পোড়া লাশ আর মৃত্যুকূপে বসবাস

ঢাকা, ১৪ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

পোড়া লাশ আর মৃত্যুকূপে বসবাস

আশেক মাহমুদ ৩:৩০ অপরাহ্ণ, মে ০৪, ২০১৯

পোড়া লাশ আর মৃত্যুকূপে বসবাস

নিমতলী থেকে চকবাজার, চকবাজার থেকে এফ আর টাওয়ার। লাশের পর লাশ বেড়েই চলছে, আগুনে পুড়ে জীবন্ত মানুষ অঙ্গার হয়ে যায়। জীবনের আরেক নাম যেন অকালে সর্বনাশ। এক সময় যে মানুষ নগরজীবনকে বেছে নিত সুন্দর জীবনের আশায়, সে-ই মানুষ এখন নগরজীবনকে মনে করে অভিশপ্ত জীবন।

চাষের হাইব্রিড মাছ খেলে মনে হয় কে যেন মাছের ওপর অভিশাপ দিয়েছে। নগরজীবনও আজ এমনি হাইব্রিড যে এখানে থেকে প্রতিদিন মানুষ মৃত্যুর অপেক্ষা করছে। বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে কখন যে কে লাশ হয়ে আসে নিজের বাসায়, কখন যে কে নিজের বাসাতেই পুড়ে অঙ্গার হয়ে যায় তার ভয়ে সবাই আজ মহা-আতঙ্কে বসবাস করছে।

২০১০ সালে নিমতলীতে ১২৪ আর এ বছরই চকবাজারে অগ্নিদগ্ধ হয়ে মারা যায় ৭১ জন। তখন নগরবাসী ভেবেছিল পুরান ঢাকা এক মৃত্যুপুরী। এখানে বসবাস করা মানে অকালে মরার জন্য পথ চেয়ে থাকা। তার চেয়ে নতুন ঢাকাই যেন আরও নিরাপদ। কিন্তু না। কি পুরান কি নতুন; পুরো ঢাকাই এখন মৃত্যুকূপ।

গত ২৮ মার্চ রাজধানীর বনানী পরিণত হয় অন্ধকূপে। আগে ভেবেছিলাম, গরিবের ঘরে সুখ নেই, বেঁচে থাকার গ্যারান্টিও নেই। প্রতিবছর শুনতাম বস্তি পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, গার্মেন্টে আগুন ধরে শত শ্রমিক পুড়ে ছাই, আর তাই তাজরীন আজো ভয়াল ইতিহাসকে স্মরণ করে দেয়। এখন দেখছি কি গরিব, কি ধনী কেউ নিরাপদ নয়। ২৮ মার্চের কালো দিন সেই কথাটাই বলছে বারেবারে। টাকা দিয়ে নাকি বাঘের দুধও মেলে; সে আশা আজ মিছে হয়ে গেছে। তাহলে কোথায় সমস্যা? কেন আধুনিক কালে কি ধনী, কি গরিব সবাইকে বাঁচতে হচ্ছে হতাশায়, ভয়ে আর আতঙ্কে?

সমস্যার অন্তরালে আমি তিনটি কারণকে চিহ্নিত করব। প্রথম কারণ, প্রাতিষ্ঠানিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি। ১৮ তলার অনুমোদন নিয়ে ২৩ তলা বহুতল ভবন নির্মিত হয় এফ আর টাওয়ার। বহুতল নির্মাণে মানা হয়নি আইন-কানুন নিয়ম-নীতি। অগ্নিনির্বাপক যন্ত্রটি ছিল পুরোপুরি অচল। চারপাশে ছিল না খোলা জায়গা, এমনকি সিঁড়িগুলো ছিল সরু প্রকৃতির।

এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, রাজধানীর ২৬১২টি ভবনের মধ্যে মাত্র ২৪টি ভবনে অগ্নিনির্বাপণের নিয়ম মানা হয় (যুগান্তর, ২০ মার্চ ২০১৯)। এর মানে ৯০% এর অধিক ভবন যদি নিয়ম না মেনে করা হয় তবে কী করে মানুষ বেঁচে থাকার আশা পোষণ করবে? এফ আর টাওয়ার আমাদের দেখিয়ে দেয়, কত অনিয়মের জঞ্জালে ভরে গেছে সব প্রতিষ্ঠান।

কারও মতে, এফ আর টাওয়ারে ফোম ও সিনথেটিক দ্রব্য থাকায় দ্রুত আগুন ছড়িয়েছে। আধাঘণ্টা পার হয়ে যায় তবু ফায়ার সার্ভিসের দেখা মেলে না, ফায়ার সার্ভিস এসেও কোনো কূল কিনারা করতে পারছে না। কেন? কারণ, ফায়ার সার্ভিসের কাছে না ছিল উন্নত প্রযুক্তি, না ছিল আগুন নেভানোর পানি। এমনকি লাফ দিয়ে উঁচু ফোমে পড়ারও কোনো ব্যবস্থা ছিল না।

সরকারি উদ্যোগে ট্যাক্স, ভ্যাটের জোগান তো কম হয় না। তাহলে কেন ফায়ার সার্ভিসের উন্নত প্রযুক্তি কেনা হয়নি? যে ফোমের ব্যবহার করে ফায়ার সার্ভিস ট্রেনিং দিত-সেই ফোমের কোনো নিশানাও কেন দেখা গেল না? এসব ফোম কি ফায়ার সার্ভিসের কাছে ছিল না? নাকি এগুলো ভাড়া করা, আমরা এর কিছুই জানি না।

আমরা শুধু দেখতে পাচ্ছি, ভবনের মালিক, ডেভেলপার কোম্পানি, রাজউক, সিটি করপোরশন ও ফায়ার সার্ভিস সব প্রতিষ্ঠান সম্মিলিতভাবে গণহত্যার সব আয়োজন করে রেখেছে। সরকারি ও বেসরকারি অর্থনীতি নিয়ে এতকাল যে বিবাদ ছিল তা যেন লোভের থাবায় একাকার হয়ে গেছে। পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় মালিক শ্রেণি আর ডেভেলপার কোম্পানি অতি মুনাফার লোভে আইন কানুনকে টাকা দিয়ে কেনার বন্দোবস্ত করে। আর সেই দুরভিসন্ধিকে প্রতিহত করার জন্য প্রয়োজন জনগণের জন্য দায়িত্বশীল সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এ কি দেখছি আমরা? মালিক শ্রেণি, ডেভেলপার, রাজউক, সিটি করপোরেশন, ফায়ার সার্ভিস সবাই আজ একই পতাকার নিচে অবস্থান করছে। এ পতাকা কিন্তু লাল-সবুজের পতাকা নয়। বরং এটি হলো হলুদ-কালো পতাকা, যে পতাকা মুনাফা আর লোভের প্রতীক, একই সঙ্গে আগুনে পুড়ে কালো অঙ্গার হওয়ার প্রতীক।

মালিক শ্রেণি আর ডেভেলপার কোম্পানির ব্যঘ্র মুনাফা লুটতে রাজউক, সিটি করপোরেশনের সরকারি কর্মকর্তারা সার্বিকভাবে সহায়তা করে চলছে? কারণ সরকারি এসব কর্মকর্তাদের লালসা এত প্রকট যে সরকার তাদের বেতন বাড়ানোর পরও এদের লোভ লালসা কিছুতেই কমতে চায় না। সে কারণে এরা মিলেমিশে আমলাতান্ত্রিক কায়দায় সরকারি বরাদ্দ লুটে ব্যস্ত আবার সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে কী করে বড় অঙ্কের ঘুষ আদায় করা যায়, তা নিয়ে মহাব্যস্ত। বহু বছর ধরে রাজউক হয়ে আছে ঘুষের গোডাউন, দিন দিন এখানে ঘুষের রেট বাড়ে বৈ কমে না। সে সুযোগ কাজে লাগিয়ে মুনাফাখোররা জনগণকে জিম্মি করছে। জনগণকে ফেলা হচ্ছে গহীন মৃত্যুকূপে। এই মৃত্যুকূপ আরো গভীর হয় নগরায়নের নামে হাউজিং প্রজেক্ট হাতে নেওয়ার ফলে। কুপরিকল্পিতভাবে হাউজিং প্রজেক্ট নেওয়া হয় খাল বিল লেক ভরাট করে। আর তাই আগুন নেভাতে পানিও পাওয়া যায় না। এই কুপরিকল্পিত নগরায়ন বিপদের দ্বিতীয় কারণ।

মূলত অবাধ দুর্নীতির কারণে সব প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা জনগণকে জিম্মি করে ফেলে। এর মূল কারণ সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার সংকট। এই তৃতীয় কারণটি সবচেয়ে জঘন্য। সমাজ জীবনে তাদের সম্মান করা হয়, যারা বিত্ত-বৈভবের অধিকারী। মানুষ এখন আর দেখতে চায় না, অফিসারটি কীভাবে আয় করেছে। মানুষ ওই অফিসারের জাঁকজমকপূর্ণ জীবন দেখে ঈর্ষান্বিত হয়। ওই কোটিপতি লুটেরাই সমাজের মানুষের জন্য রোল মডেল হয়ে যায়। এই পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের ঘুষ লেনদেনকে সবাই মিলে হালাল করে ফেলেছে। ফলে বৈধতার সংকট ঘনীভূত হয়।

সেই সংকট সব শ্রেণির মানুষকে ফেলে দেয় চরম দুর্দশায়। এখন মানুষ চায় স্বাভাবিক মৃত্যু। আগের যুগে কলেরা ছিনিয়ে নিত শত শত প্রাণ। এখন শিক্ষিত মানুষ যে রুগ্ন আত্মা নিয়ে বাস করছে তা কলেরার চেয়েও হাজার গুণে ভয়ঙ্কর। যার পরিণতি এই মৃত্যুকূপ।

আধুনিক কালে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর জীবাণুর নাম লালসা। সেই লালসার হাত থেকে জাতি মুক্তি চায়। এই লালসার প্রাদুর্ভাব পরিবার থেকে রাষ্ট্র সর্বত্র। এ থেকে নিস্তারের জন্য উচ্চমানের জ্ঞান, নৈতিকতার শিক্ষা কার্যক্রম যেমন জরুরি, তেমনি জরুরি দুর্নীতিবাজদের শাস্তির ব্যবস্থা করা। রাষ্ট্র ও সরকারকে বুঝতে হবে পদ্মা সেতু মানুষের জন্য যত জরুরি, তার চেয়েও জরুরি নাগরিকদের স্বস্তিতে বসবাসের সুযোগ দেওয়া। যদি তা না পায়, তাহলে মানুষের বিদেশমুখিতা আরো বেড়ে যাবে।

হে স্বাধীন রাষ্ট্র, এদেশ থেকে অব্যবস্থাপনার কারিগর দুর্নীতিবাজদের যদি শাস্তি দিতে না পারো, অন্তত ওদের এ দেশ থেকে তাড়ানোর ব্যবস্থা করো। আমাদের কী অপরাধ যে আমরা অভিমান করে পালিয়ে যাব! এদেশের নাগরিক বেশি কিছু চায় না, শুধু স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি চায়। হে রাষ্ট্র, তুমি সদয় হও। অন্তত স্বাধীনতার নামে কসম করে ফিরে তাকাও!

আশেক মাহমুদ : সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
[email protected]

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও