তারা ভালোই আছেন

ঢাকা, রবিবার, ২৬ মে ২০১৯ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

মাঠে-ঘাটে-বাটে

তারা ভালোই আছেন

ড. তুহিন ওয়াদুদ ৫:৪৩ অপরাহ্ণ, মে ০২, ২০১৯

তারা ভালোই আছেন

গত কয়েকদিনে আমি রংপুর, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, বগুড়ার কয়েকটি এলাকায় গিয়েছিলাম। অসংখ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। এসব মানুষ রাজনীতি বোঝেন না, তা নয়। হয়তো তারা জটিল রাজনীতি বোঝেন না। অর্থনীতির প্রাথমিক পাঠ বোঝেন না তাও নয়। আজকের দিনে সমাজ সম্পর্কে একেবারেই অজ্ঞ মানুষ আছেন, এ কথা সহজে বলা চলে না।

সম্প্রতি আমি গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি আবাসিক ভবনে এক রাত ছিলাম। ভবনটি পরিত্যক্ত কেন হয়নি সেটি বোধগম্য নয়। আমার স্ত্রী পেশায় চিকিৎসক। রংপুর মেডিকেল কলেজের শিক্ষক। তাদের একাডেমিক কাজে শিক্ষার্থীদের মাঠপর্যায়ের কিছু কাজ বোঝানোর জন্য তারা প্রায় প্রতি বছর পলাশবাড়ী যান। অন্য বছরও তিনি মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গিয়েছিলেন। আগে আমি যাইনি। এবার গিয়েছিলাম সেখানে। তারা সবাই সকালেই গিয়েছিলেন। আমি গিয়েছিলাম সন্ধ্যায়। রাতযাপন করলাম খুবই কষ্টে। দেখলাম এক বয়স্ক মহিলা আমার স্ত্রীর খোঁজখবর নিচ্ছেন। কোনো এক বছর নাকি তিনি আমার স্ত্রীর কাছ থেকে খুব সহযোগিতা নিয়েছিলেন সেই গল্প শোনাচ্ছিলেন। সেই বৃদ্ধ মহিলা হাসপাতাল চত্বরেই কোনো চিকিৎসকের বাসায় এখন কাজ করেন। তিনি বলছিলেন আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো আছেন। তার এই ভালো থাকা বলতে তিনি অর্থনৈতিকভাবে ভালো থাকার কথা বোঝাচ্ছিলেন।

বাসস্ট্যান্ড থেকে পলাশবাড়ী হাসপাতাল প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে। বাস থেকে নেমে অনেকটা সময় পলাশবাড়ীর বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে কথা বলছিলাম। তাদের সঙ্গে এলাকার শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি, বাল্যবিয়ে, বেসরকারি সংস্থা থেকে ঋণ গ্রহণসহ বহু বিষয় নিয়ে কথা হয়। রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নিয়ে অনেকেই অপরিচিত বলে আমার সঙ্গে কথা বলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ না করলেও অন্যান্য বিষয় নিয়ে স্বতঃস্ফূর্ত মতামতই দিচ্ছিলেন। তাদের কাছে ভালো থাকার সূচক হচ্ছে অতীতের সঙ্গে বর্তমানের তুলনামূলক ভালো থাকা। অনেকেই একটি কথা বলছিলেন- আগে খুব কষ্টে মানুষ বেঁচে থাকতেন। তিন বেলা খেতে পারতেন না। এখন আর আগের মতো কোনো কষ্ট নেই। তবে বয়স্ক কয়েকজন ভিন্ন মন্তব্য করেছেন। তাদের ভাষ্য হচ্ছে, আগে কষ্ট থাকলেও জীবনে অনেক সুখও ছিল। এখন খাওয়ার কষ্ট না থাকলেও সুখ নেই। রিকশায় করে যখন হাসপাতালের দিকে যাচ্ছিলাম তখন কথা হলো বৃদ্ধ রিকশাচালক চাচার সঙ্গে। তিনি বলছিলেন, এখন অনেকেই এনজিও থেকে লোন (ঋণ) নিচ্ছেন। এই লোনে নাকি লাভের চেয়ে ক্ষতি হচ্ছে বেশি। যে উদ্দেশ্যে লোন নেয়, সেই উদ্দেশ্যে ব্যয় না করে টাকাটা নষ্ট করে। কিন্তু পরে সারা বছর সেই টাকা পরিশোধ করতে হয়।

গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার কাটাখালীর একটি স্থান থেকে ভ্যানে খুলশি নামক স্থানের দিকে রওনা করেছিলাম। পথে ভ্যানচালকের সঙ্গে অনেক কথা হয়। তিনি সমাজের কিছু কিছু দিকের সমালোচনা করেন। রাজনীতি নিয়েও বিভিন্ন সমালোচনা করেছেন। কিন্তু তারও মন্তব্য হচ্ছে, মানুষ আগের চেয়ে এখন অনেক ভালো আছে। খুলশি ঘাটে মফেলা নামক এক মহিলা বলছিলেন, ভালো নেই। তিনি নিজেই নৌকায় করে ঘাট পার করেন যাত্রীদের। অবশ্য তার এই ভালো না থাকার কথা বলতে তিনি নিজেরটাই বলছিলেন। বৃহৎ অর্থে মানুষ ভালো নেই, সে কথা তিনি বলেননি। বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার মোকামতলা নামক স্থানের সাধারণ মানুষেরও অভিন্ন ভাষ্য। কুড়িগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম গরিব জেলা। এই জেলার মানুষও বলছেন, তারা ভালো আছেন। তাদের ভালো থাকাটাও একইভাবে তুলনামূলক ভালো থাকা। সারা দেশের উন্নয়নের সঙ্গে তাদের উন্নয়ন কতখানি বৈষম্যমূলক, সেটি না ভেবেই তারা তাদের অতীতের সঙ্গে তুলনা করে বর্তমানে ভালো থাকার কথাই যেন মনে করতে চান।

তবে নিম্নবিত্ত কিংবা বিত্তহীনরা ভালো থাকলেও মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্তদের মধ্যে আছে হাহাকার। এই হাহাকারও ভয়াবহ। যারা সাধারণ নিম্নবিত্ত কিংবা বিত্তহীন তারা জীবিকা নির্বাহের জন্য সব কাজেই নিয়োজিত হতে প্রস্তুত। কিন্তু নিম্নমধ্যবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্ত সমাজ সেই কাজ করতে পারে না।

আমাদের সমাজ যেহেতু সব কাজ করাকে সমান সম্মানের চোখে দেখে না তাই সম্মানিত ব্যক্তি বলে পরিচিতজনরা অনেক কাজ করতে লজ্জাবোধ করেন। এদের জন্য জীবনযাপন করা কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারও সামাজিক নিরাপত্তার বলয় ক্রমাগত বৃদ্ধি করেই চলেছে বিত্তহীন কিংবা নিম্নবিত্তদের জন্য। যারা লজ্জায় অনেক কাজে যেতে চান না তাদের জন্য সামজিক নিরাপত্তা জোরদার করা হয়নি।

দিনাজপুর গিয়েছিলাম বাংলা বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিয়ে গ্রন্থাগার পরিদর্শনে। সেই যাত্রায় সেখানেও অনেকের সঙ্গে কথা বলি। তারাও বোঝানোর চেষ্টা করেছেন, তারা ভালো আছেন। দেশ যে কতখানি এগিয়েছে তা বোঝার জন্য কারও কাছেই যেতে হয় না। সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকেই বুঝতে পারেন। তারপরও সাধারণ মানুষের কাছে, বিশেষত আগে যারা তিন বেলা খেতে পারেননি, তাদের কাছে গেলে বোঝা যায় দেশের উন্নয়ন কত বেশি হয়েছে।

দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ ভালো আছেন, এ কথার অনেক মূল্য। এই সাধারণ মানুষদের ইতিহাসের কী নির্মম বাস্তবতার মধ্য দিয়ে আসতে হয়েছে তার বর্ণনা রীতিমতো শিহরিত হওয়ার মতো। শ্রমিকদের জীবন এখনো কত বঞ্চনার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এরকম বাস্তবতায় আমাদের দেশের সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষরা তুলনামূলক ভাবনায় ভালো থাকার কথা ভাবতে শিখেছেন।

দেশ উন্নয়নের পথে হাঁটছে। মুষ্টিমেয় মানুষ ভালো থাকার চেষ্টা করলে সব মানুষ ভালো থাকবে না। আবার সমাজে বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে খারাপ রেখে কেউই ভালো থাকতে পারবে না। দেশের আপামর জনতাকে ভালো থাকতে হলে দেশের সব শ্রেণির মানুষের ভালো থাকার নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে। মঙ্গার দেশ শুধু রংপুর ছিল না। সারা দেশটাই মঙ্গাকবলিত ছিল। সেই মঙ্গাপীড়িত অবস্থার উত্তরণ ঘটেছে। এখন আমরা চাই গোটা দেশের মানুষের জীবনমান আরও বৃদ্ধি পাক। বিশ্বে অপরাপর রাষ্ট্রের তুলনায় বাংলাদেশ এগিয়ে যাক। নিকট অতীতের কষ্টে থাকা দিনগুলো পড়ে থাকুক সুদূর অতীতের পাতায়। আর বর্তমান হয়ে উঠুক সুখের, সমৃদ্ধির। যে সাধারণ মানুষ সভ্যতা বিনির্মাণের প্রধান চাবিকাঠি, তারাও সুখে থাকার সিঁড়িতে উঠে আসুক। সেটাই হোক প্রকৃত ভালো থাকা।

ড. তুহিন ওয়াদুদ : সহযোগী অধ্যাপক, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
পরিচালক, রিভারাইন পিপল
[email protected]