১৪ দল ভাঙলে কী দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতা থামবে?

ঢাকা, বুধবার, ১৩ নভেম্বর ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬

১৪ দল ভাঙলে কী দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতা থামবে?

এখলাসুর রহমান ৭:৫২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৫, ২০১৯

১৪ দল ভাঙলে কী দুর্নীতি ও সাম্প্রদায়িকতা থামবে?

একদিকে দুর্নীতিবিরোধী অভিযান অন্যদিকে দুর্নীতির অভিযোগে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. ফারজানা ইসলামের অপসারণের দাবিতে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ৷

আরও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে জোটবদ্ধ ১৪ দলে দ্বিধাদ্বন্দ্ব, সাম্প্রদায়িক শক্তির শাপলা চত্বরে যাওয়ার হুমকি৷

দুর্নীতি, দুর্বৃত্তায়ন, সাম্প্রদায়িক উত্থান ও ১৪ দলে দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে উত্তাল বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গন৷
কেন সেদিন ১৪ দল গঠিত হয়েছিল? এই দুর্নীতি, দুঃশাসন, মৌলবাদ, ও সাম্প্রদায়িকতাকে পরাস্ত করার জন্য নয় কি? কিন্তু এই ১০ বছরে কি এসব পরাস্ত হয়েছে? উল্টো ১৪ দলে দেখা দিয়েছে দ্বিধাদ্বন্দ্ব৷

১৪ দলের নেতা রাশেদ খান মেনন যেদিন নির্বাচনকে নিয়ে কথা বললেন পরদিনই একটি পত্রিকায় তাকে নিয়ে কয়েকটি নিউজ হল৷

নিউজগুলোর শিরোনাম হল— জুয়ার ‘টাকায় বিলাসী জীবনযাপন মেননের!’; ‘সম্রাটের হৃদয় আকাশের মতো উদার, সে একদিন অনেক বড় নেতা হবে’; ‘সন্ত্রাসী খালেদকে যুবলীগের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেন মেনন’, ‘মেননের শেল্টারেই ফকিরাপুলের ইয়ংমেনস ক্লাবে ক্যাসিনো গড়ে ওঠে;’ ‘চাঁদা না পেলে যুবলীগের নেতাদের গালিগালাজ করতেন মেনন!’

পত্রিকার ওয়েবসাইটেই এসব নিউজের প্রতিবাদ জানাচ্ছেন পাঠকরা৷ কী বলছেন পাঠকরা৷ একজন লিখেছেন, যখন মেনন সাহেব সত্যি কথা বললো তখন থেকে হলুদ মিডিয়াগুলো তার পিছনে লেগে গেল।

পূর্ণিমা সেন নামের একজন পাঠক লিখেছেন, মেনন সাহেব শেষ। উনি সরকারের বিরুদ্ধে মন্তব্য করায় এখন সব দোষ উনার দিকেই।

তাহিদুল আনোয়ার নামের একজন পাঠক লিখেছেন, ওনি বিনা ভোটের কথা বলছেন তাই আবার ক্যাসিনোর কথা উঠল! হায়রে দালাল মিডিয়া৷

মিল্লাত হোসেন নামের একজন পাঠক লিখেছেন, কালকে নিবাচনের গোমর ফাঁস করেছে বলে আজকে রাশেদ খানের দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে। তাহলে প্রশাসন এতো দিন কি করছে?

আবু আহসান লিখেছেন, মেনন যেহেতু জবর দখলের নির্বাচনের গোমর ফাঁস করেছে, তাই তার বিরুদ্ধে মামলাও হতে পারে। এখন একদিনের মধ্যে যেভাবে মেননের বিরুদ্ধে লেখালেখি হচ্ছে এতদিন হয় নাই৷
যুবলীগ নেতা ইসমাঈল হোসেন সম্রাট পুলিশি হেফাজতে যে বক্তব্য দিয়েছেন তার রেফারেন্সেই মেননকে জড়িয়ে এসব নিউজ৷

সম্রাট নাকি বলেছে, সে মেননকে মাসিক মাসোহারা দিত৷ তার কথিত বক্তব্যও দুরকম হয়ে গেছে৷ কোথাও লিখেছে সম্রাট বলেছে ৪ লাখ টাকা করে দিতো কোথাও লিখেছে ১০ লাখ টাকা করে৷ কোথাও ১৫ লাখ৷

তবে সত্যি কোনটা? বিভক্ত হচ্ছে সম্রাটের নিকট হতে সুবিধাভোগীদের তথ্যও৷

ওয়ান ইলেভেনের সময় সামরিক হেফাজতে কতজন কত কথা বলেছে৷ সবকথাই কি সঠিক? বিএনপি আমলে একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিয়ে জজ মিয়াওতো কথা বলেছে তার কথাও কি সঠিক ছিল?

সম্প্রতি বলেছে বরগুনার মিন্নি৷ মিন্নির বক্তব্যও কি প্রশ্নবিদ্ধ হয়নি?

২০ অক্টোবর, ২০১৯ কালের কণ্ঠ পত্রিকায় লিখেছে,

যুবলীগের ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি (বহিষ্কৃত) ইসমাইল চৌধুরী সম্রাটকে জিজ্ঞাসাবাদে বেরিয়ে আসছে অজানা সব তথ্য। কাদেরকে তিনি সুবিধা দিতেন এবং বিনিময়ে নির্বিঘ্নে ক্যাসিনো সাম্রাজ্য ও চাঁদাবাজি টিকিয়ে রেখেছিলেন তা জানিয়েছেন সম্রাট।

ক্লাবগুলোতে অবৈধ ক্যাসিনো কারবার এবং চাঁদাবাজি চালিয়ে যেতে প্রভাবশালী সংসদ সদস্য, যুবলীগ নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তাদের নিয়মিত টাকা দিয়েছেন। এই সুবিধার বিনিময়ে তিনি কোনো সমস্যায় পড়লে তাঁরা সহযোগিতা করতেন। তিনিও তাঁদের নাম ভাঙিয়ে চলতেন। র্যািবের জিজ্ঞাসাবাদে এসব কথা বলেছেন সম্রাট। সুবিধাপ্রাপ্তদের মধ্যে সাতজনকে ‘খুঁটির জোর’ বলে দাবি করেছেন তিনি।

কালের কণ্ঠ আরও লিখেছে, একাধিক র্যােব সূত্র জানিয়েছে, সম্রাট তাঁর খুঁটি হিসেবে যাদের নাম-পরিচয় দিয়েছেন তারা হলেন- গোপালগঞ্জের একজন সংসদ সদস্য (এমপি), যুবলীগের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, প্রেসিডিয়াম সদস্য ও ভোলার এমপি নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি মোল্লা মো. আবু কাওছার, বর্তমানের এক এমপি যিনি আগে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তা ছিলেন, ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা (ডিবি) পূর্ব বিভাগের একজন অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) এবং মতিঝিল অপরাধ বিভাগের আরেকজন এডিসিকে সবচেয়ে বেশি সুবিধা দিয়েছেন সম্রাট। এক্ষেত্রে তারা কেন সংবাদপত্রের শিরোনাম হলো না?

কালের কণ্ঠের প্রতিবেদনে খুঁটির জোর হিসাবে মেননের নাম নেই৷ আর যুগান্তরের নিউজে মেইন খুঁটি রাশেদ খান মেনন৷

সম্রাট তত্ত্ব দিয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনীকে নিশ্চয়ই সাংবাদিককে নয়৷ এক্ষেত্রে যুগান্তরকে আইনশৃংখলা বাহিনীর কারা তথ্য দিলো? আর সে তথ্য দুরকম হলো কেন? তারাতো মেননকেই মেইন খুঁটির জোর হিসাবে তুলে ধরলো৷ তারা লিখলো জুয়ার টাকা না পেলে যুবলীগ নেতাদের গালিগালাজ করতো মেনন৷ ছোট দলের নেতা হয়ে বড় দলের অঙ্গসংগঠনকে গালাগাল করাটা কি করে সম্ভব৷ মেননের এই শক্তির উৎস কি? মানুষ কোন রিপোর্টকে বিশ্বাস করবে যুগান্তরের নাকি কালের কণ্ঠের৷

কেন সংবাদপত্রকেও এমন প্রশ্নবিদ্ধ করা হল? যুগান্তর লিখেছে, সন্ত্রাসী খালেদকে যুবলীগের রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করেন মেনন৷

রাশেদ খান মেনন একটা ভিন্ন দলের সভাপতি হয়ে কাউকে আওয়ামী লীগের অঙ্গ সংগঠন যুবলীগের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠা করেন কিভাবে? যুবলীগের নেতৃত্ব কি রাশেদ খান মেননের কথায় নির্ধারিত হয়? মেনন ১৪ দলের মনোনীত প্রার্থী ছিলেন৷ তিনি নৌকা মার্কা নিয়ে ঢাকা ৮ হতে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচন করেছেন৷

ইসমাঈল হোসেন সম্রাট এই এলাকার ঢাকা মহানগর দক্ষিণের যুবলীগ সভাপতি৷ সেই হিসাবে সম্রাট মেননের নির্বাচনী কাজে আর্থিক ও প্রচার প্রচারনাগত ভাবে সহায়তা করেছেন৷ মেননের কি এই সহায়তা নেয়া ভুল ছিল? এই সহায়তা কি ব্যক্তি সম্রাটের নাকি যুবলীগ সভাপতি সম্রাটের? নির্বাচনে কোন প্রার্থী সহযোগিতা না নেয়?

খালেদকে যদি যুবলীগে প্রতিষ্ঠিত করে থাকেন মেনন, তবে সম্রাটকে কে? সম্রাট যে এত অপকর্মের সাথে জড়িত তা কি যুবলীগ, আওয়ামী লীগ ও আইনশৃংখলা বাহিনী জানতো না? সংবাদপত্রের তথ্য সূত্রে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তাও সম্রাটকে সহায়তা করতো৷ যদি তা সত্য হয় সেটা কি ব্যক্তি সম্রাটকে না যুবলীগের সভাপতি সম্রাটকে? আর সহায়তা প্রদানের দায় কি প্রধানমন্ত্রীর হতে পারে?

যুগান্তর জানায় খালেদ ভূঁইয়ার পে রোলে ৫ নম্বরে লেখা রাশেদ খান মেনন মাসে ১০ লাখ টাকা করে নিত৷ তাহলে বাকি ১ হতে ৪ সিরিয়ালে কারা? তাদের পরিচয় কী তাদের মাসোহারা কত ছিল সে তথ্য প্রকাশ না করে কেবল ৫ নিয়ে কেন এত রিপোর্ট? ১ হতে ৪ সিরিয়ালে কারা আছে সেটা প্রকাশ কি তাদের দায়িত্ব ছিলনা? দায়িত্ব ছিল কেবল ৫ কে নিয়ে?

যুগান্তর লিখেছে প্রতিমাসে সম্রাট এর কাছ থেকে ১০ লাখ নিতেন মেনন। ইত্তেফাক লিখেছে ৪ লাখ। অনলাইন কিছু পোর্টাল ১৫ লাখ। কোনটা সত্য ১০, ১৫ নাকি ৪ লাখ?

অন্যদিকে সম্রাট তার জবানবন্দিতে তার শক্তির ৭ স্তম্ভের কথা উল্লেখ করেছে। সেখানে মেননের নাম নাই। আবার বলা হচ্ছে তালিকায় ৫ নম্বরে আছে মেনন। এ থেকে কি বুঝবে মানুষ?

ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, আওয়ামী লীগ ও ১৪ দল সকলকে আইনশৃংখলা বাহিনীর হাতে তুলে দিয়ে দেশটাকে কোথায় নিয়ে যাওয়া হচ্ছে৷

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে পুলিশে ধরতো বিএনপি জামায়াতকে আর নির্বাচনের পরে এখন ধরছে আওয়ামী লীগ ও ১৪ দলকে৷ আইনশৃংখলা বাহিনী কেবল শেখ হাসিনার কথা শুনছে আর কারও না৷

কিন্তু শেখ হাসিনার কথাও যে তারা সবসময় শুনবে তার কি গ্যারান্টি আছে? বিএনপি জামায়াতের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির আদর্শে গড়ে উঠেছিল ১৪ দলীয় জোট৷ মতিঝিলে সমাবেশ করে তারা বলেছিল বিএনপি জামায়াতকে আর না৷

রাজপথে পুলিশের লাঠিচার্জের শিকার হয়েছিলেন রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, দীলিপ বড়ুয়াসহ আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ৷

আন্দোলনের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা ১৪ দল কি তবে ভাঙনের মুখে?

মেননের বক্তব্যকে কেউ সমর্থন করছে কেউ বিরোধীতা করছে৷ আর ১৪ দল ভাঙলে কি তা মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের রাজনীতির জন্য শুভকর হবে? মেননকে জিজ্ঞাসাবাদে নিলে কি তার প্রতিক্রিয়া পড়বে না ১৪ দলে?

সম্প্রতি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় চলমান অভিযান নিয়ে উদ্ধৃত করে নানা রকম তথ্য বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়েছে।

র্যা ব সদর দপ্তর জানিয়েছে তারা এমন তথ্য কোনো গণমাধ্যমে প্রকাশ করেনি। র্যা ব তাদের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সম্প্রতি বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় চলমান অভিযান সংক্রান্তে র্যাশবকে উদ্ধৃত করে বিবিধ তথ্য কোন কোন গণমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। বিষয়টি সম্পর্কে র্যাতব সদর দপ্তরের দৃষ্টি আকর্ষিত হয়েছে।

এ বিষয়ে র্যািব সদর দপ্তরের বক্তব্য এই যে, এ ধরনের কোন তথ্য/সংবাদ র্যাদব কর্তৃক কোন মিডিয়াতে কখনোই প্রদান করা হয়নি। এখন কথা হল সম্রাটতো কোন মিডিয়ায় কথা বলেনি৷ বলেছে র্যা বকে। র্যা ব বলছে তারা গণমাধ্যমে এমন তথ্য সরবরাহ করেনি৷ কিন্তু কিছু কোন মাধ্যম কিসের

ভিত্তিতে এসব তথ্য নিয়ে নিউজ করল? এতে করে যারা বলছেন এসব উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নিউজ৷

এক্ষেত্রে এসব বলাবলি কি খুবই প্রাসঙ্গিক ও যৌক্তিক হয়ে উঠছে না?

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও