আল্লাহকে পাওয়ার সাধনা

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

আল্লাহকে পাওয়ার সাধনা

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী ৩:৪৩ অপরাহ্ণ, মে ১৮, ২০১৯

আল্লাহকে পাওয়ার সাধনা

রমজান প্রশিক্ষণের মাস। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা আর প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাকি ১১ মাসের জন্য মানুষকে তৈরি করাই হলো এ মাসের কাজ। প্রতিবছর রমজান সেই কাজটা করেও যাচ্ছে। একইভাবে মানুষের জীবনে ও সমাজে কোরআনকে বরণ করার অনুশীলনের ব্যবস্থাও করা হয়েছে রমজানে।

আল কোরআন যে কত বড় নেয়ামত তা আমরা উপলব্ধি করতে প্রায়শই ব্যর্থ হই কিন্তু রমজান এলে আল কোরআনের গুরুত্ব অনুধাবন করা যায়। এ মাস এলেই কোরআনের অনুশীলন বেড়ে যায়। আল্লাহর বাণীর এই চর্চায় আল্লাহকে পেতে অনেকটা পথ এগিয়ে যায় তার প্রিয় বান্দারা। আল্লাহকে পাওয়ার সাধনায়ও আসে নতুন গতি।

আল কোরআন অনুশীলনের একটি সুন্দর আয়োজন তারাবি নামাজ। যুগ যুগ ধরে তারাবির মাধ্যমে হাফেজদের বক্ষে কোরআনের হেফাজত হচ্ছে। আর হাফেজদের মাধ্যমে যুগের সব দুর্বিপাক থেকে কোরআনের হেফাজত হয়ে আসছে অভিনব পদ্ধতিতে। বস্তুত কোরআনকে বরণ ও সংরক্ষণ করার মহাআয়োজন রমজান।

হাদিস শরিফে বর্ণিত, প্রত্যেক রমজানে জিবরাইল (আ.) এসে নবী করিমের (সা.) সঙ্গে সাক্ষাৎ করতেন এবং নবীজি তাকে কোরআন পড়ে শোনাতেন। যখন নবীজির সঙ্গে জিবরাইল (আ.) সাক্ষাৎ করতেন তখন তার দান বর্ষণকারী বাতাস অপেক্ষাও বেড়ে যেত। (বুখারি, মুসলিমের বরাতে মিশকাত : ১৯৯৭)।

রমজানে কোরআনের এই চর্চা ও অনুশীলনের স্বর্গীয় ব্যবস্থার পেছনে হেকমত আছে, রহস্য আছে। পৃথিবীর মানুষ আল্লাহর বাণীকে হৃদয়ে, জীবনে ও সমাজে ধারণ, বরণ করতে হলে যোগ্যতা চাই, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি চাই। সেই যোগ্যতা হাসিল হতে পারে অন্তত এক মাস সিয়াম সাধনার মাধ্যমে।

আল্লাহর কাছ থেকে তাওরাত কিতাব লাভ করার জন্য মূসা (আ.) তূর পর্বতে গিয়েছিলেন। তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল ৩০ দিন রোজা রাখার জন্য। মাস শেষ হলে হুকুম হয় আরও ১০ দিন অর্থাৎ মোট ৪০ দিন রোজা পালন করতে হবে। বোঝা গেল, আসমানি কিতাব জীবনে ধারণ করার যোগ্যতা চাইলে রোজার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক সাধনা ও যোগ্যতা অর্জন করতে হবে। আর সেই সাধনা হতে হবে রমজানের মতো মহিমান্বিত মাসে। কারণ রমজান বান্দার সাধনায় সাহায্য করে থাকে।

আমরা প্রায় বলে থাকি, কোরআন নাজিল হওয়ার কারণেই রমজানের এত গুরুত্ব ও মর্যাদা। কাজেই কেউ যদি জীবনে ও সমাজে কোরআনকে ধারণ করে, তাহলে তার মর্যাদাও বেড়ে যাবে বহুগুণ। এ কথার পিছনে যুক্তি ও বাস্তবতা আছে, থাকতে পারে; কিন্তু কোরআনের বাচনভঙ্গি বলে অন্য কথা। অর্থাৎ রমজানের নিজস্ব মহিমা ও গুরুত্বের কারণেই এ মাসে কোরআন নাজিল করা হয়েছে। শবেকদরকে গোপন করে রাখা হয়েছে একই কারণে।

আল্লামা মাইবেদি এই যুক্তির পক্ষে তাফসিরে কাশফুল আসরারে বলিষ্ঠ বক্তব্য রেখেছেন। শুধু কোরআন নয়, অন্য ধর্মগ্রন্থও নাজিল হয়েছে পবিত্র মাহে রমজানে। মুসনদে আহমদ গ্রন্থে হজরত ওয়াসেলা ইবনে আসকা থেকে বর্ণিত, রসুলে কারিম (সা.) বলেছেন, হজরত ইব্রাহীমের (আ.) সহিফা রমজান মাসের ১ তারিখ নাজিল হয়েছিল। আর রমজানের ৬ তারিখে তওরাত, ১৩ তারিখে ইঞ্জিল, ২৪ তারিখে কোরআন নাজিল হয়েছে। হজরত জাবেরের (রা.) রেওয়ায়েতে উল্লেখ রয়েছে যে, ‘যবুর’ রমজানের ১২ তারিখে এবং ইঞ্জিল ১৮ তারিখে নাজিল হয়েছে। (মা’রেফুল কোরআন)।

আমাদের উচিত রমজান মাসের মাহাত্ম্য অনুধাবন করা ও যথার্থ মর্যাদা দেওয়া। রমজানের প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগিয়ে কোরআন মজিদকে নিজের জীবনে, সমাজে ও রাষ্ট্রে বরণ ও বাস্তবায়নের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা। কারণ, এই মহাগ্রন্থই মানব জাতিকে সব দুর্দশা থেকে মুক্তি দিতে পারে। কোরআন মজিদ নিজের আত্মপরিচয় দিয়ে বলছে, ‘রমজান সেই মাস, যে মাসে কোরআন নাজিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হুদা অর্থাৎ সৎপথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্যমিথ্যার পার্থক্যকারী রূপে।’ (সূরা বাকারা : ১৮৫)।

আমরা আল্লাহকে দেখিনি, দেখা সম্ভব নয়। কিন্তু আল্লাহর অনাদি অনন্ত গুণের ধারক কোরআনের সূত্রে আমরা আল্লাহর পরিচয় পাই, খুশবু পাই। কোরআনের তেলাওয়াত, অধ্যয়ন, অনুধাবনে আমরা যখন তন্ময় হই, তখন আধ্যাত্মিকতার সুউচ্চ মাকাম আমাদের নসিব হয়।

আমাদের দেশে বর্ষায় কৃষকরা সারা দিনমান মাঠে চাষাবাদে মুখর থাকে। শীত বা গ্রীষ্ম প্রধান দেশে বসন্তে প্রাণের জোয়ার আসে, জীবনের স্পন্দন জাগে। নতুনের জয়গানে মুখরিত হয় গোটা প্রকৃতি। পবিত্র রমজান আসে রুহানি জগতের বসন্তরূপে। রমজানে কোরআনের গুঞ্জরিত চর্চার বসন্তে ইমানের সমারোহ দেখতে হলে যেতে হবে মসজিদে, একসঙ্গে ইফতারের আয়োজনে, তারাবির জামাতে, শেষ রাতে আল্লাহর ডাকে সাড়া দেওয়ার চেতানায় পরস্পর ডাকাডাকিতে।

ড. মুহাম্মদ ঈসা শাহেদী : প্রাক্তন শিক্ষক
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]