সড়কে প্রাণ ঝরছেই

ঢাকা, রবিবার, ১৯ জানুয়ারি ২০২০ | ৬ মাঘ ১৪২৬

সড়কে প্রাণ ঝরছেই

আজমত রানা ৪:৪৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৯

সড়কে প্রাণ ঝরছেই

কৈশোরে আমি প্রথমবারের মতো সড়কের ভয়াবহতা অনুধাবন করেছিলাম। সে বয়সেই বুঝতে পেরেছিলাম সড়কের দুর্ঘটনাগুলো শুধুই দুর্ঘটনা নয়। এর অনেকগুলোই সরাসরি হত্যাকাণ্ড। বাবা সরকারি চাকরি করতেন। সে সুবাদে তার নতুন কর্মস্থল চট্টগ্রাম রওয়ানা হলাম সবাই। তখন সরাসরি চট্টগ্রামে যাওয়ার কোনো বাস ছিল না। সৈয়দপুর থেকে ঢাকা এরপর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম। এভাবেই টিকিট কাটা হয়েছিল।

সেদিন সন্ধ্যায় নৈশ কোচ ছাড়ল সৈয়দপুর থেকে। তখন বগুড়ায় রাতের খাবার বিরতি দেওয়া হতো। বিরতি শেষ হলো, কোচ চলতে শুরু করল। কোচের ভেতরে হাই ভলিউমে হিন্দি গান বাজছে। বাইরে টিপ টিপ করে বৃষ্টি ঝরছে। চালকের ঠিক পেছনে ছিলাম বলে চালকের আচরণ চোখে পড়ছিল। তিনি অবিরত কথা বলে যাচ্ছেন আর হিন্দি গানের সঙ্গে মাথা দুলিয়ে চলছেন। কখনও কখনও নিজেই গান গেয়ে উঠছেন।

এভাবে কিছুদূর যাওয়ার পর আমার বাবা উঠে দাঁড়িয়ে চালককে এভাবে গাড়ি চালানোর সময় কথা না বলার অনুরোধ করেন। চালক বাবার কথায় কান না দেওয়ায় বাবা আবার কিছুটা উত্তেজিতভাবে চালককে কথা না বলতে অনুরোধ করেন। এবার একযোগে চালক, হেলপার আর সুপারভাইজার চড়াও হলেন বাবার ওপর। তাকেই বরং কথা না বলে আসনে গিয়ে বসতে একরকম বাধ্য করেন। বাবা আমার পাশের আসনেই ছিলেন। তিনি কিছুক্ষণ পর পরই ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছেন আর আনমনে বিড় বিড় করছেন।

আমরা ভাইবোনেরা সবাই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কী হয়েছিল কিছুই বলতে পারি না। শুধু কিছু চিৎকার চেঁচামেচি আর কান্নার শব্দ কানে আসছিল। কোথায় আছি তাও ঠাওর করতে পারছিলাম না। এসময় বাবার ডাক কানে আসে। আমাদের নাম ধরে বাবা ডাকছেন। আমরা একে একে কুঁকিয়ে শব্দ করে উঠলাম। বাবা আমাদের খুঁজে পেয়ে একে একে জানালা দিয়ে নিচে নামালেন। মাটিতে নামার পর বুঝতে পারলাম, আমরা সড়কে নেই। আমাদের বাসটা অনেক নিচে উল্টে পড়ে আছে। চারদিকে ঘুটঘুটে অন্ধকার।

রাতের বুক চিড়ে শুধু অনেক মানুষের কান্নার শব্দ কানে আসছিল। সে যাত্রায় আমরা কেউ মরিনি, তবে বাসে থাকা দুজন যাত্রী মারা গেছেন। আমার তিন বোন মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিল। এক বোনকে প্রায় এক মাস রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কাটাতে হয়েছে। আমার বাবার অনেক দাপ্তরিক কাগজপত্র হারিয়ে গেছে। আমরা এক কাপড়ে আবার ফিরে গেছি যেখান থেকে এসেছিলাম। সে দুর্ঘটনার পর প্রায় দু’বছর আমি বাস দেখলেই ভয় পেতাম। কোনো কারণে বাসে উঠলেই মনে হতো এই বুঝি বাসটা উল্টে যাচ্ছে। সেদিনের সে ঘটনাকে কোনো অবস্থাতেই দুর্ঘটনা বলা যায় কি? এটা সরাসরি একটা হত্যাকাণ্ড বললে কি বেশি বলা হবে?

সম্প্রতি দেশ নাড়া দিয়ে গেল নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন। সারা বিশ্ব দেখল একটি অরাজনৈতিক আন্দোলন কীভাবে সবাইকে ‘প্রতিবাদ ন্যায্য’ বলতে বাধ্য করল। শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বাহীন এমন একটা আন্দোলন নিয়ে জাতীয় অধ্যাপক জামিলুর রেজা বলেছেন ‘আন্দোলন একাধিক দুর্ঘটনার ফল’ আর অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেছেন ‘বাস্তবতা উন্মেচিত হলো’। আরও অনেকেই অনেক মন্তব্য করেছেন। এ দুটি মন্তব্যের উদ্ধৃতি দিলাম এ কারণে যে, এ দুটো মন্তব্যের ভেতরেই আছে সব কথা।

আমরা সবসময় বাস্তবতা আড়াল করার চেষ্টা করি। আমরা ভেবে নিই আমি দেখছি না বলছি না মানেই অন্য কেউ দেখছে না। আমি অন্ধ তাই প্রলয় বন্ধ। স্কুলের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে এসে আমাদের সেই না দেখা বাস্তবতাই উন্মোচিত করেছে। একটার পর একটা দুর্ঘটনার কিন্তু কোনো প্রতিকার নেই। এসব দুর্ঘটনায় যার যায় শুধু তারই যায়। সংবাদপত্রের কয়েকটা লাইন দখল করে খবরটা ছাপা হয়। পরের দিন জায়গা আর নাম পাল্টে আর একটা নতুন দুর্ঘটনার খবর ছাপা হয়।

অসহায় পরিবারগুলোর কান্না এভাবেই কান্নার স্তূপে চাপা পড়ে যায়। স্কুলের শিক্ষার্থীরা চোখের সামনেই যখন দেখল তার বন্ধু বেপরোয়া গতির বাসের চাকায় পিষ্ট হলো তখন নিজেদের আর ধরে রাখা সম্ভব হয়নি। তারা এভাবে পথে নেমে এলে ফলাফল কী হতে পারে সেটাও ভেবে দেখেনি একবার। তাদের চাওয়া কী, এটাও তারা সঠিকভাবে প্রথমদিকে বলতে পারছিল না। তাদের এ আন্দোলনের প্রকৃত অর্থে কোনো নেতা ছিল না, পরামর্শক ছিল না, কর্মী ছিল না, সবাই নেতা, সবাই কর্মী। যদিও শেষ দিকে এসে অনেক সুযোগসন্ধানী ভিড়ের মধ্যে ঢুকে আন্দোলনের গতি প্রকৃতি পরিবর্তনের চেষ্টা করেছিল কিন্তু সরকারের সঠিক সময়ে সঠিক পদক্ষেপে তা এগোতে পারেনি।

অদ্ভুত এক কাণ্ড দেখলাম এবার। দাবি জানাতে দেরি হয়েছে কিন্তু দাবি মানতে এবং সেটা কার্যকর করতে কোনো দেরি হয়নি। প্রধানমন্ত্রীর এটা এক বড় বিচক্ষণতা এবং তার এ বিচক্ষণতার ফলেই একটা সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে সবাই রক্ষা পেলাম। আন্দোলন থামল, ষড়যন্ত্র উন্মোচিত হলো, প্রধানমন্ত্রী শিক্ষার্থীদের দাবি মেনে নিলেন, সড়ক ব্যবস্থাপনায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তৎপর হলো কিন্তু সড়কে প্রাণ ঝরে পড়া থামল না। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের আগে ও পরে একই অবস্থা। এক পত্রিকায় খবর এসেছে বছরের প্রথম ৬ মাসে ১ হাজার ৫৪৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছে ১ হাজার ৮৮৩ জন।

এসব দুর্ঘটনায় আহত হয়েছেন ৩ হাজার ৮৩১ জন। গত ১২ আগস্টের খোলা কাগজ পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় শিরোনাম ছিল ‘সড়কে ঝরল ১০ প্রাণ’। সড়কের এ মৃত্যুর মিছিল কোনো মতেই থামছে না। পত্রিকাতেই খবর এসেছে সড়ক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে নয় লাখ ভুয়া চালক। সমস্যাটা শুধু চালকেই সীমাবদ্ধ নয়, আছে ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক আর আমাদের সীমাহীন উদাসীনতা। আমরা কেউই সড়কে নামলে ট্রাফিক আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখাই না। শুধু দক্ষ চালক তৈরি করলেই সমস্যার সমাধান হবে না, যদি যানবাহন হয় ত্রুটিপূর্ণ। চালক-যানবাহন ঠিক থাকল সড়ক হলো খানাখন্দে ভরা- তাহলেও কি দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে? এর পরও মনে করি চালক-যানবাহন আর সড়ক সবই ঠিক আছে, আমরা যদি ঠিক না থাকি তবে কি দুর্ঘটনা এড়ানো যাবে? সড়কে এভাবে প্রাণ ঝরে পড়া থামাতে সমন্বিত পরিকল্পনা দরকার আর দরকার সবার সচেতনভাবে এগিয়ে আসা।

আজমত রানা : সাংস্কৃতিক কর্মী, ঠাকুরগাঁও

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও