পিয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই

ঢাকা, শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯ | ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

পিয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই

ড. মো. হুমায়ুন কবীর ২:১১ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১২, ২০১৯

পিয়াজ উৎপাদন বৃদ্ধির বিকল্প নেই

পিয়াজের বর্তমান বাজারমূল্য সব পর্যায়ের সাধারণ মানুষকে বিপদে ফেলেছে। হঠাৎ করেই নিত্যপণ্য পিয়াজের এমন ধারাবাহিক মূল্যবৃদ্ধি সরকারকেও ভাবিয়ে তুলেছে। দেখা যায়, উৎপাদন মৌসুমে কমমূল্যের কারণে যেসব পণ্য কৃষক রাস্তায় ফেলে দেয়, সেই পণ্যই আবার কিছুদিনের মধ্যে অধিকমূল্যের কারণে বাজারে কিনতে পাওয়া যায় না। উৎপাদন মৌসুমে এবারও কেজিপ্রতি পিয়াজের মূল্য ছিল ১০-১২ টাকা মাত্র। অথচ গত দুই-তিন মাসে অর্থাৎ সেপ্টেম্বর-অক্টোবর-নভেম্বর ২০১৯ সময়ে সেই পিয়াজের মূল্য বেড়ে এখন ১৫০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে।

পিয়াজ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ মসলা জাতীয় পণ্য যার চাহিদা এবং ব্যবহার খুবই অপরিহার্য। প্রয়োজন অনুযায়ী কখনো কখনো কোনো কোনো পণ্যের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে বাজারে এর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। কখনো বেগুন, কখনো চিনি, কখনো লবণ, কখনো কাঁচামরিচ, কখনো আলু, কখনোবা আদা কিংবা রসুন এসব গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের তালিকায় চলে আসে। দেখা যায় কিছুদিন এগুলো আলোচনায় থাকে। হয়তো আমদানিকারকদের উদাসীনতা অথবা ব্যবসায়ীদের কারসাজিতে এসব সংকট সৃষ্টি হয়ে থাকে বলে ধারণা করা হয়। সঠিক সময়ে সঠিক তথ্য কিংবা পরামর্শ না থাকার কারণে সরকারি আমদানি পরিকল্পনা গ্রহণেও বিলম্ব হতে পারে। তবে যেহেতু বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ এবং পিয়াজ উৎপাদনের জন্য যথেষ্ট অনুকূল পরিবেশ আমাদের রয়েছে। কাজেই এখানে কেন আরও অধিক পরিমাণে পিয়াজ উৎপাদন করা হবে না, তা নিয়েই ভাবতে হবে এখন।

সরকার যেসব তথ্য কিংবা পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে বার্ষিক ক্রয় বা আমদানি পরিকল্পনা গ্রহণ করবে সেসব সংস্থার সরবরাহকৃত তথ্যের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক গড়মিল। যার কারণেও হয়তো পরিকল্পনা প্রণয়নে সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশিত কয়েকটি পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে এমন চিত্রই ফুটে উঠে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, পিয়াজ নামক গুরুত্বপূর্ণ পণ্যটির জন্য ২০১৭-১৮ অর্থবছরে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২,১২,১৯৪ হেক্টর এবং মোট উৎপাদন ছিল ২.৩৩ মিলিয়ন মেট্রিক টন, তার পরের বছর অর্থাৎ ২০১৮-১৯ অর্থবছরে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ২,১৬,০০০ হেক্টর এবং মোট উৎপাদন ছিল ২.৩৮ মিলিয়ন মেট্রিক টন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যমতে, ২০১২-১৩ থেকে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে পিয়াজের উৎপাদন বেড়েছে ৫৯% ইত্যাদি ইত্যাদি।

আবার বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের (বিবিএস) তথ্যমতে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১.৮৬ মিলিয়ন টন উৎপাদন হয় যার বিপরীতে চাহিদা হলো ২.৪ মিলিয়ন টন। আরেকটি রিপোর্টে দেখা গেছে, ২৪ লাখ মেট্রিক টন চাহিদার বিপরীতে প্রতিবছর আমদানি করতে হয় কমপক্ষে ১১ লাখ মেট্রিক টন। তবে এটি ঠিক যে উৎপাদনের মাত্রা নির্ভর করে প্রতিবছর চাহিদা এবং আমদানি ভিন্নরকম হতে পারে। সে জন্যই প্রয়োজন সঠিক পরিসংখ্যান। তাছাড়া পিয়াজ একটি পচনশীল পণ্য বিধায় তা আমদানি করে দীর্ঘদিন সংরক্ষণের সুযোগ নেই। সে জন্য আমদানি পরিকল্পনা হতে হবে নির্ভুল।

অর্থাৎ আমরা যে পরিসংখ্যানই বিবেচনা করি না কেন মোট কথা আমাদের চাহিদার সঙ্গে উৎপাদনের ব্যাপক ফারাক রয়েছে। সেই ফারাক পূরণ করার জন্যই প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে পিয়াজ আমদানি করতে হয়। অথচ পিয়াজ উৎপাদনের জন্য সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা বাংলাদেশের কৃষিতে বিদ্যমান। তাহলে প্রশ্ন আসে সমস্যা কোথায়। সেটি নিয়েই আমাদের ভাবার সময়ে এসেছে।

আমাদের বাঙালিদের একটি সংকট হলো যখন যেদিকে যেতে থাকি তখন সবাই সেদিকেই যেতে থাকি। পিছনে ফিরেও দেখি না কিংবা অতশত ভেবেচিন্তে কাজ করি না। সে জন্য আমাদের হুজুগের জাতি বলা হয়। এক সময় আমাদের দেশেই পিয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ ইত্যাদি ফসল আরও বেশি চাষ করা হতো। কিন্তু সেচের সুবিধা পাওয়ায়, উচ্চফলনশীল জাত আবিষ্কৃত এবং উৎপাদন পদ্ধতি সহজ হওয়ায় ও অধিক লাভের আশায় কৃষক এখন ধানের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়েছে। সে জন্য দেখা গেছে সব কৃষক উঁচু-নিচু সব ধরনের জমিতেই এখন ধান আবাদ করছে। তাতে কমে যাচ্ছে উপরোক্ত ফসলের জমির পরিমাণ। আর ধানের উৎপাদন বাড়াতে বাড়াতে আমরা এমন পর্যায়ে চলে এসেছি এখন কৃষক আর ধানের মূল্য পাচ্ছেন না। এমনকি সরকারি গুদামে পর্যন্ত জায়গা সংকুলান হচ্ছে না।

কাজেই এখন ধানের আবাদ কমিয়ে দিয়ে উঁচু জমিতে পিয়াজ, রসুন, আদা, মরিচ, হলুদ ইত্যাদি ফসল উৎপাদনের জন্য জমির পরিমাণ বৃদ্ধি করতে হবে। বিগত কয়েক বছর যাবৎ গোলআলুর উৎপাদন নিয়েও কৃষকের মাঝে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। আমরা জানি যেসব জমিতে আলু উৎপাদিত হয় সেসব জমিতেই পিয়াজ উৎপাদন করা সম্ভব। কাজেই এখন পিয়াজের উৎপাদন বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনে ধান এবং আলুর জমি কমিয়ে দিতে হবে।

আবার সেটি একবার শুরু করলে বারবার তাই করতে হবে এমনটি নয়। তাহলে আবার সমস্যা সৃষ্টি হবে। সে জন্য প্রয়োজন প্রতিবছর সংশ্লিষ্টদের সঠিক সময়ে সঠিক পরিসংখ্যান ও তথ্য দিয়ে সরকারকে পরিকল্পনা গ্রহণে সহযোগিতা করা। কাজেই এভাবেই পিয়াজের উৎপাদন বাড়িয়ে আমাদের এ সংকট মোকাবেলা করলে তা হবে স্থায়ী সমাধান। অন্যথায় পিয়াজ আমদানির কোনো একটি বা দুটি দেশের উপরও আমাদের নির্ভর করার প্রয়োজন হবে না। তখন ব্যবসায়ীরাও সিন্ডিকেট সৃষ্টি করে জনদুর্ভোগ তৈরি করতে পারবেন না। সরকারও বিতর্কের হাত থেকে মুক্তি পাবে। সবার জন্য মঙ্গল বয়ে আসবে।

ড. মো. হুমায়ুন কবীর : কৃষিবিদ ও ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার, জাতীয় কবি কাজী নজরুল
ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও