১/১১ ভুলে গেলে চলবে কি?

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৯ জুলাই ২০১৮ | ৪ শ্রাবণ ১৪২৫

১/১১ ভুলে গেলে চলবে কি?

শুভ কিবরিয়া ৭:১১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৮

print
১/১১ ভুলে গেলে চলবে কি?

১/১১-এর কথা প্রায়ই ভুলেই গেছে মানুষ। অন্তত এই দিনের সংবাদপত্র দেখলে তাই মনে হয়। অথচ আমাদের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি বদলে দিয়েছে এই দিনের ঘটনাপ্রবাহ। রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক যাত্রাপথ যে ভাবে বিন্যস্ত হতে পারত তার অভিমুখটাই যেন অবিশ্বাস আর সন্দেহের দোলাচলে পথ হেঁটে এক অদ্ভুত আধারে জায়গা নিল। আমাদের আজকের দিনের রাজনীতি যে অবিশ্বাস আর প্রতিহিংসাপথে দাড়িয়েছে তার একটা বদলক্ষণ ছিল এই ১/১১।

রাজনীতিবিদদের বদলে সেনা সমর্থিত একদল অরাজনৈতিক ব্যাক্তির হাতে তখন গেল দেশ। শুরু হলো রাজনীতিকে শুদ্ধিকরণের গ্রামারবহির্ভূত চেষ্টা। সেই চেষ্টায় তাৎক্ষণিকভাবে সমর্থন দিয়েছিল জনগণ। কিন্তু মানুষের সেই আশা পূরণ হয়নি। অরাজনীতির হাতে রাজনীতির মানবদলের ভুল চেষ্টা আরও বড় ভুলের জন্ম দিয়েছেই কেবল।

এই লেখা লিখতে বসে ভারতের বিশিষ্ট চিন্তাবিদ , সাধক, পন্ডিত, অর্থনীতির শিক্ষক অম্লান দত্তের কথা মনে পড়ছে। ২০০৮ সালে বাংলাদেশে এসেছিলেন এক স্মারক বক্তৃতা দিতে। তখন তাঁর একটা সাক্ষাতকার নেবার সুযোগ ঘটেছিল। নিউজ ম্যাগাজিন ‘ সাপ্তাহিক’-এ প্রকাশিত হয়েছিল সে সাক্ষাতকার। সেসময় তিনি গণতন্ত্র সম্পর্কে বেশ কিছু কথা বলেছিলেন।

তাঁর কথাগুলো স্মরণযোগ্য-

এক. যদি দুজনের মধ্যে ঝগড়া থাকে তখন ওই অবস্থাতে দুজনে কী করা যায়? হয় দুজনে মারামারি শুরু করে দিতে পারে, তা না হলে দুজনের একজনকে বিচারক রেখে বিচার চাইতে পারে। এই বিচার ব্যবস্থা হলো গণতন্ত্রের একটা প্রধান কথা। গণতন্ত্র বিষয়ে বলতে গিয়ে বলা হয় যে, গণতন্ত্র হলো ‘রুল অব ল’, আইনের শাসন। তার মানে বিচার ব্যবস্থা। তোমার আর আমার মধ্যে ঝগড়া হলে তুমি-আমি কেউই সত্যটা ঠিকমতো দেখতে পাব না। কাজেই একজন তৃতীয় পক্ষ ব্যাপারটা বুঝে কার কতটা দোষ-গুণ বিচার করে বলে দেবে। গণতন্ত্র হলো মারামারির বিকল্প।

দুই. আমরা বলি, অশিক্ষিত লোকেরা গণতন্ত্র কি বুঝবে? কিন্তু আমি দেখি যে, শিক্ষিত লোকেরাই গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে দল পাকায় বেশি। অশিক্ষিত লোকেরা কিন্তু গণতন্ত্রের পক্ষেই। মৌলবাদীরা যে একেবারে অশিক্ষিত বলে মৌলবাদী এ রকম নয়। মৌলবাদী নেতারা কিন্তু অশিক্ষিত বলে মৌলবাদী নেতা হননি।

তিন. সাধারণ মানুষ যতটা পেরেছে গণতন্ত্রের সপক্ষেই ভোট দিয়েছে। কিন্তু তাদের হাতে ক্ষমতা নেই। যাদের হাতে ক্ষমতা আছে তারা গণতন্ত্রের বিপক্ষেই গেছে। অনেক জায়গাতেই দেখতে পাবেন যে, সেনাবাহিনী গণতন্ত্রের পক্ষে না গেলে কিন্তু গণতন্ত্র রক্ষা করা খুব কঠিনই হয়। সেনাবাহিনীর হাতে যদি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতা গিয়ে পড়ে তবে গণতন্ত্রের অবস্থা একটু খারাপ হয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর হাতে ক্ষমতা বেশি আছে।

০২.
অম্লান দত্ত পোড় খাওয়া মানুষ। প্রাচ্য পাশ্চাত্যের রাজনীতি ও সমাজের অনেক উথালপাতাল দেখার সুযোগ তাঁর হয়েছে। সেকারণেই তিনি রাজনীতিতে গণতন্ত্রহীনতার বিপদ টের পেয়েছিলেন। হালে বাংলাদেশ নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তারাও গণতন্ত্রহীনতার বিপদ হিসাবে ধর্মবাদি চরমপন্থার কথা বলছেন। সম্প্রতি নাগরিক অনলাইন-এর সাথে সাক্ষাতকারে আমেরিকার ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক বিশিষ্ট রাজনীতি বিশেষজ্ঞ ড. আলী রীয়াজও একইরকম আশংকা ব্যক্ত করেছেন।

তিনি বলেছেন ,‘ সারা পৃথিবীতেই রাজনীতিতে ধর্মের প্রভাব বাড়ছে। তার একটা অন্যতম কারণ হচ্ছে বিশ্বায়নের ফলে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা, আরেকটা হচ্ছে পপুলিস্ট বা লোকরঞ্জনবাদী রাজনীতির বিস্তার। লোকরঞ্জনবাদীরা ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদের ওপর ভর করে তাঁদের আবেদন তৈরি করে। বাংলাদেশের সমাজে ধর্মের প্রভাব নতুন নয়, আগেও ছিলো।

রাজনীতিতে এর প্রভাব বেড়েছে, সেটা শুরু হয়েছে ১৯৭০-এর দশক থেকেই। সমাজে ধর্মের প্রভাব এখন আগের চেয়ে বেশি দৃশ্যমান। আমার পর্যবেক্ষন হচ্ছে গত এক দশকে বাংলাদেশের সমাজের ইসলামীকিকরণ আগের চেয়ে বেশি হয়েছে। এর কারণ বহুবিধ – অভ্যন্তরীণ কারণ আছে, বৈশ্বিক কারণ আছে। সমাজ ও রাজনীতিতে ইসলামের কেবল এক ধরনের ব্যাখ্যার প্রভাব বাড়ছে এমন নয়। অত্যন্ত রক্ষণশীল এক ধরনের ব্যাখ্যার প্রভাব বাড়ছে, আবার দেখছি এক ধরনের আক্ষরিক ব্যাখ্যার প্রভাব বাড়ছে।

এই আক্ষরিক ব্যাখ্যার একটা উৎস বৈশ্বিক। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এর দুইয়ের প্রভাবই পড়ছে এবং পড়বে। কেবল ইসলামপন্থীরা বাংলাদেশের রাজনীতির রূপ নির্ধারন করবেন না; সেটা বরঞ্চ আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি করবে, অন্য দলগুলোর তাতে ভূমিকা থাকবে। কিন্ত সমাজের এই পরিবর্তন এবং অন্য দলগুলোর ভূমিকার কারণে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্ম একটি বড় জায়গা করে নিয়েছে। তার আশু পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখিনা। বরঞ্চ তার আরো বেশি বিস্তার লাভ করবার সম্ভাবনাই বেশি।’

০৩.
রাজনীতিতে বিদ্বেষ বাড়ছে। সেই বিদ্বেষ অনিশ্চয়তা বাড়িয়ে দিচ্ছে। সহনশীলতার অভাব রাজনীতি থেকে মানুষের ব্যাক্তিগত ও সামাজিক আচরণকে প্রভাবিত করছে।এই দ্বন্দ মানুষকে মৌলবাদি প্রবণতার দিকে ঠেলছে। এটা বিপদের কথাই শুধু নয় ভয়ের কথাও বটে। রাজনীতি ও সমাজের এই বিপদজনক প্রবণতার দিকে ইংগিত করেছিলেন অম্লান দত্ত সেই ২০০৮ সালেই ।

তাঁর ভাষায় ,‘ ধরুন, আপনার সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, বন্ধুত্ব আছে। সে রকম যদি হয় তো যার সঙ্গে আমার মোটামুটি পরিচয় আছে তার সঙ্গে কথা বলার সময় আমি তাকে অতি ভালোও বলব না, অতি মন্দও বলব না। আমি তার দোষগুণ দুটোই খুব সাবধানতার সঙ্গে বলব। সেও আমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমার সম্পর্কে খুব হিসাব করেই বলবে।

কিন্তু যদি আমাদের দুজনের মধ্যে যুদ্ধ লেগে যায় তখন আমিও ওর মধ্যে মন্দ ছাড়া কিছু দেখতে পাব না, সেও আমার মধ্যে মন্দ ছাড়া কিছু দেখতে পাবে না। ওটাই মৌলবাদ। মৌলবাদ বোধহয় এক ধরনের বিদ্বেষ থেকেই আসে। তখন নিজের ধর্মে সব ধরনের গুণ দেখে আর অন্যের ধর্মে সব ধরনের দোষ দেখে। এটাও এক ধরনের মৌলবাদ। অথচ আচরিত ধর্মের সব জায়গাতেই গুণ-দোষ মিলিয়েই থাকে। ‘

০৪.
রাজনীতি বৈরী ও বিদ্বেষজাত হলে তার স্বাভাবিক বিকাশ রুদ্ধ হতে বাধ্য। গণতান্ত্রিক পথে স্বাভাবিক নিয়মে রাজনীতিতে ক্ষমতার পরিবর্তন না হলে তা যেমন রাজনীতিতে প্রাতিষ্ঠানিক বিকাশ বিঘ্নিত করে তেমনি অরাজনৈতিক বড় বিপদকে টেনে আনে। রাজনীতিতে পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর মতবিনিময় না থাকলে সেই বিপদ আরও অনেক উপজাত বিপদকে টেনে আনে। কখনও তার নাম হয় ১/১১ , কখনও তার নাম হয় ধর্মবাদি চরমপন্থা। এসব বিপদ অনেক কারণে ঘটতে পারে তবে গণতন্ত্রের মুক্ত জানালা রুদ্ধ না হলে এই বিপদের হাত থেকে বাঁচার পথ গুলো খোলা থাকে।

আমাদের এখন সেই বদ্ধ দুয়ার খুলতে হবে। খুলতেই হবে।

আর সে কারণেই ১/১১ কে মনে রাখতে হবে। কেনো এই বিপর্যয় ঘটেছিল সেই কারণগুলোকে খুঁজতে হবে।

শুভ কিবরিয়া: সিনিয়র সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক।
kibria34@gmail.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত শুভ কিবরিয়া এর সব লেখা
 
.



আলোচিত সংবাদ