‘কার খালু’দের আর্তনাদ জলে যাক!

ঢাকা, ১৯ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

‘কার খালু’দের আর্তনাদ জলে যাক!

নূরুজ্জামান ৬:২০ অপরাহ্ণ, জুলাই ০৯, ২০১৯

‘কার খালু’দের আর্তনাদ জলে যাক!

গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলছে। মূল্যবৃদ্ধিতে অর্থনীতির ওপর কী প্রভাব পড়বে তা নিয়ে ইতোমধ্যেই অর্থনীতিবিদরা চুলচেরা বিশ্লেষণ করে বক্তৃতা-বিবৃতি দিতে শুরু করেছেন। মহারথীদের এসব যুক্তিতর্ক ও বিচার-বিশ্লেষণ আমার মতো ডেঙ্গুর কামড়ে পঙ্গু মানুষের মাথায় ঢোকে না। আমার মতো পঙ্গু যারা ঘরের জ্বালাতেই দিনরাত দগ্ধ হয়ে চলেছেন, তাদের মাথায় এসব আকাশকুসুম ভাবনা ঢোকার ফাঁক-ফোকর কোথায়? আমাদের ঘরের জ্বালাই তো মহল্লার পথ ধরে সারা দেশের মানুষের কাউকে কাউকে অগ্নিদগ্ধ করে চলেছে!

তাই মহারথীদের এসব আকাশকুসুম ভাবনার ফাঁক গলিয়ে আমাদের মাথায় কেবলই ঘরের চিন্তা! আমাদের ঘরে গ্যাসই নেই তো মূল্যবৃদ্ধির চিন্তা আক্রমণ করবে কী করে? আমার মতো যাদের ঘরে গ্যাস নেই তাদের একটা বিরাট অংশ গ্যাসের দাম বাড়ালেও গ্যাস চান! কারণ অনেক আছে। শুধু এটুকুই বলা কর্তব্যের বাধ্যবাধকতার জাঁতাকলে পিষ্ট মাথা অস্থির হয়ে মাছির মতো ভনভন করে ঘুরছে বিধায় নিম্নের কটুবাক্যগুলো বলতে বাধ্য হলাম!

যারা গ্যাসের নতুন সংযোগ পাওয়ার জন্য পাগল হয়ে আছেন, তাদের কাছে মূল্যবৃদ্ধির শূল কোনো যন্ত্রণাই না। তারা সংযোগ না পাওয়ার যন্ত্রণায় কাতর হয়ে কুনো ব্যাঙের মতো ঘরের কোণে বসে স্ত্রীর সঙ্গে ভ্যাক ভ্যাক করছেন! কারণ নতুন সংযোগ না পাওয়ায় তাদের গায়ে আগুন জ্বলছে! এটা তাদের জন্য মরণফাঁদ হয়েও দাঁড়িয়েছে বটে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংযোগ দেওয়া বন্ধ রয়েছে কিন্তু বিল্ডিং তৈরি তো বন্ধ হয়ে নাই। এই দীর্ঘ সময়ে যেসব নতুন বিল্ডিং তৈরি হয়েছে তারা গ্যাস সংযোগ নেই বলে বাড়িভাড়া অন্যদের চেয়ে কম করে হলেও ২০% কম নিতে বাধ্য হচ্ছেন। তাছাড়া ভাড়াটিয়ারা সিলিন্ডার গ্যাসের বাসায় থাকতে চান না। কারণ অবশ্যই সিলিন্ডার গ্যাসের খরচ প্রায় ডাবল হয়।

১২ কেজির ১ সিলিন্ডারে ১৮/১৯ দিন রান্না করা যায়। যার দাম ১১০০/১২০০ টাকা। সেই হিসাবে ৩০ দিনে প্রায় ১৮০০ থেকে ২০০০ টাকার গ্যাস লাগে। অন্যদিকে পাইপের গ্যাস ব্যবহারের মতো নিরাপদ নয় সিলিন্ডার ব্যবহার। তাই স্বাভাবিক কারণেই ভাড়াটিয়ারা যে বাড়িতে সিলিন্ডার গ্যাস ব্যবহার করা হয়, সে বাড়িতে ভাড়া থাকতে চান না। অনেক বুঝিয়ে যদিও কাউকে রাজি করানো যায়, সে আবার ভাড়া অনেক কম দিতে চান।

আর ভাড়া কম দিতে চাইবেন, এটাই তো স্বাভাবিক। কারণ একদিকে লাইনের গ্যাসে খরচ কম অন্যদিকে নিরাপদ। পক্ষান্তরে সিলিন্ডারে খরচ ডাবল এবং ব্যবহার করাও ঝুঁকিপূর্ণ। তাই যারা নতুন বিল্ডিং করেছেন তারা পাইপের গ্যাসের সংযোগ পেতে উদ্গ্রীব। নতুন গ্রাহকদের গ্যাস সংযোগ না পাওয়ার বিড়ম্বনাও কম নয়। তারা বাড়িভাড়া ২০% কম নিতে বাধ্য হলেও সিটি করপোরেশনের হোল্ডিং ট্যাক্স কিন্তু অন্যদের সমানই দিতে হচ্ছে!

এই কারণে যাদের বাড়িতে পূর্ব থেকে গ্যাসের সংযোগ আছে এবং মাত্র ১টি চুলার অনুমোদন আছে তাদের অনেকেই তাদের চাহিদার বাড়তি চুলাগুলো অবৈধভাবে জ্বালাচ্ছেন। যার প্রমাণ সংবাদপত্রের খবরে প্রকাশ ‘অনুমোদন ১ চুলা, জ্বলছে ১৮টা!’

এমন চুরি করতে গিয়ে কেউ কেউ লাইনের গ্যাস সরবরাহকারী সরকারি কোম্পানির অসাধু লোকদের সঙ্গে লিয়াজোঁ করে চলছেন! আর লিয়াজোঁ মানেই ঘুষ দিয়ে অবৈধভাবে গ্যাস জ্বালানো। দৈনিক মানব জমিন পত্রিকার গত ১০ জানুয়ারি ২০১৯ এর প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী এভাবে অবৈধ সংযোগ রয়েছে ৩ লাখেরও বেশি! যেহেতু প্রতিদিনই নতুন নতুন বিল্ডিং তৈরি হচ্ছে সেহেতু এভাবে অবৈধ গ্যাস ব্যবহারও বাড়ছে বৈ কমছে বলে মনে হয় না।

যদি অবৈধ সংযোগ ৩ লাখও হয়, তবুও পূর্বনির্ধারিত মূল্যে মাসে ২৪ কোটি টাকার গ্যাস চুরি হচ্ছে! সেই হিসাবে বছরে ২৮৮ কোটি টাকার গ্যাস চুরি হচ্ছে! আর বর্তমানের বর্ধিত মূল্যে চুরি হবে ৩৫১ কোটি টাকার গ্যাস! অথচ এই চুলাগুলোকে বৈধতা দিলেই বছরে কমপক্ষে ৩৫১ কোটি টাকা সরকারের ঘরে জমা হয়। সেইসঙ্গে অবৈধভাবে গ্যাস জ্বালানোর পাপের অন্তর্দ্বন্দ্বে ভুগতে থাকা মানুষগুলোও কিছুটা তৃপ্তি পায়। গ্যাসে ভর্তুকির পরিমাণও কমে আসে। প্রশ্ন হচ্ছে তাহলে কার স্বার্থে সরকার যেসব বাড়িতে গ্যাসের লাইন আছে তাদের বাড়তি চাহিদার সংযোগ দিচ্ছেন না?

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নাকি সরকার বাহাদুরের দূরদর্শী লোকজনের এসব পরিসংখ্যান মাথায় ঢুকেও ছিল! তাই তারা বক্তৃতার মাঠে যেসব বাড়িতে পূর্ব থেকেই গ্যাসের লাইন আছে এবং এক বা একাধিক চুলা জ্বালানোর অনুমোদন আছে তাদের বাড়তি চাহিদাগুলোতে সংযোগ দেওয়ার কথা বলেছিলেন। নির্বাচনের ডামাডোলে কর্তাব্যক্তিরা বুঝি সেসব ভুলে গেছেন! তাই ২৩ মে ২০১৯ ঢাকা ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে জানতে পারলাম সরকার নাকি বিতরণকারী কোম্পানিগুলোকে বাসাবাড়িতে নতুন গ্যাস সংযোগ একেবারে লিখিত চিঠি দিয়ে ফরমান জারি করে বন্ধ করে দেওয়ার আদেশ দিয়েছেন! হায় কপাল! নির্বাচনের আগে যেটুকু আশার প্রদীপ জ্বলেছিল তার সবচুকুই তেলসহ পুড়ে ছাই হয়ে বাতিও নিঃশেষ হয়ে গেল!

কপাল পোড়ালেন ভালো কথা, এবার একটা এই বলে এমন শক্তিশালী চিঠি সিটি করপোরেশনকে দিন তো দেখি-‘যেসব বাড়িতে গ্যাস সংযোগ নেই, সেসব বাড়ির হোল্ডিং ট্যাক্স ২০% কম নিতে হবে!’ তাহলে অন্তত এটুকু বুঝব যে আপনারাও কেউ কেউ ডেঙ্গুর কামড়ে আমার মতো পঙ্গু হতে পেরেছেন!

নচেৎ ধরেই নেব যে আপনারাও ওইসব চুলচেরা বিশ্লেষক অর্থনীতিবিদদের দলেরই বড় বড় অঙ্ক কষা লোক! আর আমরা বঙ্কিম চন্দ্রের ‘বঙ্গদেশের কৃষক’! যেখানে ‘কর্ণওয়ালিস প্রজাদের হাত পা বান্ধিয়া জমিদারের গ্রাসে ফেলিয়া দিলেন-জমিদার কর্ত্তৃক তাহাদিগের প্রতি কোনো অত্যাচার না হয়, সেই জন্য কোনো বিধি ও নিয়ম করিলেন না।’ সেকালের হাত পা বাঁধা কৃষকের মতো একালের গ্যাস সংযোগ বঞ্চিতরা আপনাদের প্যাঁচানো দড়ির প্যাঁচে আটকা পড়ে শুধুই ছটফট করতে থাকবে! কর্ণওয়ালিসের মতো প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা আপনারাও রাখলেন না।

না জানি এসব অবান্তর কথা আবার কারো অন্তরে শূল হয়ে বিঁধে আমাকেই শূলে চড়ানোর পরিকল্পনা করছে কি-না! কারণ বঙ্কিমের প্রবন্ধ বলে, ‘কৃষক গোমস্তার নামে নালিশ করিতে গেল, সেই অবসরে গোমস্তার বাধ্য লোকে তাহার ধান চুরি করিয়া লইয়া গেল, না হয় আর একজন কৃষক গোমস্তার নিকট হইতে পাট্টা লইয়া তাহার জমিখানি দখল করিয়া লইল।’ কি জানি, সহৃদয়বান গ্যাস কোম্পানির কর্তাদের চোখের আড়ালে তাদের পান্ডারা আবার আমাদের অনুমোদিত ১টি চুলা না জানি কখন বন্ধ করে দেন!

সেকালের কথা একালে নিষ্প্রয়োজন। কারণ সেকালের বিদেশি শাসন থেকে মুক্তি পেতে আমাদের দুই দুই বার যুদ্ধ করতে হয়েছে। শেষ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যিনি তার সম্মান বিশ্বজনীন। তিনি আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান! তিনি জীবিত থাকলে এমন অসঙ্গতির কথা তিনিই বলতেন। আমাদের পোড়ামুখের প্রলাপের প্রয়োজন হতো না। ব্যথা এইখানে লাগে, ঘাতকরা আমার আপনারে সপরিবারে নির্মমভাবে খুন করেছে! তাই তো আজ উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপবে না এমন শঙ্কা দূর হয় না!

সব সময় সফরীর মতো ভয়ে থাকতে হয়! যেখানে বড় বড় মাছের ভয়ে ভয়ে থেকেও তাদের আহারে পরিণত হওয়া সফরীদিগের ভাগ্যের নির্মম পরিহাস! কারণ বঙ্কিম বাবু জানিয়েছেন সেকালে ‘শূদ্রের দাসত্বে ক্ষত্রিয়ের ধন এবং ধর্র্মের লোপ হয়।’ আমাদের সমাজেও ক্ষত্রিয়ের তো অভাব নেই! তাই তো শূদ্র হয়ে যখন চারদিকে কিলবিল করা গ্যাসখোর ক্ষত্রিয়দের বিরুদ্ধে কথা বলি বা সফরী হয়ে যখন বোয়ালের ভুল ধরি, তখন বুকটা খাঁচায় বন্দি ছোট্ট ইঁদুরের মতো দুরু দুরু করে!

যাহোক ক্ষম অপরাধ! গ্যাসের দাম বৃদ্ধি করলে রাষ্ট্রের রাজস্ব বাড়বে, কমালে জনগণের দোয়া বাড়বে! আর যেসব বাড়িতে পূর্ব থেকেই সংযোগ আছে তাদের বাড়তি চাহিদা পূরণ করলে চুরি বন্ধ হবে, মানুষের নৈতিক অবক্ষয় কমবে, রাষ্ট্রে রাজস্ব বাড়বে। কোনটা বেশি লাভজনক ভেবে দেখা মহারথীদের কাজ! আমার ডেঙ্গু খাওয়া পঙ্গু মাথার ভুলগুলো যদি আপনারা কুল হয়ে শুনেন ও সুচিন্তিত রায় দিয়ে রাষ্ট্রের ও মানুষের উপকার করেন তাহলেই ধন্য হবো!

‘জীবের শত্রু জীব; বাঙালি কৃষকের শত্রু বাঙালি ভূস্বামী। ব্যাঘ্রাদি বৃহজ্জন্তু, ছাগাদি ক্ষুদ্র জন্তুগণকে ভক্ষণ করে; রোহিতাদি বৃহৎ মৎস্য, সফরীদিগকে ভক্ষণ করে; জমিদার নামক বড় মানুষ, কৃষক নামক ছোট মানুষকে ভক্ষণ করে। বঙ্কিমের এই কথা ইংরেজ শাসনামলের। আমরা ইংরেজ পেরিয়ে পাকিস্তানি তাড়িয়ে স্বাধীন হয়েছি।

তাই স্বাধীনতার অধিকার নিয়ে বলছি, নিশ্চয়ই সরকার বাহাদুর দেশের লাভের কথা বিবেচনা করেই গ্যাসের দাম বাড়ানো ও বাসাবাড়িতে নতুন সংযোগ দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত অদল বদল, পুনর্বিবেচনা করেন কি-না তা আপনারাই ভাবুন। আমার মতো ডেঙ্গুর কামড়ে পঙ্গু কার খালুদের আর্তনাদ জলে যাক!

নূরুজ্জামান : কলাম লেখক
[email protected]

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও