দেশ কি ছাত্র বিক্ষোভ দিয়েই গণবিক্ষোভের দিকে?

ঢাকা, ১৭ জুলাই, ২০১৯ | 2 0 1

দেশ কি ছাত্র বিক্ষোভ দিয়েই গণবিক্ষোভের দিকে?

এখলাসুর রহমান ৫:৩৮ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৭, ২০১৯

দেশ কি ছাত্র বিক্ষোভ দিয়েই গণবিক্ষোভের দিকে?

সংবাদপত্রে শিরোনাম হয় সড়কে মৃত্যুর মিছিল৷ আর সে মিছিল যেন ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছে৷ সড়কগুলো হয়ে উঠছে যেন মৃত্যুকূপ৷ সড়কে প্রাণহানি নিয়ে ফুঁসে উঠছে দেশ৷ নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নেমেছে শিক্ষার্থীরা৷ সড়কের নৈরাজ্যে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে খোদ সরকার দলের নেতারাও৷

আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নে গত বছর আগস্টে দেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনা এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবি কেন এখন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হলো না, কড়া ভাষায় তার জবাব চেয়েছেন৷

তিনি বলেন, বিভিন্ন অজুহাতে সড়কের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তারা নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়নে ব্যর্থ হয়েছেন। আর এর দায় এখন আমাদের ওপর। আমি স্পষ্ট ভাষায় বলে দিতে চাই কারও ব্যর্থতার দায় আমরা নিতে চাই না। কেন নিরাপদ সড়ক বাস্তবায়ন হলো না তার জবাব দিতে হবে।

সড়কের দায়িত্বে থাকা সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, এর আগে ছাত্ররা নিরাপদ সড়কের জন্য আন্দোলন করেছিল; আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্রদের সকল দাবি মেনে নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে সেই সকল দাবি বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন এই নির্দেশনা বাস্তবায়িত হল না?

১৪ দলের সমন্বয়ক ও সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম পরিবহন শ্রমিক নেতাদের একেকজন ফ্রাঙ্কেনস্টাইন বলে মন্তব্য করে বলেন, এসব ফ্রাঙ্কেনস্টাইনদের সময় মতো রুখতে না পারলে তারা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সব অর্জনকে ম্লান করে দেবে।

তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না? পরিবহন সেক্টরে এই সমস্ত ক্ষমতাধর ব্যক্তি কারা? তারা হয় পরিবহন শ্রমিক নেতা, অথবা মালিক সমিতির নেতা অথবা সরকারের লোক।

নাসিম আরও বলেন, সড়কে তরুণ মারা যাচ্ছে, গৃহবধূ মারা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ মারা যাচ্ছে। এই ব্যবস্থাপনা কেন সঠিক হবে না? যারা এই সেক্টরে কাজ করেন তারা সবাই এইসব মৃত্যুর জন্য  দায়ী। কিন্তু কে নেবে এর দায়? দায় নিলেই কি দায়মুক্তি? সড়ক দুর্ঘটনায় যারা জীবন দিল এই দায়ে কি তাদের জীবন ফিরে আসবে? আসলে কি ঘটতে চলেছে সড়ককে ঘিরে?

বগুড়া থেকে রূপা নামের মেয়েটি ময়মনসিংহ ফিরছিলেন ছোঁয়া পরিবহনের একটি বাসে। বাসটি টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা অতিক্রম করলে নেমে যায় সব যাত্রী। আর এই সুযোগ নিয়ে বাসটি কালিহাতী এলাকায় পৌঁছালে গাড়ির হেলপার ও অন্যরা তাকে গাড়ির পেছনের সিটে নিয়ে রূপাকে পালাক্রমে ধর্ষণ করে। পরে বাসটি মধুপুর পৌঁছালে রূপা চিৎকার চেচামেচি করলে তার ঘাড় মটকে মৃত্যু নিশ্চিত করে খুনিরা। পরে মধুপুর ময়মনসিংহ সড়কের মধুপুর বনের পঁচিশ মাইল এলাকায় জঙ্গলের মধ্যে তার লাশ ফেলে রেখে যায় হত্যাকারীরা৷ সংবাদপত্রে আরও একটি শিরোনাম হয়, সিলেটে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে চলন্ত বাস থেকে ফেলে হত্যা, চালক আটক৷

ভাড়া নিয়ে বাক-বিতণ্ডার জেরে সিলেটের কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের ছাত্র মো. ওয়াসিম আফনানকে চলন্ত বাস থেকে ফেলে হত্যার অভিযোগ করেছে শিক্ষার্থীরা। সিলেটের শেরপুর এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। এভাবে একের পর এক সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে৷ সড়ক নিয়ে সৃষ্টি হচ্ছে গণঅসন্তোষ৷ এ অসন্তোষের দায় কার?

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কি ভূমিকা রাখছে সড়ক মন্ত্রণালয়? দুর্ঘটনা প্রতিরোধে যে কমিটি গঠন করে দেয়া হল কি দায়িত্ব পালন করছে এই কমিটি? কেন সড়কের নৈরাজ্য প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পরেও থামছে না? দু’দুটো শিক্ষা মন্ত্রণালয় থাকা সত্ত্বেও আমরা শিক্ষকদের আন্দোলন দেখেছি, ছাত্রদের আন্দোলন দেখেছি৷ তথ্য মন্ত্রণালয় থাকা সত্ত্বেও সাংবাদিকদের আন্দোলন দেখেছি৷ শ্রম মন্ত্রণালয় থাকা সত্ত্বেও রাজপথে শ্রমিকদের আন্দোলন করতে দেখেছি৷ কিন্তু আন্দোলনকারীদের কাউকেই সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে দাবি করতে দেখা যায়নি৷ তারা দাবি জানায় প্রধানমন্ত্রী বরাবরে৷ এতে কি মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতা ও তাদের প্রতি ভরসাহীনতার দিক ফুটে উঠছেনা? এই লাগাতার ব্যর্থতার দৃশ্যমান হতে থাকা আর কতদিন? আর একটি লক্ষণীয় বিষয় হল সড়ক দুর্ঘটনায় বেশির ভাগ প্রাণহানি ঘটছে ছাত্রদের৷ দুর্ঘটনা না হলেও বাস থেকে জোরপূর্বক নামিয়ে তাদের হত্যা করা হচ্ছে৷ সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে এত আলোচনা সমালোচনা ও সরকারি কঠোর নির্দেশনার পরেও পরিবহন কেন আরও অধিক বেপরোয়া হয়ে উঠছে?

আওয়ামী লীগের সভাপতি মণ্ডলীর সদস্য আব্দুল মতিন খসরু সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণহানির সংখ্যাবৃদ্ধিতে হতাশা ব্যক্ত করেছেন৷ তিনি বলেছেন, প্রতিদিন ২০ জনের মৃত্যু ঘটছে সড়ক দুর্ঘটনায়৷

সরকার দলের নেতারাই য়দি হতাশা প্রকাশ করে তাহলে আর আশাটা কে দেখাবে? তবে কি পরিবহন সেক্টর সরকারের চেয়েও বেশি ক্ষমতাধর?

আবার ডিএমপি কমিশনার বলেন, দুর্ঘটনা ঘটলে আমরা কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যাই। জবাব দিতে পারি না। কিন্তু এটার পরিবর্তন হওয়া দরকার। জনগণ যাতে ফুটওভারব্রিজ ও জেব্রাক্রসিং ব্যবহার করে, সেজন্য ট্রাফিক বিভাগকে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিচ্ছি। দুর্ঘটনা ঘটানোয় বাস যেমন আটক করেন তেমনি দুর্ঘটনার কারণ হলে পথচারীকেও আটক করুন। আটক করে মিডিয়াকে দেখান, দেশের মানুষকে দেখান যে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ফুটওভারব্রিজ ব্যবহার না করে, জেব্রাক্রসিং ব্যতীত রাস্তা পার হতে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটিয়েছে৷ এরকম বক্তব্য কি পরিবহন সেক্টর, সড়ক মন্ত্রণালয় ও আইনশৃংখলা বাহিনীর ব্যর্থতা ঢাকার অপচেষ্টা নয়?

শিক্ষার্থীদের বাসের চাকায় পিষে মারার প্রতিবাদে সারা দেশে পরপর দু’টি বড় আন্দোলন হয়েছে। শিক্ষার্থীরাই এই আন্দোলনের আয়োজক ছিলেন। পরে অভিভাবকেরাও তাদের সাথে মাঠে নেমেছেন।

গত বছরের ২৯ জুলাই দুপুরে ছুটির পরে রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনের বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় শহীদ রমিজউদ্দীন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্র আবদুল করিম ওরফে সজীব এবং একই কলেজের একাদশ শ্রেণির ছাত্রী দিয়া খানম ওরফে মিম নিহত হয়। তারা রাস্তার পাশের ফুটপাথে গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছিল। এ সময় জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাস তাদের চাপা দিলে দু’জন নিহত হয়। এ সময় বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী গুরুতর আহত হয়।

ওই সময় দেশজুড়ে ব্যাপক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে। এভাবেই দেশব্যাপী শিক্ষার্থীদের ক্ষুব্ধ করে তোলা হচ্ছে? শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমে যানবাহনের লাইসেন্স চেক পর্যন্ত করেছে৷ এগুলো কি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও সরকারের চরম ব্যর্থতা নয়? নাকি এর পেছনে অন্যকোন রহস্য আছে? সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু নেই তা বেড়েই চলেছে৷

১৯ মার্চ রাজধানীর প্রগতি সরণিতে কুড়িল বিশ্বরোডে সু-প্রভাত কোম্পানির একটি বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের ছাত্র আবরার আহমেদ চৌধুরী। এতে করে ছাত্র বিক্ষোভ আরও নতুন মাত্রা পেল৷

বেসরকারি সংগঠন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে একটি ভয়াবহ তথ্য দিয়েছেন৷ তিনি বলেছেন, সড়ক নিরাপত্তার জন্য যারা আন্দোলন করবে তারাই বেপরোয়া শ্রমিকদের লক্ষ্যবস্তু হয়ে উঠবে। শিক্ষার্থীরা এখন শ্রমিকদের টার্গেট। শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরা এখন খুবই দুশ্চিন্তায় আছেন। আমরা যারা সড়কে শৃংখলার কথা বলি আমরাও টার্গেটে পরিণত হতে পারি।

আশীষ কুমার দে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ সত্ত্বেও সড়কে শৃংখলা ফেরেনি। সেখানে আর কে কী করবে। যেখানে পুলিশ কমিশনার নিজেই বলেছেন তারা ব্যর্থ হয়েছেন, সেখানে তিনি এক বছরের জন্য সড়কে শৃংখলা ফেরানোর জন্য সেনা মোতায়েনের দাবি জানান।

রোড সেইফটি ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী সাইদুর রহমানও বলেন, শিক্ষার্থীরা আসলেই টার্গেটে পরিণত হয়েছে। ছাত্রদের সাথে পরিবহন শ্রমিকদের সম্পর্ক রেষারেষিতে চলে গেছে। এর আগে মেয়ে শিক্ষার্থীদের গায়ে তারা কালি মেখে দিয়েছে। এগুলো কিসের ইঙ্গিত? একথা সত্যি হলে এর পরিণতি কী হতে পারে ভাবা যায়? তবে কি ছাত্রবিক্ষোভ দিয়েই দেশে গণবিক্ষোভের ক্ষেত্র সৃষ্টি করা হচ্ছে?

অনিরাপদ সড়কের নিরাপত্তাহীনতা ক্রমশ বেড়ে চলেছে৷

স্বাধীনতা দিবসে কুমিল্লার সদর দক্ষিণ ও চান্দিনা উপজেলায় পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় দুই স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছে। নিহতরা হলো- রিয়া সাহা এবং ইয়াসমিন আক্তার। তারা মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের অনুষ্ঠানে গিয়েছিল বলে জানা গেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কুটুম্বপুর স্কুলের শিক্ষার্থীরা বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। তারা ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে টায়ারে আগুন জ্বালিয়ে প্রায় এক ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখে।

স্বাধীনতা দিবসের দিন সকালে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের জেলার সদর দক্ষিণ উপজেলার মস্তাপুর ও চান্দিনা উপজেলার কুটুম্বপুর এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে৷ নিহত রিয়া সাহা সদর দক্ষিণ উপজেলার দুর্গাপুর গ্রামের রবি সাহার মেয়ে৷

অপরদিকে জেলার চান্দিনা উপজেলার কুটুম্বপুর এলাকায় ট্রাকচাপায় ইয়াসমিন আক্তার নামে আরও এক স্কুলছাত্রী নিহত হয়েছে৷ স্বাধীনতা দিবসে যোগ দিতে গিয়েও জীবনের স্বাধীনতা হারাচ্ছে মানুষ৷ এগুলো কি ছাত্রবিক্ষোভের সর্বোচ্চ আলামতের জন্য যথেষ্ট নয়? এসবের মধ্য দিয়েই হয়ত গণঅভ্যুত্থানের জন্য প্রতীক্ষার প্রহর গুণছেন কেউ কেউ৷

সম্প্রতি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে মানুষের ভোটবিমুখতাও তার লক্ষণ নয় কি? বিক্ষোভ হচ্ছে ভোটে অনিয়মের বিরুদ্ধে৷ দেশ চরম বিক্ষোভের অগ্নিস্ফূলিঙ্গে বাস করে চলেছে, তাই নয় কি?

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

 

মতান্তর: আরও পড়ুন

আরও