বস্ত্রহারা ট্রাম্প

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৭ জুলাই ২০১৮ | ২ শ্রাবণ ১৪২৫

বস্ত্রহারা ট্রাম্প

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী ৬:৫২ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১২, ২০১৮

print
বস্ত্রহারা ট্রাম্প

আমেরিকার জনসাধারণ অভিজাতদের দ্বারা পরিচালিত শাসন কোনদিন গ্রহণ করেনি কিন্তু আজ পর্যন্তও তারা পুঁজিপতিদের জন্যই সরকার, এই হেমিলটনীয় বিশ্বাস থেকেও কখনও দুরে সরে যায়নি। ২০১৬ সালের নভেম্বরে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে যখন ডোনাল্ড ট্রাম্প ও হিলারি ক্লিনটন প্রতিদ্বন্ধিতা করছিলেন তখন আমি বলেছিলাম হিলারি ক্লিনটন এই নির্বাচনে হারতে পারেন। দৃঢ়তা নিয়ে টেলিভিশন টকশোগুলোতে বলেছিলাম ট্রাম্প নির্বাচিত হবেন। ইউটিউবে দেখতে পারেন।

আমেরিকার ইতিহাস বিস্তারিত পড়েছি এবং আমেরিকার মানুষের মনের মতিগতি সম্পর্কে একটা ধারণা লাভ করেছিলাম বলেই ট্রাম্প নির্বাচিত হবে বলে বলেছিলাম। ট্রাম্প পুঁজিবাদের পক্ষের লোক শুধু নন তিনি নিজেই খোদ পুঁজিপতি। সুতরাং আমেরিকান সমাজের অপুঁজিপতি হিলারি ট্রাম্পের মতো পুঁজিপতিকে পরাজিত করে কি করে!

ট্রাম্প প্রার্থী হয়ে ছিলেন রিপাবলিকান পার্টি থেকে। রাজ্যের গভর্নর, সিনেটর, প্রাক্তন আমলা সবাইকে প্রাইমারিতে পরাজিত করে চূড়ান্তভাবে তিনি রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থিতা লাভ করেছিলেন। বিল ক্লিনটন আর বারাক ওবামার প্রভাবে ডেমোক্রেট পার্টির নমিনেশন পেয়েছিলেন হিলারি। হিলারি মহিলা, আমেরিকানেরা কখনও কোনো মহিলাকে পূর্বে প্রেসিডেন্ট করেনি হঠাৎ করে একজন মহিলাকে প্রেসিডেন্ট করার মতো আমেরিকানদের মানসিক প্রস্তুতিও ছিলো না। সুতরাং দুনিয়ার সব মানুষ হিলারির পক্ষে হলেও আমেরিকান ভোটারেরা শেষ পর্যন্ত হিলারিকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করেনি। প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন ডোনাল্ট ট্রাম্প।

গত দশ বছরব্যাপী বিশ্বে আর্থিক মন্দা চলছে। আমেরিকার ১৩০টি ব্যাংক দেউলিয়া হয়েছে। মোটর কোম্পানীগুলোও নিজেদেরকে দেউলিয়া ঘোষণার জন্য আদালতের অনুমতি চেয়েছিলো। বারাক ওবামা ২০০৮ সালে প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে মোটর কোম্পানীগুলোর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন বলে আপাতত রক্ষ পেয়েছে।

বারাক ওবামা ৮ বছর প্রেসিডেন্ট ছিলেন। তিনি রাষ্ট্রীয় তহবিল খরচ করেছেন করপোরেট হাউসগুলোকে মন্দার কবল থেকে উদ্ধার করার জন্য। হেমিলটনীয় নীতিকে তিনিও পরিহার করার কোন চেষ্টা করেননি। তাতে আমেরিকার একশতাংশ লোকের হাতে পুঞ্জিভূত সম্পদ রক্ষা পেয়েছে কিন্তু সাধারণ মানুষের আর্থিক অবস্থা করুণ থেকে করুণতর হয়েছে। ডোনাল্ট ট্রাম্প সাধারণ মানুষের দুর্গতি গোচাবার কথা বলেছিলেন, যা হিলারি বলেননি। হিলারি আগাগোড়া তার নির্বাচনী প্রচারে ওয়াল ষ্ট্রীটের মন যুগিয়ে কথা বলেছেন। সাধারণ মানুষের দুঃখ দুর্দশার বিষয়ে চিন্তা করার কোন অবকাশ পাননি।

ট্রাম্প সাধারণ মানুষের দুর্দশার কারণগুলো নির্ণয় করেছেন সত্য কিছু তার সমাধানের কোন পরিকল্পনা পেশ করেননি। মোদ্দা কথায় বলেছেন ‘আমেরিকানিজম’। আজন্ম ট্রাম্প বড়লোক। দরিদ্রদের সঙ্গে কখনও মিশেননি, দারিদ্রতার বিষয়ে কোন প্রত্যক্ষ জ্ঞান নেই। সুতরাং কোন উপকার করতে ইচ্ছা করলেও অনবিজ্ঞতার কারণে তা এখনও সম্ভব হয়ে উঠেনি।

আমেরিকান সমাজ ব্যবস্থাও কখনও দরিদ্র মানুষগুলোকে নিয়ে চিন্তার অবকাশ তৈরি করে না। বয়স হলে অনেক মানুষের হুস-জ্ঞান লোপ পায়। মানুষ হিসেবে ট্রাম্পের হুস-জ্ঞান সম্ভবতো বেশী লোপ পেয়েছে। হোয়াইট হাউসে এমন প্রেসিডেন্ট যে আর কখনও আসেনি তা নয়। ট্রাম্পকে অনভিজ্ঞতায় জর্জরিত করে তুলছে বেশী। এর আগে কখনও তিনি রাষ্ট্র চালানোর কাজে সম্পৃক্ত ছিলেন না। এমনকি রাজ্যসভার সদস্য পর্যন্ত ছিলেন না।

দীর্ঘ সময়ব্যাপী যারা সিনেটর ছিলেন সাধারণত তারা প্রেসিডেন্ট হলে ভালোভাবে রাষ্ট্র চালাতে পারেন- এটা আমেরিকার সুশীল সমাজের কথা। প্রেসিডেন্ট নিক্সন ওয়াটারগেট কেলেংকারির তাড়া খেয়ে যখন ইম্পিচমেন্টের সম্মুখিন হচ্ছিলেন তখনও তার অবস্থা হুসহারা মানুষের মত হয়ে গিয়েছিলো। তার দিশেহারা ভাব দেখে তার দেশরক্ষামন্ত্রী তার হাত থেকে পরমাণু অস্ত্রের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছিলেন।

রিগ্যানও বুড়ো বয়সে প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন। হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্টের চেয়ারে বসে কন্ট্রাদের নিয়ে কিছু উল্টো সিধে কাজ করেছিলেন কিন্তু হোয়াইট হাউসের সামনে গুলি খাওয়ার পর হাসপাতাল থেকে এসে অবশিষ্ট সময় খুবই ধীর স্থির পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টাই করেছিলেন এবং সম্মানের সঙ্গে বিদায় নিতে পেরেছিলেন।

শক্তিশালী প্রেসিডেন্টদের মাঝে উড্রো উইলসন তার মেয়াদের শেষ সময়ে এসে ষ্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার কারণে অথর্ব হয়ে গিয়েছিলেন। তখন কার্যত উইলসনের স্ত্রীই নেপথ্যে থেকে রাষ্ট্র পরিচালনা করতেন। তখন লোকে এটাকে পেটিকোট সরকার বলতো। তবে কোনভাবেই রাষ্ট্র এ সময়ে কোন ব্যাপারে বিব্রতবোধ করেনি।

সাম্প্রতিক সময়ে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে নিয়ে সাংবাদিক মাইকেল ওলফ ‘ফায়ার এন্ড ফিউরি ইন সাইড দি ট্রাম্প হোয়াইট হাউস’ নামে একটি বই লিখেছেন। বইটি এরই মাঝে বেস্ট সেলার বুকের মর্যাদা পেয়েছে। ২ ঘন্টার মাঝে সব বই বিক্রি হওয়ার নজির বিরল। শুধু আমেরিকা প্রজাতন্ত্রটি প্রতিষ্ঠা হওয়ার সময় ১৭৭৬ মাইল টম পেইন ‘কমন সেন্স’ নামে একটি বই লিখেছিলেন। সেই বইটিও নাকি প্রথম মুদ্রনে ৫০০ কপি ছেপেছিলো আর সবই নাকি বের হওয়ার ২ ঘন্টার মধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিলো।

আসলে আমেরিকানদের সঙ্গে বৃটিশদের গৃহযুদ্ধ চলছিলো দীর্ঘ সময়ব্যাপী আর গৃহযুদ্ধটি টম পেইনের ‘কমন সেন্স’ বের হওয়ার পর স্বাধীনতা যুদ্ধের রূপ পরিগ্রহ করেছিলো। সে জন্য আমেরিকানেরা টম পেইনকে আমেরিকার ‘ধর্মপিতা’ বলে ডাকে। আমেরিকার স্থপতি ওয়াশিংটন, এডামস্, জেফারসন্স আর হেমিলটনেরা এই পুস্তকটিকে বাইবেলের মতো মর্যাদা দিতেন। মাইকেল ওলফ এর লেখা বই ‘ফায়ার এন্ড পিউরি ইনসাইড দি ট্রাম্প হোয়াইট হাউস’ আর ১৭৭৬ সালে লেখা টম পেইনের ‘কমন সেন্স’ বইটি এক বেস্ট সেলার বই ছাড়া আর কোনভাবে তুলনা করার মত নয়। একটা নবীন আর আরেকটা প্রাচীন। তবে উভয় বইয়ের বিষয় বস্তু আমেরিকা।

১৭৭৬ সালে যখন আমেরিকার স্থপতিরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভূগছিলেন তখন ‘কমন সেন্স’ বইটি তাদের কাছে পথটা স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন। তখন কিন্তু ওয়াশিংটনেরা ক্লান্তিতে ভূগছিলেন। ওয়াশিংটন স্বাধীনতার বিষয়টাকে তার সৈনিকদের কাছে স্পষ্ট করে যুদ্ধটাকে গৃহযুদ্ধ নয় স্বাধীনতার যুদ্ধ বলে ঘোষণা করে নব উদ্দীপনায় যুদ্ধের তীব্রতা বাড়াতে পেরেছিলেন।

সিজার যদি ক্লান্তিতে ভূগতে আর সিদ্ধান্তহীনতায় বসে থাকতেন তবে ফারসোলিয়ার যুদ্ধ হতো একটা সাধারণ যুদ্ধ। ওয়াশিংটনও যদি সিদ্ধান্তহীনতায় দিন কাটাতেন তবে আমেরিকার গৃহযুদ্ধ ইংল্যান্ডের সঙ্গে আলোচনায় বসে নিবৃত্ত হয়ে যেত। ‘কমন সেন্স’ বইটি যুদ্ধকে শেষ হতে দিল না। শেষ পরিণতিতেও যুদ্ধটাকে স্বাধীনতার যুদ্ধে পরিণত করে ছেড়েছিলো।

আমেরিকার এখন গভীর সংকটের কাল। সংকট উত্তরনের জন্য তার একজন দক্ষ সাহসী প্রেসিডেন্টের প্রয়োজন। বর্তমান প্রেসিডেন্ট তার পূর্ণ মেয়াদ ক্ষমতায় থাকলে আমেরিকা তার বিশ্ব নেতৃত্ব হারাবে। সুতরাং মাইকেল ওলফ বইটি লিখে ট্রাম্পকে বস্ত্রহারা করেছেন। নির্বাচনের সময় রাশিয়ার মদদ ছিলো। এ বিষয়ে তদন্ত চলছে।

ওলফও তার বইয়ে বলেছেন ২০১৬ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময় ট্রাম্প-এর পুত্রের সঙ্গে রাশিয়ার কর্মকর্তাদের বৈঠককে ‘রাষ্ট্রদ্রোহ’ ও ‘দেশ প্রেমহীনতা’ বলে হোয়াইট হাউসের সাবেক চীফ ষ্ট্র্যাটেজিস্ট। স্টিভ ব্যাননের অভিযোগের কথা গভীর পর্যবেক্ষণের দাবী রাখে। ওলফ ট্রাম্পের কাছে থাকা দুই শ’ লোকের সাক্ষাৎ নিয়েছেন। এই বই লিখার সময় এবং সবার কাছ থেকে কম-বেশ একই কথা শোনা গেছে যে ‘ট্রাম্প শিশুর মতো তার কোন বিশ্বাসযোগ্যতা নেই।’ ওলফ তার বইটিতে ট্রাম্পের প্রতিটি আচরণের বিষয় খুবই মনযোগ দিয়ে উপলব্ধি করার চেষ্টা করেছেন এবং তা তার বইতে বিস্তারিতভাবে লিখেছেন।

ট্রাম্প বলেছেন, ওলফ-এর বইটি মিথ্যায় ভরপুর। তার সঙ্গে আমার দেখাও হয়নি সে কখনও হোয়াইট হাউসেও আসেনি। ওলফ বলেছেন, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে তার কথোপকথনের নোটও আছে, রেকর্ডও আছে। ওলফ হোয়াইট হাউসেও গিয়েছেন বার বার। জিম ভ্যানডেহেই ও মাইক অ্যালেনের মত হোয়াইট হাউসে কর্তব্যরত ব্যক্তিরা বলেছেন বইটিতে ট্রাম্পের ‘সক্ষমতা ও মানসিক’ অবস্থা নিয়ে যা বলেছে তা ‘শতাংশে সত্য’। এটা বুঝতে ট্রাম্পের কাছের মানুষের প্রয়োজন হয় না। ট্রাম্পের প্রতিদিনের টুইট বার্তা দেখলেই চলে। রাশিয়ার পুতিন, চীনের শি জিনপিং, জার্মানীর মারকেল, বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে অথবা ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট কেউই এ সস্তা ব্যবস্থায় নিজেদের মতামত প্রকাশ করেন না।

যাদের কথায় বিশ্বের গতি ফিরে তারা যদি মুহুর্তে মুহুর্তে টুইট বার্তা দিয়ে থাকেন তবে শীর্ষ স্থানীয় ব্যক্তির মতামত জল-ভাত হয়ে যায়। রাষ্ট্রীয় মর্যাদাও ক্ষুন্ন হয়। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিরও এমন অভ্যাস রয়েছে। ডিগনিফাইড পোষ্টে থাকা লোকদের এ অভ্যাস নিম্নমানের বলে বিবেচিত হয়।

ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করে আমেরিকানেরা ভুল করেছে এখন তারা তা উপলব্ধি করছে এবং ইমপিচ করার সুযোগের তালাশে আছে। অনেক আমেরিকান সুশীল বলেছেন শাসনতন্ত্রে ২৫তম যে সংশোধনী আনা হয়েছিলো তা দিয়েই তাকে ঘায়েল করা যায়।

আমেরিকার প্রেসিডেন্টের পদ থেকে ট্রাম্পকে দ্রুত সরানো না গেলে বিশ্বব্যবস্থা নষ্ট হয়ে যাবে। ওলফ তার বইতে যা বলেছেন তা আমেরিকার সাধারণ লোকের মুখে মুখে আছে। তবে তিনি তা বই আকারে প্রকাশ করে রাজা ট্রাম্পের বস্ত্রই কেড়ে নিলেন।

বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলাম লেখক।
bakhtiaruddinchowdhury@gmail.com

 
মতান্তরে প্রকাশিত বখতিয়ার উদ্দীন চৌধুরী এর সব লেখা
 
.



আলোচিত সংবাদ