মিতার সন্ধানে

ঢাকা, ৩০ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

মিতার সন্ধানে

মাসুদ কামাল হিন্দোল ৪:৪৮ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৭, ২০১৯

মিতার সন্ধানে

আমাদের দেশে একই নামে আরেকজনের নাম হলে তাকে বলা হয় মিতা। ইংরেজিতে বলে নেইম সেক (Name sake)। ভারতের লেখিকা ঝুম্পা লাহিড়ি নেইম সেক নামে একটা উপন্যাসই লিখে ফেলেছেন। এক সময় আমাদের দেশে মিতার প্রচলন ছিল। তখন কম্পিউটার ইন্টারনেট মোবাইল ছিল না। ছিল চিঠি। একই নামের দু’জনের মধ্যে বন্ধুত্ব হতো। একজন আরেকজনকে মিতা বলে সম্বোধন করতেন। তাদের মধ্যে মধুর সম্পর্র্ক গড়ে উঠত।

চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগ হতো। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় উৎসবে উপহার বিনিময় হতো। একজন আরেকজনের বাড়িতে অতিথি হতেন নানা পালা পার্বণে। দুই পরিবারের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধন গড়ে উঠত। এই শতকে মিতাদের নিয়ে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে ঢাকার সেগুনবাগিচায় জাহাঙ্গীর সার্কেল নামে (মিতা সংগঠন)। সংগঠনের আহ্বায়ক প্রকাশক (জ্যোতি প্রকাশ) মোস্তফা জাহাঙ্গীর আলম। সম্ভবত পৃথিবীর কোথাও একই নামের ব্যক্তিদের কোনো সংগঠন নেই। সংগঠনের সদস্য হওয়ার জন্য প্রধান শর্ত তার নামের আগে বা পরে ‘জাহাঙ্গীর’ থাকতে হবে। এভাবেও বলা যায় যে, তাদের আহ্বান অনেকটা এরকম, দুনিয়ার জাহাঙ্গীর এক হও।

জাহাঙ্গীরদের বৃত্তবন্দি করার চেষ্টা তারা চালিয়ে যাচ্ছেন। কতজন জাহাঙ্গীরকে তালিকাভুক্ত করতে পেরেছেন জানি না। জাহাঙ্গীর নামের একটা ইতিহাস আছে। জাহাঙ্গীর ছিলেন মোগল সম্রাট। সম্রাটের নামের সঙ্গে মিল রেখে চারশ বছর ধরে দেশে-বিদেশে মানুষ তার প্রিয় সন্তানের নাম রেখেছে জাহাঙ্গীর। জাহাঙ্গীর একটি আন্তর্জাতিক নাম। শুধু বাংলাদেশ না, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তানেও জাহাঙ্গীর নামে অনেক মানুষ খুঁজে পাওয়া যাবে।

আমাদের দেশে এমন কিছু নাম আছে যে নাম বলে হাটবাজারে ডাক দিলে দু’চারজন তাকায় বা পেছনে ফিরে দেখে। সেই নামগুলো খুবই কমন থাকে। হিন্দোল বলে ডাক দিলে সে সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আমি রাস্তার যে পাশ দিয়েই হাঁটি না কেন মিতার সন্ধান করেছি। সব সময় মিতা খুঁজেছি। চেয়েছি হিন্দোল নামে একজন আমার বন্ধু হোক। শুনলাম মোহাম্মদপুরের সলিমুল্লাহ রোডে হিন্দোল নামে একজন আছেন। তিনি বয়সে আমার চেয়ে পাঁচ-ছয় বছরের বড়। মোহাম্মদপুরে এত কাছাকাছি থাকার পরও তার সঙ্গে কোনো দিন আমার দেখা হয়নি।

আমার এক বন্ধুর কাজিন বলেছিল নাখালপাড়া এলাকায় হিন্দোল নামে একটা ছেলে আছে। তাদের বাড়ির কাছেই থাকে। সেখানে বেশ কয়েকবার গিয়েছি কিন্তু সেই ছেলেটির সঙ্গে কখনো দেখা হয়নি। সম্ভবত ২০১১ সালের দিকে হবে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকায় দেখলাম তেজগাঁও নাখালপাড়া এলাকায় হিন্দোল নামে একটা ছেলে মারা গেছে। আমি যে ছেলেটিকে খুঁজেছিলাম। এই ছেলেটাই সেই ছেলে কি-না কে জানে? তার মৃত্যুর সংবাদ কেন জানি আমাকে ব্যথিত করেছে। যাকে দেখিনি বা যার সঙ্গে আমার কখনো কথা হয়নি। অদ্ভুত একটা টান অনুভব করেছি। হয়তো নামের কারণেই। এ জন্যই কি কথায় বলে নামে নামে জমে টানে। আমাকে জমে না টানলেও ভাবনায় টেনেছে।

এক সময় অনেকেই আমার কাছে জানতে চাইতেন কলাবাগানের ‘হিন্দোল ঔষধালয়’ দোকানটা আমাদের কি-না? হিন্দোল ঔষধালয় দোকানের মালিক কে বা কারা তা আমি আগেও জানতাম না। এখনো জানি না। একইভাবে জানতে চাইতেন ঢাকার মৌচাক মার্কেটের পাশে ‘হিন্দোল’ সংগীত একাডেমির সঙ্গে আমার সম্পর্ক? হিন্দোল একাডেমির সঙ্গে আমার প্রত্যক্ষ কোনো সম্পর্ক না থাকলেও পরোক্ষভাবে সম্পর্ক আছে। উচ্চাঙ্গ সংগীতে রাগ হিন্দোল গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সেখানে গান আছে ‘মেঘেরও হিন্দোলা’। হিন্দোল বলতে সংগীতের রাগ বিশেষকে বোঝায়। গ্রীষ্মের অবসানে বর্ষার আগমনে বর্ষা প্রকৃতির অন্তর্লীন সুরটি সংগীতে হিন্দোল রাগে ঝংকৃত হয়ে ওঠে।

মিতা অর্থাৎ একই নামের মানুষ নানাভাবে খুঁজেছি। এক পর্যায়ে তথ্যপ্রযুক্তির সাহায্য নেই। নেটে সার্চ দেই হিন্দোল লিখে। সেখানে কয়েকজন মিতার সন্ধান পাওয়া যায় ঠিকই। তারা সবাই ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বা অন্য রাজ্যের বাসিন্দা। তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়ে ওঠেনি। বলা হয়নি তুমি আমার মিতা হবে? কখনো ফ্রেন্ড রিকোয়েস্টও পাঠানো হয়নি। এভাবেই কেটে গেছে অনেক বছর।

মিতার সন্ধানে মিতা খুঁজতে গিয়ে কোনো মিতার সন্ধান পাইনি ঠিকই পেয়েছি এক রাজ্যের সন্ধান। যে রাজ্যের নাম হিন্দোল স্টেট। অবিভক্ত ভারতে এ রাজ্যের অবস্থান ছিল। এ রাজ্যের সবকিছুই ছিল। ছিল প্রজা বা জনসাধারণ। উৎসব-পালাপার্বণ সবই হতো। ভাবতেই ভালো লাগছে এক কালে আমার নামে একটা রাজ্য ছিল। নিজের নামে রাজ্য কয়জনের থাকে। সেদিক থেকে আমি নিজেকে ভাগ্যবান বলতে পারি। আরও জেনেছি ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পূর্ব মেদেনিপুর জেলায় হিন্দোল নামে একটি সামাজিক উৎসব হয়। এটি ঝুলন উৎসব নামেও পরিচিত। ভারতের মধ্যপ্রদেশের পশ্চিমাংশে মালয় অঞ্চলে হিন্দোলা মহল অবস্থিত। হিন্দোলা মহল হলো একটি দেওয়ানি দরবার হল। সুলতান গিয়াসুদ্দিন সভা করতেন এই মহলে। স্লোপিং দেওয়াল ও পিলারের কারসাজি দেখে মনে হবে মহলটি দোদুল্যমান। বৃষ্টি পড়লে মনে হয় মহলটি যেন দুলছে। তাই এর নাম হিন্দোলা মহল।

কলেজে পড়ার সময় এক দিন আগারগাঁও স্টাফ কোয়ার্টারে গেলাম বন্ধু কাওসারের (মিতু) বাসায়। সেখানে গিয়ে জানলাম তারা যে কোয়ার্টারে থাকে সেই কোয়ার্টারের নাম হিন্দোল কমপ্লেক্স। হিন্দোল নামে চারটা কোয়ার্টার ছিল সে সময়। হিন্দোল ক, খ, গ ও ঘ। শুধু নামের কারণেই হিন্দোল কোয়ার্টারের ছেলেদের সঙ্গে খুব সহজেই বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল।

সেখানে আড্ডা দিতে প্রায়ই যেতাম। অনেকের নাম ভুলে গেলেও আজও মনে আছে বাবু (আকাশ) ও রতনের নাম। হিন্দোল কোয়ার্টারের কেউ কেউ আমাকে আজও মনে রেখেছে শুধু আমার নামের কারণে। ব্যস্ত নগর জীবনে চলতি পথে কালেভদ্রে তাদের কারও কারও সঙ্গে এখনো দেখা হয়। কথাও হয়।

অ্যালেক্স হ্যালি রুটস উপন্যাসে (টিভি সিরিজ) তার জন্মের উৎসের অনুসন্ধান করেছেন। তার মাধ্যমে আমরা জেনেছি কিন্টে-কুন্টের কথা। আর আমি খুঁজেছি মিতা, মিতা এবং মিতা। সন্ধান করেছি নামের। এখনো খুঁজে ফিরি। আজ পর্যন্ত একজন মিতার সাক্ষাৎও পেলাম না। পাইনি তাতে কী? শুধু আনকমন নামের কারণে পেয়েছি অগণিত মানুষের ভালোবাসা। যারা আমাকে আজও মনে রেখেছেন। মিতা না হয়েও তাদের সঙ্গে আমার মিতালি গড়ে উঠেছে।

মাসুদ কামাল হিন্দোল
সাংবাদিক ও রম্যলেখক 
[email protected]

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও