খালেদা ক্ষমতার অপব্যবহার স্বীকার করেছেন: বিচারক

ঢাকা, বুধবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৪ আশ্বিন ১৪২৫

খালেদা ক্ষমতার অপব্যবহার স্বীকার করেছেন: বিচারক

মফিজুল ইসলাম ১:৪৫ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ২০, ২০১৮

খালেদা ক্ষমতার অপব্যবহার স্বীকার করেছেন: বিচারক

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টের অর্থ পরস্পর যোগসাজসে আত্মসাৎ করায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ এ মামলার ৬ আসামিই ‘রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক অপরাধী’ হিসেবে গণ্য হবেন। তাছাড়া মামলায় আত্মপক্ষ শুনানির বক্তব্যে খালেদা জিয়া নিজে জবানবন্দিতে স্বীকার করেছেন, তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন। ফলে দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় তাকে শাস্তি দিতে কোনো বাধা নেই।

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্টে দুর্নীতির মামলার রায়ের পর্যবেক্ষণে বিশেষ জজ-৫ আদালতের বিচারক ড. মো. আখতারুজ্জামান এমন অভিমত দিয়েছেন।

গতকাল সোমবার বিকেলে এ মামলায় পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন আদালত। পরে বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রায়ের সত্যায়িত কপি খালেদা জিয়ার আইনজীবী সানাউল্লা মিয়ার কাছে হস্তান্তর করেন আদালতের পেশকার মো. মোকাররম হোসেন।

রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, এ মামলার আসামিরা যোগসাজসে সরকারি এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাৎ করেন। পরিমাণের দিক থেকে তার বর্তমান বাজারমূল্য অধিক না হলেও ঘটনার সময়ে ওই টাকার পরিমাণ অনেক বেশি ছিল।

আসামিদের মধ্যে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ওই সময়ে দেশের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। আসামি কাজী সলিমুল হক কামাল সংসদ সদস্য ছিলেন। আসামি কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী সরকারি কর্মচারী হয়েও আসামি খালেদা জিয়াকে সরকারি এতিম তহবিলের ব্যাংক হিসাব খুলতে সহায়তা এবং পরবর্তী সময়ে ওই হিসাব থেকে ২টি প্রাইভেট ট্রাস্টের অনুকূলে সরকারি অর্থের চেক বেআইনিভাবে দেয়া বর্ণিত ২ আসামিকে অপরাধ করতে সহায়তা করেন।

আসামি তারেক রহমান, মমিনুর রহমান ও শরফুদ্দিন আহমেদ কৌশল অবলম্বন করে সরকারি তহবিলের টাকা একে অপরের সহযোগিতায় আত্মসাৎ করতে প্রত্যক্ষভাবে সহায়তা করেন। এর মাধ্যমে এই মামলার ৬ আসামির প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে লাভবান হয়েছেন বলে রায়ের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে।

দুই ধারার অপরাধ প্রমাণিত হলেও একটি ধারায় দণ্ড সম্পর্কে পর্যবেক্ষণে বলা হয়, প্রাথমিকভাবে খালেদা জিয়া ও ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী মিনস রিয়ো (খারাপ ইচ্ছা) নিয়ে সরকারি এতিম তহবিলের টাকা দুই ভাগে ভাগ করে দুটি ট্রাস্টের অনুকূলে হস্তান্তর করেন, যার মধ্যে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট অন্যতম।

ওই ট্রাস্টে ১৯৯৩ সালের ১৩ নভেম্বর ২ কোটি ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা স্থানান্তরের পর ওই বছরের ১৫ নভেম্বর সেখানে জমা হয়। আসামি তারেক রহমান ও মমিনুর রহমান ট্রাস্টের নামীয় এসটিডি ৭ নং হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করে প্রথমে ২ লাখ ৭৭ হাজার টাকায় ২ দশমিক ৭৯ একর জমি কেনেন। অবশিষ্ট টাকা প্রাইম ব্যাংকের গুলশান শাখায় স্থানান্তর করেন।

তৎপরবর্তী সময়ে কাজী সালিমুল হক কামাল ও গিয়াস উদ্দিনের হাত হয়ে আসামি শরফুদ্দিনের হাতে ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা চলে যায় এবং তা আত্মসাৎ করা হয়। এগুলো সবই আসামিদের মিনস রিয়ো (খারাপ ইচ্ছা) ইঙ্গিত করে। ফলে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫ (১) ধারায় বর্ণিত ক্রিমিনাল মিসকনডাক্টের উপাদান যেমন এই মামলায় উপস্থিত আছে, ঠিক তেমনি আসামিদের মিনস রিয়োসহ রংফুল গেইনের উদ্দেশ্য বর্ণিত পরিমাণ টাকা বিভিন্ন পন্থায় রূপান্তর করে আত্মসাৎ করেছেন মর্মেও আদালত মনে করেন।

আদালত মনে করেন, আসামিরা একে অপরের সহায়তায় যেভাবে টাকা আত্মসাৎ করেন, তার একটি প্রিসামটিভ ভ্যালু রয়েছে এবং যা এই মামলা নিষ্পত্তির জন্য অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক।

পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, আসামিদের মধ্যে একজন ব্যতীত অপর সবাই সরকারি কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও অপরাধমূলক বিশ্বাস ভঙ্গ করে সরকারি এতিম তহবিলের ২ কোটি ১০ লাখ ৭১ হাজার ৬৪৩ টাকা ৮০ পয়সা আত্মসাৎ করেন।

দণ্ডবিধির ৪০৯ ধারার বিধান পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ওই ধারায় সংঘটিত অপরাধের জন্য সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা যে কোনো বর্ণনার কারাদণ্ড যার মেয়াদ ১০ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এছাড়া অর্থদণ্ডে দণ্ডিত করারও বিধান রয়েছে।

উল্লেখ্য, গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে ৫ এবং তারেক রহমানসহ অন্য আসামিদের ১০ বছর করে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের রায় দেন আদালত।

পুরনো ঢাকার বকশীবাজারে আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে স্থাপিত বিশেষ জজ আদালতের বিচারক ড. আখতারুজ্জামান এ রায় ঘোষণা করেন।

এরপর থেকে খালেদা জিয়াকে পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোডের পুরনো কেন্দ্রীয় কারাগারে রাখা হয়েছে।

এমআই/আইএম