ফারুক স্যার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা

ঢাকা, সোমবার, ১৪ অক্টোবর ২০১৯ | ২৯ আশ্বিন ১৪২৬

ফারুক স্যার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা

আশেক মাহমুদ ৫:৪৩ অপরাহ্ণ, জুলাই ১৭, ২০১৯

ফারুক স্যার ও বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা

বিশ্ববিদ্যালয় শুধু অ আ ক খ মুখস্থ করাবে তা হতে পারে না। বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান সৃষ্টি করবে, গবেষণা করবে, রিপোর্ট বের হবে এবং জনগণ সতর্ক হবে। আমরা যেটা প্রকাশ করেছি সেটা সম্পূর্ণ দেশের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেই প্রকাশ করেছি-অত্যন্ত দামি এ কথাগুলো বলেছেন সম্প্রতি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক ও গবেষক আ ব ম ফারুক স্যার। কেন বললেন, তা সবারই জানা।

সম্প্রতি দেশের বড় বড় কোম্পানির প্যাকেটজাত দুধের ওপর গবেষণা চালায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়োমেডিকেল রিসার্চ সেন্টার। এর পরিচালক অধ্যাপক আ ব ম ফারুক গবেষণা থেকে উল্লেখ করেন, পাস্তুরিত দুধে শক্তিশালী অ্যান্টিবায়োটিক, ডিটারজেন্ট ও ফরমালিন পাওয়া গেছে। অমনি চারদিকে হইচই পড়ে যায়। চলতে থাকে স্যারের ওপর আমলাতান্ত্রিক আক্রমণ। যা একটা জাতির জন্য চরম অবমাননাকর।

প্রশ্ন হলো একটা গবেষণাকে পাল্টা গবেষণা ছাড়াই আক্রমণ করা কি শোভনীয়? গবেষণা কি রাজনৈতিক বিষয় যে এটাকে আমলাতন্ত্র দিয়ে নিয়ন্ত্রিত করতে হবে। জ্ঞান-গবেষণা যদি স্বাধীনভাবে পরিচালিত না হয়-তা হলে কী করে একটা জাতি উন্নত হতে পারে, আমার জানা নেই। সরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান আর স্বায়ত্তশাসিত গবেষণা এক হতে পারে না। যদি এক হয়, তখনই অস্তিত্বের সংকট বড় হয়ে যায়।

জার্মানির বিখ্যাত দার্শনিক কার্ল জেসপার বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা নিয়ে যে দর্শন হাজির করেছেন তাতে স্পষ্ট, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো সার্বিক সত্য অনুসন্ধান করা। তার এ স্বাধীন সত্য অনুসন্ধান বিষয়ক দর্শনকে মানতে না পেরে তাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসরশিপ থেকে বহিষ্কার করা হয়, এমনকি তার গবেষণা প্রকাশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। কার্ল জেসপার সরাসরি উল্লেখ করেন, The universitz must be free because it acts as an intellectual conscience to the state; as such it is not a political tool but, because it speaks from a basis of knowledge, it can fundamentallz affect action. It controls the state through the power of truth not of forceÕ (Jaspers, 1960, p. 135). এর মানে- বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ হলো মুক্ত চেতনায় বুদ্ধিবৃত্তিক জ্ঞান নির্মাণ করা, যা কিছুতেই রাজনৈতিক হাতিয়ারে পরিণত হতে না পারে। বরং বিশ^বিদ্যালয় যে সত্য হাজির করবে তা দিয়েই রাষ্ট্র চলবে, কোনো শক্তি বা ক্ষমতা দিয়ে নয়।

ঐতিহাসিক কাল থেকে মুক্ত গবেষণার ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করার যে রীতি চলে আসছিল, তা এখনো আমাদের দেশে রয়ে গেছে। আরো বহু দেশে এমনটি এখনো চলছে। এটা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। কলেজ বিশ^বিদ্যালয় থেকে উচ্চতর ডিগ্রিধারীরাই সমাজের সর্বস্তরে বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত থাকে।

সবারই দায়িত্ব জনগণের জন্য কাজ করা। কিন্তু মৌলিক শিক্ষার অভাবে এমনকি সার্বিক সত্য থেকে দূরে থাকার কারণে শিক্ষিত সমাজ জাতিকে গহিন অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে, যা কিছুতেই সভ্য সমাজের জন্য কাম্য নয়। তাছাড়া উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যে অধিক অর্থ আয়ের লোভ যেভাবে জেঁকে বসেছে, তাতে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ভেঙে পড়ার উপক্রম। আমলাতন্ত্র হয়ে গেছে আখের গোছানোর একটা আধুনিক পদ্ধতি। এই আমলাতন্ত্র যেভাবে দুর্নীতিকে নীতি বানিয়ে ফেলেছে, যেভাবে অপরাধকে পুণ্য কাজে রূপ দিয়েছে-সেই জায়গা থেকে দেখলে বোঝা যায় আমরা এখনো শিক্ষিত জাতি হতে পারিনি।

জাতিকে পথ দেখানো আর শিক্ষিত করে তোলার দায়িত্ব শিক্ষকদের, জ্ঞানী-বুদ্ধিজীবীদের, যাদের আমরা বলি সুশীল সমাজ। অথচ সুশীল সমাজ আজ অন্তসারশূন্য জীবন চেতনা নিয়ে চলছে বলেই চাটুকারিতার এক প্রবল প্রতিযোগিতা সবাই দেখতে পাচ্ছে। সেকারণে জনগণের ওপর আধিপত্য কায়েম রাখার কালচার নির্মম নিয়তির মতো চলছে। পাওলো ফ্রেইরে সে জায়গা থেকে বলে গেছেন, ‘প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা কাঠামো হলো মুখস্থ-নির্ভর, আনুগত্য-নির্ভর ও আপসকামিতা-নির্ভর। সেই অত্যাচারী কাঠামো থেকে সরে এসে অনুসন্ধানী সৃষ্টিশীল শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করেন পাওলো ফ্রেইরে। অথচ আমরা সেই প্রাগৈতিহাসিক আনুগত্য-নির্ভর শিক্ষা নিয়ে চলছি, যা আমাদের স্বাধীনতার মৌলনীতিবিরোধী।

পাশ্চাত্যের ইতিহাসে ক্যাথোলিক পোপতন্ত্র বিজ্ঞান-গবেষণাবিরোধী ছিল বলে তারা ধিকৃত হয়, আরবের রাজতান্ত্রিক শাসনে সত্যিকারের গবেষক, বিজ্ঞানী ও দার্শনিকদের শাস্তির আওতায় আনা হতো। তাই আমরা রাজতন্ত্রকে ধিক্কার জানিয়ে আসছি। আমাদের বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে স্বাধীনভাবে আমরা যেন একটা দেশ ও জাতি গড়তে পারি, সে প্রত্যাশায়। অথচ আধুনিক রাজাকারদের করাল থাবায় আমরা এখনো সে লক্ষ্যে যেতে পারিনি। আমরা পুরো আমলাতন্ত্রকে ঘুষ দুর্নীতির আখড়া বানিয়ে ফেলেছি। এই দুর্নীতিবাজরাই এ কালের রাজাকার।

এদের কারণে সৎ অফিসাররা স্বাধীনভাবে জনগণের জন্য কাজ করতে পারে না, এদের কারণে বেড়ে চলছে ব্যাঙ্ক লুটপাট, এদের কারণে শিক্ষা হয়েছে শোষণের হাতিয়ার, এদের কারণে ১৬ কোটি মানুষকে থাকতে হচ্ছে বিচারহীনতার মধ্যে, এদের কারণে প্রতিটি খাবার-পণ্য ভেজালে ছেয়ে গেছে।

আজ যখন ঢাবির গবেষণায় মাত্রাধিক ভেজাল ধরা পড়েছে, তখনই গবেষকদের টুঁটি চেপে ধরা হচ্ছে আমলাতান্ত্রিক কায়দায়। তাহলে আমরা কি ভেজাল খেতে খেতে মরব? আমরা কি গবেষণার স্বাধীনতা হারাব? আমরা কি ঘুষখোর হানাদার বাহিনীর হাতে মার খেতে থাকব? নাকি স্বাধীন জাতি গড়ার স্বপ্ন দেখব।

কার্ল জেসপারের কথা দিয়ে শেষ করছি- Universitz education is a formative process arriving at meaningful freedom; it takes place through participation in the universitz’s intellectual life’ (Jaspers, 1960, p. 65).

আশেক মাহমুদ : সহকারী অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
[email protected]

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও