মহীয়সী নারী ফজিলাতুন্নেছা

ঢাকা, রবিবার, ৮ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

মহীয়সী নারী ফজিলাতুন্নেছা

সাজ্জাদ কাদির ৪:১০ অপরাহ্ণ, আগস্ট ০৮, ২০১৯

মহীয়সী নারী ফজিলাতুন্নেছা

বাঙালি নারীর মধ্যে যে ক’জন নারীর স্বমহিমায় উজ্জ্বল স্থানটি পাওয়ার কথা ছিল তার মধ্যে বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের অবস্থানটি উপরের দিকেই। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস ইতিহাস তাকে সেই সুমহান মর্যাদার আসনটি দিতে পারেনি। ইতিহাসের সোজা পথ বারবার বিকৃত হয়ে বাঁকা পথে চলেছে। এজন্য একজন মহীয়সীর অসামান্য অবদান আমাদের প্রজন্মের পর প্রজন্মের কাছে আড়ালেই থেকে গেল। রাজনীতির সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গিও আমাদের এই মহীয়সীকে আড়াল করে রাখার পেছনে অনেকাংশে দায়ী। এই মহীয়সীর অবদান সর্বমহলে খুব বেশি আলোচিত হতে দেখা যায় না।

বঙ্গবন্ধু রচিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’, ‘কারাগারের রোজনামচা’ এবং শেখ হাসিনার লেখনী ও বক্তব্যতেই খানিকটা পাওয়া যায়। এ ছাড়া জন্ম ও মৃত্যুর দিনকে সামনে রেখে কিছু কিছু লেখা ও আলোচনায় তার অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়। আমাদের প্রজন্মের কাছে বেগম মুজিবের জীবিত অস্তিত্ব অনুভব করার সৌভাগ্য হয়নি। এজন্য ইতিহাসের অধ্যায়ন থেকেই তাকে দেখা ছাড়া আমাদের উপায়ও নেই।

১৯৩০ সালের ৮ আগস্ট গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের জন্ম। ডাক নাম রেণু। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব মাত্র তিন বছর বয়সে পিতা ও পাঁচ বছর বয়সে মাতাকে হারান। তারপর চাচাতো ভাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। বঙ্গবন্ধুর মা-বাবার কাছেই ওই পরিবারের অন্য সন্তানের মতোই বেড়ে ওঠেন তিনি।

প্রথমে গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল ও পরবর্তীতে সামাজিক কারণে গৃহশিক্ষকের কাছে পড়াশোনা করেন। বঙ্গবন্ধু তার অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থের সপ্তম ও অষ্টম পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘আমার যখন বিবাহ হয় তখন আমার বয়স বার-তের বছর হতে পারে। রেণুর বাবা মারা যাবার পরে ওর দাদা আমার আব্বাকে ডেকে বললেন, ‘তোমার বড় ছেলের সাথে আমার এক নাতনীর বিবাহ দিতে হবে। কারণ, আমি সমস্ত সম্পত্তি ওদের দুই বোনকে লিখে দিয়ে যাব।’ রেণুর দাদা আমার আব্বার চাচা।

মুরব্বির হুকুম মানার জন্যই রেণুর সাথে আমার বিবাহ রেজিস্ট্রি করে ফেলা হলো। আমি শুনলাম আমার বিবাহ হয়েছে। তখন কিছুই বুঝতাম না, রেণুর বয়স তখন বোধহয় তিন বছর হবে। রেণুর যখন পাঁচ বছর বয়স তখন তার মা মারা যান। একমাত্র রইল তার দাদা। দাদাও রেণুর সাত বছর বয়সে মারা যান। তারপর সে আমার মা’র কাছে চলে আসে। আমার ভাইবোনদের সাথেই রেণু বড় হয়।’ ১৯৩৯ সালে বঙ্গবন্ধু ও বেগম মুজিবের আনুষ্ঠানিক বিয়ে হয়। যখন তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ১৯ ও ৯ বছর। অসমাপ্ত আত্মজীবনী গ্রন্থের ২১ পৃষ্ঠায় বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, ‘১৯৪২ সালে আমাদের ফুলশয্যা হয়।’ ঐটুকু বয়সে বিয়ে হওয়া এই দম্পতির সাংসারিক জীবনে বোঝাপড়া ছিল অসাধারণ। যা এখনকার ঠুনকো দাম্পত্য জীবনের জন্য অনুকরণীয় হতে পারে।

টুঙ্গিপাড়া গ্রামের এক খোকা থেকে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠার পেছনে প্রতিটি পদক্ষেপেই বেগম মুজিবের অবদান ছিল অসামান্য। পেছন থেকে অনুপ্রেরণা এবং সাহস না দিলে বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠা অনেকাংশেই কঠিন হতে পারত। বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের স্মৃতিশক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। তিক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা, শান্ত, অসীম ধৈর্য ও সাহস নিয়ে জীবনে যে কোনো কঠিন পরিস্থিতি দৃঢ়তার সঙ্গে মোকাবেলা করতেন।

বৈষয়িক বিষয়াদি নিয়ে তার কোনো চাহিদা ও মোহ ছিল না। তিনি অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত ছিলেন বলেই স্বাধীন বাংলাদেশে ৩২ নম্বর বাড়ি ছেড়ে গণভবনে থাকতে রাজি হননি। বাড়িতে কার্পেট, দামি আসবাব, এয়ারকন্ডিশন ব্যবহার করেননি। নিজের হাতে স্বামীর খাবার রান্না করে টিফিন ক্যারিয়ারে করে প্রধানমন্ত্রীর দফতরে পাঠিয়ে দিতেন অথবা কখনো কখনো নিজে নিয়ে যেতেন। আপাদমস্তক একজন আদর্শ বাঙালি নারী ছিলেন তিনি।

মনমানসিকতায় ছিলেন অত্যন্ত দয়ালু। অন্যের দুঃখে দুঃখিত হওয়া ছিল তার স্বভাবজাত ব্যাপার। বঙ্গবন্ধু তার ৫৫ বছরের জীবনে রাজনৈতিক কারণে প্রায় ১৩ বছর জেল খেটেছেন। তার রাজনৈতিক জীবনের এই ১৩ বছরের অনুপস্থিতিতে বেগম মুজিবের কারণে কোনো প্রকার শূন্যতা তৈরি হয়নি।

আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের রোগে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা, কারাগারে আটক নেতাকর্মীদের খোঁজ-খবরাদি নেওয়া ও তাদের পরিবার পরিজনের যে কোনো সংকটে পাশে দাঁড়ানো ছিল তার নিয়মিত কাজের অংশ। ছায়ার মতো অনুসরণ করেছেন স্বামী বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে।

জীবনে অনেক কষ্ট করতে হয়েছে তাকে। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে তার মামলা পরিচালনার ব্যবস্থা করা, দলকে সংগঠিত করতে সহায়তা করা, আন্দোলন পরিচালনায় পরামর্শ দেওয়াসহ প্রতিটি কাজে তিনি অত্যন্ত দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। দলের ওই সময়ের ঘটনাপ্রবাহ জেলখানায় সাক্ষাৎকারের সময় বঙ্গবন্ধুকে জানাতেন এবং প্রয়োজনীয় পরামর্র্শ ও নির্র্দেশ নিয়ে আসতেন। বঙ্গবন্ধুর সেই নির্দেশনা আবার দলীয় ফোরামে পৌঁছে দিতেন। জেলে থাকা বঙ্গবন্ধুকে তিনি অনুপ্রেরণা, শক্তি, সাহস ও মনোবল জুগিয়েছেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধের পুরোটা সময় বঙ্গবন্ধু পরিবার পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক গৃহবন্দি ছিল। ওই সময় বেগম মুজিব অসীম সাহস, দৃঢ় মনোবল ও ধৈর্য নিয়ে পুরো পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। তার পূর্বে বিশেষ করে ৭ মার্চের ভাষণ ও ২৩ মার্চের পতাকা উত্তোলনে বঙ্গবন্ধুর প্রধান প্রেরণাদায়ী ও পরামর্শক হিসেবে বিবেচনা করা যায় বেগম মুজিবকে। সার্বিক বিবেচনায় বলা যায় বঙ্গবন্ধুর পুরো রাজনৈতিক জীবনের প্রধান পরামর্শক ছিলেন বেগম মুজিব।

১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের পরদিন ১৭ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু পরিবারের বন্দিত্বের অবসান ঘটে। আর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু লন্ডনে যান। সেখান থেকে বেগম মুজিবের সঙ্গে তার প্রথম কথা হয়। ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন। অবসান ঘটে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের দীর্ঘ প্রতীক্ষার। এরপর যুদ্ধ-বিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজেও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত ছিলেন। অসংখ্য বীরাঙ্গনাকে বিয়ে দিয়ে সামাজিকভাবে মর্যাদা দিয়েছেন তিনি।

বিভিন্ন সময় বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে তার পুরো পরিবারটিকেও আগলে রেখেছিলেন এই মহীয়সী নারী। শ্বশুর-শাশুড়ির যত্ন আত্তি, পাঁচ সন্তানের পড়ালেখা থেকে শুরু করে যাবতীয় বিষয়ে দেখভাল করা, আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা সবকিছু অত্যন্ত সূচারুরূপে করে গেছেন। সন্তানদের যেমন ভালোবেসেছেন তেমনি শাসন করেছেন।

বঙ্গবন্ধুর সীমাহীন ব্যস্ততার কারণে সন্তানদের কাছে একাধারে পিতা ও মাতা উভয়েরই দায়িত্ব পালন করে গেছেন জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তিনি ছিলেন কোমলে কঠোরে মিশ্রিত এক দৃঢ়প্রতিজ্ঞ সাহসী নারী। স্বামীর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে তিনি সন্তানদের গড়ে তোলেন। এই সময়ে এসেও এ দেশের মানুষ যার সুফল পাচ্ছে তাদের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার মতো একজন দৃঢ়চেতা বিশ্বখ্যাত নেতৃত্বের মাধ্যমে। তার অপত্য স্নেহ, মমতা, দরদ ও আপ্যায়নের কথা আজও ওই সময়ের রাজনীতিবিদরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

বাঙালি জাতির সুদীর্ঘ স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপে সক্রিয় সহযোগিতা করেছেন বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব। ইতিহাসে তাই বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব কেবল একজন সাবেক রাষ্ট্রনায়কের সহধর্মিণীই নন, কিংবা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর মাতাই নন; তিনি বাঙালির স্বাধিকার ও মুক্তির এক অন্যতম স্মরণীয় অনুপ্রেরণাদায়ী। ইতিহাস যতই নিষ্ঠুর হোক না কেন, তার নামটি কখনো মুছে ফেলা যাবে না।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেটে জাতির জনকের পুরো পরিবারের সঙ্গে এই মহীয়সীও শহীদ হন। ৪৫তম শাহাদাত বার্ষিকীর এই সময়ে তার আত্মার শান্তি কামনা করছি। আজ ৮ আগস্ট বেগম মুজিবের ৯০তম জন্মদিন। জন্ম এবং মৃত্যু দিনের এই কাছাকাছি সময়ে আমাদের প্রত্যাশা একজন বেগম মুজিবের জীবনদর্শন এ দেশের লাখো-কোটি নারীর জীবনদর্শন হয়ে উঠুক। তাহলেই সমাজে শান্তি বিরাজ করবে।

সাজ্জাদ কাদির : লেখক, কলামিস্ট
টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব ও তথ্যচিত্র নির্মাতা
[email protected]

 
 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও