সব অন্যায় কি কেবল নেতারাই করেছে, আমলারা নয়?

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

সব অন্যায় কি কেবল নেতারাই করেছে, আমলারা নয়?

এখলাসুর রহমান৷ ১০:৫৪ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০৯, ২০১৯

সব অন্যায় কি কেবল নেতারাই করেছে, আমলারা নয়?

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের দলীয় নেতা–কর্মীদের উদ্দেশে বলেছেন, আমি আপনাদের আহ্বান জানাব, আওয়ামী লীগকে বিশুদ্ধ করুন। আওয়ামী লীগ থেকে দূষিত রক্ত বের করে দিন। বিশুদ্ধ রক্ত সঞ্চালন করুন।

তিনি আরও বলেন, যারা বিএনপি ও ফ্রিডম পার্টি হতে এসেছে তাদের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হবে৷

দীর্ঘদিন ধরে হাইব্রিড, কাউয়া, মৌসুমী পাখি, ফার্মের মুরগী এরকম বহু কথা শুনে আসছে মানুষ৷ তবে কি ওরা সবাই মিলে আওয়ামী লীগের রক্তকে দূষিত করল আর এই সুযোগ তারা পেলো কিভাবে? খালেদা জিয়ার নিরাপত্তা কর্মকর্তা লোকমান হয়ে যায় বিসিবির পরিচালক৷ এখন তার বিরুদ্ধে ক্যাসিনোর অভিযোগও এল৷ তারেক রহমানের ঘনিষ্টজন কারাবন্দি গিয়াস উদ্দিন আল মামুনের বিজনেস পার্টনার ছিলেন সেলিম প্রধান। বিএনপি শাসনামলের আলোচিত ব্যক্তির নাম গিয়াস উদ্দিন আল মামুন। বিএনপি সরকারের পতন হলেও সেলিম প্রধান থেকে যান ধরাছোঁয়ার বাইরে।

জানা যায়, ১/১১ সরকারের সময়ে জাহিদ নামের এক কর্মকর্তার সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সুবাদে সেলিম প্রধান বেপরোয়া হয়ে উঠেন। সেলিম প্রধানের পাশে সবসময় স্বয়ংক্রিয় আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে ১০ জন দেহরক্ষী থাকে৷ এখন জাহিদ কোথায় কেউ জানে না কিন্তু সেলিম প্রধান ঠিকই রয়ে গেল৷

রাস্তায় চলার সময় ভিআইপি প্রটোকলের মতোই তার গাড়িবহরে থাকে ৫-৬টি দামি গাড়ি। বহরের মাঝখানে থাকে সেলিমের কালো টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার গাড়ি। সেলিম প্রধানের আগে খবর এসেছে যুবদল হতে যুবলীগের নেতা হয়ে ওঠা সশস্ত্র দেহরক্ষী বেষ্টিত জি কে শামীমের খবর৷ এরা কি করে কাদের প্রশ্রয়ে এমন ক্ষমতাধর হয়ে উঠল? আর এদের সম্পর্কে যতবেশি বলা হচ্ছে ততবেশি বেড়ে চলছে তাদের অনুপ্রবেশ?   ‌‘বঙ্গবন্ধু বইমেলা’র আহ্বায়ক হয়ে গেল শেখ মুজিবের খুনি খন্দকার মোশতাকের ভক্ত আবু রায়হান৷ খন্দকার মোশতাকের প্রতি মুগ্ধ হয়ে আবু রায়হান ‘রাজা দরশন’ নামে একটি বই লেখেন। সময় প্রকাশনীর ফরিদ আহমেদ সেটি প্রকাশ করেন ২০১৪ সালের বই মেলায়। এখন আবু রায়হানের পদত্যাগ দাবি উঠছে৷ কিন্তু কেন এসব হচ্ছে?

বঙ্গবন্ধু বইমেলার মতো একটি অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু ভক্ত না হয়ে আহ্বায়ক হয়ে যায় বঙ্গবন্ধুর খুনীর ভক্ত৷ কেন মুজিব ভক্তদের মাঝে কেউ কি ছিল না আহ্বায়ক হওয়ার মতো? কেন সব জায়গায় এমন অনুপ্রবেশকারীদের এভাবে স্বাগতম জানানো হচ্ছে? আওয়ামী লীগ দলটি কেনই-বা তার রক্ত দূষিত করছে আর দূষিত রক্ত বের করার কঠিন পথে হাঁটছে?

‘বিতর্কিত’ নেতা আতাউল্লাহ খান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে ভারত সফরে যাওয়ায় কক্সবাজারে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তারা প্রশ্ন তুলেছেন, স্বাধীনতার চেতনাবিরোধী একজন ব্যক্তি কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী হওয়ার সুযোগ পেলেন! আতাউল্লাহ খান জামায়াত-শিবিরের শিল্পগোষ্ঠী পাঞ্জেরীর কেন্দ্রীয় পরিচালক ছিলেন৷ তিনি দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগ, মুক্তিযুদ্ধ, বঙ্গবন্ধু এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালিয়েছেন। এখন ভোল পাল্টে হয়ে গেলেন খোদ প্রধানমন্ত্রীর সফরসঙ্গী!

প্রখ্যাত সাংবাদিক ও কলামিস্ট আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী বলেছেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিউ ব্লাড দরকার। ৮০ ভাগ অসৎ বর্তমান এমপিকে বাদ দিয়ে তরুণ ও নতুনদের মনোনয়ন দিতে হবে। ভালো, শিক্ষিত ও দুর্নীতি স্পর্শ করেনি- এমন লোকদেরই মনোনয়ন দেওয়া উচিত। আর ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও আওয়ামী লীগেও সংস্কার দরকার।

কিন্তু হবে কি সংস্কার? দুর্নীতি বিরোধী অভিযানগুলো দেখে মনে হচ্ছে এগুলো শেখ হাসিনার একার অভিযান৷ এনিয়ে সারাদেশের কোথাও দলের কোন কর্মসূচী নেই৷

শেখ হাসিনা কি পারবেন ৮০% অসৎ, দুর্নীতিবাজ এমপিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে? কয়েকদিন আগে মাদকবিরোধী অভিযান গেল৷ হয়েছে কি মাদকমুক্ত বাংলাদেশ? ক্যাসিনো ও জুয়া নিয়ে তুলকালাম চলছে দেশে৷ সরকার দলের অনেক বড় বড় নেতার বিরুদ্ধে উঠছে ক্যাসিনোর অভিযোগ৷ কথা উঠছে উন্নয়ন বরাদ্দের লুণ্টন নিয়ে৷

প্রধানমন্ত্রী বলছেন, উন্নয়ন বরাদ্দগুলো কোথায় যায় তা খুঁজে বের করা হবে৷

আদৌ কি তা সম্ভব? তিনি কি পারবেন যারা সরকারি কোষাগারের টাকা বের করে তার সুষ্ঠু প্রয়োগ করতে পারেননি তাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনতে? তিনি নিজেই বলছেন উন্নয়ন বরাদ্দগুলোর সঠিক ব্যবহার হলে দেশ বদলে যেত৷ এই বদল না হয়ে ওঠার দায়ে দায়ীরা কি তবে দেশদ্রোহী নয়? তিনি কি পারবেন এমন দেশদ্রোহীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে? রাস্তাঘাট, মসজিদ মন্দির ও সরকারি স্থাপনার নামে কোটি কোটি টাকা হরিলুট হচ্ছে৷ কী ঘটছে দেশে? চট্টগ্রামে নতুন মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় নির্মাণ প্রকল্পের প্রস্তাবনায় একটি বালিশ ক্রয়ের দাম ধরা হয়েছে ২৭ হাজার টাকা। আর বালিশের কভারের দাম ধরা হয়েছে ২৮ হাজার টাকা। যা নিয়ে সারাদেশে ব্যাপক তোলপাড় চলছে। তবে বিষয়টি ভুল হয়েছে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী জাহিদ মালেক৷

এভাবে ভুল বললেই কি দায় শেষ? মন্ত্রী হিসাবে কি কোন দায় নেই? দুর্নীতিবাজ, চাঁদাবাজ, জুয়াড়ি, অনুপ্রবেশকারী ও সরকারি কোষাগারের টাকা অপচয়কারী সবার বিরুদ্ধে মহাজোট নয়, দল নয়, মন্ত্রিসভা নয়, জাতীয় সংসদ নয় প্রধানমন্ত্রী একা! পারবেন কি তিনি এই কঠিন অভিযানে সফল হতে? পেরেছিলেন কি বঙ্গবন্ধু? বঙ্গবন্ধু ষড়যন্ত্রকারী, চোরাচালানকারী ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দেন আর ষড়যন্ত্রকারী মুশতাক বন্ধু বেশে পাশে দাঁড়িয়ে থাকে৷ এরপর কিছুদিন যেতে না যেতেই তাকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়৷ আর এর নেতৃত্বে থাকে মুশতাক৷ এরপর এই হত্যার বিচার করা যাবে না এই আইনও করা হয়৷ রাজনীতি ও সরকার কতোটা বিবেকহীন হলে এমন একটি আইন পাস করতে পারে? তখন বলা হয় বঙ্গবন্ধু হত্যা সময়ের বাস্তবতা৷ দেশের সকল সংবাদ পত্রগুলোতে তখন বঙ্গবন্ধু হত্যাকে নয় মুশতাকের নয়া রাষ্ট্রপতি হওয়াটাকেই লিড নিউজ করা হয়৷

বঙ্গবন্ধু মৃত্যুর কিছুদিন আগেই বলেছিলেন, পাকিস্তানীরা সব লুট করে নিয়ে গেছে কাগজ ছাড়া আমার কাছে কিছু রেখে যায়নি৷ আমাকে বিদেশ হতে ভিক্ষা করে আনতে হয় আর চোরের দল চুরি করে৷ অনেক সহ্য করেছি আর না৷ এবার দেখব চোরের শক্তি বেশি না ঈমানদারের শক্তি বেশি। তিনি বজ্রকন্ঠে বলেছিলেন এই ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, মুনাফাখোরকারী ও চোরাচালানীদের নির্মূল করতে হবে৷

দুর্নীতিবিরোধী এই সোচ্চার ঘোষণার কিছুদিন যেতে না যেতেই বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হল৷ বঙ্গবন্ধুও দলকে নির্ভর করতে পারেননি৷ তাই আওয়ামী লীগকে বিলুপ্ত করে বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ বাকশাল গঠন করেছিলেন৷ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাও কি দলের উপর ভরসা রাখতে পারছেন? আর দলও কি পারছে তাকে নির্ভরতা উপহার দিতে? যদি তাই হতো দলীয় ব্যানারে দেশব্যাপী কোন প্রকার কর্মসূচি নেই কেন? ক্যাসিনো ও জনগণের অর্থ আত্মসাত এ দুয়ের মধ্যে কোন অপরাধটা বড় ও কোনটা ছোট৷ ক্যাসিনো যারা খেলে তারা নিজেদের ইচ্ছেতে নিজেদের টাকা দিয়েই খেলে৷ পৃথিবীর অনেক দেশে ক্যসিনো চালু রয়েছে৷ বাংলাদেশেও লাইসেন্স নিয়ে ক্যাসিনো চালানো সম্ভব এমন কথাও বলা হচ্ছে কিন্তু ঘুষ দুর্নীতির লাইসেন্স কি পৃথিবীর কোথাও আছে? বঙ্গবন্ধু দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর ও ষড়যন্ত্রকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করলেন ষড়যন্ত্রকারীদের পাশে রেখে৷ পরে তারা পাশে থেকেই তাকে হত্যার নেতৃত্ব দিল৷

আর এখন বঙ্গবন্ধুর খুনীর অনুসারীরা বিভিন্ন ছদ্মবেশে বিভিন্ন দপ্তরে ঢুকে গেছে৷ খোদ শেখ হাসিনার সফর সঙ্গীও হয়ে যাচ্ছে তারা৷ আতাউল্লাহ খান, লোকমান, সেলিম প্রধান, জি কে শামীম ও আবু রায়হান তারা কি শেখ হাসিনার ইমেজ রক্ষার মিশনে নাকি ইমেজ ব্যবহার করে নিজেদের আখের গোছানোর মিশনে? শেখ হাসিনার সফর সঙ্গী হওয়াটাও একটা পুঁজি৷ দেশে তার কর্তৃত্ব বাড়বে৷ এতে ক্ষমতা প্রয়োগ করার সুযোগ বৃদ্ধি পাবে৷ প্রধানমন্ত্রীর পাশে হাটার ছবি জি কে শামীম কত জায়গায় দেখিয়েছে৷ দেশ জুড়ে কি এমনটিই চলছে না? আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক হাইব্রিড, কাউয়া, মৌসুমী পাখি, ফার্মের মুরগী প্রভৃতি কত কথা বলছেন আর অনুপ্রবেশকারীদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে৷ এই বাড়বাড়ন্ত থামবে কখন ও কিভাবে? দলীয়ভাবে ছাড়া কি পুলিশ দিয়ে অনুপ্রবেশকারীদের রোখা সম্ভব? বলা হচ্ছে শুদ্ধিকরণ অভিযান, শুদ্ধিকরণ অভিযান। কিন্তু আদৌ কি শুদ্ধিকরণ হবে? হলে কিভাবে? তবে কি তাও পুলিশ র‌্যাব দিয়ে? এভাবে দলকে নির্ভরতার বাইরে রেখে র‌্যাব পুলিশ দিয়ে কি সবকিছু করা সম্ভব? আর পুলিশ র‌্যাবসহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের শুদ্ধিকরণ অভিযান চালাবে কে? দেশ আজ এক ভয়াবহ অবস্থার মুখোমুখি৷ ক্ষমতাসীন ১৪ দল শরীকরাও বলছে, এই ১০ বছরে দেশে উন্নয়নের নামে হরিলুট হয়েছে৷ এখন প্রশ্ন যদি তাই হয় এই হরিলুট কি সব রাজনীতিকরা করেছে? অ্যাকশনতো কেবল রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে৷ তাই নয় কি?

সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের গ্রেফতার করলে কর্তৃপক্ষের পূর্বানুমতি লাগবে কিন্তু রাজনীতিকদের বেলা তা নয়৷ আওয়ামী লীগ, যুব লীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ প্রভৃতি সংগঠনের নেতাদের বেশির ভাগই আতঙ্কে রয়েছে কখন কোন অভিযোগে আইনশৃংখলা বাহিনী তাদের ধরে নিয়ে যায়৷ কিন্তু সরকারি কর্মকর্তাদের মাঝে তেমন কোন ভীতি নেই৷ কিন্তু সকল অনিয়ম দুর্নীতির সাথে আমলারা সম্পৃক্ত নয় কি? নেতাদের সইয়ে কি কোন কাজ হয়? বালিশের দাম ২৭ হাজার টাকা আর বালিশের কভারের দাম ২৮ হাজার টাকা এই ভাউচারে সই কি কোন নেতা করেছে নাকি কোন আমলা করেছে? তবে কেন সব দায়ের দায়ী নেতারা হচ্ছে?

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও