ঘাঘট মরছে কেন?

ঢাকা, বুধবার, ২২ মে ২০১৯ | ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

বাঁচায় নদী, বাঁচাও নদী

ঘাঘট মরছে কেন?

ড. তুহিন ওয়াদুদ ৫:১৩ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ০৪, ২০১৯

ঘাঘট মরছে কেন?

আমাদের দেশে অনেক কারণেই নদীগুলো তার স্বাভাবিক প্রবাহ হারাচ্ছে। কখনো দীর্ঘদিনের অযত্নে নদীর তলদেশ ভরাট হচ্ছে। কখনো নদী দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করার কারণে নদী মারা যাচ্ছে। নদীতে পানি আসার পথ বন্ধ করেও অনেক নদীর সর্বনাশ করা হচ্ছে। এরকম প্রভৃতি কারণে নদীগুলোর প্রাণ ওষ্ঠাগত।

পানি আসার প্রধান পথ বন্ধ করে দিয়ে সরকারিভাবে ঘাঘট নদীটিকে মেরে ফেলা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে শুনে এসেছি ঘাঘট নদীর উৎসমুখ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। গত শনিবার ৩০ মার্চ ২০১৯ রংপুর থেকে সেই স্থানটি দেখার জন্য গিয়েছিলাম। আমার এই যাত্রায় যুক্ত হয়েছিলেন রংপুর জিলা স্কুলের শিক্ষক সফিয়ার রহমান, সাবেক আয়কর কর্মকর্তা সাদেকুল ইসলাম, বরেন্দ্র সেচ প্রকল্পের সহকারী প্রকৌশলী ফজলুল হক। সঙ্গে আরও দুজন ব্যক্তি ছিলেন।

আমরা রংপুর থেকে প্রায় ৫০ কিলোমিটারের এই পথ মোটরবাইকে গিয়েছি। নীলফামারী জেলার জলঢাকা উপজেলার কইমারীর পাশ দিয়ে তিস্তা থেকে এই নদী প্রবাহিত হতো। কিন্তু তিস্তা নদী তার স্থান পরিবর্তন করে অনেকটা পশ্চিমে সরে আসার কারণে ঘাঘট নদীর খানিকটা অংশ গ্রাস করে নিয়েছে। নদীটির যে স্থান থেকে ঘাঘট নদী বের হয়ে রংপুরের দিকে প্রবাহিত হয়েছে সেই স্থানের পাশে অনেকটা এলাকা সমতল ভূমিতে পরিণত হয়েছে। পূর্বের নদীপথ এখন দখলদাররা ভোগ করছে। স্থানীয় বয়স্ক ব্যক্তিরা ঘাঘটের পুরনো প্রবাহ সম্পর্কে জানেন। নতুন প্রজন্ম এসব জানেন না কিছুই।

ঘাঘট নদীর পাশেই আরেকটি নদী এসে তিস্তায় মিলিত হয়েছে। সেই নদীর নাম আউলিয়া খান। আউলিয়া খান এবং ঘাঘটের মুখ প্রায় এক সঙ্গেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী প্রায় ৪০-৪২ বছর আগে এ নদী দুটির মুখ বন্ধ করা হয়েছে। আউলিয়া খান নদীর মিলিত হওয়ার স্থানটি বন্ধ করে দেওয়ার কারণে এ নদীর পানি আর তিস্তার সঙ্গে মিলতে পারছিল না। আউলিয়া খানের পানি তিস্তায় প্রবেশ করতে না পারায় ভয়াবহ বন্যা দেখা দিচ্ছিল। অন্যদিকে ঘাঘটের পানিও কমে এসেছিল। তখন আউলিয়া খান থেকে শুরু করে ঘাঘটের পুরনো উৎসমুখের সন্নিকটে ঘাঘটের সঙ্গে সংযোগকারী একটি খাল খনন করা হয়েছিল। এই খালটি আউলিয়া খান এবং ঘাঘটের সংযোগ খাল হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। তিস্তার পানির কারণে ঘাঘটে যে রকম সারা বছর পানি থাকত, আউলিয়া খান নদীর পানিতে ঘাঘটে আর সেই পরিমাণ পানি আসে না।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী রক্ষা বা ফসল রক্ষা বাঁধ যখন নির্মাণ করেছে তখনি আউলিয়া খান এং ঘাঘটের মুখ বন্ধ করা হয়েছে। আউলিয়া খান নদী উজান থেকে এসে মিশেছে। ফলে এ নদীতে পানির অভাব হয়নি। শুধু মিলিত হওয়ার নদীটি আলাদা হয়েছে। আগে মিলিত হতো তিস্তার সঙ্গে এখন মিলিত হয় ঘাঘটের সঙ্গে। যেহেতু তিস্তার পানি ছিল ঘাঘটের প্রাণ তাই ঘাঘটের মুখ বন্ধ করায় নদীর চরম সর্বনাশের পথ রচিত হয়েছে।

গত ৩০ মার্চ উৎসমুখ বন্ধ করে দেওয়ার স্থানটিতে অনেকের সঙ্গেই কথা হয়েছে। আমরা নদীটির ভাটিতে অনেক স্থানে অনেকের সঙ্গে নদীটির অতীত বর্তমান নিয়ে কথা বলেছি। তারা সবাই বলেছেন নদীটির উৎসমুখ বন্ধ করার কারণে নদীর পানি বাধাহীন চলতে পারছে না। মুখ বন্ধ করার আগে এ নদীতে সারা বছর প্রচুর পানি প্রবাহিত হতো। এখন আর এ নদীর প্রবল প্রমত্তা রূপ নেই। নদীটি পানি উন্নয়ন বোর্ডের তালিকাভুক্ত ৪০৫টি নদীর একটি।

সরকারিভাবে এ নদীর পরিচিতি নম্বর উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল-৩৫। সরকারি এ প্রতিষ্ঠানটির সূত্রমতে ঘাঘট নদীর দৈর্ঘ্য ১৯২ কিলোমিটার। প্রস্থ স্থান বিশেষে কোথাও ২০ মিটার, কোথাও ১০০মিটার। এই নদীটির মুখ বন্ধ করে দেওয়ার কারণে দীর্ঘ ১৯২ কিলোমিটার নদীতে আর আগের মতো পানি থাকে না। পানির প্রবাহ না থাকার কারণে নদীটির গভীরতাও অনেক কমে আসছে। বারোমাসি এ নদীটি মৌসুমি নদীতে পরিণত হচ্ছে। এ নদীটির একটি শাখা নদীর নাম আলাই। মূল নদীতে পানি থাকে না বলে শাখা নদী আলাই নদীও পর্যাপ্ত পানি পাচ্ছে না।

শুধু বর্ষার পানি এখন এ নদীকে বাঁচিয়ে রেখেছে। একইভাবে রংপুর শহরের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া শ্যামাসুন্দরী নদীটিও ঘাঘটের শাখা নদী। ঘাঘটের উৎসমুখ বন্ধ হওয়ার কারণে শ্যামাসুন্দরী নদীর পানির প্রবাহ কমে এসেছে অনেকটাই। ঘাঘটের পূর্বের জৌলুশ হারানোর অনেকগুলো কারণ আছে। এটি তার মধ্যে অন্যতম।

রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার তুলশির হাট নামক একটি স্থানে ঘাঘট নদীর ওপর একটি ব্রিজ আছে। ব্রিজের পাশে অনেক জেলের সঙ্গে কথা হয়। তারাই বলছিলেন ৪০ বছর আগে এ নদীটি প্রস্থে অনেক বড় ছিল। এখন যেটুকু নদী আছে প্রস্থে তার চেয়ে কয়েকগুণ বেশি ছিল এ নদীটি। নদীর অনেক জমি এখন দখলদারদের হাতে। জেলেরাও বলছিলেন পূর্বে এ নদীতে অনেক পদের মাছ পাওয়া যেত। এখন আর আগের মতো মাছ পাওয়া যায় না।

সময় এসেছে এ নদীর উৎসমুখ খুলে দেওয়ার। সরকারিভাবে নদীর মুখ বন্ধ করে দিয়ে নদী মেরে ফেলা হয় তাহলে এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। ভুল করে কিংবা জেনেশুনে এ নদীর মুখ বন্ধ করা হলেও এখন এ নদীর উৎসমুখ খুলে দিতে হবে। এ নদীর পানির উৎসমুখ খুলে দেওয়া হলে ঘাঘট, শ্যামাসুন্দরী এবং আলাই নদীতে পানির প্রবাহ বেড়ে যাবে। বর্ষায় যখন তিস্তায় প্রবল স্রোত নেমে আসে তখন শাখা নদী ঘাঘটের মাধ্যমেও পানির চাপ কমানো যাবে। সর্বোপরি একটি কথা আমাদের মানতে হবে- প্রকৃতিকে তার নিজের মতো থাকতে না দিলে তা বিরূপ আচরণ করবেই। প্রকৃতির বিরূপ আচরণ মানেই তা মানুষের জীবনের জন্য হুমকি। তাই যত তাড়তাড়ি ঘাঘটের উৎসমুখ খুলে দেওয়া যাবে ততই মঙ্গল।

ড. তুহিন ওয়াদুদ : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর ও
পরিচালক, রিভারাইন পিপল
[email protected]