আইনের শাসন ও প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা

ঢাকা, ১৪ জুন, ২০১৯ | 2 0 1

আইনের শাসন ও প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা

ড. মিল্টন বিশ্বাস ৫:৪৮ অপরাহ্ণ, মে ০২, ২০১৯

আইনের শাসন ও প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যাশা

২৮ এপ্রিল ২০১৯ জাতীয় আইনি সহায়তা দিবসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আদালতে মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমানোর পাশাপাশি খুন-ধর্ষণ-অগ্নিসন্ত্রাসসহ গুরুতর ফৌজদারি অপরাধগুলোর দ্রুত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে বলেছেন। সমাজের সবার জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিতে কাজ করার নির্দেশনা দিয়ে সরকারের আইনি সহায়তাকে তৃণমূলে ছড়িয়ে দেওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চাই প্রতিটি মানুষ ন্যায়বিচার পাক। সেই ব্যবস্থাটা যাতে নেওয়া হয়, সেটা আপনারা নেবেন। আমরা চাই না আমরা যেমন বিচার না পেয়ে কেঁদেছি, আর কাউকে যেন এভাবে না কাঁদতে হয়। সকলে যেন ন্যায়বিচার পায়।’

প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণে সপরিবারে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পর দীর্ঘদিন বিচারহীনতার সংস্কৃতি ও বিএনপি-জামায়াতের অন্যায়-অত্যাচারের কথা স্পষ্টত ব্যক্ত হয়েছে। তিনি আমাদের মনে করিয়ে দিয়েছেন, তাঁকে টার্গেট করে যে ১৯টির অধিক হামলা ও হত্যার ষড়যন্ত্র হয়েছিল-তার অধিকাংশের বিচার না হওয়ার ঘটনাও। কেবল ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বিচার সমাপ্ত হলেও ২০০৪ সালের ওই ঘটনার বিচার পেতেও শেখ হাসিনাসহ সব ভিকটিমকে দীর্ঘদিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। এভাবে নিজের জীবন ও দলের নেতা-কর্মীদের মামলার দীর্ঘসূত্রতার অভিজ্ঞতা শাসক হিসেবে প্রধানমন্ত্রীকে অনেক বেশি মানবিক করে তুলেছে।

তিনি অনুভব করেছেন, কারাগারে এখনো অনেকেই আছেন, কী কারণে যে জেলে, তারা জানেন না। তাদের অপরাধের ধরনও পরিষ্কার নয়। কী করে আইনগত সহায়তা পাবেন সেটাও জানেন না। এ বিষয়গুলো দেখার জন্য প্রধানমন্ত্রী আইন মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে খুন, অগ্নিসন্ত্রাস, আগুন দিয়ে পুড়িয়ে হত্যা করা, ধর্ষণ, নানা ধরনের সামাজিক অনাচারের বিচার যেন খুব দ্রুত হয় এবং কঠোর শাস্তি দেওয়া যায় তাও নিশ্চিত করতে বলেছেন। অর্থাৎ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তিনি মানবাধিকার রক্ষা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্যও প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

২.
আমরা সবাই জানি, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ‘মানবাধিকার’ রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম মূল লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত। এজন্য মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং নিশ্চিতকরণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। মানবাধিকার সংরক্ষণ, উন্নয়ন এবং মানবাধিকার যথাযথভাবে নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীসহ জাতীয় সংস্থাগুলো কাজ করতে বাধ্য। এখানে ‘মানবাধিকার’ বলতে সংবিধানের তৃতীয় ভাগে ঘোষিত ‘মৌলিক অধিকার’ এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কর্তৃক অনুসমর্থিত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিলে ঘোষিত মানবাধিকার, যা প্রচলিত আইন দ্বারা স্বীকৃত তাকে বোঝানো হয়েছে। সংবিধানের তৃতীয় ভাগে বর্ণিত ২২টি মৌলিক অধিকারের মধ্যে কয়েকটি হলো-আইনের আশ্রয়-লাভের অধিকার, জীবন ও ব্যক্তি-স্বাধীনতার অধিকাররক্ষণ, গ্রেফতার ও আটক সম্পর্কে রক্ষাকবচ, বিচার ও দণ্ড সম্পর্কে রক্ষণ, চলাফেরার স্বাধীনতা, সমাবেশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাক-স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ, শৃঙ্খলামূলক আইনের ক্ষেত্রে অধিকারের পরিবর্তন, দায়মুক্তি-বিধানের ক্ষমতা প্রভৃতি।

বাংলাদেশের নাগরিকদের ২২টি মৌলিক অধিকার থাকলেও কয়েকটি শর্তবন্দি অধিকার রয়েছে। এর মধ্যে ‘শৃঙ্খলামূলক আইনের ক্ষেত্রে অধিকারের পরিবর্তন’ গুরুত্বপূর্ণ। কোনো শৃঙ্খলাবাহিনীর সদস্য-সম্পর্কিত কোনো শৃঙ্খলামূলক আইনের যে কোনো বিধান উক্ত সদস্যদের যথাযথ কর্তব্য পালন বা উক্ত বাহিনীতে শৃঙ্খলারক্ষা নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে প্রণীত বিধান বলে অনুরূপ বিধানের ক্ষেত্রে এই ভাগের কোনো কিছুই প্রযোজ্য হবে না। অর্থাৎ শৃঙ্খলাবাহিনী মৌলিক অধিকার ভোগের ক্ষেত্রে অপ্রযোজ্য। তবে ‘দায়মুক্তি-বিধানের ক্ষমতা’ প্রয়োগে তারা ভিন্নতর অধিকার ভোগ করে থাকে।
সংবিধানে বর্ণিত এ বিষয়ে ব্যাখ্যা হচ্ছে-‘এই ভাগের পূর্ববর্ণিত বিধানাবলিতে যা বলা হয়েছে, তা সত্ত্বেও প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত কোনো ব্যক্তি বা অন্য কোনো ব্যক্তি জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের প্রয়োজনে কিংবা বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার মধ্যে যে কোনো অঞ্চলে শৃঙ্খলারক্ষা বা পুনর্বহালের প্রয়োজনে কোনো কাজ করে থাকলে সংসদ আইনের দ্বারা সেই ব্যক্তিকে দায়মুক্ত করতে পারবেন কিংবা ওই অঞ্চলে প্রদত্ত কোনো দণ্ডাদেশ, দন্ড বা বাজেয়াপ্তির আদেশকে কিংবা অন্য কোনো কার্যকে বৈধ করে নিতে পারবেন।’ পক্ষান্তরে ‘মৌলিক অধিকার বলবৎকরণ’ সম্পর্কে বলা হয়েছে- এই ভাগে প্রদত্ত অধিকারসমূহ বলবৎ করার জন্য এই সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের (১) দফা অনুযায়ী হাইকোর্ট বিভাগের নিকট মামলা রুজু করার অধিকারের নিশ্চয়তা দান করা হলো। ১০২ নং অনুচ্ছেদের (১) দফায় আছে- কোনো সংক্ষুব্ধ ব্যক্তির আবেদনক্রমে এই সংবিধানের তৃতীয় ভাগের দ্বারা অর্পিত অধিকারসমূহের যে কোনো একটি বলবৎ করার জন্য প্রজাতন্ত্রের বিষয়াবলির সঙ্গে সম্পর্কিত কোনো দায়িত্ব পালনকারী ব্যক্তিসহ যে কোনো ব্যক্তি বা কর্তৃপক্ষকে হাইকোর্ট বিভাগ উপযুক্ত নির্দেশাবলি বা আদেশাবলি দান করতে পারবেন। মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে কিছু আদেশ ও নির্দেশ দানের জন্য এভাবে হাইকোর্ট বিভাগের ক্ষমতা সংরক্ষণ করেছে সংবিধান।

মৌলিক অধিকার সংরক্ষণে সংবিধানের এই ধারাসমূহের বিস্তৃত ব্যাখ্যায় না গিয়েও আমরা বলতে পারি, হাইকোর্ট বিভাগ একজন ব্যক্তির অধিকার ক্ষু হলে তার প্রতিবিধানে যথাযথ আদেশ কিংবা নির্দেশ দিতে পারেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীও সেই আদেশ মানতে বাধ্য। উপরন্তু রয়েছে ‘আইনের আশ্রয় লাভের অধিকার’-এর মতো মৌলিক অধিকারও। এজন্য আমরা দেখতে পাই ২০১৪ সালে নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনায় বর্তমান সরকারের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কঠোরতার সঙ্গে হাইকোর্টও সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। দোষীদের শনাক্ত করা গেছে এবং বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। অন্যদিকে দেশের ভেতর সামাজিক ও রাজনৈতিক অরাজকতা ও নৈরাজ্য, হত্যা ও অপহরণের ঘটনায় মানুষের মৌলিক অধিকার হরণ করা হয় হরহামেশায়। জঙ্গিগোষ্ঠী মানুষের ‘চলাফেরার স্বাধীনতা’ বিঘ্নিত করে, ‘চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা কিংবা বাক-স্বাধীনতা’ চর্চার সুযোগ কেড়ে নেয়।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড মেরে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চেষ্টা ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনের চরম দৃষ্টান্ত। একই বছর প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ুন আজাদের ওপর হামলা লেখকের চিন্তা ও বাক-স্বাধীনতার মৌলিক অধিকারের ওপর নিষ্ঠুরতম আঘাত হিসেবে গণ্য হয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িত জঙ্গিগোষ্ঠীর সদস্যরা বিচারের সম্মুখীন হয়েছে। আর অপরাধীদের গ্রেফতার করার পুরো কৃতিত্ব ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর। তাহলে মানবাধিকার রক্ষা কিংবা পুনরুদ্ধারে গ্রেনেড হামলা কিংবা বোমাবাজদের বিচারের সম্মুখীন করা এবং দায়ীদের শাস্তি বিধান যেমন আদালতের কর্তব্য তেমনি সন্ত্রাসী-অপরাধীদের ধরে বিচারে সমর্পণ করা সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের দায়িত্ব। অর্থাৎ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যরা অপরাধীদের আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে এক অর্থে মানবাধিকার রক্ষায় তাঁদের দায়িত্ব পালন করছেন।
গত ১০ বছরে শেখ হাসিনা সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হয়েছে। হত্যা-গুমের অবসান ঘটিয়েছে এবং নির্বিচারে গ্রেফতারে আইন মেনে চলতে বাধ্য করেছে। নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নেওয়া সুশাসন প্রতিষ্ঠার অন্যতম নজির। ২০১৪ সালের মে মাসে নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের মামলায় র‌্যাবের কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার ও বিচারের ঘটনাটি উল্লেখ করা হয় বারংবার। কারণ এতে মানুষ আজ ন্যায়বিচারের সুবিধা পাচ্ছে- এটা স্পষ্ট। অবশ্যই সরকারকে সবসময় এটা নিশ্চিত করতে হবে।

২০১৫ সালের ৫ জানুয়ারি থেকে পরবর্তী তিন মাস বিএনপি-জামায়াত সমর্থকরা পেট্রলবোমা ছুড়ে হরতাল ও অবরোধ কার্যকর করতে চেয়েছিল; নির্বাচনের আগে ও পরে হিন্দু ও খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বাড়ি ও দোকানপাটে হামলাও চালিয়েছিল। এসব ঘটনায় দোষীদের এখনো বিচার সম্পন্ন হয়নি। অনুরূপভাবে ২০০১ সালের নির্বাচন-উত্তর হিন্দু-খ্রিস্টান জনগোষ্ঠী ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের ওপর নির্মম নির্যাতন করেছিল জামায়াত-বিএনপি; হত্যা-ধর্ষণে মেতে উঠেছিল তারা। কিন্তু ওই ‘গণতন্ত্রের শত্রু’, ‘মানবতার শত্রু’ ও ‘সভ্যতার শত্রু’দের বর্তমান সরকার এখনো কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে পারেনি।

আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় চরমপন্থী এবং ধর্মীয় উগ্রবাদীর হাত থেকে জনমানুষকে মুক্ত করার প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শাসনামল থেকেই চরমপন্থী দমনে এ দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সচেষ্ট হতে হয়েছে। সেই গোষ্ঠীর অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হয়েছে বর্তমান সরকার। তাদের বিরুদ্ধে সাফল্যজনক অভিযান এবং অস্ত্র উদ্ধার ও ৫০০শ’র ওপরে গ্রেফতার করে মামলা করা হয়েছে ১২৫টির মতো। নিয়মিত টহল ও অভিযানের মাধ্যমে জলদস্যু ও বনদস্যুতার অবসান ঘটিয়েছে। মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষার দায়িত্ব সরকারের। সেই সরকারের আস্থাভাজন সংস্থা ‘র‌্যাব’ জালনোট ব্যবসায়ী, প্রস্তুতকারক এবং হুন্ডি ব্যবসায়ী চক্রের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে মানুষের জীবনে স্বস্তি এনেছে। ১৪৩৮ জন জালনোট প্রস্তুতকারক বা ব্যবসায়ী এবং ১২৬ জন হুন্ডি ব্যবসায়ীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। উপরন্তু চাঁদাবাজদের উপদ্রব থেকে মানুষ রক্ষা পেয়েছে। একইভাবে ছিনতাইকারী, মলম বা অজ্ঞান পার্টি গ্রেফতারে সাফল্য দেখিয়েছে সরকারি সংস্থাগুলো। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা বিধানের পাশাপাশি সরকারের রাজস্ব ফাঁকিবাজদের তৎপরতা ধ্বংস করে দিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো।

মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ অবদান হলো চাঞ্চল্যকর হত্যা মামলার প্রায় এক হাজার আসামি গ্রেফতার করার ঘটনা এবং অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করা। এসব কর্মকান্ডের ফলে আইনের শাসন, ন্যায়বিচার ও রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক কিংবা জনমনে অনাস্থার সৃষ্টি হয়নি। এক্ষেত্রে সুশীল সমাজের অভিমত হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উচিত তাদের নিজস্ব প্রশাসনকে ঠিক মতো পরিচালনা করা ও সক্রিয় থাকা। উপরন্তু দ্রুত বিচার প্রক্রিয়ায় অপহরণকারী, সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির বিধান করা গেলে সরকারের ওপর মানুষের আস্থা আরও দৃঢ়তর হবে।

বাংলাদেশে বর্তমান সরকারের সময় বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড যে কমে এসেছে তা পরিসংখ্যানই বলে দিচ্ছে। বিএনপি-জামায়াত জোট আমলের শেষ তিন বছরে (২০০৩-৬) মোট গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির শতকরা ২.২৪ ভাগ অর্থাৎ ৩৪০ জন এনকাউন্টারে নিহত হয়। সামরিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ০.৭৪ ভাগ অর্থাৎ ২০৬ জন হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়। এ ধারা বর্তমান সরকারের প্রথম পাঁচ বছরে নেমে আসে ০.২৩ ভাগে অর্থাৎ ১১৭ জন মারা পড়ে এনকাউন্টারে।

বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড বর্তমানে শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। এর প্রধান কারণ, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যদের বিভাগীয় শাস্তির ব্যবস্থা কঠোর করা হয়েছে। ভয়ঙ্কর অথবা সাধারণ যে কোনো ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে অভিযুক্তকে শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে গত পাঁচ বছরে শাস্তি দেওয়া হয়েছে। গত এক দশকের মধ্যে কেবল ২০১০-১১ সালে অভিযুক্ত ১৪২৯ জন র‌্যাব সদস্যকে তদন্ত, বিচার ও শাস্তির আওতায় আনা হয়।

ফৌজদারি আদালত এবং প্রশাসনিক শাস্তির ফলে ৫২৫ জনের জেল ও ৯০৪ জনকে বরখাস্ত কিংবা বিভাগীয় শাস্তি দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগেকার সরকারের র‌্যাবের মতো সংস্থাটির অপরাধী সদস্যদের অব্যাহতি দেওয়ার সংস্কৃতি বদলে গেছে। বর্তমানে যে কোনো র‌্যাব সদস্য অপরাধী হিসেবে গণ্য হলে কিংবা অপকর্মে লিপ্ত হলে তাকে জেল, পাওনা ছাড়াই চাকরি থেকে বরখাস্ত এবং সিভিল কোর্টে বিচারের সম্মুখীন করা হচ্ছে। এ ছাড়া র‌্যাব সদস্যদের আরও বেশি জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় ২০১২ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে Internal Enquiry Cell (IEC)। এ সেলটি স্বাধীনভাবে ‘ডিজি’র (র‌্যাব) অধীনে কাজ করছে। র‌্যাব সদস্যদের বিরুদ্ধে কোনো নাগরিকের অভিযোগকে তদন্ত করা সেলটির অন্যতম দায়িত্ব। আগেই বলা হয়েছে, বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ডের সংখ্যা কমে এসেছে। কারণ র‌্যাব সদস্যদের বিচারের আওতায় আনা হয়েছে। ২০০৯ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত র‌্যাবের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পরিসংখ্যান হলো- র‌্যাবের এখতিয়ারে ১৩২৭ জন, ১২ জন ক্রিমিনাল কোর্টে, ৩৯২ জনকে অন্যান্য সংস্থা কর্তৃক বিচার করা হয়েছে। র‌্যাব কর্তৃক একজন ও ক্রিমিনাল কোর্টে পাঁচজন বিচারের অপেক্ষায় রয়েছেন। গুরুতর অপরাধের জন্য জেল হয়েছে ৫২৫ জনের, ছোটখাটো অনিয়মের কারণে ৯০৪ জন শাস্তি ভোগ করছেন।

একবিংশ শতাব্দীতে ধর্মীয় জঙ্গিবাদের উত্থানে বিশ্বের বুকে নতুন এক সন্ত্রাসের আবির্ভাব ঘটে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই ঢাকার হলি আর্টিজানের হামলা ও হত্যাকা- আমাদের কাছে ভয়ঙ্কর ছিল। ক্রাইস্টচার্চ ও শ্রীলঙ্কায় জঙ্গিবাদীদের উন্মত্ত আচরণ ও ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ডে গোটা মানববিশ্ব বিব্রত এবং ভীতসন্ত্রস্ত। বিভিন্ন জাতিধর্ম গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আর সৌহার্দ্যপূর্ণ সহাবস্থানের জন্য বহির্বিশ্বে সুনামের অধিকারী বাংলাদেশেও হঠাৎ করে জঙ্গিবাদী সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করে। কিন্তু সেই জঙ্গি দমনে বাংলাদেশের অগ্রগতি ঈর্ষণীয়। নাশকতা ও সহিংসতা গণতন্ত্রকামী মানুষকে আকৃষ্ট করে না। বরং যারা নাশকতা ও সহিংসতা করে বা এর পৃষ্ঠপোষকতা দেয়, তাদের প্রতি ক্রমাগত ঘৃণাই প্রকাশ করে জনগণ। ক্ষমতায় যে দলটিই যাবে তার কাছে জনগণের প্রত্যাশা থাকে সুখী, সমৃদ্ধ এবং একই সঙ্গে জঙ্গিমুক্ত বাংলাদেশ। আসলে জঙ্গি চারণভূমিতে পরিণত হোক বাংলাদেশ- নিশ্চয় এই চাওয়া আমাদের নয়। ৫০০ জায়গায় একসঙ্গে বোমা হামলা, আদালতে বোমা নিক্ষেপ, একুশে আগস্ট গ্রেনেড হামলা, কিবরিয়া হত্যা, আহসানউল্লাহ মাস্টার হত্যা, হরকাতুল জিহাদ, জেএমবি, বাংলাভাই ইত্যাদি বাংলার মানুষ কখনো ভুলবে না। এ দেশ হত্যার অভয়ারণ্য হোক এটা আমরা কেউ চাই না। আর এই ঘটনাগুলোর পেছনে যারা ছিল তাদের ধরে বিচারের সম্মুখীন করার কৃতিত্ব বর্তমান সরকারের। যা ছিল মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত উদাহরণ তা থেকে রক্ষা করে সরকার আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। মানবাধিকার রক্ষার জন্য নিয়মিত জঙ্গিদের কার্যক্রম নজরদারি করতে হবে। তারা যাতে সংগঠিত হতে না পারে সে জন্য গোয়েন্দা কার্যক্রম ও জঙ্গিদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রাখা দরকার।

৩.
আসলে মানবাধিকার সুদৃঢ় করার জন্য আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, সংবিধান ও গণতন্ত্র সুরক্ষাসহ রাষ্ট্রবিরোধী সব অপতৎপরতা রোধে নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে হবে সরকারের প্রতিটি সংস্থাকে। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের অবয়ব হচ্ছে সময়োপযোগী, আধুনিক, জনবান্ধব ও সেবাধর্মী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী ও বিচার বিভাগের স্বচ্ছতা। বিচারক ও আইনশৃঙ্খলা সদস্যদের নিজ নিজ অবস্থান থেকে জনসাধারণকে সার্বিক নিরাপত্তা প্রদানসহ আইনগত সহায়তা দিতে বিশেষভাবে তৎপর থাকতে হবে। অপরাধীদের গ্রেফতার এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্ত পরিচালনার ওপরই আইনের শাসন ‘অনেকাংশে’ নির্ভর করে। সরকারের দায়িত্ব ও কর্তব্য নিয়ে কেউ যাতে প্রশ্ন তুলতে না পারে সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। জীবনের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা বিধানের অধিকার রয়েছে প্রত্যেক নাগরিকের। কাউকে নৃশংস অত্যাচার ও খুন করা স্পষ্টত মানবাধিকার লঙ্ঘনের চূড়ান্ত পর্যায়। বর্তমানে এসব বিষয়ে সতর্ক রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২৮ এপ্রিলের ভাষণ থেকে তাঁর সদিচ্ছার পরিচয় পেয়েছি আমরা।

ড. মিল্টন বিশ্বাস : অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ 
এবং পরিচালক; জনসংযোগ, তথ্য ও প্রকাশনা দফতর,
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও