‘কবর-ফ্ল্যাটের’ দাম সাড়ে তিন লাখ

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৫ এপ্রিল ২০১৯ | ১১ বৈশাখ ১৪২৬

‘কবর-ফ্ল্যাটের’ দাম সাড়ে তিন লাখ

আশেক মাহমুদ ৯:২৪ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯

‘কবর-ফ্ল্যাটের’ দাম সাড়ে তিন লাখ

‘এইখানে তোর দাদীর কবর ডালিম গাছের তলে, তিরিশ বছর ভিজায়ে রেখেছি দুই নয়নের জলে।’ কবি জসিমউদদ্ীনের এই কবিতায় কবরকে ঘিরে বাংলার পল্লীগ্রামের মানুষের যে আবেগ ফুটে উঠেছে, তা আজ আবাসন ব্যবসার দাপটে ক্ষয়িষ্ণু হতে চলেছে। বিষয়টি স্পষ্ট করে তুলেছে রিহ্যাব মেলার ৩১নং স্টলের ‘পূর্বাচল রাওজাতুল জান্নাত’ প্রকল্পের বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান এমআইএস হোল্ডিংস।

প্রকল্পটি জান্নাতের কোনো প্রকল্প নয়। এটি কবর বিক্রির প্রকল্প। বেসরকারি আবাসন কোম্পানি এখন আর শুধু মানুষের স্বচ্ছন্দে বসবাসের স্বপ্নের ঠিকানাই দিচ্ছে না, এটি দেখিয়ে দিচ্ছে আরেকটি নতুন স্বপ্ন। সামর্থ্যবানদের বলে দিচ্ছে, শুধু ভালোভাবে বাঁচলেই কি হবে? ভালোভাবে তো মরতেও হবে! সেই চিন্তা থেকেই পূর্বাচলে ২০০ বিঘা জমির ওপর ৮ হাজার কবরের প্রকল্প হাতে নেয় কোম্পানিটি। 
এখানে ৭ ফুট দৈর্ঘ্য এবং সাড়ে ৩ ফুট প্রস্থের (২৪ দশমিক ৫ বর্গফুট) জমির মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৩০ হাজার টাকা, সঙ্গে সার্ভিস চার্জ ১৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে ৩ লাখ ৪৫ হাজার টাকায় পাওয়া যাবে একটি কবর। কেউ কেউ খবরটি শুনে হাসাহাসি করলেও, কবর কেনার স্টলটিতে দীর্ঘ লাইন দেখে কোম্পানিটি নিজেই অবাক। কোম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক খুশিতে বলেই ফেললেন, ‘রিহ্যাব মেলায় এত বেশি সাড়া পেয়েছি যা কল্পনারও বাইরে।’

তা হলে আমরা বুঝতেই পারছি, পুঁজিবাদী আবাসন প্রকল্প শুধু মানুষের জীবন নিয়েই ব্যবসা করছে না। মানুষের মরণ নিয়েও যে বড় আকারে মুনাফা আসতে পারে, তাও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে। এত দিন আবাসন কোম্পানিগুলো গ্রাহকদের আকর্ষণ করতে বিজ্ঞাপনে প্রচার করত এই বলে, ‘নিজের একটি বাড়ি হবে, এমন স্বপ্ন কার না থাকে? ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পরিকল্পিত আবাসন গড়াই আমাদের স্বপ্ন।’ সেই স্বপ্নপূরণের দিকে যখন মানুষের ছুটোছুটি বেড়ে গেছে, তখনই আবাসন প্রকল্প আমাদের সামনে নতুন আর একটি স্বপ্ন এনে হাজির করল। 

স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে বাঁচার পর স্বাচ্ছন্দ্যের মধ্যে মৃত্যুর স্বপ্ন। মানুষের মৃত্যুকে কেন্দ্র হয়ে যখন জীবন বীমার ব্যবসা সারা বিশ্বে বিস্তৃত হয়েছে, তখন ‘কবর-ফ্ল্যাট’ বিক্রির নতুন উদ্যোগ পুঁজিবাদীদের পুঁজি বিনিয়োগ ও মুনাফা লাভের পরিসরকে দিল নতুন রূপ।

কবর নামক ফ্ল্যাট কেনার প্রতি মানুষের ঝোঁক দেখে বোঝা যায়, তারা বেঁচে থাকার মধ্যে যেমন স্ট্যাটাস খুঁজে, মৃত্যুর পরও তারা চায় একটা স্ট্যাটাসওয়ালা কবর। বুদ্ধিজীবী কবরস্থান, আজিমপুর কবরস্থান, সামরিক কবরস্থান-এগুলোর মধ্যে একটা আলাদা ভিন্নমাত্রার সম্মান আছে, এটা সবাই জানে। কিন্তু যাদের হাতে টাকা আছে তারা সবাই তো এখানে কবর লাভের সুযোগ পাবে না। আগে তাদের নিজ গ্রামে কবরস্থ করার একটা রেওয়াজ ছিল। তা ছাড়া গ্রামের মানুষের সঙ্গে শহুরে মানুষদের বন্ধন আগের চেয়ে অনেক কমে গেলেও অন্তত মৃত্যুর পর সেই মানুষদের কবরস্থ করতে নিজের গ্রামে নিয়ে আসা হতো। 

ফলে নাড়ির সঙ্গে যে বন্ধন, তা অন্তত গ্রামে কবরস্থ করার মধ্য দিয়ে রক্ষা করা হতো। কিন্তু যেভাবে কবরের জমি বিক্রির উদ্যোগ নিচ্ছে আবাসন কোম্পানি, আর এদিকে মানুষের ঝোঁক যেভাবে বাড়ছে, তাতে মনে হচ্ছে, এর ফলে সচ্ছলদের কাছে কবর যতটা না শোক আর পরকাল স্মরণের প্রতীক, তার চেয়ে বেশি ইহকালীন মর্যাদার প্রতীক হয়ে থাকবে।

যেমন, যারা ভাড়া বাসায় থাকে তাদের সামাজিকভাবে কম মর্যাদার চোখে দেখা হয়। পুঁজিবাদী জমানায় তাদেরই সম্মান বেশি ধরা হয়, যাদের নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে।

একসময় এমনও দেখা যাবে, যাদের কবরস্থ করা হয়েছে ‘পূর্বাচল জান্নাত’ কবরস্থানে অথবা হবু কবরস্থান ‘প্যারাডাইজ গ্রেইভ হাউজ’ বা ‘হ্যাপি লাইফ জান্নাত’-এর কবরস্থানে, যারা ৪ লাখ বা ৫ লাখ টাকায় কিনে নিল ‘কবর’ নামক ফ্ল্যাট, তাদের দেখা হবে উঁচু মর্যাদায়। কেউ মারা গেলে তার পরিবারের সদস্যরা হয়তো বলবে, ‘জানেন, আমার স্বামীকে (বা বাবাকে) আল্লাহর রহমতে হ্যাপি লাইফ জান্নাত-এ কবর দিয়ে শান্তি পেলাম। তার তো একটা ঠিকানা হলো।’ এ কালচার যত বিস্তার পাবে, কবর-ফ্ল্যাট ব্যবসা হবে ততই জমজমাট। 

এমনকি টাকার সংকট হলে কিস্তিতে কবর লোনের অফারও আসতে পারে। এতে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না। তখন টিভিতে, পত্রিকায়, ফেসবুকে বিজ্ঞাপন হবে এ রকম-‘নিজের একটি শেষ ঠিকানা হবে, এ আশা কার না থাকে। আপনার ইচ্ছাকে সত্যি করতে কবর লোন দিচ্ছে অভাবনীয় অফার। আপনার ইচ্ছা পূরণ করতে টাকা কেন বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আর তাই ‘ইটারনাল ব্যাঙ্ক’ আছে আপনার পাশে।’

আমরা এমন এক আর্থসামাজিক বাস্তবতায় এসে দাঁড়িয়েছি, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক আর খেটে-খাওয়া মানুষদের পাশে কেউ নেই। যেখানে লাখ-কোটি প্রাতিষ্ঠানিক ও ভাসমান শ্রমিকদের বাঁচতে হয় বস্তির মতো অবাঞ্ছিত বাসস্থানে, যেখানে অধিকাংশ মানুষ বেঁচে থাকার সংগ্রাম করে চলছে, মেনে চলছে কর্তাদের শোষণ আর বঞ্চনা, সেখানে ‘কবর’ নামক ফ্ল্যাটের ব্যবসা পুঁজিবাদকে হাস্যকর ও লজ্জাকর রূপে তুলে ধরছে। পাল্টে যাচ্ছে মানুষের রুচিবোধ আর সংস্কৃতি। ‘মসজিদেরই পাশে আমায় কবর দিও ভাই’ গানে কবি নজরুলের যে চিন্তাধারার প্রকাশ ঘটেছিল, আজ পুঁজির পীড়নে তা হারাতে চলছে।

কবর-ফ্ল্যাটের প্রকল্প এভাবে যদি চলতে থাকে, তা হলে অদূর ভবিষ্যতে গ্রামের প্রতি মানুষের ঝোঁক আরও কমতেই থাকবে। তার চেয়ে বড় কথা, মানুষের মূল্যবোধ যখন আবাসন কোম্পানির হাতে যদি জিম্মি হয়ে পড়ে, তখন সামাজিক সম্পর্কের মধ্যে সুষম ভারসাম্য হারিয়ে যাবে। 
কবর-ফ্ল্যাটের বিস্তারে মুনাফা আর নকল মর্যাদার যে সামাজিক চর্চা হবে, তার পরিণতি ‘লাল সালু’র নকল মাজার কালচারের চেয়ে আরও বেশি ভয়াবহ হবে, একথা নিশ্চিত করে বলা যায়। কোম্পানিগুলো অবশ্যই ব্যবসা করবে। কিন্তু সবকিছু নিয়ে, সব মূল্যবোধ নিয়েই কি ব্যবসা করা যায়?

আশেক মাহমুদ : সহকারী অধ্যাপক, সমাজ বিজ্ঞান বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।
Email: [email protected]

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।