকে