আমি তাঁর চোখেই দেখি বাংলাদেশ! কেন?

ঢাকা, বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ৮ ফাল্গুন ১৪২৫

আমি তাঁর চোখেই দেখি বাংলাদেশ! কেন?

রাফে সাদনান আদেল ৪:৪০ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ১১, ২০১৯

আমি তাঁর চোখেই দেখি বাংলাদেশ! কেন?

আসুন, আজ থেকে না হয় আমরা শুধুই বাংলাদেশের দালালি করি। আপনি বাংলাদেশকে দেখতে পান? প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে আমি এই মাটিতে এসেছি। আমার দেখা হয়নি আমার উত্তরসূরীর দেশের জন্য রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ, আমার দেখা হয়নি একাত্তরের নয় মাসের বীরত্বপূর্ণ যুদ্ধ আর অনেক আত্মত্যাগ শেষে বিজয় উল্লাস! আমি দেখেছি স্বৈরশাসকের কাছ থেকে গণতন্ত্রের পথে আমার দেশ!

আমি দেখেছি কিভাবে পাশ্চাত্যের কাছে ভিক্ষা চেয়ে আর মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিক পাঠিয়ে আমার দেশ এগিয়ে যাবার চেষ্টা করেছে ধীর গতিতে। আমার সৌভাগ্য আমি দেখেছি ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে আমার দেশ এখন এশিয়ার যাদুকরি অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আর প্রবৃদ্ধিতে একে একে সবাইকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাচ্ছে দুর্দমনীয় গতিতে।

একবার ভাবুন তো! যেই মানুষটি স্বাধীকারের ডাক দিলেন, হুম, আমি বঙ্গবন্ধুর কথা বলছি, তার নেতৃত্বে তার নেতারা পরিচালনা করলেন স্বাধীকারের আন্দোলন তো বটেই একেবারে সম্মুখ সমর, হুম আমি জাতীয় চার নেতার কথা বলছি! তারা আজ কোথায়! তাদেরকে কী নৃশংসভাবে মরে যেতে হয়েছে তাদের স্বপ্নের দেশের বিপথগামী বেঈমান গুটিকয়েক ঘাতকদের হাতে! শেষ মূহুর্তে তাদের চোখে কী ঘৃণা জমতে পারতো! কিন্তু তারা হাসিমুখেই চলে গেছেন! হয়ত মনে মনে বলেছিলেন, ‘আহারে আমার অবুঝ সন্তানেরা, তোদের মানুষ চেনায় কতো ভুল!’

তারা বেঁচে থাকলে হয়ত আজকের এই সমৃদ্ধি আমি জন্মেই পেতে পারতাম‍! অন্তত চার দশক পেছনে নিয়ে গিয়েছিল বেঈমানদের এই দুষ্কর্ম। স্বাধীন দেশে আবারো স্বাধীনতা বিরোধীরা দাঁত কেলিয়ে হেসেছে, আমার প্রাণের লাল-সবুজ পতাকা নিয়ে করেছে কতো উপহাস! মুক্তিযোদ্ধারা লজ্জায় ঘৃণায় মাথা নিঁচু করে অনেকেই চলে গেছেন আমাদের ছেড়ে সেই একই দীর্ঘশ্বাস নিয়ে!

আর আমরা যারা নতুন প্রজন্মের, তাদের মেলেনি হিসেব! আমরা দেখেছি ইতিহাসকে বিকৃত করার কতো শত কৌশল! আমরা দেখেছি শুধুমাত্র ব্যক্তিস্বার্থে প্রতিহিংসার রাজনীতি। আমরা দেখিছি স্বাধীন দেশেও নিজেদের মধ্যে কতো হানাহানি! মাসের পর মাস অযৌক্তিক কারণে দেশের অর্থনীতির অবনমনকে তুচ্ছ জ্ঞান করে কতো শত ক্ষমতা হাসিলের রাজনীতি।

এতো কিছুর পর কিভাবে এই দেশটিই আবার ২০২১ সালেই হচ্ছে মধ্যম আয়ের দেশ! ২০৪১ সালে উন্নত দেশের কাতারে যাওয়া আজ সময়ের ব্যাপার মাত্র! কিভাবে? একটি বারো নিজেকে প্রশ্ন করেছেন?

একটি মানুষ! একটি ভোর! ছোট্ট বোনটি ছাড়া আর কেউই রইল না তার আপন বলে! সেই মানুষটির ট্রমার কথা কেউ ভেবেছেন কখনো! টেলিভিশনের পর্দায় যখন দেখছেন নিজের বাবা, মা এমনকি ছোট্ট ভাইটিকেও রক্তাত্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে! একবার ভাবুন তো তাদের মনের অবস্থা কী ছিল! সর্বস্ব হারিয়েও নিজেকে শক্ত করেছেন। আগলে রেখেছেন বোনটিকে। আগলে রেখেছেন বাবার স্বপ্নগুলোকে বুকের গহীনে। জীবন বাজি রেখে আবারো ফিরেছেন নিজভূমে!

বাবার মতো দুই দিন পর পর হত্যা চেষ্টা হয়েছে তার উপর। সুযোগ পেলেই শাসকরা রাজনৈতিক মামলায় হেনস্থা করছেন, জেলে যাচ্ছেন যখন তখন! উনিও তো একজন মানুষ তারও তো ধৈর্য্যের সীমা আছে! এই আমরা তরুণ সমাজ, প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে যাদের জন্ম। একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলায় বেঁচে যাওয়ার পর তিনি তার রাজনৈতিক একাগ্রতা আরো বেড়ে গেল! জাতির জনকের কন্যা তিনি, বাবার স্বপ্ন পূরণে উঠে পড়ে লাগলেন তিনি।

আশ্চর্যজনকভাবে যারা একাত্তরের ভয়াবহতা দেখেন নি সেই প্রজন্ম কখনোই তার পাশ ছাড়েনি। কতো মগজ ধোলাই এর চেষ্টাই না হয়েছে এই প্রজন্মের উপর দিয়ে। কিন্তু কখনো পরিবর্তনের শ্লোগানে, কখনো ডিজিটাল বাংলাদেশ আবার কখনো সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রার শ্লোগানে এই তরুণ প্রজন্মই বারবার তার পাশে এসে দাড়িয়েছে, থেকেছে ছায়াসঙ্গীর মতো। তরুণ প্রজন্ম জ্বলে উঠেছে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে এই মাটিতেই, জাতির পিতা, জাতীয় চার নেতার হত্যার বিচার হয়েছে এই মাটিতেই; ইতিহাসের কলঙ্কিত অধ্যায়ের ঋণ খানিকটা হলেও শোধ করতে সবসময় শেখ হাসিনার পাশে ছিল এই তরুণ প্রজন্ম।

আর সেকারণেই তিনি এবার ডাক দিলেন, তরুণ যুবসমাজ: ‘তারুণ্যের শক্তি, বাংলাদেশের সমৃদ্ধি’। জানালেন, তারুণ্যের শক্তিকে কাজে লাগিয়ে ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে এবং স্বাবলম্বী তরুণ সমাজ গঠন করতে ২০২১ সালের মধ্যে ‘তরুণ উদ্যোক্তা নীতি’, একটি দক্ষ ও কর্মঠ যুবসমাজ তৈরি করতে ২০২৩ সালের মধ্যে ‘কর্মঠ প্রকল্প’ এবং প্রতি উপজেলায় যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপন করে স্বল্প ও অদক্ষ তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা নিবে তার দল আওয়ামী লীগ।

গড়ে তুলবেন জাতীয় যুবনীতি। আশ্বাস দিলেন এবার থেকে হবে বার্ষিক যুব বাজেট, তরুণদের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করার জন্য গঠন করা হবে যুব মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন ‘যুব গবেষণা কেন্দ্র’। একবিংশ শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় যুগোপযোগী করতে কারিগরি শিক্ষা, তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি খাতে বাড়ানো হবে বিনিয়োগ।

তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে ন্যাশনাল সার্ভিস কর্মসূচি পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি উপজেলায় প্রসারিত করা হবে। প্রতিটি উপজেলায় ‘যুব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’ স্থাপন করা হবে। বিভিন্ন ট্রেডে প্রশিক্ষণ দেয়ার পাশাপাশি এই কেন্দ্রগুলোকে পর্যায়ক্রমে ‘তরুণ কর্মসংস্থান কেন্দ্র’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য ‘কর্মঠ প্রকল্প’-এর অধীনে “স্বল্প শিক্ষিত/স্বল্প দক্ষ/অদক্ষ” শ্রেণির তরুণদের শ্রমঘন, কৃষি, শিল্প ও বাণিজ্যের উপযোগী জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ‘সুদক্ষ প্রকল্প’-এর অধীনে দক্ষ শ্রমিকের চাহিদা ও যোগানের মধ্যে যে ভারসাম্যহীনতা রয়েছে তা দূর করতে নানামুখি কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

জাতীয় পর্যায়ে স্বল্প, মধ্যম ও উচ্চ শিক্ষিত তরুণদের তথ্য সম্বলিত একটি ইন্টিগ্রেটেড ডাটাবেইজ তৈরি করা হবে। এর মাধ্যমে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজন ও তরুণদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকরির জন্য আবেদন করার আহ্বান জানাতে পারবে।

বেকারত্বের হার ২০২৩ সালে ১২ শতাংশে নামিয়ে আনা এবং কর্মসংস্থানে কৃষি, শিল্প ও সেবার অংশ যথাক্রমে ৩০, ২৫ ও ৪৫ শতাংশে পরিবর্তন করা হবে। ২০২৩ সাল নাগাদ অতিরিক্ত ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করার পদক্ষেপ গৃহীত হয়েছে। এছাড়া উক্ত সময়ে নতুনভাবে ১ কোটি ১০ লক্ষ ৯০ হাজার মানুষ শ্রমশক্তিতে যুক্ত হবে।

তরুণদের মধ্যে উদ্যোক্তা হওয়ার প্রবণতা ও আত্মকর্মসংস্থান বৃদ্ধি করতে কর্মসংস্থান ব্যাংক এর মাধ্যমে বিনা জামানতে ও সহজ শর্তে জনপ্রতি দুই লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ সুবিধা ইতোমধ্যে প্রদান করা হচ্ছে। ভবিষ্যতে এই সুবিধা আরও বিস্তৃত করা হবে। তরুণ উদ্যোক্তাদের মধ্যে যারা সম্ভাবনার ছাপ রাখতে সক্ষম হবে তাদের জন্য আর্থিক, প্রযুক্তি, উদ্ভাবনসহ অন্যান্য সরকারি সুযোগ সুবিধা আরও বৃদ্ধি করা হবে। তরুণ উদ্যোক্তা তৈরি করার জন্য প্রণয়ন করা হবে একটি যুগোপযোগী ‘তরুণ উদ্যোক্তা নীতি’।

তরুণদের সুস্থ বিনোদনের জন্য প্রতিটি উপজেলায় গড়ে তোলা হবে একটি করে ‘যুব বিনোদন কেন্দ্র’ যেখানে থাকবে বিভিন্ন ইনডোর গেমস এর সুবিধা, মিনি সিনেমা হল, লাইব্রেরি, মাল্টিমিডিয়া সেন্টার, ‘সাহিত্য ও সংস্কৃতি’ কর্নার, মিনি থিয়েটার ইত্যাদি।স্বল্প খরচে তরুণদের কাছে ইন্টারনেটসহ বিভিন্ন তথ্য প্রযুক্তির সুবিধা পৌঁছে দিতে ‘ইয়ুথ প্ল্যান’ চালু করা হবে।

উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী ও জঙ্গিবাদের প্রথম লক্ষ্য যুবসমাজকে আকৃষ্ট করা। এই যুবসমাজ যাতে আদর্শিক ভ্রান্তিতে মোহাবিষ্ট হয়ে জঙ্গি তৎপরতায় যুক্ত না হয় সেজন্য কাউন্সেলিং এবং তাদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিকাশকে ত্বরান্বিত করা হবে। এমনকি তরুণদের মাদকের ভয়াল আসক্তি থেকে মুক্ত করতে প্রতিটি জেলায় একটি করে সরকারি মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র করা হবে ও বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর জন্য সরকারি অনুদান বাড়ানো হবে। প্রতিটি জেলায় একটি করে ‘যুব স্পোর্টস কমপ্লেক্স’ গড়ে তোলা হবে।
নাগরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের স্বার্থে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের যাত্রায় যুক্ত করা হবে তরুণদের। মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদী উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রণয়নে আমলে নেয়া হবে তরুণদের বক্তব্য। জাতীয় যুবনীতির বাস্তবায়নের অগ্রগতি পরিবীক্ষণেও যুক্ত করা হবে সমাজের সকল স্তরের তরুণদের।

এমন করে তরুণদের কর্মসংস্থান আর আত্মনির্ভরশীলতার কথা ভেবেছে কি কেউ কখনো? বঙ্গবন্ধু কন্যা নিজেই বলেন, জীবনের পরোয়া করেন না তিনি। সবকিছু দিয়ে যেকোনো মূল্যে তিনি চান দেশ এগিয়ে যাক। আর সেকারণেই তিনি পাশে আস্থা রেখেছেন তার পরীক্ষিত সৈনিক এই তরুণদেরই।

দায়িত্ব বেড়েছে আমাদেরও। আমাদেরও উচিত পূর্ন উদ্যোমে উন্নয়ন কাজে ঝাঁপিয়ে পড়া। যার যার অবস্থান থেকে মাদক, সন্ত্রাস-জঙ্গীবাদ-ধর্ষণের মতো সমস্যাগুলোকে কঠোর হাতে দমনে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীকে পূর্ণ সহায়তা করা। দুর্নীতিকে জিরো টলারেন্সে প্রতিহত করা।

অনেকেই হয়ত বলবেন, এ কী আপনি তো আওয়ামী লীগের দালালি করলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দালালি করলেন! মাঝে শুধু একটু প্রচ্ছন্নভাবে তরুণদের স্তুতি গাইলেন! আমি বলবো আমি বাংলাদেশের দালালি করলাম! যিনি স্বাধীনতা বিরোধী মুক্ত দেশ গড়েছেন, আমাদের সিনা টান করে বাঁচতে শিখিয়েছেন, যিনি আমার প্রজন্মের উপর আস্থা রেখেই এগুতে চান সমৃদ্ধির পথে, আমি তার চোখেই দেখি বাংলাদেশ! আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি!

লেখক: সংবাদ ও যোগাযোগকর্মী

লেখকদের উন্মুক্ত প্লাটফর্ম হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে মুক্তকথা বিভাগটি। পরিবর্তনের সম্পাদকীয় নীতি এ লেখাগুলোতে সরাসরি প্রতিফলিত হয় না।