সরসীর রাত

ঢাকা, শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৮ | ৬ আশ্বিন ১৪২৫

সরসীর রাত

আব্দুল হক ১:৩৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ০৯, ২০১৮

সরসীর রাত

সারারাত পকুরের উদগ্রীব, কুণ্ঠিত স্বর শোনা যায় 
রাত্রি লম্বা হয়, লম্বা হয়। দিন বাইপাস করা
সময়ের ধীর রিলে রেসে
জল-ভূমি ঘুমাতে পারে না। তরলের মহাদেশ,
অগোচর চলাচলে, ঝিম মেরে থাকে।

নিশাচর জলাশয়, ক্রমে ক্রমে, আমার ভিতরে ঢুকে যায়।
কোনো গাছ শব্দ হয়ে ওঠে, কোনো পাখি পাশ ফেরে
কোনো ফল খসে পড়ে, কোনো জাল নিজেকে গুটায়।
দিঘীর অস্ফুট পাতে মহা তারা অসীম নৈশব্দে পড়ে গেলে,
তার অনুবর্তী ডাব, ধুপ করে পুকুরের নিথর মাটিতে নেমে আসে।
এক স্বরপুটি মাছ, ঘাট থেকে একটু দূরে, মাঝ রাত্রি ভেঙে,
অসামান্যে ডিগবাজি খায়। সহসা বাতাস ওঠে;
অসীমের হাঁসগুলি নিরব পানিতে,
ঘুরে ঘুরে, স্পোকহীন, উপদ্রত সাইকেল চালায়।

পুকুর সমস্ত রাত কথা বলে চলে।
মানুষের নির্দয়তা তার নাই;
নিজেকে সাজায় না সে, ঢেলে ঢেলে, অনেক চেষ্টায়;
সুদীর্ঘ করে না প্রেম; খর্বও করে না;
পুকুর চিন্তা করে, চিন্তা না করেই;
পানিহীন হয়ে যেতে যেতে,
বহু রাতে অনির্দিষ্ট কথা ওঠে— আদিম ভাষায়,
আলাজিভহীন মুখ, জোছনায়, আর্তনাদ করে,
রাত্রি লম্বা হয়, লম্বা হয়,
দিন বাইপাস করে সময় পরের রাত্রে ঢোকে,
পুকুরের আলাজিভহীন স্বরে রাত্রির ধীর রিলে রেস শুরু হয়।

এক ভাসমান বিছানায় শুয়ে, আমি যে এতিম, এই কথা 
মনে পড়ে। পিতা-মাতা কোন সালে মারা গেছে, মনে নাই।
কিন্তু দেখি, তাদের পকুরগুলি, স্নান করা চাকা,
মনে আছে। ফলে আর কিছুই করি না রাতে, শুধু 
শুয়ে থাকি। মৃত্যু হয় জন্ম হয় পুকুরের স্বরে;
শুয়ে থেকে জন্ম মৃত্যু হয়ে যেতে পারে যে আমার;
আমি কি তা জানতাম আগে?

সারারাত টিটি পাখি-খাল-বিল-নদী-নালা;
তরল প্রবাহে
জাল ফেলে, জাল তোলে, টেনে টেনে বাতাসের হাত।
গ্রাম বিড়ি খেয়ে কাশে, খক খক, খক—
তরলের ফুসফুস, বাষ্পের টং শ্বাস ফেলে। 
বিলের ভিতরে মাঠ নেমে হাঁটে, ধুপ ধুপ— ধুপ।
স্থল ছেড়ে জলে নেমে আসা ঢেকিগুলো,
ধান নয়, পানির হৃদয়, রাত্রে, কোটে, কোটে, কোটে।

তরলকে, জানে না মানুষ, ভাল করে। অবিরাম তরলকে
জলবৎ ব্যবহার করে, স্নান করে বুকে নেমে,
শরীরে বহন করে, কিন্তু তবু জলীয়কে, জানে না মানুষ। 
যাকে জানতে চাও, ভাবতে চাও, তুমিও কি জানো তাকে?
তবু যেন মানুষের কল্পনায়—
পুকুরের বিবর্তন, দেখতে পাওয়া যায়।
পুকুর সে হত্যা করে— কারণ সে ভালবেসে আত্মহত্যা করে।
ভয় পেয়ে বাঁচে। পানি শুধু করুণায় ঘোরে, কাছে থাকে।

মানুষ অনেক রাতে, টের পায়, পিতা-মাতা নেই, 
পানির শরীর আছে, পিতা আর মাতার মতন।
যেখানে পুকুর নেই, কিন্তু ছিল আগে, 
সেখানে কি পিতা-মাতা ছিল কিম্বা আছে?
আমাদের পিতা-মাতা পুকুরের মাঝখানে থাকত তখন,
ফুটতো শাপলার মতো,
কাত হয়ে পড়ে থাকত, অসীম পানিতে...

পাপড়িতে ভর করে চলে যেত ভেসে;
মানুষ অনেক রাতে, শুয়ে শুয়ে এইসব ভাবে।

যখন পুকুর ভাবে, তার পানি ধীরে ধীরে ঘোরে;
বাতাসের টংগুলি ঘোরে তার সাথে, ধীরে ধীরে।
মাঠ আর জমিনের প্রতিবিম্ব পুকুরের কেন্দ্রে নেমে আসে,
বৃষ্টি হয় দিঘীনালা পার হয়ে সকল দিঘীতে;
যখন পুকুর ভাবে, বৃষ্টি মাঠ হয়ে যায়, মাঠও বৃষ্টি হয় 
বৃষ্টি আর মাঠ আর দিঘী আর সীমাহীন তরলের টং
পুকুরের কেন্দ্রে নেমে ঘুরতে থাকে।
যখন পুকুর ভাবে, পৃথবীর সব ছায়া জলে নেমে ঘোরে।

সারারাত পুকুরের উদগ্রীব, কুণ্ঠিত স্বর ঘরে আসে।
নিয়তির মতো শব্দে মানুষকে ঘুম থেকে তুলে,
তরুণ উদ্ভিদ খসে পড়ে— কেউ ডাল কেটে সন্তর্পণে টানে—
অবৈধ জাল ফেলে মাছ ধরে কেউ—
কালো দেহে ছাই মেখে, তেল মেখে, জাল টেনে তোলে—
ডাব পাড়ে গাছ বেয়ে উঠে—
হাত দিয়ে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে,
ঝুনা নাড়িকেলগুলি গাছ থেকে ছিঁড়ে নিতে থাকে।
আমি অসহায়ভাবে ঘরে শুয়ে, নিজের ভিতরে, সব শুনি;
আমার সকল ফল, সব মাছ, ওরা রাত্রে, চুরি করতে চায়। 
কিছু মাছ নিজের মনের জোরে লাফ দিয়ে পার হয় বেআইনি জাল;
কিছু ফল অবৈধ হাত গলে নেমে যায় জলে; শব্দ হয়—
সরসী সমস্তরাত কথা বলে, আজও বলে। পুকুরের
শব্দের ভিতরে, রাত্রে, পৃথিবীর সব উপাখ্যান শোনা যায়।


বোধগম্যতা

হৃদয়ের চেয়ে বেশি মৌলিক মানুষের মুখ—
নিজের ভিতর দিয়ে করাতের মত 
হাঁটি আর দেখি।
শব্দ হয়; শব্দহীনও হয়—
নিজেকে বুঝতে গিয়ে বোধগম্যতার ওই পাশে চলে যাই,
চেতনার অন্ধকারে দেখি শুয়ে আছে 
পচা পাতা, পুকুরের অলৌকিক পতনের শব্দ...

শঙ্কা, ভয়, অবিশ্বাস, স্বার্থপরতা, বহুভাবে খণ্ডীভূত মন
ভয় লাগে; চেতনার মধ্যে এত চৈতন্যহীনতা?
পানির বিমর্ষতা স্থলে ভেসে আসে, 
মেলানকোলিক শয়তান আমার এ ডিএনএতে 
রেল লাইনের মত শুয়ে আছে।
দিগন্ত বিভক্ত করে আকাশ ছাড়িয়ে চলে গেছে
নিজের ভিতর দিয়ে চলতে থাকা করাতের রেল-লাইন, গান।

গভীর শীরার মধ্যে কোন এক ধৃত পাখি ছটফট করে।
ঘাম কিম্বা বেদনাকে অতিক্রম করে যাওয়া 
মানবিক চিন্তা বা কথা, অন্যের ব্যথাকে বোঝা,
অন্যের ঘামকে বোঝা, এসব কোথায়? 
ঘুরে ঘুরে গুহার গভীরে নামা পিপড়ার মতো
চৈতন্যে শত শত মুখ নেমে আসে—
দেখি, মুখই মৌলিক, 
স্তনের চেয়ে বেশি সুগঠিত মানুষের মুখ;
হৃদয়ের চেয়ে বহু বেশি অদ্বিতীয়
মানুষের ভাঙাচোড়া মুখ;
ফলে চোখ জ্বলে,
মানুষের মৌলিক মুখের পিছনে
চেতনার অমৌলিক বিদ্যুৎ চলে যাওয়া গুহা দেখা দেয়;
স্তন বা হৃদয়ের চেয়ে বেশি মুখ ও মুখোশ মনে পড়ে।

নিজের ভিতরে আমি ধীরে ধীরে করাতের শব্দের মতো
ঢুকতে থাকি। পা ফেলি ভঙ্গুর কাঁচে— 
ম্লান নিজ প্রতিবিম্ব দেখে
প্রেম আর জাগে না হৃদয়ে; 
বেদনায় পরমায়ু ঐ যত ভেঙে ফেলা আয়নার সমান।
চূর্ণ আয়নার প্রতি খণ্ডে, খণ্ড খণ্ড যাকে দেখি, সেকি আমি? 
কোথায় সম্পূর্ণ আমি? তাকে আর জানি না, দেখি না।

গভীর অরণ্য হতে করাতের ধ্বনিগুলি ধীরে ধীরে
সকল শব্দের মূলে নেমে যেতে থাকে। 
গুহার অনেক নিচে হাত ফসকে পড়ে যাই, আমি।
চেতনার অন্ধকারে ছিন্নভিন্ন হওয়া মুখ হাতে নিয়ে 
বসে থেকে দেখি,
আত্মা আর কিছু নয়, মানুষের আত্মপরতার,
শুনতে শোনায় ভাল এ রকম নাম।
নিজের চৈতন্য মধ্যে করাতের রেল-লাইন,
করাতের মত নেমে যায়।