বেঁচেই দিলেন!

ঢাকা, রবিবার, ২৬ মে ২০১৯ | ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

বেঁচেই দিলেন!

মনদীপ ঘরাই ৬:৫৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ২৪, ২০১৯

বেঁচেই দিলেন!

কারা বিক্রি করছে তারুণ্য? কারাই বা বিক্রি করছে যৌবন? যৌবন বিক্রির কথা শুনে আপনার সুশীল মন নড়েচড়ে উঠে আঙ্গুল তুলছে নিশ্চয়ই দেহ পসারিণীদের দিকে।

ওই বৃত্ত থেকে বের হয়ে কিছু বলতেই কলম হাতে নিলাম। বাণিজ্য মেলা, বইমেলার পর এখন কি মেলা চলছে? ইন্টারনেট ঘেঁটে বের করার চেয়ে আমার লেখাটার সাথে থাকুন।বলছি।

এখন চলছে তারুণ্যের মেলা আর যৌবন ফেস্ট। শুনতে ভালই শোনায়, তাই না? কিন্তু বলেছি যে নেতিবাচক অর্থে! আমি, আপনি, চারপাশের সবাই প্রতিদিন বেচে চলছি আমাদের তারুণ্য আর যৌবন। এর চেয়ে বড় মেলা আর কই পাবেন?

এই খাপছাড়া শুরুর জন্য আমাকে হয়তো সোশ্যাল মিডিয়া ট্রায়ালে দোষী বানিয়ে ফেলেছেন। মানলাম আমি দোষী। এবার নিজের বক্তব্যগুলো বলি।

আমাদের এই মানব জীবনে সবচেয়ে যে জিনিষটি দামী, তার নাম টাকা-পয়সা কিংবা অলঙ্কার নয়; সবচেয়ে দামী- সময়। বুঝতে শেখার পর জীবনের কোনো না কোনো সময়ে একবারের জন্য হলেও বলেছি:

“ভাই, আমার মরার সময়ও নাই”

এমনি ব্যস্ততায় জীবন কাটানোর পর হঠাৎ একদিন টুক করে জীবন ঘড়ি থেমে যায়। কারও জীবন থামে ঘটনাবিহীন, কারও দুর্ঘটনায়।

এসবের সাথে যৌবন, তারুণ্য বেচা-বিক্রির সম্পর্ক কোথায়?

আপনার জীবনে বেচার মতো কি আছে? বিদ্যা, শিক্ষা, কৌশলএগুলো গায়ে মেখে আপনি পেশা বা মননে এগিয়ে যান। এগুলো আপনি চাইলেও বেচতে বা বিলাতে পারেন না। কারণ, এগুলো আপনারও কারও না কারও কাছ থেকে নেয়া। আর বাকিটা বিল্ট ইন।

আপনার বেচার মতো যদি একটা কিছুও থেকে থাকে তা হলো আপনার “সময়”।

তারুণ্য আর যৌবনেই এখনকার মানুষ সময় বেচে দিচ্ছে সবচেয়ে বেশি। কারণ, শৈশবে পরিবারের কড়া নজরে সময়টা সেভাবে বেচার সুযোগ থাকে না। আর বার্ধক্যে? আপনার সময় বিক্রয়যোগ্য থাকে ন। কেউ নিতে চায় না সে সময়!

এবার আসি কিভাবে বিনে টাকায় বিকোচ্ছে লাখো মানুষের কোটি সময়…

বছর বিশেক আগেও মেলাটা তেমন করে জমে পারে নি এ জগতে। তখন একসাথে খাবার খেত পরিবারের সবাই, ব্যস্ততার মাঝেও কেনাকাটায় একত্রে বাইরে যেত, এক টিভিতে পরিবারের সবাই বসে মুভি অব দ্য উইক কিংবা শুক্রবারের সিনেমা দেখতো। সম্পর্কের বন্ধনগুলোও ছিল বেশ মজবুত।

দিন বদলেছে। চলছে “সময় মেলা”। সবাই যার যার ব্যক্তিগত স্টলে বসে বেচেই যাচ্ছি নিজেদের সময়।

কে কিনছে? কত দামে কিনছে? কোন দামেই কিনছে না রে ভাই। স্যাটেলাইট টিভি দিয়ে সময় বেচার শুরুটা। নানান চ্যানেল, নানা অনুষ্ঠান। ভাগ হতে থাকে পরিবারের রুচি। আস্তে আস্তে পরিবারে যায়গা করে নেয় একের অধিক টিভি, আর সামর্থ্য না থাকলে রিমোট দখলের লড়াই। পরিবারের সবাই মিলে শেষ কবে ইত্যাদির মতো একটি অনুষ্ঠান দেখেছেন, মনে পড়ে? এখন আমরা পশ্চিমা কিংবা পাশের দেশের অনুষ্ঠানের কাছে বেচে দিচ্ছি সময়। নিজেদের সময়।

মানুষ আমাকে কেমন করে দেখতে পছন্দ করবে সে হিসেব করতে করতেই বেচে দিচ্ছি সময়। ব্র্যান্ডের কাছে বেচছি, সাজগোজের কাছে বেচছি।

টিভি তো এখন পুরোনো আলাপ। ইন্টারনেট আসার পর এই “সময় বেচার মেলা” জমেছে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার সাথে।

তারুণ্যের স্পর্শের আবেগ বেচে দিচ্ছি ফেসবুক, ভিডিও কল, টিকটক আর টিন্ডারের কাছে। আঠেরো হবার আগে-পরে মস্তিষ্কের উত্তাপ বেচে দিচ্ছি নীলছবির নোংরা দুনিয়ায়।

ক্রিকেট-ফুটবল খেলে শরীরটাকে চাঙ্গা রাখতেন তো আগে? সে সময় কবে বেচা হয়ে গেছে পাবজি আর মোবাইল গেমের কাছে। ফুটবলও এখন স্ক্রিনের সামনে জয়স্টিকে বসে খেলে তরুণরা।

স্ক্রিনে ঢুকতে ঢুকতে এতই বেহাল যে, অনুপ্রেরণা খুঁজতেও দেখতে হয় ইউটিউব। শুনতে হয় লাখ টাকা বেতনের সাফল্যের গল্প। অথচ আমরা বড় হয়েছে যে বাবার কষ্টের উপার্জনে, যে মায়ের সারাদিনের যত্ন-আত্তির আত্মত্যাগে, তারাই হতে পারতো অনুপ্রেরণার উৎস। কিন্তু কিভাবে? অনুপ্রেরণা খুঁজতেও বেচে দিয়েছি সময়।

মানুষ এখন লাইভে গালি দেয়, পোশাক বিক্রি করে, রিভিউ দেয়, আর আমরা হা করে দেখি। সময় বেচে।

এতো গেলো তারুণ্যের সময় বেচার গল্প। আর যৌবন? সেখানেও হানা দিয়েছে এই কালোজাদু। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সময় বেচার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। হিন্দি সিরিয়াল হোক কিংবা মেকওভার, নারীরা সময় বেচে চলেছে অবলীলায়। পরচর্চা, পরনিন্দা, পরশ্রী…. পরের চিন্তায় বেচে দিচ্ছে নিজের বিস্তর সময়। পুরুষেরা কর্মক্ষেত্রে আরও একটু ভালো করার, আরও একটু বেশি রোজগার করার জন্য বেচেই চলছে সময়। তারপর?

বাসায় ফিরে পারিবারিক সময় বেচে দিচ্ছে অন্যের জ্ঞানগর্ভ কথার টকশো কিংবা আইপিএল, বিপিএল এর কাছে।

একটা কথা মাথায় রাখবেন, সময় যখন বিক্রয়যোগ্য এত অমূল্য সম্পদ, সেটা সম্পদের সংজ্ঞা অনুযায়ী সীমিতও বটে। ফুরোচ্ছে আপনার সময়, প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্তে। প্রত্যেকটি জন্মবার্ষিকী আপনার ক্রেডিট কার্ডের লিমিট ফুরোনোর মত "সময়" ফুরোনোর নোটিফিকেশন ছাড়া আর কিছু নয়।

তাই, সময় থাকতে নিজেকে সময় দিন, সময়টাকে ভাগ করে নিন আপন মানুষগুলোর সাথে।

তা না হলে....

বার্ধক্যে আপনার অবিক্রিত সময় কাটবে "বিকৃত" একাকীত্বের সাথে।

লেখক: সিনিয়র সহকারি সচিব, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার