সমাজের গভীরে পচন ধরেছে

ঢাকা, ৩০ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

সমাজের গভীরে পচন ধরেছে

অরিত্র দাস ১১:২৪ অপরাহ্ণ, জুন ৩০, ২০১৯

সমাজের গভীরে পচন ধরেছে

দেশটা কী মগের মুল্লুক-যে যেখানে যেভাবে পারছে নিজের স্বার্থে টান পড়লেই খুন করছে, ধর্ষণ করছে, কুপিয়ে জখম করছে, জমি থেকে উচ্ছেদ করছে, অপহরণ করছে, সম্পত্তি লুট করছে, সংখ্যালঘু নির্যাতন করছে। এসব করে আবার পার পেয়েও যাচ্ছে। বিচার ব্যবস্থার ফাঁকফোকর দিয়ে বেরিয়ে যায় অপরাধীরা, তারপর রাজপথে বুক ফুলিয়ে হেঁটে বেড়ায়।

এই ফাঁকে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বলতে থাকেন, প্রধানমন্ত্রী গণভবনে বসে তদারকি করছেন, অপরাধীকে ধরতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন...। মোদ্দা কথা, এই দেশে এখন চিকিৎসাসেবা দেওয়া, মামলা নেওয়া, ছিঁচকে চোর থেকে সন্ত্রাসী গ্রেফতারসহ সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ যেন বাঞ্ছনীয় হয়ে পড়েছে। অর্থাৎ দেশে এখন যে কোনো ঘটনা ঘটলে প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করবেন বলে দলীয় নেতাকর্মীরা বিশ্বাস করেন এবং সেইভাবে তারা প্রচার করেন। এর ফলে গণতন্ত্রের চর্চা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে-তা বোধহয় বোঝেন না দলদাসরা! তারা জানেন না, সবকিছুতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের ধুয়া তোলা মানে হচ্ছে, দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা, প্রশাসন তাদের স্ব স্ব কাজে নিষ্ঠাবান নন-এমন একটি ধারণা জনমনে বদ্ধমূল করা।

ইদানীং আরেকটি বিষয় খুব পরিলক্ষিত হচ্ছে-আদালত বিভিন্ন ঘটনার প্রেক্ষিতে একের পর এক রুল জারি করছেন। ওমুককে এখনো গ্রেফতার করা হলো না কেন জানতে চেয়ে আদালতের রুল, তমুককে অপসারণ করা হলো না কেন জানতে চেয়ে রুল। পিরোজপুরে যুবলীগ নেতার দখল-কাণ্ডে হাইকোর্টের রুল। রাইফা ‘হত্যায়’ ডাক্তারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নয় কেন-জানতে চেয়ে হাইকোর্টের রুল। তরুণীর শ্লীলতাহানিতে পুলিশকে কেন শাস্তি নয়-হাইকোর্টের রুল জারি। রিফাত হত্যায় হাইকোর্ট আসামিদের দেশত্যাগ ঠেকাতে সীমান্তে এলার্ট জারির নির্দেশ দিয়েছেন। বিমানবন্দরে মশার উৎপাত; তাও হাইকোর্টের রুল জারি। তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলে বিলম্বের কারণ জানতে চেয়ে আদালতের রুল। একটি রাষ্ট্রে জুতা সেলাই থেকে চণ্ডীপাঠ পর্যন্ত সব কিছু যখন আদালতের নজরদারিতে রাখতে হয় তখন বুঝতে হবে রাষ্ট্র ভালো নেই। ভালো নেই সে দেশের সমাজব্যবস্থা।

বরগুনার কলেজ সড়কের কিন্ডারগার্টেনের সামনে প্রকাশ্য দিবালোকে স্ত্রী আয়েশার সামনে রিফাতকে কুপিয়ে হত্যা করে দুজন মাদকাসক্ত সন্ত্রাসী। রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় প্রধান আসামি সাব্বির আহম্মেদ নয়ন ওরফে নয়ন বন্ড একজন ছিঁচকে চোর ছিল। মাদক সেবনের টাকা জোগাড় করতে সে চুরি ও পরে ছিনতাইয়ের কাজে লিপ্ত হয়। একপর্যায়ে শুরু করে মাদক ব্যবসা। এরপর বিভিন্ন মহলের যোগসাজশে হয়ে ওঠে এলাকার শীর্ষ সন্ত্রাসী। নয়নের বিরুদ্ধে মাদক, চুরি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধে ১০টির বেশি মামলা রয়েছে।

তার একটি গ্রুপও আছে। নাম ‘বন্ড ০০৭’। বিখ্যাত হলিউড সিরিজ জেমস বন্ডের কোড নম্বরের সঙ্গে মিল রেখে রাখা হয়েছে তার গ্রুপের নাম। এমন অসংখ্য গ্রুপ আছে দেশের জেলা, উপজেলা, পৌরসভা, গ্রাম, পাড়া, মহল্লাজুড়ে। আমরা কয়টার খবর জানি? একটি করে অপরাধ সংঘটিত হয় আর বের হয়ে আসে নানা গ্রুপের নাম।

অপর আসামি খুনি রিফাত ফরাজী মাদক ব্যবসা, মাদক সেবন ও ছিনতাইসহ নানা অপকর্মে যুক্ত ছিল। অতীতে তরিকুল ইসলাম নামে এক প্রতিবেশীকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে সে। নানা ছুতোয় স্থানীয়দের ওপর হামলা, মারধর করা ছিল রিফাতের কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। অথচ ওই এলাকার সম্মানিত সংসদ সদস্য একটি বেসরকারি টেলিভিশনের লাইভ প্রোগ্রামে এসে বললেন, ‘নয়ন বন্ড এবং রিফাত ফরাজী যে মাদক ব্যবসায়ী ও সন্ত্রাসী ছিল তা তিনি জানেন না।’

ভদ্রলোক হয়তো এও জানেন না তার এলাকায় কতজন গরিব আছে, কতজন বেকার আছে, কতজন ভোটার আছে, কোন পরিবার অর্থাভাবে আছে, শিক্ষা-চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত কতজন মানুষ এবং সর্বোপরি তার বাড়ির লোকজন তাকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন!

রিফাতকে যেভাবে কুপিয়ে মারা হলো তাতে বিশ্বজিৎ হত্যাকাণ্ড মনে পড়ে যায়। ২০১২ সালের ৯ ডিসেম্বর প্রকাশ্য-দিবালোকে বিশ্বজিৎকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। কেউ ছুটে আসেনি তাকে বাঁচাতে। সবাই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই হত্যাকাণ্ড দেখছিল। বিশ্বজিৎ হত্যা মামলার ২১ আসামির মধ্যে মাত্র ৪ জন এখন কারাগারে আছে। বাকি ১৭ জন হয় পলাতক, নয়তো বেকসুর খালাস। মনে পড়ে, টিএসসির সামনের রাস্তায় কোপ খেয়ে পড়েছিলেন বিজ্ঞানমনস্ক লেখক ও ব্লগার অভিজিৎ রায়।

প্রায় দেড় দশক আগে ২০০৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একইভাবে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সন্ত্রাসী হামলার শিকার হয়েছিলেন লেখক হুমায়ুন আজাদ। ২০১৩ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর মিরপুরে একই কায়দায় খুন হন ব্লগার আহমেদ রাজীব হায়দার। অভিজিতের ওপর দুর্বৃত্তদের হামলার সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী রাফিদা আহমেদ। রাফিদা আহমেদ লেখালেখি করেন বন্যা আহমেদ নামে। বন্যা আহমেদ সেদিন পারেননি ঘাতকের হাত থেকে ভালোবাসার মানুষটাকে বাঁচাতে।

খিলগাঁও গোরানের একটি পাঁচতলা ফ্ল্যাটবাড়ির পঞ্চম তলায় স্ত্রী ও বোনকে নিয়ে থাকতেন নিলয় যার আসল নাম নীলাদ্রি চ্যাটার্জী। নিলয় আদিবাসীদের নিয়ে কাজ করে, এমন একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় কাজ করতেন। বাসায় ঢুকে স্ত্রীর সামনেই কুপিয়ে মারা হয়েছিল নিলয় নীলকে। স্ত্রী আশা মনি আহাজারি করে বলেছিলেন, ‘এত হাজার হাজার লোক। আর আমি তখন এত চিৎকার করলাম, সবাইকে এত ডাকলাম, কেউ এগিয়ে আসেনি। এই দেশ কি আমার না? আমি কি অন্য দেশ থেকে এইখানে এসেছি?’ কান্নাজড়িত কণ্ঠে ঠিক একই কথাগুলো বলেছেন নিহত রিফাত শরীফের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা। ‘আমার সামনেই সন্ত্রাসীরা আমার স্বামীকে কুপিয়ে হত্যা করেছে। আমি শত চেষ্টা করেও তাকে রক্ষা করতে পারিনি। হামলার সময় কোনো লোক এগিয়ে আসেনি।’

সব মিলিয়ে বোঝা যায়, সমাজের অনেক গভীরে পচন ধরেছে। এখন সবাই দাঁড়িয়ে থেকে ঘটনাটা মোবাইল ক্যামেরায় ধারণ করতে এবং ছবি ও ভিডিও শেয়ার দেওয়ার পর তাতে কয়টা লাইক কমেন্ট পড়ল তা দেখতে ভীষণ উদ্বেলিত হয়। এই দেশে এখন আর কেউ বিপদে এগিয়ে আসে না বা এগিয়ে আসতে চায় না। আমরা পিঠ বাঁচিয়ে চলতে অভ্যস্ত হয়ে গেছি। সবাই চিন্তা করে, আমি তো ভালো আছি, কোপ তো আমাকে দেয়নি, আগুন তো আমার ঘরে লাগেনি। অথচ আগামীকালের কোপটি যে তার দিকে তেড়ে আসবে না, তার নিশ্চয়তা কতটুকু!

সত্যি বলতে, আমাদের আঁচলে যতক্ষণ আগুন না লাগে ততক্ষণ আমরা নড়েচড়ে বসি না। প্রকাশ্য দিবালোকে সিলেট নগরীর সুবিদবাজারে নূরানী আবাসিক এলাকায় অনন্ত বিজয় দাশকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মায়ের চোখের সামনে চাপাতির আঘাতে খুন হন জুলহাস মান্নান। এসবের আদৌ বিচার হয় কি! বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে একই অপরাধের বারবার পুনরাবৃত্তি ঘটছে।

পত্রিকা ঘেটে পাওয়া য়ায়, চলতি বছরের গত ২৬ দিনে ২২ জনকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করায় ঠাকুরগাঁওয়ে ভাতিজা জীবনের ছুরিকাঘাতে আহত ফুফু তানজিনা আক্তার রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মৃত্যুবরণ হয়। সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় দুর্গানগর ইউনিয়নের মহেশপুর গ্রামে মা এবং ছেলে অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্যকে কুপিয়ে ও গলাকেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলায় ইউপি সদস্য ও আওয়ামী লীগ নেত্রী বিউটি আক্তার কুট্টিকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। রাজশাহীর মোহনপুরে পদ্ম বিলে ছাগল চরাতে গিয়ে দুই শিশু একটি লাশ দেখতে পায়। পরে জানা যায়, আসমা বেগম নামের এক গৃহবধূকে ধর্ষণের পর কুপিয়ে হত্যা করা লাশ ছিল ওটি। শায়েস্তাগঞ্জে স্বামীর বিরুদ্ধে স্ত্রী মুক্তিরানী দাসকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে খুন করার অভিযোগ উঠেছে।

এ যেন এক কোপাকুপির দেশ! বৃষ্টির মতো কোপ এসে পড়ছে মানুষের শরীরে। তা নিয়ে লেখালেখি, মিছিল-মিটিং-মানববন্ধন হয়, ঝড়ো তর্ক-বিতর্ক হয়। অল্প কিছুদিন পর এটি ভুলে নতুন কোনো ইস্যু নিয়ে শাহবাগের রাস্তায়, পত্রিকার পাতায় কর্মসূচি লেখালেখি হয়। এতে ঢাকা পড়ে যায় পুরনো সব অন্যায়-অপরাধ এবং সেসবের বিচার। অপরাধীরা মুখ টিপে হেসে নতুন কোনো অপরাধে নেমে পড়ে।

নরসিংদীর বীরপুরে ফুলন বর্মণ নামে এক কলেজছাত্রী দোকান থেকে কেক নিয়ে বাড়ি ফেরার পথে হামলার শিকার হন। বাড়ির আঙ্গিনায় পৌঁছামাত্র পূর্ব থেকে ওঁত পেতে থাকা অজ্ঞাতনামা দুই দুর্বৃত্ত তার হাত ও মুখ চেপে পাশের নির্জন স্থানে নিয়ে যায়। সেখানে তার শরীরে কেরোসিন ঢেলে আগুন দেয়। মৃত্যু হয় তার।

এই মৃত্যুর মিছিলে আমরা সবাই এক এক করে পতিত হবো। কারণ এর জন্য আমরাই দায়ী। গণনির্লিপ্ততা, নীরবতা, সিলেকটিভ মানবতা, দলীয়প্রীতি, গা বাঁচিয়ে চলা, ক্লীবতা বাংলাদেশকে আজ এই জায়গায় এনে দাঁড় করিয়েছে। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা না হলে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরুতে না পারলে এ ধরনের কোপাকুপি, অপরাধ, খুন, ধর্ষণ, নির্যাতন চলবেই। মাঝে মাঝে আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে এত এত তনু, রাজিব, ফুলন, নুসরাত, রিফাতের লাশের ওপর উন্নয়নের তকমা নিয়ে বাংলাদেশ তুমি কীভাবে দাঁড়িয়ে আছো?

অরিত্র দাস : লেখক ও কলামিস্ট

[email protected]

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও