আইসিসির কাছে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করি

ঢাকা, ৩০ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

আইসিসির কাছে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করি

রিয়াজুল হক ১০:৪৯ অপরাহ্ণ, জুন ২৭, ২০১৯

আইসিসির কাছে দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশা করি

চলমান বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া-ওয়েষ্ট ইন্ডিজ ম্যাচে মাত্র ১৫ রানে হেরে যায় ওয়েষ্ট ইন্ডিজ। ওই ম্যাচে গেইল এবং হোল্ডার দুইবার মাঠের আম্পায়ারদের ভুল সিদ্ধানের শিকার হতে যেয়েও ডিআরএস প্রযুক্তির কল্যাণে বেঁচে যায়। এই বিতর্ক আরো বেড়ে যায় ক্রিস গ্যাফানির একটি সিদ্ধান্তে। ক্রিস গেইলকে নো বল করেও আম্পায়ার সেটি নো বল না ডাকায় পার পেয়ে যায় অজি পেসার। এতে করে বেশ চটে যান ধারাভাষ্যকার মাইকেল হোল্ডিং। তিনি আম্পায়ারিং এর মান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। এরপরেই বিশ্ব ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইসিসি ধারাভাষ্যকারদের উদ্দেশ্যে ঘোষণা দেন, আম্পায়ারদের ভুল নিয়ে বেশি কথা বলা যাবে না। সমালোচনার রাস্তা এড়িয়ে চলা হোক।

ধারাভাষ্যকারদের সমালোচনা করতে মানা করা হচ্ছে। কিন্তু সেক্ষেত্রে আইসিসিকে গ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে। আম্পায়ার সবসময় খেলা চালানোর মত দক্ষ এবং যোগ্য কিনা, সেটা যাচাইয়ের দরকার আছে। খেলার মাঠে খেলোয়াড় অন্যায় করলে, তাদের বিভিন্ন রকম জরিমানা/শাস্তি হয়। আম্পায়ারও খেলার অংশ। তাদেরও অন্যায় থাকতে পারে। পরিস্থিতি বিবেচনা সাপেক্ষে সবকিছুরই তদন্ত হওয়া দরকার। তদন্তে অপরাধী প্রমাণিত হলে জরিমানা/শাস্তি দেওয়া প্রয়োজন। খেলা পরিচালনাকীদের জন্য যদি খেলায় অংশগ্রহণকারী দলের উপর বিরূপ প্রভাব ফেলে, তবে খেলার গ্রহণযোগ্য উন্নয়ন কখনো সম্ভব না।

সেক্ষেত্রে আইসিসিকে সকল ধরণের বিতর্কের বাইরে থাকতে হবে। কিন্তু আইসিসি কি আদৌ সেটা পারছে? একটু পিছনে ফিরে দেখা যাক। ক্রিকেটের অনেক আইনের মধ্যে একটি হচ্ছে একজন বোলার বল করার সময় তার কনুই ১৫ ডিগ্রীর বেশি বাঁকা হতে পারবেন না অর্থাৎ সর্বোচ্চ ১৫ ডিগ্রী পর্যন্ত বাঁকা করতে পারবেন। ২০১৬ সালের টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের বাছাই পর্বের প্রথম ম্যাচে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সন্দেহজনক বোলিং অ্যাকশনের খাতায় নাম আসে তাসকিন আহমেদের। আইসিসি থেকে নোটিশ দেওয়া হয় সাতদিনের ভিতরেই পরীক্ষা দিতে হবে বায়োমেকানিক্যাল ল্যাবে। পরীক্ষা দিয়ে আসার কয়েকদিনের মধ্যেই আইসিসি থেকে তাদের সাময়িকভাবে নিষিদ্ধের চিঠি পাঠানো হয়। পরীক্ষার ফলাফল দেখে আইনজীবী মুস্তাফিজুর রহমান খান বলেন, তাসকিনের স্টক ডেলিভারি ও ইয়র্কারে কোনো সমস্যা পায়নি আইসিসি। কিন্তু বাউন্সারে কিছু সমস্যা পাওয়া গেছে। সন্দেহের সৃষ্টি হয় তাসকিনের বাউন্সার পরীক্ষা নিয়েই। কারণ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচে তাসকিন আহমেদের করা চার ওভারে কোনো বাউন্সার ছিল না। সেই ম্যাচের দুই আম্পায়ার ভারতের এস রবি ও অস্ট্রেলিয়ার রড টাকার তাসকিনের স্টক ও ইয়র্কার নিয়ে প্রশ্ন তুললেও পরীক্ষায় ইতিবাচক ফলাফল আসে। সুতরাং পরীক্ষাগারে তাসকিনের বাউন্সারের পরীক্ষা নেওয়ার কথা না। কিন্তু চেন্নাইয়ের আইসিসি অনুমোদিত ল্যাবে তাসকিনকে ৩ মিনিটের মধ্যে ৯টি বাউন্সার করতে বলা হয়। যার মধ্যে তিনটি অবৈধ প্রমাণিত হয়। আইসিসির ২.২.১৩ ধারার নিয়ম অনুযায়ী কোনো বোলারের নির্দিষ্ট কোনো ডেলিভারিতে সমস্যা থাকলে সেই বোলারকে সতর্ক করে দেওয়ার নিয়ম আছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সেই বোলার খেলতে পারবে। অথচ নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে তাসকিন একটিও বাউন্সার করেননি। কিন্তু তারপরও তাঁকে সতর্ক না করে নিয়ম ভঙ্গ করে তাসকিনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এটা আইসিসির একটা আজব বিচার ছিল।

২০১৫ বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচটির কথা এখনো সবার মানে আছে। প্রথমবার কোয়ার্টার ফাইনালে খেলছিল বাংলাদেশ। বিভিন্ন চাপের মধ্যেও দারণ খেলছিল। অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্নে অনুষ্ঠিত ওই ম্যাচের আম্পায়ার ছিলেন আলিম দার ও ইয়ান গোল্ড। রুবেল হোসেনের একটি ফলটস বল রোহিত শর্মার কোমরের নীচে থাকলেও, লেগ আম্পায়ার আলিম দারের পরামর্শে ‘নো বোল’ ডাকেন ইয়ান গোল্ড। ফিল্ড আম্পায়ার ইয়াল গোল্ডও ঘোষণা করলেন, এটা নো বল, রোহিত আউট হননি! সারা বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে আম্পায়ারের এই অবাক করা কর্মকান্ড।

বলটি নো বল হবার মতো উঁচু ছিল না। এমনকি আম্পায়ারকে বিভ্রান্ত করতে পারে এমন উচুতেও ছিলনা। খোদ ভারতের ক্রিকেটারও এর প্রতিবাদ জানান। ক্রিকেট বিশ্বে বাজে দৃষ্টান্তের সৃষ্টি হয়। এখানেই শেষ হয়নি। সেই কোয়ার্টার ফাইনালেই ভারতের বিপক্ষে ব্যাট করতে নেমে দলীয় ৭৩ রানে মোহাম্মদ শামির করা শর্ট বলে ধাওয়ানের হাতে ক্যাচ দেন মাহমুদুল্লাহ। ধাওয়ান বাউন্ডারি লাইনের একদম কাছে ছিলেন বলে আম্পায়ার থার্ড আম্পায়ারের কাছে যান সিদ্ধান্তের জন্য। যেখানে স্পষ্ট দেখা যায়, ধাওয়ানের পা বাউন্ডারি লাইনের সাথে লেগে থাকা অবস্থায় ক্যাচ ধরেছেন। সকলেই ভেবেছিল টিভি আম্পায়ার স্টিভ ডেভিস বিগ স্ক্রিনে ‘নট আউট’ লোড করবেন, কিন্তু লোড হল ‘আউট’!

২০১৫ সালের বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে যে আলীমদারের বাজে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল, অন্তত সেই আলীমদারকে বাংলাদেশের কোন খেলায় সংশ্লিষ্ট করা উচিত ছিল না। আইসিসির এই বিষয়টি অবশ্যই বিবেচনায় নেওয়া উচিত ছিল। অথচ চলতে বিশ্বকাপের আফগানিস্তানের সাথে খেলায় তিনি থার্ড আম্পায়ার ছিলেন। তিনিই আবার নতুন বিতর্কের জন্ম দিলেন। বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তানের মধ্যকার ম্যাচটি বাংলাদেশ দলের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ সেমিফাইনালের স্বপ্ন টিকিয়ে রাখতে হলে এই ম্যাচে বাংলাদেশকে জিততেই হবে। বাংলাদেশ তাদের ব্যাটিং ইনিংস শুরুও করেছিল দারণভাবে। তামিম কিছুটা ধীরে শুরু করলেই লিটন দাস বলের সাথে পাল্লা দিয়েই স্কোর শুরু করেছিলেন। ১৭ বলে ১৬ রান। বড় ইনিংসের ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন। পঞ্চমওভারের দ্বিতীয় বলে লেগ স্পিনার মুজিব-উর-রহমানের বলে ক্যাচ উঠিয়ে দেন এই ডানহাতি ব্যাটসম্যান। ফিল্ডার হাসমতউল্লাহ শহিদি বলটি লুফে নেন। তবে তিনি সঠিকভাবে ক্যাচটি নিতে পেরেছেন কিনা তা নিয়ে মাঠের আম্পায়ার মাইকেল গফ ও রিচার্ডকেটেলবরো নিয়ে দ্বিধায় পড়েন। তারা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলেন না।

যে কারণে প্রাথমিকভাবে আউটের সংকেত দিয়েও থার্ড আম্পায়ারের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য মাঠের আম্পায়ার অপেক্ষা করতে থাকে। এই অপেক্ষা শুধু মাঠের আম্পায়ারদের ছিল না, গ্যালারী ভর্তি দর্শকদের অপেক্ষা ছিল, টিভি স্ক্রিনের সামনে বসে থাকা কোটি কোটি ক্রিকেট প্রেমী মানুষের অপেক্ষা ছিল। টিভি স্ক্রিনে দেখা যায়,  বল ফিল্ডারের তালুবন্দি হওয়ার আগেই মাটি স্পর্শ করেছে বলেই মনে হচ্ছিল। এমনটা সন্দেহ প্রকাশ করছিলেন ধারাভাষ্যকারও। যে টিভি রিপ্লে থার্ড আম্পায়ার আলিম দার দেখছিলেন, কোটি কোটি মানুষও সেই স্ক্রিন দেখছিলেন। কিন্তু তারপরেও তিনি লিটন দাসকে আউট ঘোষণা করলেন। যে ক্যাচটি নিয়ে এত সন্দেহ, সেই ক্যাচটির বেনিফিট অব ডাউট তো ব্যাটসম্যানের পাবার কথা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সেটা হলো না। এটা ক্রিকেটের জন্য সুখকর কিছু না।  একই ম্যাচে সৌম্য সরকারের আউট নিয়েও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

মুজিব উর রহমানের বত্রিশ ওভারের শেষ বলটি সৌম্য সরকারের প্যাডে লাগে। তাতেই জোর আবেদন জানায় আফগানিস্তান। ফিল্ড আম্পায়ার আঙ্গুল তুলে দেন। রিভিউ নেন সৌম্য সরকার। রিভিউ দেখলেন থার্ড আম্পায়ার। কিন্তু সেখানে দেখা হলো না আলট্রাএজ! অথচ মনেই হচ্ছে ব্যাট স্পর্শ করে বলটি প্যাডে লেগেছে। আলট্রা এজ দেখার ধারে কাছে গেলেন না থার্ড আম্পায়ার আলিম দার। তিনি দেখলেন বলের লাইন। আর সেটা দেখেই রিভিউতে আফগানিস্তানের পক্ষে রায় দিলেন। সাধারণত লাইন দেখার পাশাপাশি আলট্রা-এজটাও থার্ড আম্পায়ার দেখেন, যা দর্শকরাও দেখেন। কিন্তু সৌম্য সরকারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বেলায় আলট্রা এজের ধারে-কাছেও গেলেন না থার্ড আম্পায়ার আলীম দার। এত তাড়া কেন ছিল, ক্রিকেট বোদ্ধাদের কাছে সেটাই বড় প্রশ্ন? কোন আম্পায়ার যদি একাধিকবার একটি দলের বিপক্ষে অনেক বিতর্কের জন্ম দেয়, তাদের ঐ দেশের খেলা থেকে দূরে রাখাই শ্রেয়। সেটা তো আইসিসি করছে না।

বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগে একটা কথা বেশি করে শোনা যাচ্ছিল। কয়েকটা দেশের যখন ২/৩টা ম্যাচ শেষ হবে, তখন কোন দেশ হয়তো তাদের প্রথম ম্যাচ শুরু করবে। টুর্নামেন্টে যদি কাউকে বিশেষ সুবিধা দেওয়ার কথা চিন্তু করে ফিকচার তৈরী করা হয়, তবে প্রতিযোগী অন্য দেশগুলোকে প্রতিযোগিতা থেকে অনেকটা পেছনে চলে যায়।

ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রণ সংস্থা আইসিসি। তাদেরকে সকল ধরণের বিতর্ক থেকে দূরে থাকতে হবে। কেউ যেন তাদের দিকে আঙুল তুলতে না পারে, সেই ব্যবস্থা এই সংস্থাকেই করতে হবে। কোন দেশ বেশি অনুদান দিল, কোন দেশের টিভি স্পন্সর বেশি, কোন দেশের খেলায় প্রচার বেশি ইত্যাদি ইত্যাদি বিষয়গুলো থেকে বের হয়ে আসতে হবে। সকল সদস্য দেশ গুলোর প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। প্রতিটা দেশের অভিযোগ গুরুত্বের সাথে দেখতে হবে। প্রভাবশালী কোন দেশ যেন অন্য দুর্বল ক্রিকেট খেলুড়ে দেশের সাথে কোন প্রকার অসামঞ্জস্যপূর্ণ আচরণ করতে না পারে, সে দিকটাও আইসিসিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ ক্রিকেট খেলুড়ে সব দেশেই তাকিয়ে থাকে আইসিসির দিকে। তাদেরকে সবসময় নিরপেক্ষতার প্রমাণ দিতে হবে। কারণ আইসিসির উপরও নির্ভর করছে ক্রিকেটের সার্বিক উন্নয়ন।

লেখকঃ উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক।

[email protected] 

  

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও