কোরিয়া-জাপান বিরোধের সুবিধা নেবে কে?

ঢাকা, বুধবার, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০১৯ | ৮ ফাল্গুন ১৪২৫

কোরিয়া-জাপান বিরোধের সুবিধা নেবে কে?

আহমেদ শরীফ ১:৩৮ অপরাহ্ণ, ফেব্রুয়ারি ০৪, ২০১৯

কোরিয়া-জাপান বিরোধের সুবিধা নেবে কে?

জাপানি সামরিক বাহিনী বলছে যে, গত ডিসেম্বরের শেষে জাপান সাগরে দক্ষিণ কোরিয়ার নৌবাহিনীর একটা ডেস্ট্রয়ার জাপানি একটা প্যাট্রোল বিমানের উপরে জাহাজের ‘ফায়ার কন্ট্রোল রাডার’ দিয়ে ‘লক’ করে। এই ‘লক’ করার অর্থ হলো জাহাজটা বিমানের উপরে গোলাবর্ষণ করার জন্যে প্রস্তুত ছিল। বিষয়টা নিয়ে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মাঝে কথাবার্তা চললেও কোন সমাধান হয়নি।

কোরিয় সামরিক বাহিনী জাপানিদের সমালোচনা করে নিজেদের ইউটিউব চ্যানেলে একটা ভিডিও বের করে, যেখানে জাপানি নীতির চরম সমালোচনা করা হয় এবং জাপানের কাছ থেকে এব্যাপারে ক্ষমা দাবি করা হয়। কোরিয়রা বলছে যে জাপানি বিমানটা বিপজ্জনকভাবে অত্যন্ত নিচ দিয়ে উড়ে এবং কোরিয় জাহাজের খুব কাছে দিয়ে উড়ে ভয় দেখাবার চেষ্টা করে, যদিও বিমান থেকে পরিষ্কারভাবেই দেখা যাচ্ছিল যে, কোরিয় জাহাজখানা বিপদে পড়া ফিশিং ট্রলারকে সহায়তা দিচ্ছিল। আর কোরিয় জাহাজ ‘ফায়ার কন্ট্রোল রাডার’ নয়, বরং ‘সার্চ রাডার’ সচল রেখেছিল, যা কিনা শত্রু বিমানকে ‘লক’ করে না।এর জবাবে জাপানিরা এক অডিও প্রকাশ করে, যা কিনা কোরিয় জাহাজের ‘ফায়ার কন্ট্রোল রাডার’এর অনুরূপ বলে বলা হয়, যেখানে দাবি করা হয় যে, কোরিয় জাহাজটা জাপানি বিমানের উপরে আক্রমণের ভীতি প্রদর্শন করে।

২৮শে জানুয়ারি জাপানি প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে তার বাৎসরিক নীতি বিষয়ক ভাষণে কোরিয়ার সাথে সামরিক দ্বন্দ্বের বিষয়টাকে এড়িয়ে শুধুমাত্র চীন এবং উত্তর কোরিয়া নিয়ে কথা বলেন, যা কিনা কোরিয়াতে অনেকেই ভালো চোখে দেখেননি। কোরিয়ার সাথে জাপানেরসাম্প্রতিক সামরিক রেষারেষিএখন গুরুত্ব পেলেও সেখানে পুরোনো ক্ষতের ভারই বেশি। ১৯১০ থেকে ১৯৪৫ পর্যন্ত কোরিয়ায় জাপানি ঔপনিবেশিক সময়ে জাপানি সেনাদের বিরুদ্ধে কোরিয় নারীদের জোরপূর্বক যৌনকর্মী বানানোর চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে, যেব্যাপারে কোরিয়াতে আবেগ যথেষ্টই গভীর। ‘কমফোর্ট উইমেন’ নামে ডাকা এই মহিলাদের ব্যাপারে সম্পূর্ণ ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাদের জন্যেযথেষ্ট ক্ষতিপূরণের ব্যাবস্থা করার জন্যে কোরিয়াতে এখনও আন্দোলন চলছে।

২০১৫ সালেদুইদেশ ‘কমফোর্টউইমেন’দেরইস্যুটাকেসমাধানেরউদ্দেশ্যেএকটাচুক্তিকরে, যামোতাবেকজাপানকোরিয়াকে ৯ মিলিয়নডলারসহায়তাদেবারজন্যএকটাফাউন্ডেশনগঠনকরে। কিন্তু ২০১৮ সালে কোরিয় সরকার সেই ফাউন্ডেশকেই বন্ধ করে দেয়; যার ফলশ্রুতিতে ‘কমফোর্টউইমেন’দেরইস্যুখানা আবারও সামনে চলে আসে। কোরিয়ায় আন্দোলনরতরা বলছেন যে, জাপান কোনরকম খরচ দিয়েই এই অপরাধ থেকে মাফ পেতে চাইছে, যা গ্রহণযোগ্য নয়। অপরদিকে জাপান বলছে যে, কোরিয়ার সাথে ক্ষতিপূরণের ব্যাপারটা ১৯৬৫ সালে দুই দেশের মাঝে স্বাক্ষরিত চুক্তির মাধ্যমেই সমাধান হয়ে গিয়েছে; এবং এখন কোরিয়ার কাছ থেকে অভিযোগ শুনতে শুনতে জাপান বিরক্ত।

উভয় দেশই পূর্ব এশিয়াতে চীন, উত্তর কোরিয়া এবং রাশিয়াকেকৌশলগত ব্যালান্সে রাখার জন্যে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করে চলেছে। একারণেই এই দুই দেশের বন্ধুত্ব পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রের জন্যে এতটা মূল্যবান। ‘হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’এর ব্রুস ক্লিংনার বলছেন যে, এর আগে ওবামা সরকারের সময়ে জাপান-কোরিয়া সমস্যাকে সমাধান করতে ওয়াশিংটন পিছনে শক্ত অবস্থান নিয়ে দুই দেশকে সমস্যা সমাধানে বাধ্য করেছিল। কিন্তু বর্তমান ট্রাম্প সরকার এখন এই ব্যাপারটাতে অতটা আগ্রহ দেখাচ্ছে না। ‘ইন্সটিটিউট ফর সিকিউরিটি এন্ড ডেভেলপমেন্ট পলিসি’এর ‘কোরিয়া সেন্টার’এর প্রধান সাংসু লি বলছেন যে, ট্রাম্পের ‘আমেরিকা ফার্স্ট’ নীতির কারণে জাপান-কোরিয়ার সমস্যায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা নিয়ে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধুদের সঠিকভাবে মূল্যায়ন না করাকে কারণ দেখিয়েই মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেমস ম্যাটিস গত ডিসেম্বরে পদত্যাগ করেছিলেন। একইসাথে মার্কিন বন্ধুদের কাছেই যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্ব কমতে শুরু করেছে; কমতে শুরু করেছে মার্কিন প্রভাব।কোরিয় উপদ্বীপকে রক্ষার জন্যে সেখানে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের খরচ বহন করার জন্যে ট্রাম্প সরকারের চাপ সৃষ্টি কোরিয়ার উপরে মার্কিন প্রভাব কমার পেছনে ইন্ধন যুগিয়েছে। আবার জাপানিদেরকে নিজেদের প্রতিরক্ষার দায়িত্ব নেবার জন্যে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ সৃষ্টির পর কোরিয়া সেটাকে জাপানি সাম্রাজ্যবাদের পূনরুত্থানের আভাস হিসেবে দেখছে। গত অক্টোবরে কোরিয়াতে অনুষ্ঠিত এক নৌ-মহড়াতে জাপানি নৌবাহিনী জাহাজ থেকে ‘রাইজিং সান’ পতাকা নামানোর নির্দেশ দেয়ায় জাপান সেই অনুষ্ঠানই বয়কট করে। ‘রাইজিং সান’ পতাকাকে কোরিয় এবং চীনারা জাপানের অতীতের সাম্রাজ্যবাদের স্মৃতি হিসেবে দেখে।  

একইসাথে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন যে, পূর্ব এশিয়ার নিরাপত্তা নিয়ে মার্কিন আগ্রহ কমার সাথে সাথে অত্র অঞ্চলের নেতারা যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অভিষ্যত কেমন হতে পারে, তা নিয়ে চিন্তা করছেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায় যে, ২০১৮ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম জং-উন-এর সাথে তিন তিনবার দেখা করার মাঝে মার্কিনীরা চেয়েছিল যে, পারমাণবিক ইস্যুতে দক্ষিণ কোরিয়া কিছুটা আস্তে চলুক। উল্টো মু জে-ইন গত অক্টোবরে ইউরোপিয়দের কাছে আবেদন করে বসেন যে উত্তর কোরিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা যেন কমানো হয়। ইউরোপ তার এই আহ্বানকে সন্মান না দেখালেও ওয়াশিংটন তার ‘বন্ধু’ হিসেবে দক্ষিণ কোরিয়ার কাছ থেকে এমনটা হয়তো আশা করেনি।

পহেলা ফেব্রুয়ারি কোরিয়ার রাজধানী সিউল-এ ‘কমফোর্ট উইম্যান’ কিম বোক-ডং-এর অন্তেষ্টিক্রিয়া অনুষ্ঠিত হয়। আবেগঘন এই অনুষ্ঠানে প্রতিবাদকারীরা জাপানি দূতাবাসের সামনে জমায়েত হয় এবং জাপানের কাছ থেকে পরিপূর্ণ ক্ষমাপ্রার্থনা এবং খতিপূরণ আশা করে। ৯২ বছর বয়সী কিম বোক-ডং-এর মৃত্যুর পর ২’শ ৩৯ জন ‘কমফোর্ট উইমেন’এর মাঝে এখন মাত্র ২৩ জন বেঁচে রইলেন। কিম-এর মৃত্যুতে দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন জে-ইন বলেন যে, তার চেষ্টা কোরিয়ানদেরকে সত্যের সামনে দাঁড়াতে সাহস যুগিয়েছে। ‘আল-জাজিরা’র সাথে কথা বলতে গিয়ে আরেক ‘কমফোর্ট উইম্যান’ ইয়ুন মি-হিয়াং বলেন যে, যখন ‘কমফোর্ট উইমেন’রা সকলেই মৃত্যুবরণ করবেন, তখন লাখো মানুষ প্রতিবাদ করে বলবে, “শোনো, জাপানি সরকার! শোনো, যুদ্ধাপরাধী!” কোরিয়ার রাস্তায় এমন আবেগাপ্লুত শ্লোগান কোরিয়া এবং জাপানের মাঝে যেমন দূরত্ব বৃদ্ধি করছে, তেমনি ওয়াশিংটনেও নীতিনির্ধারকদের মাঝে চিন্তার উদ্রেক করছে।

দুই মার্কিন মিত্রকে একত্রে বসিয়ে সমস্যার সমাধান করার সক্ষমতা যে ওয়াশিংটনের আগের মতো নেই, তা এখন নিশ্চিত। এখন অতীতের ঘটনার সাথে নতুন করে সামরিক দ্বন্দ্ব যোগ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও ঘোলাটে হলো। অত্র অঞ্চলের অপর দুই শক্তিধর দেশ চীন এবং রাশিয়া এই দ্বন্দ্বকে কাছে থেকে অবলোকন করলেও যুক্তরাষ্ট্রের অবর্তমানে মধ্যস্ততাকারী হয়ে সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অবস্থানটি দখল করে ফেলার সুযোগ তাদের কাছে নেই বললেই চলে। 

লেখক: ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক