ভয়-আতঙ্কে বেসামাল সমাজ

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

ভয়-আতঙ্কে বেসামাল সমাজ

আশেক মাহমুদ ৫:৪৪ অপরাহ্ণ, জুলাই ৩০, ২০১৯

ভয়-আতঙ্কে বেসামাল সমাজ

এই দেশ, এই মাটি নিয়ে আমাদের কত কি স্বপ্ন। অথচ আজ আমরা থাকছি মহাআতঙ্কে, এটা ভাবতেই কষ্ট হয়। সমাজের মানুষ এখন স্বপ্ন দেখা বন্ধ করে দিয়েছে। মানুষ আতঙ্ক থেকে বাঁচতে চায়। দারিদ্র্যের চেয়ে সাংস্কৃতিক দারিদ্র্য যে কত ভয়াবহ হতে পারে-তা আমজনতা এখন অতিমাত্রায় টের পাচ্ছে। রাস্তায় চললে গাড়িচাপার ভয়, খেতে গেলে ভেজালের ভয়, পকেটে টাকা থাকলে ছিনতাই-চাঁদাবাজের ভয়, নারী হলে ধর্ষণের ভয়, প্রেম হলে ছলনা করে লুটে নেওয়ার ভয়, চাকরি হলে চাকরি হারানোর ভয়, বিয়ে হলে তালাকের ভয়, পরকীয়া হলে খুনের ভয়, সন্তান হলে সন্তান হারানোর ভয় এখন যেন স্বাভাবিক কিছু।

আর সব ভয়ের গণ্ডি পেরিয়ে এখন শুরু হয়ে গেছে যে কোনো সময় যে কারও হাতে গণপিটুনির ভয়। এটা কি করে আমরা ভাবতে পারি যে একটা স্বাধীন দেশের নাগরিকরা গণপিটুনির আতঙ্কে থাকবে। আমি জানি না, অন্য কোনো দেশে এরূপ বীভৎস অবস্থা আছে কিনা। মোট কথা, দেশ এখন মহাআতঙ্কের মধ্যে চলছে। জনগণের মধ্যে থাকা সব চেতনা বিলুপ্তির পথে। বাবা তার কন্যাসন্তানকে দেখতে গিয়ে গণপিটুনিতে মারা যায়। বাবার বলার সাধ্য নেই যে সে মেয়েটির বাবা।

কেননা বাবা তো বোবা, কথা বলবে কি করে? এদিকে কন্যাসন্তান তুবার মা তাসলিমাকে যেভাবে নির্মম নৃশংসভাবে ও নির্লজ্জভাবে হত্যা করল যা দেখে আমরা সবাই শুধু বিস্মিত নয়, চরমভাবে লজ্জিত। আমার প্রশ্ন- হঠাৎ করে জনতা এখন প্রতিবাদী ভাবজগতে কি করে এলো? সমাজের মানুষের মধ্যে যে জ্ঞান, বিবেক, বোধশক্তি কিছু নেই-এটা তার প্রমাণ। ছেলেধরা সন্দেহে নির্মমভাবে হত্যার আয়োজন করা হচ্ছে উৎসব করে। আগে তো আমরা দেখতাম, ছিঁচকে চোরকে বেঁধে পেটানো হতো, জিজ্ঞাসাবাদ করা হতো-কেন সে চুরি করেছে, তারপর উত্তম-মধ্যম দেওয়া হতো। কিন্তু এখন ছেলে ধরা নামে সন্তানের মাকে, কোথাও সন্তানের বাবাকে সাপের মতো করে মেরে ফেলা হচ্ছে!

এটা কি করে আমরা সহ্য করতে পারি, সন্তানের মাকে, সন্তানের বাবাকে দিনে দুপুরে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়, সঙ্গে সঙ্গে সেলফি তোলার হিড়িক পড়তে থাকে। আগে যেখানে মা-বাবা আতঙ্কে থাকত, তার সন্তানকে কেউ অপহরণ করে মুক্তিপণ দাবি করে কিনা। অথচ এখন এ কোন সমাজ দেখতে পাচ্ছি, যেখানে মা-বাবা নিজেরাই আতঙ্কে আছে নিজের সন্তানের অপহরণের দায় দিয়ে কখন তাদের পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়।

কেউ কেউ এই সুযোগে তার শত্রুকে মারার দুরভিসন্ধি করছে। এই আতঙ্কে এখন মায়েরা তার সন্তানকে স্কুলে পাঠাতে ভয় পাচ্ছে। নির্লজ্জ দুরাচারের কোন সীমায় গেলে এমনটি হতে পারে, তা বোঝার সাধ্য আমাদের নেই। আমরা বলতাম, নারীর গায়ে স্বামীর হাত তোলা অন্যায়, এটা এক ধরনের পুরুষতান্ত্রিক অনাচার। অথচ নারীরা যে কোনো সময় ধর্ষিত হতে পারে, যে কোনো সময় আগুনে ঝলসে যেতে পারে, যে কোনো সময় ছেলে ধরার নামে গণপিটুনির শিকার হতে পারে। শুধু কি নারী? কেন বোবা বাবাকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যা করা হলো? এর উত্তর কে দেবে? এরূপ কদর্য সমাজ একদিনে হয়নি। বহু কারণ আমাদের এরূপ পরিস্থিতিতে নিয়ে গেছে।

এক.
কারও কারও মতে, সমাজে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষ আস্থা হারিয়ে ফেলেছে বলে আইন নিজের হাতে নিয়ে নিয়েছে। এভাবে গণপিটুনি প্রচলিত অব্যবস্থার এক প্রতিক্রিয়া মাত্র। আমি মনে করি, ব্যাপারটা আরও গভীরে। কেন বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা থাকে না। যে শিক্ষিত শ্রেণি বিচারের কাজ করবে তারা কি স্বাধীন? তারা কি রাজনৈতিক প্রভাব থেকে মুক্ত? অন্যদিকে অফিস আদালতে যেখানে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না, সেখানে কি করে সুষ্ঠু বিচার হবে তা আমার বুঝে আসে না। সমাজে যারা প্রভাব-প্রতিপত্তিহীন তারা তো মনে করে বিচার তাদের জন্য নয়। তাই তারা মামলা করতেও যায় না। বিচার যদি প্রভাব আর অর্থের বলে চলে তাহলে মানুষ কি করে বিচারের ওপর আস্থা রাখবে? তাছাড়া বিচারে যদি প্রকাশ্য খুনিরা ছাড়া পায়, তখন বিচার কি হাস্যকর ব্যাপার হয়ে যায় না? তাহলে এর সমাধান কি? অনেকেই বলে এর সমাধান ক্রসফায়ার।

দুই. 
কারও কারও মতে, কিছু কিছু লোমহর্ষক ঘটনায় জনতার মুখে ক্রসফায়ারের দাবি ওঠে। নয়ন বন্ডের মতো লোকদের ক্রসফায়ার দেওয়ায় মানুষের কাছে ক্রসফায়ারই বিকল্প বিচার নামে অভিহিত হয়। সে কারণে ছেলে ধরার গুঞ্জন উঠলেই মানুষ শব তৈরি করে নিজেরাই ক্রসফায়ারের মতো করে মেরে ফেলতে উদ্যত হয়। আমি এ কারণটিকেও যথার্থ মনে করি না। ফেসবুক নিজেই আতঙ্ক তৈরি করে দিতে পারে, সেই আতঙ্কের ওপর মানুষের বিশ্বাস জন্মায়। কেননা সমাজে এমন কোনো নেতৃত্ব তৈরি হয়নি, যাদের কথা জনতার ওপর প্রভাব ফেলবে। সে শূন্যতা বিকৃত রূপে পূরণ করতে যায় জনপ্রিয় ফেসবুক।

ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে যায়, পদ্মা সেতু নির্মাণ করতে লাখ খানিক মানুষের মাথা লাগবে। সেই থেকে মানুষের মধ্যে জন্মে আতঙ্ক, ছেলে ধরা আতঙ্ক। ছেলে ধরা, অপহরণ আগেও ছিল, এখনো আছে।

কিন্তু যখন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেই আতঙ্ক থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য কোনো নির্ভরযোগ্য প্রচারণা আসেনি। কেননা সমাজের মানুষ এমন কোনো নেতৃত্ব দেখছে না যারা অবহেলিত মানুষদের জন্য কাজ করে চলছে। এমন কোনো স্বাধীন সুশীল সমাজ তথা নৈতিক বুদ্ধিজীবী শ্রেণি আসেনি, যাদের ওপর মানুষ আস্থা রাখতে পারছে। এমন কোনো আলেম শ্রেণি আসেনি যারা জনগণের ভাগ্য নিয়ে কথা বলবে। জনগণের ভাগ্য নিয়ে যখন শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির কোনো কাজ নেই তখন সেই জাতি কি করে গড়ে উঠবে?

তিন.
নারী যখন ধর্ষিত হয়, তখন জনতা নীরব থাকে। নুসরাতকে আগুনে পোড়ানোর পর যারা দায়ী তাদের ওপর জনতার ক্ষুব্ধ রোষ চাপা পড়া ছিল। বাসচাপায় সন্তানকে যখন পিষে ফেলা হয় তখন মানুষের ক্ষোভ থাকে পুঞ্জীভূত। সবাই জানে কে ঘুষখোর, তারপরও ঘুষখোর ভেবে কেউ তার গায়ে আঁচড় তো দেয়ই না বরং অনেকেই তাদের সম্মান করে।

এ থেকে বোঝা যায় যারা প্রমাণিত অপরাধী তাদের ওপর মানুষের ক্ষোভ থাকে কম, যদি থাকেও তা থাকে নিস্তেজ হয়ে। অথচ সন্দেহের ওপর মানুষের এত ক্ষোভ ও অনাচার প্রমাণ করছে আমরা জাতি হিসেবে কত নিম্ন পর্যায়ে আছি। সন্দেহ যখন প্রমাণিত অপরাধের চেয়ে শক্তিশালী হয়, তখন প্রমাণিত হয়, মানুষ অজ্ঞতার চরম সীমায় বাস করছে।

সেই সন্দেহের বশে যখন একজন মাকে রাস্তার মধ্যে পিটিয়ে পিটিয়ে হত্যা করা হয় তখন, আর সেই হত্যাকাণ্ড কেউ উপভোগ করে, কেউ সেলফি নিয়ে থাকে, তখন নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়, সমাজের মানুষ কি পরিমাণ অমানবিক, অসৎ ও পশু প্রকৃতির।

চার.
যে জাতি সন্দেহের ওপর ক্ষুব্ধ হয়, সন্দেহের ভিত্তিতে মানুষ হত্যা করে, সে জাতির ভাগ্যে কি দুর্দশা আছে, আমার জানা নেই। তবে আমাদের সমাজের একটা প্রথা সব সময় চলে আসছে, তা হলো দুর্বলের ওপর শক্তি দেখানো। দুর্বলের ওপর শক্তি দেখানো যখন মানুষের মজ্জাগত হয়ে যায় তখন মানুষ তার অজ্ঞতা, সন্দেহ আর ক্ষোভগুলো সে জায়গাগুলোতে প্রয়োগ করে। এর পরিণতি আজ আমরা সবাই ভোগ করছি।

এভাবে কি চলতে থাকবে? নাকি পরিবর্তন হবে? মানুষের ভাগ্যের পরিবর্তনের জন্য কতজন দায়িত্ব নিয়ে কাজ করছে? শিক্ষিত শ্রেণি যত বড় আকার ধারণ করছে ঠিক তত বড় মাত্রায় স্বার্থপর হয়ে পড়ছে। এ দেশের আলেম সমাজ জনগণ থেকে বিচ্ছিন্ন, তারা জানেই না সমাজের প্রতি তাদের দায় দায়িত্ব কি? বুদ্ধিজীবী শ্রেণির এক অংশ দেশি বিদেশি প্রভাবশালী শক্তির আনুগত্য করছে, আর এক অংশ নিষ্ক্রিয় বিলাসী জীবনের প্রতি নিবিষ্ট থাকছে।

এ অবস্থার পরিবর্তন দরকার। শিক্ষিতদের দায়িত্ব নিতে হবে সমাজের সংস্কারের জন্য, জ্ঞানীদের দায়িত্ব নিতে সমাজের মানুষদের পথ দেখানো জন্য, রাজনীতিবিদদের দায়িত্ব নিতে হবে রাষ্ট্র ও প্রশাসনকে গণমুখী করার জন্য। যদি ও এটা সময় সাপেক্ষ, তবুও করতে হবে। আপাতত গণপিটুনির আতঙ্ক থেকেমা বাবাদের মুক্ত করতে হবে। প্রয়োজনে, গণপিটুনিতে অংশ নেওয়া লোকদের গণগ্রেফতার করে শাস্তি দিতে হবে। প্রশাসনিক কাঠামোকে যদি গণমানুষের অধিকারের অবলম্বন করা না হয়, তাহলে মানুষ কি করে বুঝবে যে তারা আজ স্বাধীন দেশের নাগরিক।

আশেক মাহমুদ : সহকারী অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা 
[email protected]

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও