হার্ভার্ড বনাম হাওড়া

ঢাকা, সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯ | ৩ আষাঢ় ১৪২৬

হার্ভার্ড বনাম হাওড়া

বাচি কারকারিয়া ১০:৪৭ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৮, ২০১৯

হার্ভার্ড বনাম হাওড়া

 

স্টিভেন পিঙ্কার বিশ্বের সবচেয়ে খ্যাতিমান মনস্তত্ত্ববিদদের একজন। তিনি একজন জনপ্রিয় মার্কিন বুদ্ধিজীবী। মনোরঞ্জন ব্যাপারী একজন হতদরিদ্র রিকশাওয়ালা, ভাগ্য যাকে সাহিত্য জগতে একজন আলোড়ন সৃষ্টিকারী বানানোর আগপর্যন্ত যিনি একজন নিরক্ষর মানুষই ছিলেন। গত সপ্তাহের শেষে তাদের দুজনের পথ এসে মিললো মুম্বাইয়ের মেহবুব স্টুডিওতে, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে অনেক মাটির প্রদীপের আকাশের তারকায় পরিণত হওয়ার ইতিহাস।

মুম্বাইয়ে সাহিত্য উৎসব ‘টাইমস লিটফেস্ট’-এ আমরা এ দুজনকে একক বক্তা হিসেবে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। এদের মধ্যে মনের কাজকর্ম পিঙ্কারের চেয়ে ভালো জানে বা বোঝে এমন মানুষের সংখ্যা বিশ্বে খুব কম। অন্যদিকে প্রাণটুকু টিকিয়ে রাখার জন্য কত কী যে করতে হয় তা ব্যাপারীর চেয়ে ভালো জানে এমন মানুষের সংখ্যাও বেশি নয়। এদের দুজনের বক্তৃতার সময়ই পড়েছিল রোববার সকাল ১০টায়, এবং সেটা কোনো অলৌকিক কারণে নয়, স্রেফ কার্যসূচিতে সময় সংকটের কারণে। আমাদের আমন্ত্রিতদের তালিকায় এতসব চমৎকার বক্তারা ছিলেন, তাদের বক্তৃতাকে প্রায়ই একই সময়ে ফেলতে হচ্ছিল, যার ফলে অনেকে একজন প্রিয় বক্তার বক্তব্য শুনতে গিয়ে আরেক প্রিয়জনের বক্তৃতা শুনতে পারছিল না।

পিঙ্কার আর ব্যাপারী দুজনেই ছিলেন দুই বিপরীত মেরুর মানুষ, সবদিক থেকেই। এদের মধ্যে প্রথমজন ছিলেন সুরুচি আর মার্জিত বুদ্ধিদীপ্তির মূর্তিমান প্রতীক। অন্যদিকে ব্যাপারী ছিলেন মাটির মানুষের জলজ্যান্ত প্রতিভূ। একজনের পরনে নামি ডিজাইনারের তৈরি জিন্স, অন্যজনের ভূষণের অঙ্গ গামছা। সবুজ ডোরাকাটা গামছাটাকে তিনি গর্বিতভাবে জড়িয়ে রেখেছিলেন তার শিরা ওঠা গলার চারপাশে।

কম মগজওয়ালা মানুষ হিসেবে আমি বেশি মগজওয়ালা আমেরিকান মানুষটার সর্বশেষ বই ‘এনলাইটেনমেন্ট নাউ’ সম্পর্কে তার কথাবার্তা শোনার জন্য সবচেয়ে বড় টাইমস স্টুডিওর দিকেই যাচ্ছিলাম। কিন্তু যাওয়ার পথে একটা পোকার মতো ধরা পড়ে গেলাম আদিত্য বিড়লা লনে আমাদের ভারতীয় বক্তার বক্তব্যের অগ্নিশিখায়। বাংলা মেশানো হিন্দিতে মনোরঞ্জন ব্যাপারী বর্ণনা করছিলেন এক সুদীর্ঘ আর অবিশ্বাস্য জীবনপরিক্রমার কাহিনী। ভারত ভাগের পর সাবেক পূর্বপাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) থেকে সপরিবারে পালিয়ে আসার পর দণ্ডকারণ্য শরণার্থী শিবিরে নিদারুণ কষ্ট আর দারিদ্র্যের শৈশব থেকে রিকশাওয়ালা হয়ে কীভাবে আজকের জননন্দিত লেখকে পরিণত হলেন, সেই অবাক করা গল্প। বলছিলেন, ‘এখন আমি এরকম ভালো জামা-কাপড় পরতে পারি, কিন্তু আমার বাবাকে তার সারা জীবন একটা ছেঁড়া গেঞ্জির চেয়ে বেশি কিছু দিয়ে গা ঢাকতে দেখিনি।’
কিশোর বয়সে পেটের খিদে মেটাতে তাকে অপরাধমূলক কাজে জড়াতে হয়েছে। বাঁকা একটা হাসি মুখে নিয়ে তিনি বললেন, ‘জীবনকে আমি দেখেছি জেলের জানালা দিয়ে। ওটা শুধু ‘দেখা’ ছিল না, ওটা ছিল ‘দর্শন’, চোখ যতটুকু দেখতে পায় তার বাইরে দেখা। একজন মহান মানুষ, যার নাম লেনিন, একটা কথা সঠিক বলেছেন, কারাগারই হলো পৃথিবীর বৃহত্তম বিশ^বিদ্যালয়। এটা মানুষকে খাদ্য, আশ্রয়, শৌচাগার, বিছানা সবকিছু দেয়। এমনকি ‘সালমান খানদের’ হামলা থেকে নিরাপত্তাও।’ জেলেই তিনি বেরিয়ে আসেন নিরক্ষরতার বৃত্ত থেকে, যার শুরুটা ছিল তার মামলার কাগজপত্রের খসড়া কীভাবে করতে হবে তা শেখার মধ্য দিয়ে। এর পর পড়া হয়ে দাঁড়াল তার নতুন জানালা। এবং শেষ পর্যন্ত লেখালেখি তার নতুন দরজা।

জেল থেকে বেরিয়ে রিকশা চালানোকে তিনি পেশা হিসেবে নিলেন। হাড়ভাঙা খাটুনির ফাঁকে ফাঁকে একটু সময় পেলেই হাতের কাছে যা পেতেন তাই পড়তেন। পড়ে কোনো কিছু বুঝতে না পারলে যাকে পেতেন তাকেই বলতেন একটু বুঝিয়ে দেওয়ার জন্য। তার অনুরোধ কেউ রাখত, কেউ রাখত না। পড়তে গিয়ে এক দিন তিনি একটা নতুন শব্দ পেলেন-‘জিজীবিষা’। এর পর যিনি তার রিকশায় যাত্রী হলেন, সেই ভদ্র মহিলাকে তিনি শব্দটার মানে জিজ্ঞেস করলেন। মহিলাটি জবাব দিলেন, এটার অর্থ হলো ‘বাঁচার ইচ্ছে’। একজন রিকশাওয়ালার এত ভদ্রতা, বিনয় আর জানার জন্য অপরিসীম ক্ষুধা দেখে মহিলাটি তার সঙ্গে কথাবার্তা চালিয়ে গেলেন। ব্যাপারী পরে যখন বুঝতে পারলেন, তার রিকশায় চড়া এই মহিলা আর কেউ নন, স্বয়ং বিখ্যাত লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী, তখন তিনি তার পায়ে মাথা রেখে প্রণাম করলেন।

বই উৎসবের ভাষণে ব্যাপারী যখন বলছিলেন, ‘আমার কাছে ওটা ছিল কালিদাসের সামনে সরস্বতীর আবির্ভাবের মতো,’ তখন তার শ্রোতাদের সবার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিল। মহান সেই লেখিকা তার ম্যাগাজিনে ব্যাপারীকে লিখতে বলেছিলেন, আর তারপর থেকে ‘আমার কিসমত বদলে গেল’।
পিঙ্কারের ভাষণ সেদিন আমার আর শোনা হলো না। যারা সেটা শুনেছেন, উজ্জ্বল চোখ-মুখ নিয়ে তারা বেরিয়ে আসছিলেন মিলনায়তন থেকে। কিন্তু খোলা লনে দাঁড়িয়ে শোনা মনোরঞ্জন ব্যাপারীর ভাষণ আমার জন্য ছিল নতুন করে অনেকখানি আলোকিত হওয়া।

[টাইমস অব ইন্ডিয়ার সাবেক সম্পাদক বাচি কারকারিয়ার এ লেখাটি পত্রিকাটিতে প্রকাশিত হয়েছে গত ২০ ডিসেম্বর। ভাষান্তর করেছেন জ্যোতির্ময় নন্দী]