বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থা

ঢাকা, ২৪ মে, ২০১৯ | 2 0 1

বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থা

ড. মো. আবদুর রউফ ৪:৩৪ অপরাহ্ণ, জুন ০১, ২০১৯

বাংলাদেশের ভ্যাট ব্যবস্থা

বিগত কয়েক বছর ধরে আমাদের দেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি বিষয় নিয়ে বিতর্ক চলছে। তন্মধ্যে ভ্যাটমুক্ত সীমা নির্ধারণ হলো একটি বিষয়। এই সীমা নির্ধারণ বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন রয়েছে। যেমন : সার্বজনীন প্রাথমিক ভ্যাটমুক্ত সীমা কত হওয়া উচিত, টার্নওভার করের ক্ষেত্রে সীমা কত হওয়া উচিত ইত্যাদি। এসব প্রশ্নের সর্বজনগ্রহণযোগ্য সমাধান এখনো পাওয়া যায়নি।

বর্তমান ভ্যাট আইনে (মূল্য সংযোজন কর আইন ১৯৯১) এ ধরনের কোনো সার্বজনীন প্রাথমিক ভ্যাটমুক্ত সীমা নেই। তবে ভ্যাট আইনের অধীনে কুটির শিল্পের ক্ষেত্রে যে সুবিধা প্রদান করা হয়েছে তাকে পরোক্ষভাবে ভ্যাটমুক্ত সীমা বলা যেতে পারে। কিন্তু এরূপভাবে কুটির শিল্প হিসাবে সুবিধা পেতে হলে তিনটি কঠিন শর্ত পূরণ করতে হয়। শর্তগুলো হলো- (ক) যেসব প্রতিষ্ঠান রেজিস্ট্রার অব জয়েন্ট স্টক কোম্পানিজের আওতায় নিবন্ধিত নয় অর্থাৎ এই সুবিধা কেবলমাত্র অংশীদারি প্রতিষ্ঠান এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান পেয়ে থাকে। (খ) বছরের যে কোনো সময় উক্ত প্রতিষ্ঠানে মূলধনী যন্ত্রপাতিতে বিনিয়োগের পরিমাণ ৪০ লাখ টাকার বেশি হবে না। (গ) এরূপ প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক টার্নওভার ৬০ লাখ টাকার বেশি হবে না। বর্তমানে, মূল্য সংযোজন কর আইন-১৯৯১ এর আওতায় খুব অল্পসংখ্যক প্রতিষ্ঠান এরূপ শর্ত পূরণ করে কুটির শিল্প হিসেবে ভ্যাটমুক্ত সুবিধা ভোগ করছে।

ভ্যাট ব্যবস্থায় সার্বজনীন প্রাথমিক ভ্যাটমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন আছে কি-না তা বিচার্য বিষয়। আমরা যদি আন্তর্জাতিক রীতি-নীতির (Best international practices) দিকে তাকাই, তাহলে আমরা দেখতে পাই যে কিছু কিছু দেশে সার্বজনীন প্রাথমিক ভ্যাটমুক্ত সুবিধা দেওয়া আছে কিন্তু অনেক দেশে এই সুবিধা নেই। ভ্যাট ব্যবস্থায় সাধারণত সার্বজনীন প্রাথমিক ভ্যাটমুক্ত সুবিধা দেওয়ার প্রয়োজন হয় যে সমস্ত দেশের অর্থনীতিতে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ভূমিকা বেশি।

আমরা যদি বাংলাদেশের আজকের অর্থনীতির সঙ্গে ১৯৯১ সালের অর্থনীতির তুলনা করি, তাহলে নিঃসন্দেহে আমরা বলতে পারি, ১৯৯১ সালে সার্বজনীন প্রাথমিক ভ্যাটমুক্ত সুবিধা প্রদান করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত ছিল কিন্তু ১৯৯১ সালে আমাদের দেশে ভ্যাট ব্যবস্থা চালু করার সময় কেন সার্বজনীন প্রাথমিক ভ্যাটমুক্ত সুবিধা দেওয়া হয়নি তা বোধগম্য নয়। সম্ভবত, ওই সময় ভ্যাটের ভিত্তি সম্প্রসারণ ছিল প্রধান বিবেচনার বিষয়। যা হোক, একদিকে আমাদের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সুবিধা প্রদান করা দরকার এবং অন্যদিকে আমাদের ভ্যাট আরোপের ক্ষেত্র বৃদ্ধি করা দরকার। এ দুটি বিষয়ের দিকে লক্ষ্যে রেখে, আমার মতামত হলো, সার্বজনীন প্রাথমিক ভ্যাটমুক্ত সীমা ২৫ লাখ টাকা হতে ৪০ লাখ টাকার মধ্যে হওয়া বাঞ্ছনীয়; তবে শর্ত হলো, টার্নওভার যথাযথভাবে প্রাক্কলন করতে হবে এবং বিধি-বিধান কঠোরভাবে প্রয়োগ করতে হবে।

বর্তমানে টার্নওভার কর প্রদানের ক্ষেত্রে বার্ষিক টার্নওভার সীমা হলো ৮০ লাখ টাকা পর্যন্ত। ১৯৯১ সালে তা ছিল ৫ লাখ টাকা, ১৯৯৫ সালে ছিল ১৫ লাখ টাকা, ১৯৯৭ সালে ছিল ২০ লাখ টাকা। এভাবে ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৩ সালে তা ৮০ লাখ টাকায় উন্নীত হয়। এরপর তা নতুন ভ্যাট আইনের হৈচৈ এর মধ্যে হারিয়ে যায়। ফলে, দীর্ঘদিন এর কোনো পরিবর্তন হয়নি অর্থাৎ ৮০ লাখ টাকা রয়ে গেছে। ১৯৯১ সাল থেকে এর প্রবৃদ্ধি বিবেচনা করলে এরূপ উপসংহারে আসা যায় যে, আজকে টার্নওভার কর আরোপের ক্ষেত্রে বার্ষিক টার্নওভার সীমা সর্বোচ্চ ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারিত হতে পারে; তবে শর্ত হলো টার্নওভার সীমা নির্ধারণে যথাযথভাবে টার্নওভার প্রাক্কলন করার পদ্ধতি থাকতে হবে।

১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনে আরও একটি সীমা রয়েছে, তা হলো প্যাকেজ ভ্যাট। এখানে বলা আবশ্যক যে, ১৯৯১ সালের ভ্যাট আইনে শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য অর্থাৎ ক্ষুদ্র দোকানের জন্য প্যাকেজ ভ্যাট পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। যেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ঢাকা (উত্তর ও দক্ষিণ) সিটি করপোরেশন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন এলাকায় অবস্থিত, তাদের প্যাকেজ ভ্যাটের আওতায় ভ্যাট প্রদানের যোগ্যতা অর্জনের ক্ষেত্রে বার্ষিক টার্নওভার সীমা প্রায় ৮ লাখ টাকা পর্যন্ত, অন্যান্য সিটি করপোরেশন এলাকায় এই সীমা প্রায় ৬ লাখ টাকা, জেলা শহরের পৌর এলাকায় এই সীমা প্রায় ৪ লাখ টাকা এবং দেশের অন্যান্য এলাকায় এই সীমা প্রায় ২ লাখ টাকা।

এখানে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, এসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বার্ষিক নির্ধারিত পরিমাণ ভ্যাট প্রদান করেন। বর্তমানে উপরোল্লিখিত চারটি এলাকায় যথাক্রমে ২৮ হাজার টাকা, ২০ হাজার টাকা, ১৪ হাজার টাকা এবং ৭ হাজার টাকা বার্ষিক ভ্যাট প্রদান করে থাকেন। এখানে আরও উল্লেখ করা যেতে পারে, টার্নওভার কর ও প্যাকেজ ভ্যাট হতে খুব সামান্য পরিমাণ রাজস্ব আহরিত হয়, যা বার্ষিক প্রায় ২০ কোটি টাকা যা দেশের মোট রাজস্বের হিসাবের ওপর তেমন কোনো প্রভাব বিস্তার করে না।

নতুন ভ্যাট আইনে, সব প্রতিষ্ঠানের জন্য সার্বজনীনভাবে ৩০ লাখ টাকা ভ্যাটমুক্ত সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী সমাজ এই সীমা ৫০ (পঞ্চাশ) লাখ টাকায় উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছে। নতুন ভ্যাট আইনে টার্নওভার করের ক্ষেত্রে বার্ষিক টার্নওভার সীমা ৮০ লাখ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। ব্যবসায়ী সমাজ তা পাঁচ কোটি টাকায় উন্নীত করার দাবি জানিয়ে আসছে। এই সীমা নির্ধারণ আমাদের দেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে প্রতিবন্ধক হয়ে আছে।

অভিজ্ঞতার আলোকে দেখা যায়, আইনে করমুক্ত সীমা নির্ধারণের বিধান সন্নিবেশের সিদ্ধান্তের চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো বাস্তবে কীভাবে প্রকৃত টার্নওভার প্রাক্কলন করা হবে তা নির্ধারণ করা এবং আইনের বিধান সঠিকভাবে প্রয়োগ করা। যদি আইনে পর্যাপ্ত বিধান থাকে কিন্তু তা যথাযথভাবে প্রয়োগ করা না যায়, তাহলে উক্ত বিধান সমাজের কোনো উপকারে আসে না বরং তা অনিয়ম ও হয়রানি বৃদ্ধি করে।

বাস্তবে অনেক ব্যবসায়ী রয়েছেন, বিশেষ করে পুরান ঢাকার ব্যবসা কেন্দ্রে এবং চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে যাদের বার্ষিক টার্নওভার অনেক বেশি কিন্তু তারা প্যাকেজ ভ্যাট পদ্ধতির আওতায় রয়েছে। আরও বিপর্যয়কর অবস্থা হলো, এখনো তাদের কেউ কেউ কোনো ভ্যাট প্রদান করেন না। আমাদের দেশের ভ্যাট ব্যবস্থাপনায় প্রকৃত টার্নওভার নির্ধারণের ব্যর্থতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের ঘটনা ঘটে যা ভ্যাট ব্যবস্থাকে বিচ্যুত করে চলেছে। সুতরাং, ভ্যাট ব্যবস্থায় সীমার বিধান সন্নিবেশ মূল সমস্যা নয় বরং বিধি-বিধান সঠিকভাবে প্রয়োগ করার অভাব হলো মূল সমস্যা।

১৯৯১ সালের ভ্যাট আইন এবং নতুন ভ্যাট আইন, উভয় আইনে কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত টার্নওভার কিভাবে প্রাক্কলন করতে হবে তার কোনো সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি অন্তর্ভুক্ত নেই। বড় প্রতিষ্ঠানের অডিট করার সময়, কোনো রকমে আমদানি, ক্রয়, বিক্রয় ইত্যাদি তথ্য পরীক্ষা করে এ ধরনের টার্নওভার নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু হাজার হাজার ক্ষুদ্র এবং মাঝারি প্রতিষ্ঠান নিরীক্ষা করা সম্ভব হয় না, যা করা উদ্দেশ্য হওয়াও সঠিক নয়। তাহলে প্রশ্ন হলো কিভাবে টার্নওভার নির্ধারিত হবে?

এই হাজার হাজার ক্ষুদ্র এবং মাঝারি প্রতিষ্ঠানের সঠিক টার্নওভার নির্ধারণের একটি বিশেষ পদ্ধতি উদ্ভাবন করা যেতে পারে। প্রতিষ্ঠানের সঠিক টার্নওভার নির্ধারণের নিমিত্তে ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের ভাড়া, নিয়োগকৃত লোকবল, পরিশোধিত পরিসেবার বিল, ব্যাংক লেনদেন, ক্রয়-বিক্রয়, ব্যবসার প্রকৃতি ইত্যাদি মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। টার্নওভারের পরিমাণ অর্থাৎ সীমা যাই নির্ধারণ করা হোক না কেন, এর হিসাব সঠিকভাবে হওয়া প্রয়োজন। এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত টার্নওভার নির্ধারণের ক্ষেত্রে, আইনে কোনো ফাঁক-ফোকর থাকা উচিত নয়; স্বচ্ছ সূত্র উদ্ভাবন করতে হবে।

ভ্যাট আলোচনার বর্তমান এই সন্ধিক্ষণে, সব প্রতিষ্ঠানের সঠিক টার্নওভার হিসাব করার জন্য একটি বাস্তবানুগ মানদণ্ড উদ্ভাবন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যবসায়ের প্রকৃত অবস্থা বিবেচনা করে পরবর্তীতে টার্নওভার সংশোধন করার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

ভ্যাটমুক্ত সীমা কত হবে বা টার্নওভার করের সীমা কত হবে শুধু তা অনেক বিচার-বিশ্লেষণ করে আইনে সন্নিবেশ করা এবং তারপর অনির্ধারিত রেখে বা শিথিলভাবে নির্ধারণ করে বর্তমানে আমাদের দেশের ভ্যাট ব্যবস্থায় যেসব অস্বস্তি বিরাজ করছে তা দূরীভূত করা যাবে না।

ড. মো. আব্দুর রউফ : বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পরিচালিত ভ্যাট বিষয়ক একটি প্রকল্পে বিশেষজ্ঞ হিসেবে কর্মরত।

অনুবাদ : মো. আরশেদ আলী, বাংলাদেশ ভ্যাট কনসালট্যান্টস অ্যাসোসিয়েশন সভাপতি।

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও