উচ্চশিক্ষায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা

ঢাকা, রবিবার, ২০ অক্টোবর ২০১৯ | ৪ কার্তিক ১৪২৬

উচ্চশিক্ষায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা

সৈয়দ ফারুক হোসেন ৭:২১ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ০২, ২০১৯

উচ্চশিক্ষায় সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা

ভর্তিযুদ্ধ বা মেধাযুদ্ধ মানে উচ্চশিক্ষা লাভের যুদ্ধ এবং এই যুদ্ধের সফলতা তখনই আসে যখন একজন শিক্ষার্থী তার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ে পড়ার সুযোগ লাভ করেন। প্রতিটি যুদ্ধে অংশগ্রহণের জন্য যেমন অস্ত্রের প্রয়োজন হয়, তেমনি ভর্তিযুদ্ধ বা উচ্চশিক্ষা যুদ্ধের জন্য একমাত্র হাতিয়ার হচ্ছে নিয়মিত পড়াশোনা, অধ্যবসায় এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস রাখা। কারণ অনেক সময় দেখা যায়, সম্পূর্ণ প্রস্তুতি থাকা সত্ত্বেও একজন শিক্ষার্থী তার সাফল্য অর্জনে ব্যর্থ হন। এর প্রকৃত কারণ হচ্ছে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসটা না থাকা।

অনেক সময় সবকিছুর উত্তর জানা সত্ত্বেও একজন শিক্ষার্থী দেখা যায়, প্রশ্নপত্রের উত্তর ঠিকমতো লিখতে পারেন না। আবার এমনও হয় যে, ভুলবশত যেখানে যে প্রশ্নের উত্তরটি লেখার কথা সেখানে সেটি না লিখে আরেক জায়গায় লিখেন। সত্যিকার অর্থে এই ভুলগুলো শুধরে নেওয়া হচ্ছে নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস তৈরি করা, আমাকে উত্তীর্ণ হতেই হবে। এমন ভাব থাকাটাই হচ্ছে উচ্চশিক্ষার যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার একটি মোক্ষম সুযোগ। অনেকে আবার ভুল করে পূর্ব প্রস্তুতিগুলো যেমন, পরীক্ষার হলে সময়মতো না আসা, উত্তরপত্রে ভুল করা- এসব ভুল করে ফেলেন, যা কি-না তার অকৃতকার্যের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এ বছর এইচএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় চৌদ্দ লাখ। পাসের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ। জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় অর্ধ লাখ। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আসন সংখ্যা প্রায় ৪২ হাজার।

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এ দেশে সর্বক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মান যেহেতু সমান নয় এবং এ কারণেই অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের ভালো বিদ্যালয়ে ভর্তি করাতে সবসময় তৎপর থাকেন। এই যে এত শিক্ষার্থী এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন, তাদের পরবর্তী গন্তব্য কোথায়? বেশির ভাগই তাদের পছন্দসই বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজে ভর্তি হতে চাইলেও বিরাট সংখ্যককে ব্যর্থ হতে হবে। কারণ পর্যাপ্ত আসন নেই।

নিজের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপদান করার জন্য এই মেধাযুদ্ধ। পড়াশোনা করতে হবে আমাদের নিজেকেই, কেউ পরীক্ষায় পাস করিয়ে চান্স পাইয়ে দেবে না। জয়ের তীব্র আকাক্সক্ষা নিয়ে সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর অধ্যবসায় এবং ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে সিদ্ধান্তে অটল থাকার ইচ্ছা নিয়ে নামতে পারলে আশা অনুযায়ী ফল আসবেই।

বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের গুচ্ছ বা সমন্বিত ভর্তি পদ্ধতি কার্যকর হচ্ছে না। তাই ঢাকা থেকে শুরু করে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের যেতে হবে ভর্তিযুদ্ধে অংশ নিতে। এতে একদিকে শিক্ষা ব্যয় যেমন বাড়ছে, অন্যদিকে বাড়ছে হয়রানিও। তারপরও পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও বিষয়ে সুযোগ পেতে এসব শিক্ষার্থী কোচিং থেকে শুরু করে সব চেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ভর্তিযুদ্ধ শুরু হচ্ছে, সে যুদ্ধে হাজারও শিক্ষার্থী যে নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে লড়াই করবেন, তাতে সন্দেহ নেই।

দু’চোখে রঙিন স্বপ্ন আর ভবিষ্যতের কঠিন সময়টাকে কীভাবে মোকাবেলা করা যায়, তা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ভাবনার শেষ নেই। পড়াশোনার চেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি আলাদা। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে কোচিং করেন বা প্রাইভেট টিউটরদের কাছে পড়েন। অনেকে কোচিং না করেও ভালো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পান। তবে সবচেয়ে বড় কথা, ভর্তি পরীক্ষায় সফল হতে একটি ভালো গাইডলাইন অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। তা না হলে প্রস্তুতিতে বড় রকমের ঘাটতি থেকে যায়।

স্বপ্নচারী শিক্ষার্থীদের সামনে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির যুদ্ধ। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ হওয়ার পরবর্তী কয়েক মাসকে একজন শিক্ষার্থীর জীবনের অন্যতম টার্নিং পয়েন্ট বলা যায়। জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিতে এই কয়েক মাস খুব বেশি গুরুত্বপূর্ণ। উচ্চশিক্ষা অর্জনে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিকল্প নেই। খোলামেলা আর বড়সড় ক্যাম্পাস, গবেষণার সুযোগ, প্রতিষ্ঠিত প্ল্যাটফর্ম, পড়াশোনার উন্নতমান, কো-কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিজ ইত্যাদি কারণে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এক্ষেত্রে যথেষ্ট এগিয়ে। উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষা শেষ করা প্রত্যেকটা শিক্ষার্থীর কাছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় একেকটা স্বপ্নের নাম।

পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন পূরণ করতে শিক্ষার্থীদের কঠিন এক ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। ভর্তি পরীক্ষা না বলে সেই পরীক্ষাটাকে ভর্তিযুদ্ধ বলাই অধিক শ্রেয়। লাখ লাখ পরীক্ষার্থীর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে নিজের পছন্দের বিষয়ে পড়তে পারার সুযোগ অর্জন করাটাকে যুদ্ধ বললে মোটেই অত্যুক্তি হয় না। সামান্য একটু ভুলের জন্য এই যুদ্ধের ময়দান থেকে খালি হাতে ফেরাটা যেমন অস্বাভাবিক কিছু না, ঠিক তেমনি ভালো প্রস্তুতি আর ইউনিক কিছু টেকনিক অবলম্বন করে জয় ছিনিয়ে আনাটাও অসম্ভব কিছু নয়।

বাংলাদেশে উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলের পর শিক্ষার্থীরা প্রস্তুতি নেন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির। ভর্তিযুদ্ধে নামার আগে পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের সম্পন্ন করতে হয় ভর্তির ফরম তোলা ও জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া। অনেক আগেই দেশে ইন্টারনেটের মাধ্যমে এই নিয়ম চালু হয়েছে। আর সেটাকে ঘিরেই ঢাকায় গড়ে উঠেছে এক মৌসুমি ব্যবসা। এক দল ব্যবসায়ী বছরের এই সময়ে ভর্তি ফরম পূরণ ও জমা দেওয়ার ব্যবসা করে হচ্ছেন লাভবান আর শিক্ষার্থীরা সময় বাঁচানোর জন্য সাহায্য নিচ্ছেন এসব ব্যবসায়ীদের।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান বলেছেন, ‘ভর্তি পরীক্ষায় নতুনত্ব এবং প্রশ্নফাঁস বন্ধে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় দেশের অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের থেকে চ্যাম্পিয়ন। ভর্তি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব ক্যাম্পাসে দুই শিফটে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ করা হয়। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে অন্যান্য স্কুল-কলেজ কেন্দ্রগুলোর ওপর থেকে নির্ভরশীলতা দুরীভূত হয়।’ তাছাড়া অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণে বিগত কয়েক বছর ধরেই চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

এইচএসসি পাসের পরই তারা পছন্দের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে প্রথমেই মোটা টাকা দিয়ে কোচিংয়ে ভর্তি হন। তারপর মাস দুয়েক ভর্তি কোচিং শেষ করে ভর্তি পরীক্ষায় অবতীর্ণ হন। এ সময় যাদের আর্থিক অবস্থা দুর্বল তারা এই কোচিং করার সুযোগ পান না।

বর্তমানে শুধু মেডিকেল কলেজগুলোতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি প্রচলিত আছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর শুধু কৃষিবিজ্ঞানবিষয়ক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুচ্ছ পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং ইতিমধ্যে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে আবেদন গ্রহণও শুরু হয়েছে। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো কয়েক বছর ধরে চেষ্টা করে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। অনেক আগে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির অধীনে কুয়েট, চুয়েট ও রুয়েটে একযোগে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হতো। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে এই পদ্ধতি চালু করা দরকার।

সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা অত্যন্ত প্রয়োজন। এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক মত থাকলেও আমাদের বিরাট এ কর্মযজ্ঞ যে ছাত্র-ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়, তাদের স্বার্থকে সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিতে হবে। যানজট যদি নাও সমস্যা করে, তাহলেও দীর্ঘ পথের ক্লান্তি থেকে তাদের মুক্তি দেওয়া প্রয়োজন। অপরিচিত স্থান, আবাসন অনিশ্চয়তা, যাত্রার যানবাহন সমস্যা ইত্যাদি থেকে মুক্তি দিতে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা এখন কেবল অপেক্ষা মাত্র। তবে শুধু শিক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের স্বস্তি দূর করা নয় বা তাদের টেনশন অথবা ঝামেলামুক্ত করার লক্ষ্যেই নয়, বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ভর্তি ব্যবস্থাকে সুষ্ঠু, বৈজ্ঞানিক এবং স্বচ্ছ ও দুর্নীতিমুক্ত করে একটি স্থায়ী গ্রহণযোগ্য ভর্তি ব্যবস্থার স্বার্থে সমন্বিত ভর্তি ব্যবস্থা অবশ্যই গ্রহণ করতে হবে, কারণ এর কোনো বিকল্প নেই।

কেন্দ্রীয়ভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি চীন, অস্ট্রেলিয়া, ব্রাজিলসহ বিশ্বের অনেক দেশে আছে। প্রয়োজনে তাদের পদ্ধতিগত বিষয়গুলো দেখা যেতে পারে। ভর্তি পরীক্ষা কমিটিতে যারা আছেন, তারা সমাজের আলোকিত মানুষ, যারা জ্ঞান সৃষ্টি-বিতরণ করেন। শিক্ষার্থী ও অভিভাবক এই গুচ্ছ ভর্তি পরীক্ষায় শুধু যাতায়াত ভোগান্তি নিরসন নয়, এসব জটিলতা কাটিয়ে সহজ ও অধিকতর কার্যকর সমাধান জরুরি।

ছাত্রছাত্রী এবং অভিভাবকের জন্যও মঙ্গলজনক সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি বাস্তবায়ন করা নিয়ে বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছে। এ পদ্ধতিতে ভর্তি পরীক্ষা নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে প্রচুর লেখালেখি হয়েছে। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালসহ দেশের বড় বড় শিক্ষাবিদ এই পদ্ধতির প্রয়োগ নিয়ে আশা প্রকাশ করেছেন। তারা প্রচুর লিখেছেন এবং দেখিয়েছেন কেন এই পদ্ধতিটির প্রয়োগ আমাদের সন্তানদের জন্য প্রয়োজন। যেকোনো পদ্ধতি প্রয়োগে সমস্যা আসতে পারে, তবে তা সমাধানে আলোচনা করতে হবে।

আমরা কেবল ভর্তি পরীক্ষার্থীদের ঝামেলা লাঘব করতে চাই। তাদের শারীরিক ও মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দিতে হবে। এ কল্যাণকর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন নিয়ে এত বিলম্ব হবে কেন। যদিও কয়েক বছর ধরেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চেষ্টা করছে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নিতে। দেশের সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে সমন্বিত ভর্তি পরীক্ষা নেওয়ার বিষয়ে বিগত কয়েক বছর ধরে আলোচনা হলেও কার্যক্ষেত্রে এর প্রয়োগ ঘটানো যায়নি। কর্তৃপক্ষ যেখানে সচেষ্ট সেখানে তা বাস্তবায়ন না হওয়ার কথা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যদি একসঙ্গে বিষয়টি নিয়ে উদ্যোগী হয়, তাহলে এটি বাস্তবায়নে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

সৈয়দ ফারুক হোসেন
ডেপুটি রেজিস্ট্রার, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও