নির্বাচনে খালেদা ফ্যাক্টরই পষ্ট

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫

নির্বাচনে খালেদা ফ্যাক্টরই পষ্ট

নিজস্ব প্রতিবেদক ১২:০৫ পূর্বাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৮

নির্বাচনে খালেদা ফ্যাক্টরই পষ্ট

বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দেশের রাজনীতিতে বড় ফ্যাক্টর, তা আস্তে আস্তে পষ্ট হয়ে উঠেছে। ২০ দলীয় জোটের নেত্রী এবং বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া দুর্নীতির একটি মামলায় নিম্ন আদালতের রায়ে বর্তমানে জেলে রয়েছেন। ওই মামলায় আদালত তাকে পাঁচ বছর কারাদণ্ড এবং অর্থদণ্ডও দিয়েছেন। এর পরে খালেদা জিয়া নিম্ন আদালতের রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আপিল করেছেন এবং জামিন চেয়েছেন। গত বৃহস্পতিবার খালেদা জিয়ার আবেদন গ্রহণ করে নিম্ন আদালতের দেওয়া অর্থদণ্ড স্থগিত করেন হাইকোর্ট। আর জামিনের শুনানির জন্য আদালত আজ রোববার দিন ধার্য করেছেন। খালেদা জিয়ার বয়স এবং অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে তার জামিন চাওয়া হয়েছে। তাছাড়া তিনি একজন সম্মানিত ব্যক্তি, সাবেক তিনবারের প্রধানমন্ত্রী এবং সিনিয়র সিটিজেন।

খালেদা জিয়া আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না- তা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে চলছে নানা ধরনের হিসাব-নিকাশ, রাজনৈতিক মাঠও বেশ উত্তপ্ত।

আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের মধ্যে কেউ না কেউ প্রতিদিনই খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে বিভিন্ন মন্তব্য করছেন।

আওয়ামী লীগ
আওয়ামী লীগের নেতারা সরাসরি খালেদা জিয়ার নির্বাচনে অংশগ্রহণ নেওয়া নিয়ে কোনো মন্তব্য করছেন না। তবে তারা বিভিন্ন আকার-ইঙ্গিতে খালেদা জিয়া যাতে নির্বাচনে অংশ নিতে না পারেন, সেরকম কথাই বলছেন। আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ও বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ গতকাল ভোলায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলে যদি বিএনপির জনপ্রিয়তা বাড়ে, তবে তাকে (খালেদা জিয়া) কারাগারে রেখেই বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান।

আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের গত ১৭ ফেব্রুয়ারি ফেনী সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া আগামী নির্বাচনে অংশ নিতে না পারলেও বিএনপি একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে। এ সময় ওবায়দুল কাদের আরও বলেন, বিএনপি বলেছে খালেদা জিয়াকে ছাড়াও তারা শক্তিশালী। সেই শক্তিশালী বিএনপিকে নিয়েই তারা একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন করবে। আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ গতকাল শনিবার সকালে কুষ্টিয়া পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে এক অনুষ্ঠানে বেগম খালেদা জিয়াকে দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসী হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, দেশের জনগণ বিএনপির এসব দুর্নীতিবাজ-সন্ত্রাসীকে কারাগারেই দেখতে চায়। জনগণও তাহলে নিরাপদে এবং দেশ শান্তিতে থাকবে। বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে থাকা মাইনাস নয়, বরং প্লাস, এতে তার ভোট বাড়ছে, বিএনপি নেতাদের এমন মন্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে হানিফ বলেন, বেগম খালেদা জিয়া কারাগারে থাকলে যদি ভোট বৃদ্ধি পায়, তাহলে তিনি (বেগম জিয়া) আমরণ কারাগারেই থাকুক।

এর আগের দিন শুক্রবার কুষ্টিয়ায় এক অনুষ্ঠানে হানিফ বলেন, বিএনপি নেত্রী অযোগ্য হলে তাকে বাদ দিয়েই এ নির্বাচন হবে। আন্দোলন-সংগ্রাম করে বেগম জিয়াকে কারাগার থেকে মুক্ত করা যাবে না।

বিএনপি
বিএনপি নেতারা বলছেন, খালেদা জিয়াকে ছাড়া তারা কোনো নির্বাচনে অংশ নেবেন না। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন গত ১৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবে একটি অনুষ্ঠানে বলেন, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ছাড়া কোনো নির্বাচনে যাবে না বিএনপি। তিনি আরও বলেন, বিএনপি নির্বাচনমুখী দল। দেশের মানুষ বারবার ভোট দিয়ে খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী বানিয়েছেন। আগামী নির্বাচনেও আমরা শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে নিরপেক্ষ সরকারের দাবি আদায় করে ভোটে অংশ নেব। তবে খালেদা জিয়াকে বাদ দিয়ে নয়। এর আগে গত ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধনকালে বিএনপির মহাসচিব ও ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বেগম খালেদা জিয়াকে ছাড়া কোনো নির্বাচনে যাবে না বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো একটা ভোটারবিহীন নির্বাচন করতে চায় সরকার। কিন্তু দেশে আর কোনো একতরফা ভোট করতে দেওয়া হবে না।

অন্যান্য
জাসদ সভাপতি ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু গতকাল কুষ্টিয়ায় এক অনুষ্ঠানে বলেন, বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়া এতিমের টাকা আত্মসাতের দায়ে এখন জেলহাজতে। তিনি একজন চিহ্নিত অপরাধী। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো অপরাধী অংশ নিতে পারবে না। তবে বিএনপির জন্য নির্বাচনের দরজা সব সময় খোলা। তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, অপরাধী, কুচক্রী, খারাপ মানুষের জন্য গণতন্ত্র নয়। গণতন্ত্র ভালো মানুষের জন্য। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশে আজ গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত।
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা এম হাফিজ উদ্দিন খান বলেন, এখন যে প্রস্তুতি ও পরিবেশ, তাতে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনে কোনো আশার আলো দেখা যাচ্ছে না। সংসদ ভেঙে নির্বাচন দেওয়া ও নির্বাচনে সেনাবাহিনী মোতায়েনের বিষয় আমলে নেওয়া হচ্ছে না। একদল নির্বাচনী প্রচার শুরু করে দিয়েছে, আরেক দল বন্দি। কিন্তু এখন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন (ইসি) অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। ইসির কোনো তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব অবাধ, সুষ্ঠু নির্বাচন করা। এজন্য যা যা দরকার, তা তাদের করতে হবে।

নির্বাচন কমিশন
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কেএম নূরুল হুদা গত ২ ফেব্রুয়ারি সকালে নির্বাচন ভবনে সাংবাদিকদের কাছে বলেছেন, বিএনপি ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়। ওই দিন রাষ্ট্রপতি পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে বর্তমান রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করা হয়। এ সময় সিইসি নির্বাচন ভবনে উপস্থিত ছিলেন। পরে তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এ সময় কেএম নূরুল হুদা বলেন, বিএনপি একটা বড় দল। তাদের ছাড়া সব দলের অংশগ্রহণ হয় কি করে? বিএনপি ছাড়া অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হবে না। সিইসি আশা প্রকাশ করেন, বছরের শেষে অনুষ্ঠেয় একাদশ সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেবে।

এর আগে ২৮ জানুয়ারি বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল সিইসির সঙ্গে দেখা করেন। এ সময় সিইসি কেএম নূরুল হুদা বলেন, বিএনপিকে ছাড়া দেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন সম্ভব নয়। বিএনপির ওই প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ছিলেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান।

মোটকথা, বিএনপি চেয়ারপারসন নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন কি না- তা নির্ভর করছে উচ্চ আদালতের ওপর। উচ্চ আদালত খালেদা জিয়ার আপিল গ্রহণ করেছেন, তার অর্থদণ্ড স্থগিত করেছেন। এখন তার পাঁচ বছরের কারাদণ্ড যদি স্থগিত করা হয় এবং তাকে জামিন দেওয়া হয় তাহলে তার নির্বাচনে অংশ নিতে কোনো বাধা থাকবে না।

সংবিধানের ৬৬ (২)(ঘ) অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘নৈতিক স্খলনজনিত কোনো ফৌজদারি অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হইয়া ন্যূনতম দুই বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন এবং মুক্তির পর পাঁচ বছর পার না হলে কেউ নির্বাচনে যোগ্য হবেন না।’ তবে বাংলাদেশে উদাহরণ আছে নিম্ন আদালতে দণ্ডিত হয়ে উচ্চ আদালত থেকে জামিন পেয়ে নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন এবং সংসদ সদস্য পদ টিকিয়ে রেখেছেন। এ রকম অন্তত চারজন হলেন- জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, মহীউদ্দীন খান আলমগীর এবং আব্দুর রহমান বদী।

কেকে/এএস