সংস্কৃতি চর্চার শূন্যতায় ১০ বছরে রণন

ঢাকা, সোমবার, ২০ মে ২০১৯ | ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

মাঠে-ঘাটে-বাটে

সংস্কৃতি চর্চার শূন্যতায় ১০ বছরে রণন

ড. তুহিন ওয়াদুদ ১১:২৬ অপরাহ্ণ, মে ১১, ২০১৯

সংস্কৃতি চর্চার শূন্যতায় ১০ বছরে রণন

সংস্কৃতির পুণ্যভূমি ছিল বাংলাদেশ। সভ্যতা যখন এই ভূমিতে খুব ধীর পায়ে হেঁটেছে তখনো লোকগান, পুঁথি, পালা, নাটকসহ বিচিত্র সংস্কৃতির প্রসার ছিল। ধীরে ধীরে আকাশ সংস্কৃতি আমাদের সংস্কৃতির ধরন পাল্টে দিয়েছে। বর্তমানে সেই চর্চা অনেকটাই নিম্নগামী।

যাত্রা-পালা-কীর্তন সবকিছুই এখন বিলুপ্তির পথে। যখন কারমাইকেল কলেজে পড়তাম তখন দেখেছি প্রায় প্রতিদিন হলরুমে কোনো না কোনো অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। কয়েক মাস আগে কারমাইকেল কলেজের বিতর্ক পরিষদের একটি অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম। বিতর্ক পরিষদের ২০-২৫ বছর আগের একজন সদস্য ওই অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। তিনি খুব আক্ষেপ করছিলেন।

বক্তৃতায় বারবার নতুনদের প্রতি অতীতের সংস্কৃতি চর্চার কথা তুলে এনে সাহস দেওয়ার চেষ্টা করছিলেন। ছাত্রশিবিরের যন্ত্রণাতেও তারা কীভাবে নিজেদের সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত রেখেছিলেন সেই কথা বলছিলেন। কারমাইকেল কলেজ ১০ বছর আগেও এ অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল। এখনো প্রায় ২৭-২৮ হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া করে। কিন্তু শিক্ষার্থীর তুলনায় সংস্কৃতি অঙ্গনের খুব বেহাল দশা। মাত্র কয়েকটি সংগঠন নিজেদের তৎপরতায় সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

গত বাংলা বর্ষবরণ উপলক্ষে বদরগঞ্জ উপজেলা প্রেস ক্লাব তিন দিনব্যাপী বর্ষবরণ উৎসবের আয়োজন করেছিল। বিশেষ অতিথি হিসেবে সেখানে একদিন গিয়েছিলাম। আয়োজকরা জানালেন দীর্ঘকাল পর তারা এ কাজ করছেন। তবে সাধারণ মানুষের সাড়া ব্যাপক। রাত ১১-১২টা পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষ জেগে জেগে গানের অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন। বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের চাকচিক্য বাড়লেও ভেতরের সৌন্দর্য কমছে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে প্রায় প্রতিদিন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। এছাড়া ক্লাস চলাকালে একাডেমিক ভবনগুলোর সামনে পথনাটক, বিকালে ইবলিশ চত্বরে কিংবা মাঠের অন্য কোনো অংশে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলতোই। যারা সংস্কৃতিসেবী, তারাও কোনো না কোনো সংগঠনে অনায়াসে যুক্ত হতে পারতেন। কিন্তু এখন আর সংস্কৃতি চর্চার সেই ব্যাপকতা নেই। চর্চা একেবারেই থেমে গেছে তা নয়, কমে আসছে।

আমি এক সময় কুড়িগ্রাম সরকারি কলেজে শিক্ষকতা করতাম। প্রায় ৩ বছর সেখানে শিক্ষকতা করেছি। আমরা কয়েকজন মিলে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলাম বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। কুড়িগ্রামের ইতিহাসে বাংলা বর্ষবরণে সবচেয়ে বড় শোভাযাত্রার আয়োজন করেছিলাম আমরাই। উদ্যোগ গ্রহণ করলে প্রচুর মানুষ অংশগ্রহণ করে। কিন্তু উদ্যোগ গ্রহণ করার মানুষের সংখ্যাই কমে যাচ্ছে।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ২০০৮ সালের ১২ অক্টোবর। এর শিক্ষা কার্যক্রম উদ্বোধন হয়েছে ২০০৯ সালের ৪ এপ্রিল। মাত্র ১ সপ্তাহ পরই আমরা একটি সংগঠনের কার্যক্রম শুরু করি। ১২ এপ্রিলেই আমরা সংগঠনের নাম ঠিক করার জন্য একটি সভা ডেকেছিলাম। অনেকে মিলে, অনেকের মত নিয়ে প্রথমে সংগঠনের নাম ঠিক করা হয় ‘আলোর মিছিল’। নামকরণের পরপরই নাম নিয়ে আপত্তি চলতে থাকে। কিছুদিন এই নামেই চলছিল সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। পরবর্তী সময়ে নাম পরিবর্তনের সুপারিশ আসতে থাকে। তখন প্রথমে আমি প্রস্তাব করি ‘অনুরণন’। ‘অনুরণন’ নামেই যখন এর কার্যক্রম চলছিল তখন বাংলা বিভাগের অধ্যাপক সরিফা সালোয়া ডিনা নামটি আরেকটু ছোট করার পরামর্শ দেন। অধ্যাপক সরিফা সালোয়া ডিনা তখন কেবলই বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান করেছেন। আপার পরামর্শ আমরা গ্রহণ করি। ‘অনুরণন’ এর ‘অনু’ বাদ দিয়ে আমরা ‘রণন’ নামটি বহাল রাখি। শুরু হয় ‘রণন’ নামের যাত্রা। ১০ বছর ধরে রণন-এর সভাপতি হিসেবে রণনকে আমি সবচেয়ে কাছে থেকে দেখার দীর্ঘ সময় পেয়েছি।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সুস্থ চিন্তা-চেতনার বিকাশ রোধ করার জন্য সেমিস্টার সিস্টেম চালু করা হয়েছে। মননশীল জাতি যাতে গড়ে উঠতে না পারে সেজন্য শিক্ষার্থীদের অসংখ্য পরীক্ষার শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। শিক্ষার্থীর পক্ষে সুষ্ঠু চিন্তা করার কোনো সময় নেই। প্রায় প্রতিদিনই পরীক্ষা আর পরীক্ষা। হরেক নামে চলে সেসব পরীক্ষা। ইনকোর্স, মিডটার্ম, প্রেজেন্টেশন, সেমিস্টার ফাইনাল ইত্যাদি।

আমি যখন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃতি চর্চার সাংগঠনিক কাজ শুরু করি তার পূর্বে সিমেস্টার সিস্টেমের ভূত কত ভয়াবহ তা প্রত্যক্ষ করিনি। যখন কাজ শুরু করলাম তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি মাত্র ব্যাচ। ৬টি বিষয়ে ৩০০ শিক্ষার্থী পড়ছে। প্রতি রবি সোমবার আমরা বসতে শুরু করি। অনেক শিক্ষার্থী নিয়মিত আসছে। ধীরে ধীরে যতই পরীক্ষা শুরু হলো, ততই শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কমতে থাকল। যে শিক্ষার্থী খুব ভালো নজরুল সংগীত করত, অল্পদিনের মধ্যে তার সংগীত চর্চা শিকায় উঠল। যে ছেলে ভালো অভিনয় করত, তার অভিনয় পরীক্ষায় খেয়ে ফেলল। যে ভালো নাচ করত তার নাচশিল্পের যাত্রা শেষ হলো।

বিবিধ সংকটে পড়লাম সংগঠন নিয়ে। বাংলা বিভাগের প্রথম ব্যাচের শিক্ষার্থী সামিউল ওয়াকিল মুন সাধারণ সম্পাদক হিসেবে লেগে ছিল। আমরা বিচিত্র অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে কাজ চালাতে থাকি। উচ্চারণ কর্মশালা, বিতর্ক, সংগীত, নাটক, আবৃত্তি সবকিছুর সঙ্গেই আমরা যুক্ত থাকি। সামিউল ওয়াকিল মুনের পর যুক্ত হয় কম্পিউটার সায়েন্সের জামিল সারোয়ার আহাদ। একনিষ্ঠ সংগঠক। চারদিকে পরীক্ষার চাপে পিষ্ট থেকে যে কজন শিক্ষার্থী সংগঠনকে এগিয়ে নিয়েছে তাদের অন্যতম জামিল সারোয়ার আহাদ। বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার পাশাপাশি একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের হাল ধরে থাকা অনেক বড় কাজ।

জামিল সারোয়ার আহাদের শিক্ষা সমাপনীর পর ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মঞ্জুর আরিফ সাধারণ সম্পাদকের হাল ধরে। মঞ্জুর আরিফ এক বিশেষ যোগ্যতা আর দক্ষতায় ‘রণন’ এর শিল্পীদের এক ছায়াতলে রাখার কাজটি করেছে। কায়সার নামের মার্কেটিং বিভাগের এক শিক্ষার্থী ছিল। সে খুব ভালো কবিতা লেখে। আমি তাকে কবি কায়সার নামে ডাকি। সে রণন-এর একনিষ্ঠ এক কর্মী। সামিউল ওয়াকিল মুন ও কায়সার এখন একটি বেসরকারি সংস্থায় সম্মানের সঙ্গে বড় চাকরি করছে। জামিল সারোয়ার আহাদ ভালো একটি সরকারি চাকরি করছে। মঞ্জুর আরিফ পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে।

রণন আসলে কী করছে? এই প্রশ্নের একটি ছোট উত্তর পাওয়া যাবে রণন অন্তপ্রাণ সাদিয়া কবীরের ফেসবুকের একটি স্ট্যাটাস থেকে। সাদিয়া কবীর এখন অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী। সে ‘রণন’ এর দশ বছরপূর্তির পোস্টার শেয়ার করে নিজের সম্পর্কে লিখেছে- ‘একজন সাধারণ শিক্ষার্থীকে সাংগঠনিক বানিয়েছিল রণন। মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে যার হাত কাঁপত, তাকে মাইক্রোফোন ধরা শিখিয়েছিল। একজন শিক্ষার্থীও যে তার আচরণ ও কর্মের দ্বারা সমাজের কাছে দায়বদ্ধ তা বুঝিয়েছিল রণন। বিশ্ববিদ্যালয়ের সূচনালগ্নে ছোট ছোট হাত-পা নিয়ে হামগুড়ি দেওয়া শিশু রণন আজ অনেকটাই পরিণত। ....রণনকর্মীরা যেখানেই থাকুক না কেন রণন তাদের হৃদয়ে সর্বদা জাগ্রত।’ কখনো কখনো এ প্রতিষ্ঠানের অনেক ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা ‘রণন’ এর সদস্যদের রণনে আসা থেকে নিবৃত্ত করতে চেয়েছিলেন। ‘রণন’ কর্মীগণ সেসব কথায় কর্ণপাত করেনি।

‘রণন’ এর বর্তমান সাধারণ সম্পাদক সঞ্জয় চৌধুরী সব সময় একটি কথা বলে- ‘আমরা শুদ্ধতার চর্চা করি’। রণন সত্যিই এমন এক শুদ্ধতার চর্চা করে যা অনেক সময় প্রথাগত ধারণার বাইরে। রণন বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ বিনির্মাণের পক্ষে কাজ করে। বক্তব্যস্বর্বস্ব আত্মপ্রচারমুখী এমনকি ‘মুই কি হনু রে’ টাইপের কার্যকলাপকে ঘৃণার সঙ্গে পরিত্যাগ করে চলছে রণন। কারও সমালোচনামূলক কথার জবাব কথায় না দিয়ে ভালো কাজের মাধ্যমে সেই জবাব দেওয়ার চেষ্টা তারা করছে।

বর্তমানে এ সংগঠনে গান, নাটক, আবৃত্তি অভিনয়ের আলাদা আলাদা শাখায় পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে কোনো একক অনুষ্ঠানের আয়োজন করতে হলে রণন বিশ্বদ্যিালয়ের মান ধরে রেখে শুদ্ধ ধারায় সেই অনুষ্ঠান করার সামর্থ্য রাখে। প্রতিষ্ঠাবার্ষিক অনুষ্ঠানে অনেকের মধ্যে এসেছিলেন আওয়ামী লীগের রাজনীতিক আবুল কাশেম। তিনি অনুষ্ঠান দেখে বলেছিলেন অনেক দিন পর শুদ্ধ ধারার একটি বড় অনুষ্ঠান দেখলাম।

‘রণন’ গত ১০ বছরে অসংখ্য অনুষ্ঠান করেছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেক প্রতিনিধিত্বশীল ব্যক্তির ওপর বড় বড় অনুষ্ঠান করেছে। দেশের প্রয়োজনে অনেক ইস্যুতে প্রতিবাদী হয়েছে। শুধু নদী নিয়ে যে গান, নাচ, অভিনয় এবং আবৃত্তির অনুষ্ঠান হতে পারে তাও করে দেখিয়েছে। রণন সাংগঠনিকভাবে একটি যুগান্তকারী কাজ করেছে। আমার উদ্যোগে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ৩৩ হাজার গাছ লাগানো হয়েছে সেখানে সাংগঠনিকভাবে রণন অনেক বড় সহায়তা দিয়েছে।

গত ১২ এপ্রিল ‘রণন’ প্রতিষ্ঠার দশ বছর পূর্ণ করেছে। এখন চলছে একাদশ বর্ষযাপন। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ৩০ এপ্রিল একটি উৎসবের আয়োজন করা হয়। দিনব্যাপী এ অনুষ্ঠানের উদ্বোধক ছিলেন শুদ্ধচারী মানুষ অধ্যাপক তোফায়েল হোসেন এবং সমাপনী বক্তা ছিলেন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব মিলন ভট্টাচার্য। এই অনুষ্ঠানে বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ৩৩ হাজার বৃক্ষরোপণে যারা সহায়তা দিয়েছিল তাদের হাতে রণন কৃতজ্ঞতা স্মারক তুলে দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের যে মালী, কুক, প্রহরী এ কাজে প্রত্যক্ষ সহায়তা করেছে তারা কেউই বাদ পড়েননি। গুনগুন-রণন বইমেলার তৃতীয় আয়োজন সম্পন্ন হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক সংগঠন গুনগুন-এর সঙ্গে ৬-৭ দিনব্যাপী বইমেলার মতো একটি যুগান্তকারী কাজ করে যাচ্ছে রণন।

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা শুদ্ধতার নিরিখে শিল্প-সংস্কৃতি চর্চা করতে চায়, রণন তাদের জন্য সদাউন্মুক্ত। দেশব্যাপী সংস্কৃতি চর্চার শূন্যতার কালে আরও আরও সাংস্কৃতিক সংগঠন গড়ে উঠুক, বেড়ে উঠুক রণন সবসময় তা চায়।

ড. তুহিন ওয়াদুদ: সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও পরিচালক, রিভারাইন পিপল

[email protected]