চিকিৎসার জন্য ভিভিআইপিদের বিদেশযাত্রার ব্যর্থতা কার?

ঢাকা, শনিবার, ২৩ মার্চ ২০১৯ | ৯ চৈত্র ১৪২৫

চিকিৎসার জন্য ভিভিআইপিদের বিদেশযাত্রার ব্যর্থতা কার?

এখলাসুর রহমান ৪:৪৩ অপরাহ্ণ, মার্চ ০৭, ২০১৯

চিকিৎসার জন্য ভিভিআইপিদের বিদেশযাত্রার ব্যর্থতা কার?

বাংলাদেশের চিকিৎসার মানকে বিশ্বমানে নিয়ে যাওয়ার দাবিতে প্রধানমন্ত্রী বরাবরে খোলা চিঠি দিয়েছেন ময়মনসিংহের আওয়ামী লীগ নেত্রী নাজনীন আলম৷ সোশ্যাল মিডিয়ায় দেয়া তার স্ট্যাটাসটি বিভিন্ন পত্রিকার শিরোণাম হয়ে বেশ আলেচিত হয়ে উঠছে৷

তিনি লিখেছেন,

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী,

একটি বিশ্বমানের হাসপাতাল চাই। ১৮ কোটি মানুষ আপনার দিকে তাকিয়ে আছে। যেখানে সর্বোচ্চ চিকিৎসাসেবার সুযোগসহ দেশি-বিদেশি বিশ্বমানের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকবে, দেশের গরিব মানুষ কম খরচে জটিল রোগের চিকিৎসা নিতে পারবে। সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা ভারতে আর যেন যেতে না হয়। বিদেশ থেকেও যেন রোগীরা আসেন চিকিৎসা নিতে। এমনটা কি কোনো দিন সম্ভব হবে না।

আমাদের দেশ অনেক এগিয়েছে। বিদেশ নির্ভরতাও কমেছে। ওষুধ উৎপাদনে কিন্তু আমরা যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছি। আপনার হাত ধরে পদ্মা সেতুসহ অনেক সফলতাই তো এসেছে। তাহলে চিকিৎসা ক্ষেত্রে বিদেশ নির্ভরতাকে কি কমানো যায় না?

এটা খুবই যৌক্তিক ও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন৷ মানুষের অন্যতম পাঁচটি মৌলিক চাহিদার মধ্যে একটি হলো চিকিৎসা৷ এখন কথা উঠছে এত ঝুঁকি নিয়ে পদ্মাসেতু নির্মাণ করতে পারলে একটি বিশ্বমানের হাসপাতাল নির্মাণের ঝুঁকি কেন নয়?

কিছুদিন পরপর বাংলাদেশ হতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাধরদের চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাওয়া ঘটনা ঘটছে৷ বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি,মন্ত্রিপরিষদের সদস্য এমনকি খোদ স্বাস্থ্যমন্ত্রীকেও চিকিৎসা নিতে বিদেশ যেতে দেখা যায়৷ আরো দেখা যায় বাংলাদেশের সরকারি তহবিল হতে সাহায্য নিয়ে সে টাকা বিদেশের হাসপাতালে খরচ করতে৷

সম্প্রতি সরকারি তহবিল হতে টাকা নিয়ে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন চলচ্চিত্রকার আমজাদ হোসেন৷ সেখানে তার ১৮ দিনের ব্যয় ছিল ৩২ লাখ টাকা৷ আমজাদ হোসেনের ব্রেইন ডেথ ছিল ৬ দিন৷ সে ৬ দিনে আইসিউতে তার ব্যয় ছিল ১১ লাখ টাকা৷ এভাবে বিদেশের নানা হাসপাতালে কোটি কোটি টাকা চলে যাচ্ছে৷ যেসব রোগে ভিভিআইপিরা বিদেশ যাচ্ছে উন্নত চিকিৎসার জন্য সেসব রোগ কি এদেশের সাধারণ মানুষদের হচ্ছে না? তাদের কি উন্নত চিকিৎসার অধিকার নেই? শুধুই কি রয়েছে মরার অধিকার? প্রশ্নটা ভিভিআইপিদের উদ্দেশেই রইলো৷

এ বিষয়ে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী ড.মাহাথির মুহাম্মদ বলেছেন, কোনো দেশের রাষ্ট্রপতি যদি অন্য দেশে চিকিৎসা নিতে যায় এর অর্থই হলো তার নিজ দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থা একদমই ভালো না৷ এটা তার ব্যর্থতা৷ আমি নিজে বিদেশে গিয়ে চিকিৎসা করাতে পারলেও আমার জনগণেরতো সে সামর্থ্য নেই৷ কিন্তু বাংলাদেশের ভিভিআইপিদের মাঝে কি এ প্রশ্ন জাগে? তবে নারীনেত্রী নাজনীন আলমের মনে প্রশ্ন জেগেছে, আমাদের দেশের মানুষকে চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড বা ভারতে আর যেন যেতে না হয়। বিদেশ থেকে যেন রোগীরা আসেন বাংলাদেশে চিকিৎসা নিতে। এদেশে এমনটা কী কোনো দিন সম্ভব হবে না?

কে বিদেশ যেতে পারে, কে বিদেশ যেতে পারে না এ নিয়েও বাহাস শুরু হয়ে গেছে৷ তিনবারের প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসী নন৷ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক চিকিৎসার জন্য বিদেশ যেতে পারলে তিনি কেন যেতে পারবেন না? এমন প্রশ্ন তুলছেন বিএনপি নেতারা৷ ভিভিআইপিরা দেশীয় চিকিৎসাকে অবজ্ঞা করে বিদেশ নির্ভরতা প্রকাশ করতে যেন লজ্জার মাথা খেয়ে বসেছেন৷ 

শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি বলেন, সেতুমন্ত্রী অসুস্থ হয়েছেন তাই তাকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। সাধারণ মানুষ যেভাবে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যায় সেভাবেই পাঠানো হয়েছে। খালেদা জিয়া অপরাধের দায়ে একজন দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি। খালেদার চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাওয়া একই বিষয় নয়। তাই তাকে বিদেশে পাঠানো যাচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, খালেদা জিয়ার যে অসুস্থতা, সেই অসুস্থতার ভালো চিকিৎসা যদি দেশে না হতো, তাহলে আদালতের নির্দেশেই তাকে বিদেশে নিয়ে চিকিৎসা করানো হতো।

ওবায়দুল কাদেরকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানো হলেও কারাবন্দি খালেদা জিয়াকে কেন পাঠানো হচ্ছে না? এমন  প্রশ্নে আওয়ামী লীগ নেতা মাহবুবুল আলম হানিফ বলেন, খালেদা জিয়া জেলখানার কয়েদি। ওবায়দুল কাদের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। একজন মুক্তিযোদ্ধা আর জেলখানার কয়েদির চিকিৎসা এক হতে পারে না৷

অন্যদিকে বিএনপি নেতা খন্দকার মোশাররফ বলেন, আজকে সরকারের একজন মন্ত্রীকে বিদেশে উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয় অথচ তিনবারের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ন্যূনতম চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে না।

তিনি আরো বলেন, এমন উদাহরণ আছে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী যখন জেলে ছিলেন, তখন চিকিৎসার জন্য প্যারোলে মুক্তি পেয়ে বিদেশে গেছেন। অবস্থাদৃষ্টে এটা পরিষ্কার যে, সরকার দল ও বিরোধী দল কেউই আর দেশের চিকিৎসার প্রতি আস্থাশীল নন৷

ডা. দিপু মনি বললেন, সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য যেভাবে বিদেশে যায় ওবায়দুল কাদেরও সেভাবে গেছেন? এ পর্যন্ত কয়জন সাধারণ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে গেছেন? তাদের কি সে সামর্থ্য আছে?

ওবায়দুল কাদেরকে বিদেশে পাঠানো হবে এ সিদ্ধান্ত এ দেশীয় হাসপাতাল দিতে পারলো না৷ ভারতের ডা.দেবী শেঠিকে এসে এ সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করতে হলো৷ এতে কি এদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার চরম দৈন্যতা ও ব্যর্থতা ফুটে ওঠেনি? এতে কি বাংলাদেশের সকল হাসপাতাল, সকল চিকিৎসক ও স্বাস্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যর্থতার দিক ফুটে উঠলো না?

উপজেলা হাসপাতালে রোগীর চিকিৎসা সম্ভব না হলে তারা জেলাতে পাঠায়৷ জেলাতে সম্ভব না হলে বিভাগীয় শহরের হাসপাতালে পাঠায়৷ আর সেখানে সম্ভব না হলে রাজধানীতে পাঠায়৷ এক্ষেত্রে সিদ্ধান্তটা সংশ্লিষ্ট হাসপাতালকেই নিতে দেখা যায়৷ সাধারণ রোগীদের বেলায় যুগযুগ ধরে এমন রীতিই চলে আসছে৷

ওবায়দুল কাদের সুস্থ হয়ে উঠুন এ প্রত্যাশা করি৷ সেই সাথে বাস্তবতার খাতিরে বলতেই হয় তিনি সাধারণ রোগী হিসেবে বিদেশ যাননি৷ গিয়েছেন অসাধারণ হিসেবে, মন্ত্রী ও সরকার দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে৷ সাধারণ রোগীর জন্য ভারতের দেবী শেঠি আসতেন না৷ এরকম অবস্থায় তাদের মৃত্যু অবধারিত ছিল৷ রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ কিছুদিন পরপর শরীর চেকআপ করানোর জন্য বিদেশ যান৷ স্বাস্থ্যমন্ত্রীরাও যান৷ সবাই নিজের দিকটাই ভাবছেন আমজনতার কথা ভাবছেন না কেউ৷ ভাবলে বাংলাদেশে স্বাস্থসেবা মানে ও গুণে অবশ্যই সমৃদ্ধ হতো৷

লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক