নাস্তিক রাশেদ খান মেনন! নাস্তিকরা কি হজ করে?

ঢাকা, শুক্রবার, ২৪ মে ২০১৯ | ১০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

নাস্তিক রাশেদ খান মেনন! নাস্তিকরা কি হজ করে?

এখলাসুর রহমান ১০:২১ অপরাহ্ণ, মার্চ ১২, ২০১৯

নাস্তিক রাশেদ খান মেনন! নাস্তিকরা কি হজ করে?

সম্প্রতি জাতীয় সংসদে দেয়া বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের বক্তব্যকে ঘিরে হেফাজতে ইসলাম আন্দোলন শুরু করে দিয়েছে৷

হেফাজতের নেতারা বলছেন, জাতীয় সংসদে কওমী মাদ্রাসাকে বিষফোঁড়া, শায়খুল ইসলাম শাহ আহমদ শফীকে তেতুল হুজুর, ইসলামী অনুশাসনকে মোল্লাতন্ত্র, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে কটূক্তি করে নাস্তিক রাশেদ খান মেনন উস্কানিমূলক, ইসলামবিরোধী ও পরিবেশ বিনষ্টকারী বক্তব্য দিয়েছেন।

এই বক্তব্যের কারণে রাশেদ খান মেননকে আইনের আওতায় এনে শাস্তির দাবি জানিয়েছেন হেফাজতের নেতারা৷

দেশব্যাপী এটাকে ইস্যু করে সংগঠিত হতে চেষ্টা করছে হেফাজত ইসলামী৷

হেফাজতের নেতারা বলছেন, ‘রাশেদ খান মেনন মারা গেলে তার জানাজা পড়া যাবে না। মুসলমানের কবরস্থানে দাফন করা যাবে না।’

জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, ‘যারা কওমি মাদ্রাসার বিরুদ্ধে বলে, কওমি মাদ্রাসাকে বিষবৃক্ষ বলে, তাদের জিহবা এদেশের জনগণ কেটে ফেলবে।

ধর্মের নামে এমন উগ্র কথা বলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির পায়তারা করছে হেফাজত। এর পেছনে বড় কোনো উদ্দেশ্য লুকিয়ে নেই-তো?

হেফাজত একসময় সরকারকে ‘ফেলে’ দিতে ঢাকার মতিঝিলের শাপলা চত্বরে জড়ো হয়েছিল৷ তাদের এই সংগঠিত শক্তিকে ভয় পেয়েই সরকার তাদের সাথে ‘সমঝোতা’ করল! লতিফ সিদ্দিকীকে মন্ত্রিসভা হতে সরিয়ে দিল৷ তাকে দল থেকে বহিষ্কার করল৷ চলে গেল তার সংসদ সদস্য পদটিও৷

তাদের ভয়েই বাংলা একাডেমির মেলায় বিক্রি নিষিদ্ধ হল ইরানী মুসলিম লেখকের বই নবী মুহম্মদের ২৩ বছর৷ গ্রেফতার করা হয় বইটির প্রকাশককে৷

হেফাজতের ভয়ে হাইকোর্ট হতে সরানো হলো ন্যায় বিচারের প্রতীক জাস্টিসিয়ার ভাস্কর্য৷ তাদের ভয়ে পাঠ্যসূচি হতে বাদ গেল হিন্দু কবি কুসুম কুমারী দাশের কবিতা, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের কবিতা৷ বাদ গেল বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতা৷

এই আপসকামিতায় ক্রমশ বেপরোয়া হয়ে উঠছে হেফাজত। জামায়াতসহ বিভিন্ন নামী বেনামী জঙ্গিগোষ্ঠী সম্পৃক্ততায় হেফাজত বেড়ে উঠছে না-তো?

এদিকে, এক রোহিঙ্গা যুবক নিজেকে মুজাহিদ দাবি করে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে হুমকি দিয়ে ভিডিও বার্তা প্রচার করছে৷

সাম্প্রদায়িক জঙ্গিগোষ্ঠীকে প্রশ্রয় দেয়া যে আত্মঘাতী তার লক্ষণ এখন পাকিস্তানেও দেখা যাচ্ছে৷ দেশটি ১৮২টি মাদ্রাসা বাজেয়াপ্তসহ নিষিদ্ধ ঘোষিত দলগুলোর ১শ’রও বেশি জনকে আটক করার কথা ঘোষণা করেছে।

কয়েকবছরের মধ্যে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে এটিই ছিল পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় পদক্ষেপ। তাছাড়া, যেসব ইসলামিক জনকল্যাণ সংগঠন জঙ্গি তৎপরতার সম্মুখভাগে আছে বলে যুক্তরাষ্ট্র চিহ্নিত করেছে সেগুলোকেও টার্গেট করার প্রস্তুতি নিচ্ছে পাকিস্তান।

কাশ্মীরের পুলওয়ামায় ১৪ ফেব্রুয়ারির জঙ্গি হামলায় অন্তত ৪০ ভারতীয় জওয়ান নিহত হওয়ার পর থেকে জঙ্গিগোষ্ঠী জৈশ-ই-মোহম্মদসহ ভারতে হামলা চালানো জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশ্বের শক্তিধর দেশগুলোর চাপের মুখে আছে পাকিস্তান।

মাদ্রাসা বাজেয়াপ্ত করার ব্যাপারে পাক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে বলেছে, প্রাদেশিক সরকারগুলো ১৮২টি মাদ্রাসার ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাগুলো ১২১ জনকে ইতোমধ্যে আটক করেছে। তবে এ সমস্ত পদক্ষেপ ভারতের ক্ষোভের মুখে নেওয়া হয়নি বরং দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার আওতায়ই নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।

পাকিস্তান সরকার ইতোপূর্বে জঙ্গি নেতা ও তাদের প্রতিষ্ঠানের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্ত করেছে। মুম্বাই হামলার হোতা হাফিজ সইদের সংগঠন জামাত-উদ-দাওয়া ও শাখা সংগঠন ফালাহ-এ-ইনসানিয়াতের কিছু সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

তাছাড়া বেশ কিছু জইশ জঙ্গিকে গ্রেফতারও করেছে পাকিস্তান। পাকিস্তানকে জঙ্গি পুষে এখন জঙ্গি উৎখাতেই যেতে হল৷

বাংলাদেশেও কি সেরকম ঘটতে পারে না? হেফাজত বিচার দাবি করছে রাশেদ খান মেননের, বিচার দাবি করছে শাহরিয়ার কবিরের৷ কথায় কথায় নাস্তিক মুরতাদ ঘোষণা দিয়ে ধর্মের নামে ক্ষেপিয়ে তুলছে মাদ্রাসার কোমলমতি ছাত্রদের৷ 

প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে আশ্রয় দেয়ার কারণে যাকে মাদার অব হিউম্যানিটি বলছেন সারাবিশ্বের মানুষ, সেই মানবতার প্রতীককে হত্যার হুমকি দিয়ে ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেছে এক রোহিঙ্গা।

দামি জামা কাপড় ও অলঙ্কারে শোভিত অবস্থায় একটি গাড়িতে বসে সেই রোহিঙ্গা যুবক প্রধানমন্ত্রীকে আরাকানি ভাষায় ‘পরিণতি খারাপ হবে’ বলে হুমকি দিয়েছে। একই সাথে বাংলাদেশের যত উঁচু দালানকোঠা স্থাপনা আছে, সবই ধ্বংস করে মাটির সাথে মিশিয়ে দেবে বলে জানায় এই যুবক।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের চেষ্টা করে যাচ্ছেন, পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বিভিন্ন দেশের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন- যার ফলে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ থেকে দ্রুত চলে যেতে হতে পারে- এটাই মূলত তাদের মাথা ব্যথার কারণ, যা যুবকের বক্তব্যে স্পষ্ট।

ভিডিও বার্তায় রোহিঙ্গা যুবক বলেছে- তাদেরকে (রোহিঙ্গাদেরকে) যেন মজবুর (বাধ্য) করা না হয়। তারা মিয়ানমারের বৌদ্ধ অধিবাসীদের বিরুদ্ধে সংগঠিত হচ্ছে এখানে থেকে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে চায় রোহিঙ্গারা। তার কথায় আরসা (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) এবং আরএসও (রোহিঙ্গা সলিডারিটি অর্গানাইজেশন) নামক জঙ্গি সংগঠনগুলোর বক্তব্য এবং অভিপ্রায় প্রতিফলিত হচ্ছে। সংগঠনগুলোর সাথে আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএস এবং আল-কায়দার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পুরনো। তারা আরাকান অঞ্চলকে ভিন্ন ধর্মরাষ্ট্র হিসেবে গড়ার প্রত্যয়ে কাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। যদিও এই সংগ্রামকে তারা হকের লড়াই (অধিকার আদায়ের যুদ্ধ) হিসেবে অভিহিত করে। হুমকিকিদাতা যুবক, যার পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়নি এখনও, সে এদেশের মুসলমান সম্প্রদায়কে তাদের প্রতি সহনশীল হওয়ারও আহ্বান জানিয়ে তার ভিডিওতে জানায়, মুসলমান হয়ে যেন তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান না নেয়, তাতে পরিণতি ভালো হবে না।

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরী বলেন, হেফাজত নিয়ে খেলা খেলবেন না, যদি হেফাজত ইসলামকে নিয়ে খেলা করেন, তবে আমরাও কঠিন খেলা খেলব।

শুক্রবার (৮ মার্চ) জুমার নামাজের পর বায়তুল মোকাররমে বিক্ষোভ মিছিল শুরুর সময় এমন হুমকি দেন তিনি৷

মসজিদ ইবাদতের জায়গা, শান্তির জায়গা৷ অথচ এখানেও লাঠালাঠি, বিভক্তি৷ এই বায়তুল মোকাররমেই চরমোনাইয়ের পীর ও দেওয়ান বাগীর পীরের অনুসারীদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে৷ এক মুসলমান রক্ত ঝরিয়েছে আরেক মুসলমানের৷ বিভক্ত হয়ে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে তবলিগ জামাতেও৷

এগুলো কীসের আলামত? রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগ করতে বললে মুসলমানিত্বের দাবি তুলে দেশে নৈরাজ্য সৃষ্টি করে রোহিঙ্গাদের ক্ষেপিয়ে দেয়ার পাঁয়তারা করছে না যে কেউ তার কি নিশ্চয়তা আছে? রোহিঙ্গা যুবকের ভিডিও বার্তায় কি সে ইঙ্গিত স্পষ্ট হয় না? ধর্মের নামে মসজিদ কেন্দ্রিক এসব দলাদলি ও সংঘাত সৃষ্টির অপকর্ম বন্ধ হবে কবে? যে খানে ধর্মপ্রাণ মানুষগুলোর নিমগ্ন চিত্তে স্রষ্টাকে স্মরণ করার কথা৷ সে মসজিদ এখন পরিণত হয়েছে সভা-সমাবেশ ও সংঘর্ষের উস্কানি সৃষ্টির মাধ্যম। বাইতুল মোকাররম মসজিদ এই ধর্মাশ্রয়ী বিভাজন বাদীদের হাত থেকে কবে মুক্তি পাবে? এইতো সেদিন তারা রাজাকারদের বাঁচাতে ও সরকারকে ফেলে দিতে শাপলাচত্বরে লক্ষ মানুষকে বিভ্রান্ত করে ধর্মের নামে পথে নামিয়েছিল৷ এখন সেই তারাই সরকারের সুহৃদ হবে এমন ভাবনা কি অবান্তর নয়?

রাশেদ খান মেনন কী বলেছেন? তিনি কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতিকে অভিনন্দন জানিয়েছেন৷ তিনি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র নির্মাণে সাম্প্রদায়িক বিস্তৃতির আশংকা করছেন৷ সাম্প্রদায়িক শক্তির চাপে কুসুম কুমারী দাশ, দ্বিজেন্দ্র লাল রায় ও রবীন্দ্র নাথের কবিতা বাদ দেয়ার সমালোচনা করেছেন৷

তিনি আশংকা প্রকাশ করছেন হয়তো নজরুলের লেখা, সজীব করিব মহাশশ্মানকে একদিন পড়তে হবে সজীব করিব গোরস্থান৷ এতে কোথায় ধর্মানুভূতিতে আঘাত হল? আর কোথায় নজরুলকে কটূক্তি করা হল? তিনি নাস্তিক হন কিভাবে? নাস্তিকরা কি নামাজ পড়ে ও হজে যায়? রাশেদ খান মেনন যে হজ করে এসেছেন৷ এই হজের কী ব্যাখ্যা দেবেন তারা?

হেফাজত এ ব্যাপারে কিছু বলবেন কি? কওমী মাদ্রাসার স্বীকৃতি দিয়েছে সরকার কিন্তু এগুলোর ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ কি সরকারের হাতে আছে? এসব মাদ্রাসায় কি জাতীয় সঙ্গীত পড়ানো হয়? জাতীয় দিবসগুলো পালিত হয়? নাকি পাকিস্তানের মাদ্রাসাগুলো যেভাবে বেড়ে উঠল বাংলাদেশেও সেরকম পরিণতিরই অপেক্ষা?

রাশেদ খান মেননের বক্তব্যে সেরকম বিষবৃক্ষের আশংকাকেই তুলে ধরেছেন, তিনি কওমী শিক্ষাকে বিষবৃক্ষ বলেননি৷ তবে হেফাজত এখন কোন কঠিন খেলা খেলতে চাইছেন? বাবু নগরীর কথাতে-তো সেই কঠিন খেলার দিকটাই ফুটে উঠল৷ তাই নয় কি?

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।