ধর্ষকরা মানুষ নয়, প্রত্যেক দলের গঠনতন্ত্রে যুক্ত হোক ৪টি ধারা

ঢাকা, সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯ | ৩ আষাঢ় ১৪২৬

ধর্ষকরা মানুষ নয়, প্রত্যেক দলের গঠনতন্ত্রে যুক্ত হোক ৪টি ধারা

ইকবাল জাফর ৩:০৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ১০, ২০১৯

ধর্ষকরা মানুষ নয়, প্রত্যেক দলের গঠনতন্ত্রে যুক্ত হোক ৪টি ধারা

রাজনৈতিক দলগুলো কাদের জন্য? —নিশ্চয়ই মানুষের জন্য। রাজনৈতিক দলগুলো কাদের দ্বারা পরিচালিত? —নিশ্চয়ই মানুষের দ্বারা। রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মকাণ্ডের সুফল কারা ভোগ করবে? —নিশ্চয়ই মানুষ যারা।

তাহলে, রাজনৈতিক দলগুলোর সকল কর্মকাণ্ড মানুষকে নিয়ে, মানুষের দ্বারা এবং মানুষের ভেতর সীমাবদ্ধ হলে— কোনো রাজনৈতিক দলের ভেতর “ধর্ষকের স্থান” হতে পারে না। হোক সে “বর্তমানের ধর্ষক” আর “অতীতের ধর্ষক” —কারো প্রতি কোনো ছাড় থাকতে পারে না।

কারণ, ধর্ষক তো কোনোভাবেই কোনো যুক্তিতেই “মানুষই নয়” —নিকৃষ্ট যে পশুগুলো আছে, তার চেয়েও সহস্রগুণ বর্বর কোনো জানোয়ার সে বা তারা। যে বা যারা কিনা কাঠামোগতভাবে দু’পেয়ে জঘন্য-জীব হিসেবে কেবল একটি মুখোশ পরে থাকে বড়জোর...। অতএব, তাদের কোনো রাজনৈতিক পরিচয় রাখা যেতে পারে না। শুধু তা-ই নয়, তাদের কোনো মানুষের দল-সংঘ-সংগঠন-সম্প্রদায়-ধর্ম-জাতি-উপজাতির পরিচয় ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে না— মুখোশ উম্মোচন হওয়ার সাথে সাথেই সে বা তারা যে ‘চরম বর্বর জানোয়ার’ সে-হিসেবে তাদের মানুষ পরিচয় খারিজ হয়ে যায়। ফলে, স্বাভাবিকভাবেই দল-সংঘ-সংগঠন-সম্প্রদায়-ধর্ম-জাতি-উপজাতির পরিচয়ও তখনই সরাসরি খারিজ হয়ে যায়।

এবং সে-কারণে তখন “সকল মত-পথ-ভেদ-বিভেদের ঊর্ধ্বে গিয়ে তখন সমগ্র মানবজাতির পক্ষ থেকে” ঐ বর্বর ধর্ষক বা ধর্ষকদের প্রতি ঘৃণা-প্রতিবাদ ও চরমতম শাস্তির দাবি উঠে আসে— এবং উঠে আসা উচিৎও।

তাই— কোনো রাজনৈতিক দলে ধর্ষক ঢুকতে পারে না এবং কোনো রাজনৈতিক দলে ধর্ষক থাকতে পারে না বা ধর্ষককে পুষতে পারে না এবং কোনো রাজনৈতিক নেতা-কর্মী-সমর্থক ধর্ষণ করার পর রাজনৈতিক পরিচয় বহন করার কোনো অধিকারই পেতে পারে না...।

তা-ছাড়া, ধর্ষকদের যখন মানুষের কোনো রাজনৈতিক দল-সংঘ-সংগঠন-সম্প্রদায়ের পরিচয় দেওয়া হয়— তখন এর মাধ্যমে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে তাদের সুবিধা দেওয়া হতে পারে বা বিচার বাধাগ্রস্ত হতে পারে বা শাস্তি কমে আসতে বা শাস্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার মতো জঘন্য ব্যাপারও ঘটে যেতে পারে...। যার অসংখ্য ক্ষত পৃথিবী বহন করে চলেছে, যার অসংখ্য উদাহরণ পৃথিবীতে রয়েছে।

যেমনঃ বিশ্বে আলোড়ন-সৃষ্টিকারী আসিফার ঘটনাটা। অর্থাৎ কাশ্মীরের ফুলের মতো নিষ্পাপ শিশু আসিফা বানুকে ১ সপ্তাহ ধরে গণধর্ষণ ও হত্যার মামলাটি। আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে (১০ জানুয়ারী ২০১৮) ভারত শাসিত কাশ্মীরের কাঠুয়ায় ৮ বছরের শিশু আসিফা বানু হারিয়ে যাওয়ার ৭ দিন পর রাসানা গ্রামের একটি জঙ্গলে তার মৃতদেহ খুঁজে পাওয়া যায়। পাওয়ার পর বেরিয়ে আসে শিশুটির উপর চলা ভয়াবহ ঘটনার তথ্য-প্রমাণ। শিশুটিকে বর্বর জানোয়াররা মন্দিরে আটকে রেখে দলবেঁধে ৭ দিন ধরে গণধর্ষণ করে হত্যা করে পাশের জঙ্গলে লুকিয়ে রাখে। যে ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় অভিযুক্ত আটজনের বিচার কার্য আমরা এখনো দেখছি...।

ওই ধর্ষণের দায়ে ওই মন্দিরের পরিচালক সাবেক এক সরকারী কর্মকর্তা ও দুই পুলিশ কর্মকর্তাসহ সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। কিন্তু ধর্ষিত শিশুটির পরিচয় “মুসলীম”ও ধর্ষণকারীর পরিচয় “হিন্দু” এবং বিজেপি শাসিত সরকার ভারতে চালু থাকায় “পরিচয়ের কারণে” (?) এই মারাত্মক মামলাটি এগোতে বার বার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, এমন কি প্রতিবাদটাও হচ্ছে খণ্ডিত...।

ইতোমধ্যেই ধর্ষণের আলামত নষ্টে দুই পুলিশ শিশুটির জামা ধুয়ে ফেলে এবং রফা করতে পুলিশকে বড় অংকের ঘুষের প্রস্তাব দেওয়া হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। যা অভিযোগপত্রে জানানোও হয়েছে। এবং অভিযুক্তরা “হিন্দু” পরিচয়ের কারণে তাদের মুক্তির দাবীতে “হিন্দু অধিকার রক্ষাকারী” কয়েকটি সংগঠন সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভও করেছে এবং ঐ বিক্ষোভ মিছিলে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি’র দুই মন্ত্রীও অংশ নিয়েছে...।

যার প্রতিবাদে এবং আসিফা ধর্ষণ ও হত্যার বিচারের দাবীতে দেশটির রাজধানী দিল্লীতে প্রতিবাদ সমাবেশে দেশটির প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী, তার মা সোনিয়া গান্ধী ও বোন প্রিয়াংকা ভদ্র গান্ধীসহ ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে একদল মানুষ অংশও নিয়েছে। এমনকি জাতিসংঘসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থা এ ঘটনার নিন্দা জানিয়েছিল। এত কিছুর পরও ধর্ষিত ও নিহত শিশু আসিফার পরিবারের পক্ষের আইনজীবী দীপিকা সিং রাওয়াতকে জীবননাশের হুমকী দেওয়া হচ্ছে, যা তিনি দেশটির উচ্চ আদালতে জানিয়েছেন। ঘটনার পর একটি বছর চলে গেলেও বিশ্বব্যাপী বহুলভাবে আলোড়ন-সৃষ্টিকারী এই মামলাটির ভবিষ্যৎ এখনো অস্পষ্ট...। এ ধরনের আরও বহু বহু মামলার উদারহণ রয়েছে...।

অতএব, কোনো সুস্থ-মানুষ ওই বর্বর জানোয়ারদের ঐ সুযোগ করে দিতে পারে না। অর্থাৎ ঐ বর্বর জানোয়ারদের কোনো মানুষের দল-সংঘ-সংগঠন-সম্প্রদায়-ধর্ম-জাতি-উপজাতির পরিচয় থাকার সুযোগ নেই। সে কারণে ওদের রাজনৈতিক পরিচয়ও থাকতে পারে না।

অর্থাৎ, ধর্ষকের রাজনৈতিক পরিচয় বাদ দিয়ে “বর্বর ধর্ষক” পরিচয়েই হাজির করতে হবে। মানবের অন্য কোনো প্রকার সংগঠনের পরিচয়ও তার বা তাদের ঢাল হয়ে থাকতে পারে না— তাই, প্রত্যেক রাজনৈতিক দলসহ যেকোনো প্রকার মানুষের সংগঠনের গঠনতন্ত্রে তিনটি ধারা যুক্ত করা উচিৎ।

যেমনঃ প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে যুক্ত হোক ৪টি ধারা—

(১) কোনো ধর্ষণকারী কোনো রাজনৈতিক দলের কোনো স্তরেরই সদস্য হতে পারবে না।

(২) দলের যেকোনো পর্যায়ের যেকোনো নেতা বা কর্মী বা সমর্থক ধর্ষক হিসেবে প্রমাণিত হলে বা ধর্ষণ করলে— তখনই সে বা তারা সরাসরি আজীবনের জন্য দলটি থেকে বহিষ্কৃত হবে।

(৩) দলের যেকোনো পর্যায়ের যেকোনো নেতা বা কর্মী “অতীতে ধর্ষণ করেছে” প্রমাণিত হলে— প্রমাণিত হওয়ার ক্ষণ থেকেই সে বা তারা সরাসরি আজীবনের জন্য দলটি থেকে বহিষ্কৃত বলে নির্ধারিত হবে।

(৪) দলের যেকোনো পর্যায়ের যেকোনো নেতা বা কর্মীর বিরুদ্ধে কখনো কোনো ধর্ষণের অভিযোগ দায়ের করা হলে বা ধর্ষণ-সংক্রান্ত মামলা হলে— অভিযোগ দায়ের বা মামলা  হওয়ার ক্ষণ-থেকেই সে বা তাদের স্বয়ংক্রিয়ভাবে দলটির যেকোনো স্তরেরই সদস্যভুক্তি এবং সকল পদ-পদবী স্থগিত হয়ে যাবে। তবে, বিচার কার্য সম্পাদনের পর যদি নির্দোষ প্রমাণিত হন, অর্থাৎ উক্ত অপরাধে জড়িত না হলে— তখন তিনি  বা তারা দলটিতে সদস্যভুক্তি ও পদ-পদবী ফেরৎ পাবেন।

চরম বর্বরোচিত কাজ ধর্ষণ দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। শংকাজনক হারে বেড়েছে শিশু-ধর্ষণসহ নানা-বয়সী নারীর উপর এই ঘৃণিত পাশবিক নির্যাতন; এবং বেড়েছে তা গোপন করতে হত্যাযজ্ঞ। এই বর্বরতা-অসভ্যতা ও চরম অমানবিকতা বন্ধে প্রয়োজন আরও কঠোরতর আইন ও শাস্তির নিশ্চয়তা। কেননা আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে ধর্ষক যত বের হয়ে যাবে, যত কম শাস্তি পাবে— ততই এই বর্বরতা বেড়ে যাবে। তাই আসুন, যার যার স্তর থেকে আমরা সচেতন হই, আওয়াজ তুলি, প্রতিবাদ করি, প্রতিরোধ গড়ি। এক কথায় দাবী তুলি— “প্রমাণিত ধর্ষকের শাস্তি হোক মৃত্যুদণ্ড”।

লেখক: সাংবাদিক