৩০ ডিসেম্বরের পরে ১০ মার্চ, এরপরে কি?

ঢাকা, শুক্রবার, ২২ মার্চ ২০১৯ | ৮ চৈত্র ১৪২৫

৩০ ডিসেম্বরের পরে ১০ মার্চ, এরপরে কি?

এখলাসুর রহমান ৫:৩২ অপরাহ্ণ, মার্চ ১৫, ২০১৯

৩০ ডিসেম্বরের পরে ১০ মার্চ, এরপরে কি?

দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসংসদ নির্বাচনের দাবিতে ছাত্র-ছাত্রীরা আন্দোলন করলো এইতো সেদিন৷ আন্দোলনের ভিত্তিতেই অনুষ্ঠিত হল এবারের ডাকসু নির্বাচন৷

এবার শুরু হল নির্বাচনের ফলাফল বাতিলের আন্দোলন৷ নির্বাচনে ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগে আন্দোলনকারীরাই এবার নামল পুনর্নির্বাচনের দাবিতে৷

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কুয়েত-মৈত্রী হলে বাক্সভর্তি ব্যালট উদ্ধারের খবর বেরোলো পত্রিকায়৷ সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হওয়ার পরই ছাত্রীরা এসব ব্যালট পেপার উদ্ধার করল৷ কুয়েত-মৈত্রী হলে ভোটের আগে খালি ব্যালট বাক্স না দেখানোর কারণে বিক্ষোভের মুখে সকাল ৯টায় ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়। এ হলের ভোটগ্রহণ স্থগিত এবং প্রভোস্টকে বরখাস্তের দাবিতে প্রো-ভিসি অধ্যাপক ড. আব্দুস সামাদ ও প্রক্টর এ কে এম গোলাম রব্বানীকে অবরুদ্ধ করে শিক্ষার্থীরা। এসময় শিক্ষার্থীরা প্রো-ভিসির প্রাইভেটকারটি জাল ভোটের ব্যালট দিয়ে ঢেকে দেয়।

বিক্ষোভকারীরা জানান, সকালে খালি বাক্স দেখাতে বললে- গড়িমসি করায় তাদের সন্দেহ হয়। পরে রিডিং রুম থেকে ছাত্রলীগ প্রার্থীর পক্ষে জাল ভোট দেয়া ব্যালট পেপার উদ্ধার করা হয়। ঘটনাটিকে অনাকাঙ্ক্ষিত উল্লেখ করে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেন প্রোভিসি ও প্রক্টর। একই সঙ্গে সাময়িকভাবে ভোটগ্রহণ স্থগিতেরও ঘোষণা দেন তিনি৷

দীর্ঘ ২৮ বছর ১০ মাস পর বহুল আলোচিত এ ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের প্যানেল ও স্বতন্ত্র অবস্থান থেকে সহসভাপতি (ভিপি) পদে লড়েন ২১ জন শিক্ষার্থী। সাধারণ সম্পাদক (জিএস) পদে প্রার্থী হন ১৪ জন।

নির্বাচনের সেরা চমক হল সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে নুরুল হক নূরের জিতে যাওয়া আর হেরে যাওয়া ছাত্রলীগ সভাপতি রেজওয়ানুল হক চৌধুরী শোভনের। এ নিয়ে শুরু হল চরম বিশৃঙ্খলা৷

নির্বাচিত ভিপি নূরুল হক নূরও পুনর্নির্বাচন চাচ্ছে৷ ছাত্রলীগও পুনর্নির্বাচন চাচ্ছে৷ পুনর্নির্বাচন চাচ্ছে বামপন্থী ছাত্র সংগঠন গুলো? আবার ভিপি নুরুল হক নূরের সঙ্গে দেখা করে ছাত্রলীগ সভাপতি ও ভিপি পদ প্রার্থী শোভন নূরকে অভিনন্দনও জানান৷ নতুন ভিপির সঙ্গে কোলাকুলি করেন ছাত্রলীগ সভাপতি। একই সঙ্গে নেতাকর্মীদেরকেও ভোটের ফল মেনে নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি৷

এদিকে, মনোযোগ ভিন্নখাতে প্রবাহিত করতেই কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা নুরুল হক নূরকে ভিপি পদে নির্বাচিত করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। ডাকসু নির্বাচনের ফলাফল বাতিলের দাবিতে ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে ভোটের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচনের দাবি তোলেন তারা৷ 

ছাত্রদলের ভিপি প্রার্থী মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নির্বাচনের ফলাফল ছিল পূর্বপরিকল্পিত। ১০ মার্চ রাতেই আসলে নির্বাচন হয়ে গেছে। নির্বাচনে সরকারের উচ্চপর্যায় থেকে নির্দেশিত ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে।

অনুরূপ অভিযোগ করেন বিজয়ী ভিপি নূরুল হক নূরও৷ তিনি বলেন, এখানে আগের রাতে ব্যালট ভর্তি করে রাখা হয়েছিল। এটা ছিল নির্বাচনের একটা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়া৷ নির্বাচিত হওয়ার পরও ডাকসু নির্বাচনের সার্বিক ফলাফল বাতিল চেয়েছেন তিনি।

ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ তুলছে অন্যান্য ছাত্র সংগঠন ও কোটা সংস্কার আন্দোলনের সমর্থক ছাত্র-ছাত্রীরা৷ আবার ছাত্রলীগও ভিপি পদে পুনর্নির্বাচনের দাবি তুলছে৷ এ দাবি কেন? ভিপি নূর কি কারচুপি করে জিতেছে? কারচুপি করার মত এমন কি ক্ষমতা তার?

ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী তানহা সুফিয়া কামাল হল থেকে সদস্য পদে প্রগতিশীল ছাত্র ঐক্যের প্যানেল থেকে ৮৪১ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ এনে তিনিও ফল প্রত্যাখ্যান করেন৷

তানহা বলেন, ‘আমার বাবা যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তেন তখন সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল। সেটাও তিন দশক আগে। ক্যাম্পাসে সুস্থ রাজনীতির চর্চা ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনতে এবারের নির্বাচনে অংশ নিয়েছিলাম। কিন্তু পুরো নির্বাচনেই ব্যাপক কারচুপির ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচন কোনোভাবেই সুষ্ঠু হয়নি। আমি জয়ী হলেও ডাকসু নির্বাচনের ফল বাতিল করে পুনরায় ভোটের দাবি জানাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, নির্বাচন যদি সামগ্রিকভাবে অবাধ ও সুষ্ঠু হতো এবং আমি যদি ১০টি ভোট না-ও পেতাম তবুও নিজেকে জয়ী মনে করতাম।

এমন প্রহসনের নির্বাচন তিনি মানেন না বলে জানান। অবিলম্বে ভোটের ফল বাতিল করে পুনরায় তফসিল ঘোষণার দাবি জানান তানহা।

এদিকে পুনর্নির্বাচনের দাবিতে রাজু ভাস্কর্যের পাদদেশে আমরণ অনশন করছেন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী চার প্রার্থী এবং দুজন সাধারণ শিক্ষার্থী।

মঙ্গলবার (১২ মার্চ) সন্ধ্যা ছয়টা থেকে প্রথমে চার প্রার্থী অনশন শুরু করলেও পরে তাদের সঙ্গে আরও দুজন শিক্ষার্থী যোগ দেন।

অনশনকারী চার প্রার্থী হলেন— ডাকসু নির্বাচনে শহীদুল্লাহ হল সংসদের সাহিত্য সম্পাদক পদের প্রার্থী শোয়েব মাহমুদ, মুহসিন হল সংসদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদের প্রার্থী মো. মাঈন উদ্দিন, জগন্নাথ হল সংসদের সদস্য পদের প্রার্থী অনিন্দ্য মণ্ডল এবং কেন্দ্রীয় সংসদের ছাত্র পরিবহন পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী তাওহীদ তানজীম।

এছাড়া, দুজন সাধারণ শিক্ষার্থী হলেন— আল মাহমুদ ত্বাহা ও রাফিয়া তামান্না৷

২৮ বছর পরে অনুষ্ঠিত ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে এই হ-য-ব-র-ল পরিস্থিতি সৃষ্টির দায় কার?

 

ডাকসু নির্বাচনে কুয়েত-মৈত্রী হলে ব্যাপক ভোট কারচুপি ধরা পড়ে৷ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যদি ভোট কারচুপির অভিযোগ ওঠে মানুষ আর ভরসা করবে কাকে? 

অধ্যাপিকা শবনমের বিরুদ্ধে ভোটের আগেই ব্যালট বাক্স ভরার অভিযোগ উঠল৷ এখন আর কাদের উপর ভরসা করবে মানুষ? হয়তো স্কুল কেবিনেট নির্বাচনেও অনুরূপ ঘটনা ঘটবে একদিন৷

জাতীয় নির্বাচন হতে শিখেছে ডাকসু আর ডাকসু হতে শিখবে স্কুল কেবিনেট৷ তাই নয় কি?

প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন সময়ে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে৷ তারাই নেতৃত্ব দিয়েছে ৫২ এর ভাষা আন্দোলনে, ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলনে ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানে, ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধে, ৯০ এর গণআন্দোলনে৷

এই এত এত ইতিবাচক ভূমিকার অধিকারী ছাত্রদের শিক্ষকরা যদি লিপ্ত হয় ভোট ডাকাতিতে এ লজ্জা কার? ডাকসু নির্বাচনকে ঘিরে এমন ভোট ডাকাতির ঘটনা কি গোটা শিক্ষক সমাজকে কলংকিত করলো না? এ নির্বাচনকে নিয়ে সরকার দলের ছাত্র সংগঠনের সভাপতির এক কথা, অন্যদের আরেক কথা৷ পুনর্নির্বাচন হলে ছাত্রলীগের যেসব নেতা জিতেছেন সেটা কি তারা মানবে? শুধু হেরে যাওয়া পদগুলোতে পুনর্নির্বাচনের দাবি কি যৌক্তিক?

হ-য-ব-র-ল ক্ষুব্ধতার মধ্য দিয়ে কি ঘটতে চলেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে?

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি বলছেন, পুনর্নির্বাচন সম্ভব নয়৷ ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কি ভিসি আর ইসি এক হয়ে গেল না? পুনর্নির্বাচন না দিয়ে কি এই ক্ষোভের আগুন নেভাতে পারবেন তিনি? শৃঙ্খলার মধ্যে আনতে পারবেন চলমান বিশৃঙ্খলাকে?

ডাকসুতে ভোট ডাকাতির শিক্ষা কি ৩০ ডিসেম্বরের জাতীয় নির্বাচন হতে পায়নি? বাংলাদেশের সকল নির্বাচনী ব্যবস্থাই আজ শতভাগ আস্থা হারানোর পথে৷ অথচ সরকার দলের নেতারা তা এড়িয়েই যাচ্ছেন৷ তাদের চোখে জয়ের নেশা ছাড়া আর কিছুই নেই যেন৷

তাইতো শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ২৮ বছর পরে হলেও ডাকসু নির্বাচন হওয়ায় আমরা আনন্দিত। আর ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়েই সারা দেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গণতন্ত্রের চর্চা দেখতে পাব।

এমন কথায় হয়তো মানুষ হাসতেও পারবে না, কাঁদতেও পারবে না কেবল ক্ষুব্ধতায় জ্বলতে পারবে৷ তাই নয় কি? এই চেপে থাকার পরিণতি যে খারাপ হতে পারে এমন ভাবনা ভাবারও যেমন সময় নেই কারও৷

জয়ের নেশায় ৩০ ডিসেম্বরের দিন গণতন্ত্রের মূল্যবোধ ভুলে গিয়েছিল আওয়ামী লীগ৷ সেই রীতিই বহাল থাকল ১০ মার্চের উপজেলা নির্বাচন ও ১১ মার্চের ডাকসু নির্বাচনে৷ উপজেলা নির্বাচনে দলীয় প্রতীকের বিপরীতে কোন দলীয় প্রতীক ছিল না৷ অধিকাংশ উপজেলাতেই আওয়ামী লীগের দলীয় প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের নিয়েই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে৷ আওয়ামী লীগ দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীরাও উপজেলা নির্বাচনে অনিয়মের অভিযোগ তুলছেন৷

হয়তো আগামীতে আর তারা নির্বাচনে আসতে চাইবেন না৷ এবারে যেখানে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিল না সেখানে তারা জিতে গেছে বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়৷ ২০ দল, ঐক্যফ্রন্ট, বাম গণতান্ত্রিক জোট ও ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলন নির্বাচন বর্জন করেছে৷

উপজেলা নির্বাচনকে ঘিরে ১৪ দল ও মহাজোটেও জ্বলছে চাপা ক্ষোভের অনল৷ ক্ষুব্ধতায় ফুঁসছে আওয়ামী লীগ দলীয় বিদ্রোহীরাও৷ সামনের নির্বাচনে ১৪ দল শরীক, জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ দলীয় বিদ্রোহী প্রার্থীরাও নির্বাচন বর্জন করলে কী হবে তখন? তখন সবাই বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতে যাবে৷ এমন ফলাফলে কি প্রতিক্রিয়া হবে দেশে-বিদেশে?

১১ মার্চের ডাকসু নির্বাচনের মধ্য দিয়ে প্রাচ্যের অক্সফোর্ড খ্যাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা কি এমন একটি প্রজন্ম গড়ে তুলছেন না? গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে নির্বাসনে পাঠাচ্ছেন না? মানুষের আর ভরসার জায়গা রইল কি?

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক