প্রাথমিক শিক্ষায় যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

ঢাকা, শুক্রবার, ৬ ডিসেম্বর ২০১৯ | ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

প্রাথমিক শিক্ষায় যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

লায়ন মো. শামীম সিকদার ৫:১৬ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৪, ২০১৯

প্রাথমিক শিক্ষায় যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত

শুরুতেই প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি, কারণ তিনি কোমলমতি শিশুদের পরীক্ষা নামক ভীতি থেকে মুক্তি দিয়েছেন। এখন থেকে শিশুরা তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া শিখবে খেলতে খেলতে, হাসি-আনন্দে আর নিজের মতো করে। তাদের দিতে হবে না আর কোনো পরীক্ষা। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী প্রথম থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত সব ধরনের পরীক্ষা বন্ধের জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দিয়েছেন। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এই নির্দেশ কার্যকর হবে বলে জানা গেছে। এই তিন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের স্কুলে উপস্থিতি, স্কুল থেকে দেওয়া ডায়েরির রিপোর্টই মূল্যায়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। পরীক্ষার চাপ যেন শিশুর স্বাভাবিক বিকাশে বাধা হতে না পারে, সে জন্যই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

দেশের প্রাথমিক স্তরের সব বিদ্যালয়ে কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার জন্য একধরনের মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। এসব পরীক্ষায় প্রথম হওয়ার জন্য শিশুদের মায়েরা অবতীর্ণ হয় এক পরীক্ষা যুদ্ধে। সব অভিভাবকই চান তার সন্তান প্রথম হবে। এজন্য শিক্ষার্থীর ওপর দেওয়া হয় লেখাপড়ার প্রচণ্ড চাপ। সব সময় চলে পড়া আর পড়া। পড়ালেখা ছাড়া আর কোনো কাজ শিশুদের যেন থাকতে নেই। খেলাধুলা করার সময়টাও তারা অপচয় মনে করে। শিশুদের তৈরি করা হয় যন্ত্রমানবে। তাদের সবকিছুই চলে মা-বাবার নির্দেশমতো। এসব শিশু নিজেরমতো করে কিছু করতে পারে না। অবশেষে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশের ফলে শিশুরা এই ভীতিকর অবস্থা থেকে মুক্তি পাবে।

প্রাক-প্রাথমিকের মেয়াদ এক বছর থেকে বাড়িয়ে দুই বছর করারও চিন্তা-ভাবনা চলছে। কিন্ডার গার্টেনের দৌরাত্ম্য কমিয়ে চার বছরের বেশি বয়সী শিশুকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়মুখী করতেই এ পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। শিশুর ওপর থেকে পরীক্ষার চাপ কমাতে সিঙ্গাপুর-ফিনল্যান্ডসহ উন্নত বিশ্বের আদলে শিক্ষাব্যবস্থা সাজানোর নির্দেশ দেওয়ায় দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিশুদের অতিরিক্ত চাপ কমে যাবে। ফলে তারা আনন্দের সঙ্গে লেখাপড়া শিখতে পারবে।

এ ছাড়া বিদ্যালয়গুলোতে স্কাউটসহ অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে এ নির্দেশনা কার্যকর করার চিন্তা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আগামী বছর থেকে এক বছর মেয়াদি প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষাকে বর্ধিত করে দুই বছর মেয়াদ করার চিন্তা-ভাবনা চলছে। একই সঙ্গে স্কুলকে আকর্ষণীয় করতে প্রতিটি স্কুলে ‘কাব স্কাউট’ গঠনের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে শিশুদের শিক্ষার ভিত শক্তভাবে তৈরি হবে।

জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ-২০১৯ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘শিশুদের শিক্ষার জন্য অতিরিক্ত চাপ দেওয়া উচিত নয়। তাদের পড়াশোনাটা, তারা যেন খেলতে খেলতে, হাসতে হাসতে সুন্দরভাবে নিজেদের মতো করে পড়তে পারে সে ব্যবস্থাই করা উচিত। সেখানে অনবরত পড়, পড়, পড় বলাটা বা তাদের ধমক দেওয়া আরও বেশি চাপ দিলে শিক্ষার ওপর আগ্রহটা কমে যাবে। একটা ভীতি সৃষ্টি হবে। সেই ভীতিটা যেন সৃষ্টি না হয় সেজন্য আমাদের শিক্ষক ও অভিভাবকদের আমি অনুরোধ করব।’

কোমলমতি শিশুদের লেখাপড়ার কঠোর শৃঙ্খলে আবদ্ধ করাকে তিনি এক ধরনের মানসিক অত্যাচার বলে মনে করেন। প্রধানমন্ত্রী আরও বলেছেন, শিশু প্রথমে বিদ্যালয়ে যাবে এবং হাসি-আনন্দ ও খেলার মধ্য দিয়ে লেখাপড়া করবে। তারা তো আগে থেকেই পড়ে আসবে না, পড়ালেখা শিখতেই তো শিশুরা বিদ্যালয়ে যাবে। এর ফলে শিশুদের শিক্ষার ভিতটা শক্তভাবে তৈরি হবে। পৃথিবীর অনেক দেশেই ৭ বছরের আগে শিশুকে স্কুলে পাঠায় না।

অনেক সময় আমরা দেখি প্রতিযোগিতাটা শিশুর মধ্যে না হলেও বাবা-মায়ের মধ্যে একটু বেশি হয়ে যায়। এটাকেও আমি একটি অসুস্থ প্রতিযোগিতা বলে মনে করি। সব শিক্ষার্থীর সমান মেধা থাকবে না এবং সবাই সবকিছু এক রকম করায়ত্ত করতে পারবে না। যার যেটি যেভাবে সহজাতভাবে আসবে, তাকে সেটি গ্রহণ করার সুযোগ দেওয়া উচিত, যেন শিক্ষাকে সে আপন করে নিয়ে শিখতে পারে।

প্রাথমিক শিক্ষার আরেকটি বিষয়ের প্রতি প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। তা হলো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি। বর্তমানে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সময়সূচি সকাল সোয়া ৯টা থেকে সোয়া ৪টা। এত লম্বা সময় শিশুদের বিদ্যালয়ে থাকার মতো শক্তি থাকে না। একজন শিশু শিক্ষার্থীকে সকাল সাড়ে ৮টার মধ্যে বিদ্যালয়ের উদ্দেশে রওনা দিতে হয়। তার মানে তাকে সকালের খাবার আরও আগে খেতে হয়। এরপর বিদ্যালয়ে এসে একটানা সাড়ে তিন ঘণ্টা ক্লাস করার পর দুপুর সোয়া ১টার সময় মাত্র ৩০ মিনিটের বিরতি দেওয়া হয়।

এ সময়ের মধ্যে একজন শিক্ষার্থী বাড়ি গিয়ে খাবার খেয়ে ফিরে আসাটা দুরূহ। ধরে নিলাম বাড়ি গিয়ে খেয়ে আসা সম্ভব, কিন্তু দুপুর ১টার মধ্যে গ্রামের কতজন মা পারেন রান্নার কাজ শেষ করতে। অধিকাংশই পারেন না। শিশুদের সঙ্গে কথা বলে এসবের সত্যতা পাওয়া গেছে। তবে শিক্ষা বিভাগের কর্তা ব্যক্তিরা বিদ্যালয়ে দুপুরের টিফিন নিয়ে আসার জন্য বলেন। গ্রামাঞ্চলের শিশুদের কতজন মা পারেন সকালের সাংসারিক কাজকর্ম শেষ করে সন্তানের জন্য টিফিন তৈরি করে দিতে। আবার দেওয়ার মতো সময় থাকলেও কতজন অভিভাবকের সামর্থ্য আছে টিফিনের জন্য বাড়তি খরচ করার। তার মানে দুপুরে না খেয়ে বা সামান্য কিছু খেয়ে বিকাল সোয়া ৪টা পর্যন্ত শিশুদের ক্লাসে থাকতে হয়।

এ অবস্থায় বিকালের ক্লাসগুলো থেকে পড়া আয়ত্ত করার মতো তাদের শক্তি থাকে না। আমি দেখেছি বিকালে যখন বিদ্যালয় ছুটি হয় তখন সকালের মতো হই-হল্লা থাকে না। তখন তারা ক্লান্তভাবে স্কুল থেকে বের হয়। শহরের বিদ্যালয়গুলোতে হয়তো এর কিছুটা ব্যতিক্রম থাকতে পারে। তবে শহরের চেয়ে গ্রামে বিদ্যালয়ের সংখ্যা বেশি। তাই শিশু শিক্ষাকে আরও কার্যকর করার জন্য তাদের বিদ্যালয়ে অবস্থানের সময় কমালে শিশুরা পড়ালেখার প্রতি আরও আগ্রহী হবে।

শিশুদের পরীক্ষায় ভালো ফলাফলের জন্য বর্তমানে শিশুদের লেখাপড়ায় যে চাপ দেওয়া হচ্ছে তা মোটেও কাম্য নয়। এতে শিশুরা লেখাপড়ার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে। পরীক্ষা পদ্ধতি ছাড়াই শিশু শিক্ষার্থীদের আরও বেশি শেখানো যায়। এজন্য প্রয়োজন বর্তমান শিখন পদ্ধতি যথাযথ বাস্তবায়ন করা। প্রতিটি শিশুই কামনা করে তাকে সবচেয়ে বেশি আদর করা হোক। পিতা-মাতা সে ভূমিকা পালন না করলে ঘরের অন্য কারও সাহায্য সে নেবে। এ ক্ষেত্রে শিশুর শিক্ষায় পিতা-মাতার ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের যে কোনো কাজ, কথা ও উপদেশ যদি বাসায় পিতা-মাতা অনুশীলন করতে পারেন তবে শিশু সে শিক্ষাকে সার্থকভাবে ধারণ করতে পারে। কারণ শিশু শিক্ষার্থীরা বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের সব কিছুকেই গুরুত্ব দেয়। শিশু শিক্ষার সার্থকতা আনয়নে শিক্ষক সমাজের প্রতিটি স্তর থেকে শিখতে সহায়ক সবকিছু বাস্তবরূপে প্রদর্শন করবেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষক শিশুর প্রকৃত সমস্যা না জানার কারণে তার অগ্রগতি রিপোর্ট তৈরিতে কষ্ট হয়। তাই শিশুর সুষ্ঠু শিক্ষার জন্য স্কুল এবং পরিবারের সমান তথ্য নিতে হবে। শিশুর ব্যক্তিগত দিক সম্পর্কে তার কাজে অভিভাবকের কাছে সঠিক তথ্য জানা না থাকলে শিক্ষক-অভিভাবকের মাঝে ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে।

স্কুলে এলেই যে জ্ঞানার্জন করা যায় সে ধারণাটা শিশুদের আছে। অভিভাবকরা তাদের স্কুলে পাঠিয়ে অনেকটা নিশ্চিন্ত থাকতে চান যে, তারা লেখাপড়া শিখছে এবং মানসম্মতভাবেই শিখছে। যেসব বাবা-মা লেখাপড়া জানেন এবং সন্তানদের পড়াশোনার অগ্রগতি বুঝতে পারেন তারা অনেক সময় স্কুলে গিয়ে শিক্ষকদের সঙ্গে আলোচনা করে শিশুদের প্রতি স্কুলের দায় বাড়িয়ে দেন। কিন্তু যাদের বাবা-মা শিক্ষিত নয় বা নিরক্ষর তারা তো আর স্কুলে গিয়ে নিজের সন্তানের অগ্রগতির হিসাব নিতে পারেন না। এই নিরক্ষর বাবা-মায়ের সন্তানরাই ভাগ্যবিড়ম্বিত অধিকাংশ শিক্ষার্থী যারা না বুঝে নিজের শিক্ষার দায়ভার নিজেরা বহন করে। শিশুদের মধ্যে যারা ভালো করেছে তাদের প্রতি শিক্ষকদের কিছুটা দৃষ্টি থাকলেও যারা পিছিয়ে পড়া স্বল্প মেধাবী শিশু তারা শিক্ষকের কাছে অনেকটাই বাড়তি বোঝা। এই অক্ষমতার কারণে অপূর্ণ প্রাপ্তিকে শিশু অধিকারের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কখনোই মেনে নেওয়া যায় না, যারা আদিবাসী, প্রতিবন্ধী অথবা কর্মজীবী শিশু তাদের কাছে নিজের মনের ভাব ভালোভাবে বোঝাতে পারে না এবং বাড়িতেও কারও সাহায্য পায় না।

শিশুদের শেখার মাত্রা গ্রাম বা শহরের স্কুলভেদে খুব যে একটা তারতম্য হয় তা মনে করার কারণ নেই। প্রায় সবক্ষেত্রেই শিক্ষাঙ্গন শ্রেণিতে একঘেয়ে পাঠদান কৌশল অবলম্বন করেন, শিক্ষার্থীরা পাঠ মুখস্থ করে আসে, নিয়মিত ক্লাসে উপস্থিত থাকার চেষ্টা করে এবং পরীক্ষায় গ্রহণযোগ্য একটা নম্বর পেলেই শিক্ষক, অভিভাবক এবং আত্মীয়স্বজন খুশি হয়ে যান। পরীক্ষা পদ্ধতি বাতিল হলে এই ধারার পরিবর্তন হবে। তখন শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনের লেখাপড়া শিক্ষার্থী কী শিখছে তা প্রতিদিনই মূল্যায়ন হবে।

প্রাথমিক শিক্ষায় যুগান্তকারী এ সিদ্ধান্তের ফলে পরীক্ষার প্রতি শিশুদের যে ভয়ভীতি ছিল তা কমে আসবে। তারা উপরের ক্লাসে পরীক্ষা দিতে আর অনীহা দেখাবে না, তাদের মধ্যে থাকবে না কোনো পরীক্ষাভীতি। তারা খেলতে-খেলতে, হাসতে-হাসতে সুন্দরভাবে আনন্দময় পরিবেশে নিজেদের মতো করে শিখবে।

লায়ন মো. শামীম সিকদার : কলেজ শিক্ষক ও কলাম লেখক
[email protected]

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও