ঘুষ ছাড়া ছাড়পত্র মেলে না

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯ | ১২ বৈশাখ ১৪২৬

ঘুষ ছাড়া ছাড়পত্র মেলে না

এখলাসুর রহমান ৪:৩১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৬, ২০১৯

ঘুষ ছাড়া ছাড়পত্র মেলে না

বিভিন্ন বিভাগ হতে ছাড়পত্র পেতে টেবিলে টেবিলে উৎকোচ দিতে হয় বলে অভিযোগ বহুতল ভবন মালিকদের৷ তারা বলেছেন, ঘুষ ছাড়া ছাড়পত্র মেলে না।

আবার বনানীর এফআর টাওয়ারে ফায়ার সার্ভিসের কোনো অনুমোদনই ছিল না। ভবনটিতে ছিল না আগুন নেভানোর কোনো ব্যবস্থাপনা। এ কারণেই আগুন নেভাতে কিছুটা বিলম্ব হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিসের অভিযোগ৷

তারা বলেন, রাজধানীর প্রায় ৫ হাজার ভবন ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদন নেই। ফায়ার সার্ভিস নোটিশ দিলেও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার দায়িত্ব বর্তায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক)।

বহুতল ভবনের ক্ষেত্রে ফায়ার সার্ভিসের ছাড়পত্র বা অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনার অনুমোদন বাধ্যতামূলক থাকলেও এর কোনটিই ছিল না এফআর টাওয়ারে। কিন্তু কথা হলো এই তথ্যগুলো এই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পরে কেন প্রকাশ পেলো? সময় থাকতে ব্যবস্থা নিলে কি এমন ভয়াবহ মৃত্যুর ঘটনা ঘটতো?

এখন খবর বেরিয়েছে ফায়ার সার্ভিস গত জানুয়ারি মাসেও এ ব্যাপারে ভবন কর্তৃপক্ষকে নোটিশ দিয়েছিল। কিন্তু তারা এ নোটিশকে কোনো গুরুত্ব দেয়নি। ফায়ার সার্ভিস আরও জানায় তাদের পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি আছে। কিন্তু ভবনে যদি আগুন নেভানোরই কোনো ব্যবস্থা না থাকে তাহলে যন্ত্রপাতি দিয়ে কি হবে? সেখানে ফায়ার ফাইটিং করতে বেগ পেতে হয়৷

সরকার অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমাতে ২০০৩ সালে অগ্নিপ্রতিরোধ ও নির্বাপণ আইন করে। এই আইনে ঢাকা মহানগরে বহুতল ভবন নির্মাণে ফায়ার সার্ভিস থেকে ছাড়পত্র নিতে হয়। ভবনের সামনে সড়কের প্রশস্ততা, নকশা অনুসারে ভবনের অগ্নিনিরাপত্তা পরিকল্পনা, ভবন থেকে বের হওয়ার বিকল্প পথ, কাছাকাছি পানির সংস্থান, গাড়ি ঢুকতে পারবে কি না এসব বিষয় পর্যবেক্ষণ করে ছাড়পত্রটি দেয় ফায়ার সার্ভিস। তারপর এই ছাড়পত্র দেখিয়ে রাজউক থেকে ভবনের নকশার অনুমোদন নিয়ে ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করতে হয়। নির্মাণকাজ আংশিক বা পুরোপুরি শেষ হওয়ার পরও ভবনটিকে ব্যবহারোপোযোগী হিসেবে রাজউকের কাছ থেকে সনদ নিতে হয়। এই সনদ দেওয়ার সময় আগে জমা দেওয়া নকশা অনুযায়ী ভবনটি নির্মিত হয়েছে তাও খতিয়ে দেখার কথা রাজউকের।

কিন্তু রাজউক কেন এতসব নিয়মকানুন উপেক্ষা করে এসব বহুতল ভবনকে ছাড়পত্র দিয়ে এত এত মানুষকে মৃত্যুঝুঁকিতে ঠেলে দিল? এফআর টাওয়ারের অনুরূপ ঘটনা কি রাজধানীর ৫০০০ ভবনেও ঘটতে পারে না?

ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা দায়ী করছেন রাজউককে৷ তারা বলছেন, নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ হচ্ছে কিনা তা দেখার দায়িত্ব আর্কিটেক্ট ও প্রকৌশলীদের। এই পুরো বিষয়টি তদারকির দায়িত্ব রাজউকের মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের।

জানা যায়, নকশা বহির্ভূত ভবন নির্মাণ কাজে মোটা অঙ্কের উৎকোচ গ্রহণ করে থাকে তারা৷ আর এই উৎকোচ বাণিজ্যের কারণেই ঘটছে একের পর এক দুর্ঘটনা। ঘটছে মৃত্যু৷ নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডে প্রাণ হারালো ১২৩ জন৷ চকবাজারে অগ্নিকাণ্ডে ৭১ জন। বনানীর অগ্নিকাণ্ডে ২৬ জন৷

যখনই এমন কোনো ভয়াবহ মৃত্যুর ঘটনা ঘটে তখনই রাজউক সহ অন্যদের নিয়ে তদন্তের নামে হৈচৈ শুরু হয়ে যায়। কিন্তু এসব হৈচৈ-য়ে কি এসব অবৈধ ভবনের কিছু এসে গেল?যদি তাই হতো মৃত্যুর ফাঁদ হয়ে খোদ রাজধানীতেই ৫০০০ ভবন কিভাবে বহাল তবিয়তে থাকে?এগুলোতেও কি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা না ঘটলে প্রশাসন তৎপর হবেনা?

না হয় কেন এখনও এই ৫০০০ ভবনের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা? ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা অনিয়মের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে? ফায়ার সার্ভিসের অনুমোদনহীন ৫০০০ ভবনে যদি একযোগে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে কেমন হবে এ দৃশ্যটা? জাগনা ঘুম ও সুবিধাভোগী ঘুমের দায় কেন নেবে সাধারণ মানুষ?

বহুতল ভবনের মালিক দায়ী না মালিকদের কাছ থেকে উৎকোচ নিয়ে যারা এসব অবৈধ ভবনকে বৈধতা দিয়েছে তারা দায়ী? বহুতল ভবনের মালিকদের মতো তারাও গ্রেফতার হবে কি? মানুষের জীবন নিয়ে যারা এমন ছিনিমিনি খেলা কোনো বিবেকবান মানুষ মেনে নিতে পারে না৷ তাদের বিচার হোক এটাই সকল বিবেকী মানুষের প্রত্যাশা৷

রাজধানীর ৫০০০ ভবন চিহ্নিত করে এই অনিয়মের দায়ে দায়ীদেরও চিহ্নিত করা হোক৷ কিন্তু কে কার বিচার করবে? সংবাদপত্রে খবর বেরিয়েছে, খোদ ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) নগর ভবনেই নেই অগ্নিকাণ্ড মোকাবিলার ব্যবস্থা।
বহুতল এই ভবন থেকে ডিএনসিসির কর্মীদের নামার জন্য বহির্গমণ সিঁড়ি একটি। সেটিও পাশাপাশি দুজনের ওঠা-নামার উপযুক্ত নয়। জরুরি পরিস্থিতিতে নামার জন্যও নেই কোনো ব্যবস্থা। আগুন লাগলে কর্মীদের সতর্ক করতে নেই কোনো ফায়ার অ্যালার্ম। কার্যালয়ের প্রতিটি কক্ষে বিভাজক হিসেবে ব্যবহৃত দেয়ালগুলোও বোর্ডের তৈরি। প্রতি কক্ষের ভেতর ফলস ছাদ। জরুরি পরিস্থিতিতে কোন দিকে যেতে হবে, এ রকম কোনো নির্দেশনাও নেই ভবনে।

ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলামও তা স্বীকার করেন৷ তিনি বলেন, ‘ডিএনসিসি ভবনে অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা নেই। যা সত্য, তা লুকানোর উপায় নেই। এই ভবনের নির্মাতা কমপ্লায়েন্সের ব্যবস্থা করেনি। সিটি করপোরেশন এ নিয়ে চিন্তিত। তবে এই ভবনে যত শিগগির সম্ভব অগ্নিনিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে আমি নির্দেশ দিয়েছি।’

মেয়রের এই চিন্তিত হওয়ার বোধ কেন আগে জাগলো না৷ রাজধানীর প্রতিটি ভবন হতে কেবলই কি ট্যাক্স ও কর নেয়াই কর্তৃপক্ষের দায়? বহুতল ভবনের নামে মানুষের মৃত্যুর ফাঁদ চাইনা৷ জরুরি ভিত্তিতে এর প্রকৃত দায়ে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হোক৷ দেরিতে হলেও সকলের এ বোধ জাগবে আশা করি৷

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক