শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন অমানবিক!

ঢাকা, রবিবার, ১৯ মে ২০১৯ | ৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন অমানবিক!

মঞ্জুরুল আলম পান্না ৪:২১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৪, ২০১৯

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কেন অমানবিক!

মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা যে যুগোপযোগিতা থেকে এখনো অনেক দূরে এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে যে কোনো বিষয়েই ধর্মীয় এই শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে আমাদের অনেকের ভেতরে এক ধরনের উন্নাসিকতা প্রকাশ পেতে দেখা যায়, একটা একপেশে দৃষ্টিতে। ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাতের মর্মান্তিক ঘটনার পর সেই মানুষদের কেউ কেউ মাদ্রাসা শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ পান আবারও। তাদের মতে, মাদ্রাসাগুলোতেই অসামাজিক এবং অনৈতিক কাজগুলো ঘটছে বেশি।

একসময় মানুষের ধারণা ছিল, মাদ্রাসার ছাত্ররাই কেবল জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ছে। সে ধারণা কাটতে আমাদের খুব বেশি সময় লাগেনি। দেশের নামকরা উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী জড়িয়ে পড়ছে জঙ্গিবাদে। একইভাবে এ কথাও সত্য, স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো সাধারণ কিংবা ধর্মীয় কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানই নারীদের জন্য নিরাপদ নয়। সোনাগাজী মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার মতো শিক্ষকদের একাংশের নৈতিক স্খলনজনিত এই অরাজকতা-পাশবিকতা-উচ্ছৃঙ্খলতা শুধু মাদ্রাসাতেই নয়, দেশের সব ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেই বিরাজ করছে অনেক আগে থেকে। কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকেই আমরা যেমন মানবিক করে গড়ে তুলতে পারিনি তেমনি নারীদের সুরক্ষায় প্রতিষ্ঠানগুলোতে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা তৈরি করতে পারিনি আজ পর্যন্ত।

গণসাক্ষরতা অভিযানে পরিচালিত এডুকেশন-ওয়াচ ২০১৭ নামক একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৫০ শতাংশ, মাধ্যমিকের দুই-তৃতীয়াংশ এবং উচ্চ শিক্ষার ৭০ শতাংশ শিক্ষার্থী তাদের শিক্ষকদের আদর্শবাদী বলে মনে করেন না। এমনকি শিক্ষকদের ৫০ শতাংশ তাদের নিজেদের নৈতিকতাসম্পন্ন মানুষ বলে দাবি করেন না। ২০১২ সালে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠান ইউএন-ওমেনের করা এক জরিপে উঠে আসে ভয়াবহ আরেক চিত্র।

জরিপে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে গড়ে ৭৬ শতাংশ ছাত্রীই কোনো না কোনোভাবে যৌন হয়রানির শিকার হন। তবে পাবলিক বা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি আরও খারাপ। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে এ হার সবচেয়ে বেশি ৮৭ শতাংশ। বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোতে ৭৬ শতাংশ, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৬ শতাংশ এবং মেডিকেল কলেজে যৌন হয়রানির শিকার হন ৫৪ শতাংশ ছাত্রী। যৌন নিপীড়কদের মধ্যে যেমন শিক্ষকরা রয়েছেন তেমনি রয়েছে সহপাঠীরাও।

ধর্ষক পরিমলের কথা নিশ্চয় এখনো মনে আছে সবার। এই ব্যক্তি কিন্তু কোনো মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন না। তিনি ছিলেন রাজধানীর নাম করা অন্যতম আধুনিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ভিকারুননিসা নূনের শিক্ষক, ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় যাকে উচ্চ আদালত যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। ২০১৫ তে রাজধানীর মিরপুরে হলি ক্রিসেন্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্লে-গ্রুপের ছাত্রী পাঁচ বছর বয়সী এক শিশু ধর্ষণ মামলায় আসামিকে একই সাজা দেন বিশেষ ট্রাইব্যুনাল।

১১ অক্টোবর, ২০১৭ তে রাজধানীর ডেমরার একটি বেসরকারি স্কুলের ষষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে পরীক্ষায় ফেল করানোর ভয় দেখিয়ে ধর্ষণের অভিযোগ পাওয়া যায় সেখানকার শিক্ষক মুফতি মাসুমের বিরুদ্ধে। ধর্ষণের শিকার ছাত্রীটি ছিল কিছুটা মানসিক প্রতিবন্ধী। দুই মাস ধরে ওই শিক্ষক তাকে স্কুল ছুটির পর পড়া বুঝিয়ে দেওয়ার কথা বলে বসিয়ে রাখত। সবাই চলে যাওয়ার পর তাকে ধর্ষণ করত। ২০১৭-এর ৯ নভেম্বর গোপালগঞ্জের শেখ হাসিনা গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের গণিতের শিক্ষক শ্রীবাস কুমার মল-এর বিরুদ্ধে শ্রেণিকক্ষেই শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অসামাজিক কার্যক্রমের অভিযোগ ওঠে, যা তিনি নিজে লিখিতভাবে স্বীকার করে নেন।

বছর তিনেক আগে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. শরীফ উদ্দিন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের এক সহযোগী অধ্যাপকের বিরুদ্ধে ছাত্রীদের যৌন নির্যাতনের অভিযোগ প্রমাণিত হলে ওই দুই শিক্ষককে স্থায়ীভাবে চাকরিচ্যুত করা হয়। গত বছর ফেনীর সোনাগাজীর নবাবপুর হজরত ওসমান (রা.) মাদ্রাসার শিক্ষক মাওলানা আবদুল ফাত্তাহ বিন আমিনের বিরুদ্ধে তিন ছাত্রকে বলাৎকারের অভিযোগে এক অভিভাবক মামলা করেন। যৌন হয়রানির অভিযোগে গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক আক্কাস আলীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে কদিন আগেই।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্রী ধর্ষণ, বলাৎকার বা যৌন হয়রানির এমন অসংখ্য অভিযোগ রয়েছে শিক্ষকদের বিরুদ্ধে, যার কিছুসংখ্যক হয়তো আমাদের নজরে আসে। যেগুলো নিয়ে গণমাধ্যমে একটু হইচই হয়, সহপাঠীরা আন্দোলনে নামে সেগুলো নিয়ে প্রশাসন খানিকটা নড়েচড়ে বসে।

উপরে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের এমন একটি করে উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে মাত্র। যৌন হয়রানির শিকার ছাত্রীদের জীবনে নেমে আসে নানা ধরনের জটিলতা। বিপর্যস্ত হয় শিক্ষাজীবন। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন নিপীড়িত ছাত্রীদের একটা বিশাল অংশ। আবার কিছু ছাত্রী হয়রানির শিকার হয়ে একপর্যায়ে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন, অনেককে ধর্ষণের পর ধর্ষকের হাতে খুন হতেও দেখা গেছে।

তবু শাসকগোষ্ঠী যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আজ পর্যন্ত একটা কার্যকর আইনই প্রণয়ন করতে পারেনি। বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির করা এক রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০০৯ সালে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি রোধে একটি নীতিমালা করে দেন।

জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত কোনো আইন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত সংবিধানের ১১১ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ওই নীতিমালা অনুসরণ করতে বলা হয়। নীতিমালা অনুযায়ী কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র বা রাস্তাঘাটে যৌন হয়রানির অভিযোগ উঠলে তা খতিয়ে দেখতে কর্তৃপক্ষকে তদন্ত কমিটি গঠনের কথা বলা হয়। অভিযোগ গ্রহণে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে একটি করে অভিযোগকেন্দ্র স্থাপন এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত নির্যাতিত ও অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয় গোপন রাখতে বলা হয়।

অভিযোগকেন্দ্র গঠনের ব্যাপারে রায়ে বলা হয়, একজন নারীকে প্রধান করে অন্তত ৫ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে, যেখানে নারী সদস্যের সংখ্যা হতে হবে বেশি। কমিটির দাখিল করা তদন্ত প্রতিবেদন দেখে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবেন আদালত।

কেবল ধর্ষণই নয়, যে কোনো যৌন হয়রানি যে শাস্তিযোগ্য অপরাধ, সে ব্যাপারে সচেতনতা তৈরি করাই ছিল এ নীতিমালার উদ্দেশ্য। অথচ প্রায় এক দশক পার হয়ে গেলেও এর কিছুই মানা হয়নি। ২০০৯ সালে হাইকোর্টের দেওয়া নির্দেশনা কতটা প্রয়োগ হচ্ছে, তা নিয়ে গত বছর একটি গবেষণা পরিচালনা করে ব্রিটিশ সংস্থা অ্যাকশন এইড।

গবেষণায় দেখা গেছে, ৮৭ শতাংশ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ২০০৯ সালের সুপ্রিম কোর্টের দিকনির্দেশনা সম্পর্কে একেবারেই অবগত নয়, কর্মক্ষেত্রে যার হার ৬৪.৫ শতাংশ। হাতেগোনা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে যৌন নিপীড়নবিরোধী কমিটি থাকলেও, যাদের সেটা প্রয়োগ করার কথা তারা অনেকে এ গাইডলাইন সম্বন্ধে জানেনই না।

কয়েক দিন আগে হাইকোর্ট বলেছেন, ‘নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই দেশে ধর্ষণের সংখ্যা বাড়ছে’। আদালতের প্রতি সম্মান রেখেই এর সঙ্গে আরেকটি লাইন যোগ করতে চাই। নারীর প্রতি রাষ্ট্রের চরম উদাসীনতা আর অসম্মানও ধর্ষকের রাজত্ব কায়েমে সহায়তা করছে।

মঞ্জুরুল আলম পান্না : সাংবাদিক
[email protected]