দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় হয়ে ওঠার দায় কার?

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর ২০১৯ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় হয়ে ওঠার দায় কার?

এখলাসুর রহমান ২:১৬ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ০৪, ২০১৯

দলের চেয়ে ব্যক্তি বড় হয়ে ওঠার দায় কার?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতাকেন্দ্রিক ব্যক্তিচর্চা অনুপ্রবেশ করে রাজনীতির আদর্শিক গণতান্ত্রিক চেতনাকে নষ্ট করে দিচ্ছে। দলগুলো হতে পারছেনা একেকটি আদর্শিক কর্মীবাহিনীর টিম। জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে গড়ে তুললেন বিএনপি। এরশাদ গড়ে তুললেন জাতীয় পার্টি। বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী খন্দকার মুশতাকও কয়েক মাসের জন্য রাষ্ট্রপতি হয়ে গড়ে তুলেন ডেমোক্রেটিক লীগ নামের একটি সংগঠন। ক্ষমতার বলয়ে থাকার সময়ে এসব সংগঠনে ডান বাম সর্বস্তর হতেই নেতাকর্মী যোগদানের হিড়িক পড়ে যায়। এক্ষেত্রে প্রশ্ন মুশতাক, জিয়া, এরশাদ রাষ্ট্রপতি না হলে  এসব দলে কেউ কি যেতেন? দলগঠনের ভিত্তি তাই আদর্শিক না হয়ে ক্ষমতাই নয় কি? আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, শেখ হাসিনা নিজেই তার যোগ্যতা দিয়ে, দক্ষতা দিয়ে নিজেকে অতিক্রম করেছে। শেখ হাসিনা তার ব্যক্তিত্ব দিয়ে, গৌরব দিয়ে, তার সাহস দিয়ে, তার বিচক্ষণতা দিয়ে প্রমাণ করেছেন শি ইজ লার্জার দ্যান আওয়ামী লীগ। আগে শুনতাম ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়। এখন তা উল্টে হয়ে যাচ্ছে দেশের চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে ব্যক্তি বড়।

কী ঘটছে রাজনীতিতে? তোয়াজ আর তেল মর্দনে তা কি ক্রমশই জনগণের জন্য পিচ্ছিল হয়ে উঠছেনা? এখন  টাকা হলে মন্ত্রী-এমপি হওয়া যায়। টাকা হলেই সংগঠনের নেতা  হওয়া যায়। আর মন্ত্রী এমপিদের ঘিরে গড়ে উঠছে একশ্রেণীর তোয়াজকারী ও চাটুকার চক্র। রাজনীতি হয়ে উঠছে ক্ষমতা, কর্তৃত্ব ও  উপার্জনের পথ। চলছে পদ পদবী বেচাকেনা। নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার বাণিজ্য, কমিশন বাণিজ্য প্রভৃতি রাহুর মত ঢেকে দিচ্ছে রাজনীতির জনহিতৈষী আদর্শিক চেতনাকে। মন্ত্রী এমপিদের ঘিরে গড়ে উঠা তোয়াজকারী  ক্ষমতাপূজকরা সবসময় ক্ষমতার পূজা করে নিজেদের আখের গুছাতে চায়। তারা সুসময়ে সরব থাকে দুর্দিনে নিরব হয়ে যায়। এখন রাজপথে হাটবাজারে ও অফিস আদালতে বিএনপির কোন নেতাকর্মী পাওয়া যায়না। কাউকে জোর গলায় বলতেও দেখা যায়না যে সে বিএনপি করে? বরং উল্টো দলে দলে ক্ষমতার পূজো করতে তারা যোগ দিচ্ছে আওয়ামী লীগে। কিন্তু বিএনপি আবার ক্ষমতায় গেলে কি তারা ফের দলে দলে বিএনপিতে ফিরবেনা? হয়তো অনেকেই এসে দলটির গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্বও নিয়ে নেবে। তারা চলে যাবে সামনের সারিতে আর দূর্দিনে লেগে পড়ে থাকারা পড়ে যাবে পেছনের কাতারে। বাংলাদেশের রাজনীতিতে কি এমনটিই চলছেনা?

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের  মাননীয় শেখ হাসিনাকে বললেন যে, শি ইজ লার্জার দ্যান আওয়ামী লীগ। এটা কি দল হিসেবে আওয়ামী লীগের জন্য গৌরবের না অগৌরবের? আর এই লার্জার দ্যান হয়ে ওঠাটা ক্ষমতায় থাকার সময়ে কেন? সম্প্রতি আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হলেন জয়নাল হাজারী। সে খবরটিও দলটির সাধারণ সম্পাদক জানেন না। জয়নাল হাজারীও জোর গলায় বললেন এটা ওবায়দুল কাদেরের জানার বিষয়না। তিনি উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হয়ে আওয়ামী লীগকে ধন্যবাদ জানাননি। জানিয়েছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী মাননীয় শেখ হাসিনাকে। এভাবে ব্যক্তিকে দলের উর্ধ্বে নিয়ে গিয়ে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে দলটিকে? দূর্দিনে দল ও জোট ও সুদিনে ব্যক্তি এগুলো কিসের আলামত? বিএনপি জামাতের ৪ দলীয় জোট সরকারের দমনপীড়নের সময়ে রাজপথে নির্যাতিত হয়েছিল আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। জীবন দিয়েছিল আহসান উল্লাহ মাষ্টার, এস এম কিবরিয়া, স্বপন জোয়ার্দারসহ অসংখ্য নেতাকর্মী। এছাড়া কারাবরণ করেছে হাজার হাজার নেতাকর্মী। একুশে আগস্টে গ্রেনেড হামলায় যেদিন শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়। তখনো মাননীয় শেখ হাসিনাকে বাঁচাতে মানব ঢাল হয়েছে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরাই। তখন কিন্তু পুলিশ কিংবা আইনশৃংখলা বাহিনীর কেউ মানবঢাল হয়নি।

২০১৪ সালে যখন নির্বাচন বানচালের ঘোষণা দেয় বিএনপি জামাত জোট। দেশ জুড়ে অনির্দিষ্ট কালের জন্য অবরোধ ডাকে তারা। পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ করে জানমালের ক্ষয়ক্ষতি সাধন করা হয়। এমনই একটা উত্তপ্ত সময়ে গঠিত হয় নির্বাচনকালীন সরকার। এ সরকারে যোগ দেয় ১৪ দল ও মহাজোটের শরীকরা। এতে মন্ত্রীসভায় যোগ দেন জাসদ সভাপতি হাসানুল হক ইনু। ২০১২ সালে মন্ত্রীত্বের অফার ফিরিয়ে দেয়া ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় পার্টি (জেপি)র সভাপতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ও জাতীয় পার্টি (এরশাদ) এর আনিসুল ইসলাম মাহমুদ সহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ। তখন আওয়ামী লীগের বাইরের ১৪ দল ও মহাজোট নেতৃবৃন্দ নির্বাচনকালীন সরকারে যোগ না দিলে নিশ্চয়ই সে সরকার এক জটিলতার মধ্যে পড়তো। কারণ একদল নিয়ে নিশ্চয়ই নির্বাচনকালীন সরকার গ্রহণযোগ্য হতোনা। আর মাননীয় শেখ হাসিনাও নির্বাচনকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন ব্যক্তি হিসেবে নয় দলের প্রধান হিসেবে। সুতরাং নেতৃত্বের শেকড় যে দলের ও দল নিয়ে গড়ে ওঠা জোটের এতে প্রশ্ন আছে কার? ব্যক্তির চেয়ে যে দল বড় এতে প্রশ্ন আছে কার?

ব্যক্তির দলের উর্ধ্বে উঠে যাওয়ার দায় নিশ্চয়ই দলেরই সেটা ব্যক্তির নয়। আওয়ামী লীগ কি পারবে সে দায় অস্বীকার করতে? চেইন অব কমান্ড ও গঠনতন্ত্র অনুযায়ী আদর্শিক পথে চললে নিশ্চয়ই এমন ঘটনা ঘটতোনা। দুর্নীতি দুর্বৃত্তায়ন ও ক্ষমতার অপব্যবহারে ক্ষুব্ধ হয়েই হয়তো মাননীয় শেখ হাসিনা একক সিদ্ধান্তে এই অভিযান পরিচালনা  করছেন। এই অভিযানে ভীত হয়ে উঠছে মন্ত্রী, এমপি ও আওয়ামী লীগ এবং তার অঙ্গ সহযোগী সংগঠনের নেতারা। বিতর্কিত হচ্ছে রাজনৈতিক দল। চলছে মন্ত্রী এমপিদের ব্যাংক হিসাব জব্ধ ও বিদেশে যেতে নিষেধাজ্ঞা। এগুলোর দায় কি দলের নয়? মাননীয় শেখ হাসিনা কি ব্যক্তি হিসাবে প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন না দলের সভাপতি হিসেবে? যে দলের নেতাকর্মীরা তাকে সভাপতি বানালো সে দলের নেতাদের বিরুদ্ধেই কেন তাকে অভিযান চালাতে হচ্ছে? কেন তাকে দল ঠিক করতে পুলিশি এ্যাকশন পরিচালনা করতে হচ্ছে? ক্ষমতার বাইরে গেলে মাননীয় শেখ হাসিনার পাশে কি এসব পুলিশ থাকবে না দলীয় নেতাকর্মী থাকবে?

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক যখন প্রশ্ন করেন লোকমান এখনও কিভাবে বিসিবির পরিচালক? এই প্রশ্নের উত্তর তিনি কার কাছে আশা করেন? বিসিবির সভাপতি একুশে আগস্টে গ্রেনেড হামলায় নিহত আইভী রহমানের ছেলে পাপন। পাপন সাহেবকে কি দলকে উপেক্ষা করে পরিচালক বানালেন? আর যদি তাই হয় কেন বানালেন? এগুলো কি আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সমন্বয়ের ব্যর্থতা নয়? যে অভিযান পরিচালনা হচ্ছে এর পরিণতি ভাল না মন্দ তাও শেষে বুঝা যাবে। তবে এর সমস্ত কৃতিত্ব অথবা দূর্নাম যে আওয়ামী লীগ বা ১৪ দলের ললাটে যাবেনা যাবে মাননীয় শেখ হাসিনার দিকে সেটাও কিন্তু পরিস্কার।

এমকে

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও