ধর্ষণ যাচাইয়ে মজনুর রিমান্ড কি জরুরি ছিল?

ঢাকা, শনিবার, ১৮ জানুয়ারি ২০২০ | ৪ মাঘ ১৪২৬

ধর্ষণ যাচাইয়ে মজনুর রিমান্ড কি জরুরি ছিল?

এখলাসুর রহমান ২:৩১ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১১, ২০২০

ধর্ষণ যাচাইয়ে মজনুর রিমান্ড কি জরুরি ছিল?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ছাত্রী ধর্ষণের ঘটনায় গ্রেফতারকৃত মজনুকে রিমান্ড আবেদনের জন্য আদালতে আনা হলে এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থায় মজনু সারাক্ষণ কাঁপছিল বলে সংবাদপত্রের খবর বেরিয়েছে৷ ৯ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার দুপুরে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবেদনের শুনানি শেষে তাকে ৭ দিনের রিমান্ড প্রদান করেছে৷ শুনানির শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত মাথা নিচু করে ছিল মজনু৷ তার পুরো শরীর কাঁপছিল। পুরো সময়জুড়ে সে ছিল নিশ্চুপ ও অস্বাভাবিক৷ উল্লেখ্য, গত ৫ জানুয়ারি রাজধানীর কুর্মিটোলায় এই  ধর্ষণের ঘটনা ঘটে৷ এভাবে একের পর এক ধর্ষণের ঘটনা ঘটেই চলেছে৷ ধর্ষণবিরোধী ক্ষোভ বিক্ষোভের সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলছে ধর্ষণও৷ এর আগে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে তনু, ফেনীর ফুলগাজীতে মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত ইস্যুতেও মানুষ রাজপথে নেমে বিক্ষোভ করেছে৷ এর মধ্যে খবর বেরোলো ময়মনসিংহে রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে এক মাদ্রাসাছাত্রীকে গণধর্ষণ করেছে ধর্ষকরা৷

রাজধানী শহরসহ সমগ্র দেশে নারী ধর্ষণের ঘটনা ক্রমশ বেড়েই চলছে৷ নুসরাতকে ধর্ষণ ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হল৷ এর বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠল দেশ৷ ব্যাপারটি প্রধানমন্ত্রীর নজরে গেল এজন্য হয়তো অধ্যক্ষ সিরাজ উদ দৌল ও সাঙ্গপাঙ্গরা গ্রেফতার হল৷ নুসরাতকে দুঃশ্চরিত্রা প্রমাণের চেষ্টাও কম হয়নি৷ প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ না করলে হয়তো নুসরাত নিশ্চিত দুঃশ্চরিত্রাই হয়ে যেতো৷ সম্প্রতি ঢাকার কুর্মিটোলায় ধর্ষণের শিকার হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী৷ কেনো এভাবে সর্বত্র আমাদের নারীরা রাস্তাঘাটে চলাফেরার স্বাধীনতা হারিয়েছে? সংবাদপত্রে ধর্ষক মজনুর চেহারা দেখে ও তার পরিচয় জেনে নানামুখি আলোচনা সমালোচনা চলছে৷ পুলিশ বলছে সে একজন সিরিয়াল রেপিস্ট, মাদকাসক্ত ও ছিনতাইকারী৷ সে ভিক্ষুক ও প্রতিবন্ধীদের ধর্ষণ করত৷ তাহলে সে এ পর্যন্ত কতজনকে ধর্ষণ করেছে? এইসব ধর্ষণের কোনো বিচার হয়নি বলেই কি মজনু এমন বেপরোয়া ধর্ষক হয়ে উঠল না? এসব ধর্ষণ যেভাবে চেপে গেছে শিক্ষার্থী ধর্ষণটা নিয়ে দেশব্যাপী আন্দোলন বিক্ষোভ না হলে কি তাও সেভাবেই চেপে যেত না?

মজনুকে নিয়েও শুরু হয়েছে নানামুখী আলোচনা৷ কেউ বলছে আসল ধর্ষক ধরাছোঁয়ার বাইরে তাকে আড়াল করতেই জজ মিয়ার মতো মজনুকে সাজানো হয়েছে৷ পুলিশ বলছে মজনুই ধর্ষক, শুধুই ধর্ষক নয় সিরিয়াল ধর্ষক৷ আসলে সত্যি কোনটা? মজনু কি ধর্ষক না আরেক জজ মিয়া৷ জাতির সামনে সত্যটা উন্মোচন হওয়া খুব জরুরি৷ ৮ জানুয়ারি দৈনিক মানবজমিন পত্রিকার একটি প্রতিবেদনে লিখেছে: নির্যাতিতা ছাত্রী পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি কয়েক দফা চিৎকার করার চেষ্টা করলেও যুবকটি মুখ চেপে ধরে। তাকে মারধর করে। হুমকি দেয়। সুঠামদেহী যুবককের আচরণ দেখে বেশ প্রভাবশালী মনে হয়েছিলো। ওই যুবক বারবার ছাত্রীর পরিচয় জানতে চেয়েছিলো, তখন বেশ ভয় পান নির্যাতিতা। ধর্ষণের এক পর্যায়ে অজ্ঞান হয়ে যান তিনি। এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, মজনুকে কি প্রভাবশালী ও সুঠামদেহী বলা যায়?

এই ফোকলা দাঁতের অর্ধমৃত লোকটির সাথে কি ভিকটিমের বর্ণনার কোনো মিল আছে? তাকে কি অসুস্থ ও প্রতিবন্ধী মনে হয়না? মজনু কি অসুস্থ ও বিকারগ্রস্থ ধর্ষক নাকি আরেক জজ মিয়া? জজ মিয়াকে আইনশৃংখলা বাহিনীর লোকেরাই বানিয়েছিল৷ তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা কি তারা নিজেরাই নষ্ট করেনি?

কার উপর নির্ভর করবে মানুষ? পুলিশের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পঞ্চম শ্রেণির এক ছাত্রীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে রাজধানীর সবুজবাগ থানায়৷ ধর্ষণ থেমে নেই৷ তা চলছেই ঘরে বাইরে সর্বত্রই৷ ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় হাফেজিয়া মাদ্রাসার এক ছাত্রীকে (১৪) রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে রাতভর গণধর্ষণ করেছে ধর্ষকরা৷ ধর্ষণের শিকার ওই ছাত্রী ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছে৷ঢাকার কামরাঙ্গীর চরে ধর্ষিতা হলো এক শিশু৷

প্রতিবন্ধী মেয়ের ধর্ষণের বিচার চেয়ে এখন মামলার আসামি হয়ে পথে পথে ঘুরছেন টিএসসির চা বিক্রোতা জলিল মিয়া ওরফে ‘স্বপন মামা’। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) এলাকায় দীর্ঘ ৪০ বছর ধরে চায়ের দোকান চালাচ্ছেন তিনি। শিক্ষার্থীদের কাছে ‘স্বপন মামা’ নামেই তিনি পরিচিত।

জানা যায়, এক বছর আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সদরের বাসুদেব গ্রামে স্বপন মামার বাকপ্রতিবন্ধী মেয়ে (২০) ধর্ষণের শিকার হয়। এ ঘটনার পর গ্রাম্য সালিশে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চালান মুরব্বিরা। মীমাংসা না হলে অভিযুক্ত বাচ্চু মিয়ার (৫০) নামে মামলা করেন স্বপনের স্ত্রী রহিলা। এক বছর জেলে থাকার পর জামিনে এসে জলিল মিয়া ও তার পরিবারের পাঁচজনের নামে পাল্টা দুটি মামলা করেন বাচ্চু মিয়া। ওই মামলার আসামি হয়ে এখন পথে পথে ঘুরছে স্বপন মামা ও তার পরিবারের সদস্যরা। গরিব হওয়ায় মামলার খরচ চালাতেও হিমশিম খাচ্ছে পরিবারটি৷ পুলিশ কেন ধর্ষক কর্তৃক এই মিথ্যে মামলাটি নিলো? ধর্ষণের এই বিচারহীনতার জন্যই কি ধর্ষণ বাড়ছে না? কেবল মজনুকে গ্রেফতার ও বিচারের মুখোমুখি করতে পেরেই আত্মতৃপ্তিতে ভুগার কিছু নেই৷ ঢাবির শিক্ষাথী ধর্ষণ নিয়ে আন্দোলন বিক্ষোভ না হলে মজনুর অন্য ধর্ষণগুলোর মতই হয়তো তা চেপে যেত৷ পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী সে সিরিয়াল রেপিস্ট ও ছিনতাইকারী হলে এতদিন কিভাবে সে বহাল তবিয়তে রেপ ও ছিনতাই চালিয়ে যেতে পারলো?

মজনু কি রেপিস্ট না বিক্ষোভ দমানোর কৌশলে আরেক জজ মিয়া বানানো৷ এই সন্দেহ ও সংশয় দূর করতে হবে৷ এদিকে ধর্ষকদের মৃত্যুদণ্ড দেয়ার দাবীতে আন্দোলন চলছে৷ ধর্ষণ যে হারে বাড়ছে এ দাবীটা সময়ের বাস্তবতাই নিশ্চয়ই৷ বাসস্টপে, বাসে, ট্রেনে, সড়কে, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় ও মাদ্রাসা সহ সর্বত্রই নারীদের চলাফেরার নিরাপত্তা দিতে হবে৷ ধর্ষক যেই হোক তাকে শাস্তি দিতে হবে৷ নিরাপরাধকে মুক্তি দিতে হবে৷ ধর্ষক কর্তৃক ধর্ষণ মামলার বাদীর বিরুদ্ধে মিথ্যে মামলা নিলো যে পুলিশ তাকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে৷ পুলিশ হেফাজতেও নারীর নিরাপত্তা ও আসামীর সত্য স্বীকরোক্তি প্রকাশ নিশ্চিত করতে হবে৷ মজনু কি ধর্ষক না ধর্ষক নয় তা প্রমাণের জন্য কি রিমান্ড জরুরি ছিল? এ বিষয়ে তার ডাক্তারী পরীক্ষা ও ভিকটিমের বক্তব্যই কি যথেষ্ট ছিল না? জাতি ভিক্টিম রেফারেন্সে পুলিশী বক্তব্য নয়, সরাসরি ভিক্টিমের বক্তব্য চায়৷ কারণ নিকট অতীতে মিন্নীর রেফারেন্সে পুলিশী বক্তব্য মানুষ শুনেছে ও যা বুঝার বুঝেছে৷

লেখক:রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও