টার্গেট যখন শেখ হাসিনা

ঢাকা, ৮ আগস্ট, ২০১৯ | 2 0 1

টার্গেট যখন শেখ হাসিনা

মিল্টন বিশ্বাস ৫:০১ অপরাহ্ণ, আগস্ট ২১, ২০১৯

টার্গেট যখন শেখ হাসিনা

বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে ১৯ বার। দেশ-বিদেশের সেসব ষড়যন্ত্রের মধ্যে ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা ছিল নারকীয়। আসলে সেদিনের গ্রেনেড হামলা ছিল পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস।

১৫ বছর আগে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ২০০৪ সালে এই হামলার ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় তৎকালীন সরকারের মন্ত্রী, আমলা, পুলিশ-গোয়েন্দা, রাজনৈতিক নেতা এবং মুফতি হান্নানের হরকাতুল জিহাদ আল বাংলাদেশকে (হুজি) ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে দেখা গেছে।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের তৈরি করা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে মুফতি হান্নানের জঙ্গি দল হুজিকে নিয়োগ করা হয়। তার আগে হুজি গোপালগঞ্জের কোটালীপাড়ায় শেখ হাসিনাকে হত্যা করার জন্য বোমা পেতেছিল। আগেই লিখেছি, ১৯ বার তাকে হত্যাচেষ্টা চালানো হয়েছে। ২১ আগস্টে তিনিই মূল টার্গেট ছিলেন। আসলে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকাণ্ডের ৩০ বছর পর সেই আগস্ট মাসেই আবারও গণহত্যার ঘটনা ঘটে।

এই গ্রেনেড হামলা ছিল বিএনপি-জামায়াত জোট তথা খালেদা-নিজামীর নীলনকশা আর জঙ্গিবাদ উত্থানের ভয়ঙ্কর দৃষ্টান্ত। সেদিন বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসবিরোধী সমাবেশে ভয়াবহ গ্রেনেড হামলায় তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ প্রায় ৩০০ বেশি নেতাকর্মী গুরুতর আহত হন; নিহত হন আওয়ামী মহিলা লীগের নেতা ও প্রয়াত রাষ্ট্রপতির সহধর্মিণী আইভি রহমানসহ ২৪ জন। বিশ্বজুড়ে তোলপাড় করা গ্রেনেড হামলার সেই ঘটনার ভয়াবহতা আমাদের হতবাক করে দিয়েছিল। পরের বছর ঠিক একই মাসের ১৭ তারিখে দেশের ৬৩ জেলায় একযোগে পাঁচ শতাধিক বোমা বিস্ফোরণ ও নিহত মানুষের স্বজনদের আর্তনাদ এবং আহত মানুষের কান্নায় আমাদের মনে ক্ষোভ ও ঘৃণা আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু বোমা হামলার ভয়ঙ্কর ঘটনাগুলো শুরু হয়েছিল তারও আগ থেকে। ১৯৯৯ সালের ৬ মার্চ যশোরের টাউন হল মাঠে উদীচীর সমাবেশে এক বোমা হামলায় নিহত হয় ১০ জন। একই বছর ৮ অক্টোবর খুলনার নিরালা এলাকায় অবস্থিত কাদিয়ানীদের উপাসনালয়ে বোমা বিস্ফোরণে আটজন নিহত হয়। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি ঢাকার পল্টন ময়দানে সিপিবির মহাসমাবেশে বোমা হামলায় ছয়জন নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হয়।

১৪ এপ্রিল রমনার বটমূলে ছায়ানটের বর্ষবরণ উৎসবে সংঘটিত বোমা বিস্ফোরণে নিহত হয় ১১ জন। ৩ জুন বোমা হামলায় গোপালগঞ্জের বানিয়ারচর গির্জায় সকালে প্রার্থনার সময় নিহত হয় ১০ জন; আহত হয় ১৫ জন। সিলেটে একাধিক বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে। তবে সাবেক অর্থমন্ত্রী শাহ এ এম এস কিবরিয়া নিহত হন গ্রেনেড হামলায়। ২০০৪ সালের ২১ মে হযরত শাহজালাল (রহ.) মাজার পরিদর্শনে গেলে গ্রেনেড হামলায় আহত হন তৎকালীন ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূত আনোয়ার হোসেন; যিনি সিলেটি বাংলাদেশির সন্তান। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক সমাবেশে, অফিসে, নেতার গাড়িতে, সিনেমা হলে একাধিক বোমা হামলার ঘটনা ঘটেছে।

উল্লেখ্য, ১৯৯৯ থেকে ২০০৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত সারা দেশে বোমা ও গ্রেনেড হামলায় নিহত হয়েছে শতাধিক ব্যক্তি। অথচ ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে বিএনপি-জামায়াত জোট এ ধরনের তৎপরতা বন্ধে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। হামলা প্রতিরোধ ও জঙ্গি দমনে তৎকালীন সরকারের নিষ্ক্রিয়তা জঙ্গিবাদ উত্থানে সহায়ক হয়ে উঠেছিল; ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় খালেদা-নিজামী সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা বর্তমানে আরও স্পষ্ট হয়েছে ওই মামলার রায় ঘোষণার দ্বারপ্রান্তে এসে।

অথচ সে সময় খালেদা-নিজামী জোট সরকারের স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবরের তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত কমিটি করে জজ মিয়া নাটক সাজানো হয়েছিল; নষ্ট করা হয়েছিল গ্রেনেড হামলার সব আলামত। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসে জজ মিয়াদের কোনো দোষ খুঁজে পায়নি। বরং ২০১১ সালের ৩ জুলাই ৫২ জনকে আসামি করে সম্পূরক চার্জশিট দাখিল করা হলে প্রকৃত অপরাধীদের মুখোশ উন্মোচিত হয়।

প্রধান আসামিদের তালিকায় নাম রয়েছে-বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান, খালেদা জিয়ার ভাগ্নে সাইফুল ইসলাম ডিউক, জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী (পলাতক), স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বাবর, জামায়াত নেতা আলী আহসান মুজাহিদ (যুদ্ধাপরাধী হিসেবে ফাঁসি সম্পন্ন), সাবেক উপমন্ত্রী পিন্টু (মৃত), জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান (অন্য একটি মামলায় ফাঁসি সম্পন্ন) প্রভৃতি। এদের ভাই ও সঙ্গীদের অনেকেসহ হুজি নেতাদের সংশ্লিষ্টতা এখন প্রমাণিত সত্য। অর্থাৎ একদিকে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় গ্রেনেড হামলা অন্যদিকে জঙ্গিদের সঙ্গে তৎকালীন জোট সরকারের সুসম্পর্ক বর্তমানের তথাকথিত ২০-দলীয় বিরোধীদের রাজনীতির ভয়ানক চিত্র বিশ্ববাসীর সামনে উপস্থাপিত হচ্ছে। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার ৫২ আসামির মধ্যে ৩৩ জন কারাগারে; পলাতক ১২ জনের মধ্যে তারেক রহমান লন্ডনে, হারিছ চৌধুরী আসামে, কেউ কেউ আছেন কানাডা, ব্যাংকক, আমেরিকায়; হুজির শীর্ষ নেতারা পাকিস্তানে পালিয়েছে। এদের সবাইকে অবিলম্বে দেশে ফিরিয়ে এনে বিচার সম্পন্ন করা ও রায় কার্যকর করা জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে দেশের মধ্যে জঙ্গিগোষ্ঠীর তৎপরতা এখনো অব্যাহত রয়েছে। এর প্রধান কারণ বিএনপি-জামায়াত সরকারের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। ১৯৯১-এ জামায়াতের সমর্থনে বিএনপি ক্ষমতা গ্রহণ করার পর ১৯৯২ সালে জামায়াতের সহযোগিতায় ইসলামী জঙ্গি সংগঠন ‘হরকাতুল জিহাদ’ আত্মপ্রকাশ করে প্রকাশ্যে জিহাদের ঘোষণা দেয়। পরবর্তী সময়ে কথিত জিহাদের মাধ্যমে বাংলাদেশে ইসলামী শাসন চালুর অভিন্ন আদর্শে জামায়াত ও ইসলামী জঙ্গি সংগঠনগুলো একে-অপরের পরিপূরক হিসেবে কাজ শুরু করে। তখন থেকেই বিএনপি নীরব দর্শক ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে জঙ্গিবাদের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।

এরই ধারাবাহিকতায় তাদের কার্যক্রম গোপনে চলতে থাকে ১৯৯৬-২০০১ পর্যন্ত শেখ হাসিনার শাসনামলেও। কিন্তু ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট ক্ষমতায় আসার পর ২০০৬ পর্যন্ত সারা দেশজুড়ে জঙ্গিবাদের বিস্ময়কর উত্থান বিশ্ববাসীকে হতবাক করে দেয়। কারণ, জোট প্রশাসন জঙ্গিদের প্রত্যক্ষ সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল। ২০০৫ সালে সারা দেশব্যাপী বোমা বিস্ফোরণের কথা আমরা আগেই উল্লেখ করেছি। সে সময় বিদেশি পত্রিকা থেকে আমরা জেনেছিলাম, লাদেন এ দেশে এসেছিল। শেখ হাসিনার ওপর গ্রেনেড হামলার কথা এ সূত্রে মনে রাখা দরকার।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার ২৯ মার্চ ২০০৭ সালে যে শীর্ষ জঙ্গিদের ফাঁসি কার্যকর করে তাদের সবারই জামায়াত-শিবিরের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়। শায়খ আবদুর রহমান ও সিদ্দিকুল ইসলাম বাংলা ভাই অতীতে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিল। ১৫ জুন ২০০৭ সালে দৈনিক পত্রিকা থেকে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত কয়েকজন জেএমবি সদস্য অতীতে জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার কথা স্বীকার করেছে।

২০০৪ সালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় গ্রেফতারকৃত হরকাতুল জিহাদের প্রধান মুফতি হান্নান তার ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতে হামলার সঙ্গে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, লুৎফুজ্জামান বাবর এবং ইসলামী ঐক্য জোট নেতা মুফতি শহিদুল ইসলামের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। ‘ইসলামী সমাজ’, ‘আল্লাহর দল’ বর্তমানে নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠন। জামায়াতে ইসলামের একাংশ বের হয়ে তৈরি হয়েছিল ‘ইসলামী সমাজ’ আর ‘আল্লাহর দলে’র প্রতিষ্ঠাতা ছিল ছাত্রশিবিরের কর্মী। শীর্ষ নেতারা যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিচারের সম্মুখীন হওয়ায় প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য ভিন্ন পন্থার অনুসন্ধান করেছিল জামায়াত-শিবির। তারা এখন ‘হিযবুত তাহরির উল্লাইয়াহ বাংলাদেশ’, ‘হরকাতুল জিহাদ আল-ইসলামী বাংলাদেশ’ (হুজি)-সহ আরও অনেক জঙ্গি সংগঠনকে তাদের পতাকাতলে একত্র করেছে।

ঐতিহাসিকভাবে এ দেশের সংস্কৃতির সঙ্গে বিশ্বের অন্যান্য ইসলামী রাষ্ট্রের পার্থক্য রয়েছে। এখানকার ইসলাম ধর্মানুসারীরা উদার ও মানবিক। হাজার বছর ধরে অন্যান্য ধর্ম বিশ্বাসীরা এখানে নির্বিঘ্নে বাস করছে। এ জন্যই আমরা মনে করি, ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক জঙ্গিরা জোর করে ক্ষমতা দখল করতে পারবে না। উগ্রপন্থীরা ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালিয়ে বঙ্গবন্ধুর উত্তরসূরি শেখ হাসিনা তথা এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার নেতৃত্বকে নিঃশেষ করতে চেয়েছিল। তাদের সে প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। পরের বছর সিরিজ বোমা হামলার মাধ্যমে দেশকে তালেবান রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্রও নস্যাৎ হয়েছে। বর্তমান সরকারের জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান ইতোমধ্যে প্রশংসা কুড়িয়েছে।

এ ধারা অব্যাহত থাকলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষসহ অন্যান্য ক্ষুদ্র ধর্ম বিশ্ববাসীরাও নিরাপদে এ দেশে বসবাসের নিশ্চয়তা পাবে। সাম্প্রদায়িক ও অনগ্রসর-পশ্চাৎপদ দৃষ্টিভঙ্গির চূড়ান্ত পরিণতির নাম জঙ্গিবাদ। দেশ থেকে এ ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা চিরতরে বন্ধ হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।

ড. মিল্টন বিশ্বোস : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
এবং পরিচালক, জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দফতর, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও