এবারও কি সেই আধা বিরোধীদল নিয়েই সংসদ হচ্ছে?

ঢাকা, রবিবার, ২০ জানুয়ারি ২০১৯ | ৬ মাঘ ১৪২৫

এবারও কি সেই আধা বিরোধীদল নিয়েই সংসদ হচ্ছে?

এখলাসুর রহমান ২:৩৫ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ০৭, ২০১৯

এবারও কি সেই আধা বিরোধীদল নিয়েই সংসদ হচ্ছে?

একাদশ সংসদ নির্বাচনে অবিশ্বাস্য জয় পেলো আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট৷ মহাজোটের বাইরে মাত্র ৭ টি আসন পেয়েছে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট৷ কিন্তু তারা শপথ গ্রহণ এখনও করেনি। মহাজোটের শরীক জাতীয় পার্টিও ২২টি আসনে জিতে একবার সরকারে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করছে, আরেকবার বিরোধী দলে থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করছে৷ যে জাতীয় পার্টি গড়ে উঠেছিল গণতন্ত্র হত্যাকারী হুসেইন মুহাম্মদ এরশাদের রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে৷

দীর্ঘ দশ বছর আওয়ামী লীগ, বিএনপি, বামপন্থী দলগুলো লড়াই করেছে গণতন্ত্রের জন্য৷ বুকে পিঠে স্বৈরাচার নিপাত যাক ও গণতন্ত্র মুক্তি পাক লিখে স্বৈরশাসনের গুলিতে জীবন দিয়েছে নূর হোসেন৷ এ ছাড়াও জীবন দিয়েছে ডাঃ মিলন, ফিরোজ জাহাঙ্গীর সহ আরো অনেকেই৷ সেদিনের গণতন্ত্রের ঘাতক দলটিকেই একাদশ সংসদে গণতন্ত্র রক্ষায় বিরোধী দল হতে অনুরোধ করতে হবে৷

ক্ষমতার স্বাদ পাওয়া দলটি বিরোধী দল না হয়ে সরকারে থাকতেই বেশি আগ্রহ প্রকাশ করে চলেছে৷ এক্ষেত্রে বিরোধী দল হতে পারতো জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট৷ কিন্তু তারা এখনও শপথ নেয়নি। না হয় মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে বিরোধী দলীয় নেতা করে রাজনীতির এই শূন্যস্থানটা পূর্ণ করা যেতো৷

মহাজোটের যৌথ ভোটের অংশীদারিত্বে নির্বাচনে জিতেছে আওয়ামী লীগ, দুই জাতীয় পার্টি, দুই জাসদ, ওয়ার্কার্স পার্টি ও তরিকত ফেডারেশন৷ এক্ষেত্রে জাতীয় পার্টি (এরশাদ)ছাড়া অন্যরা নির্বাচন করেছে নৌকা প্রতীকে৷ সুতরাং নৌকা বিভক্ত করে কি আর এসব দলকে বিরোধী দল বানানো যায়? তাছাড়া তারাও কি বিরোধী দল হতে চাইবে? নিজের দলীয় প্রতীক বিসর্জন দিয়ে নৌকায় উঠে তারা সংসদ সদস্য হয়েছে৷ এখনকার স্বপ্ন মন্ত্রী হওয়া৷ সুতরাং বিরোধী দলীয় নেতা হওয়ার ইচ্ছে হবে কার?

জাতীয় পার্টির (এরশাদ)নেতাদের কেউ কেউ ইতোমধ্যেই মন্ত্রী হওয়ার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন৷ দশম সংসদ নির্বাচনে দলটি সরকার দল ও বিরোধী দল দুটোই হয়েছিল৷ এবারও কি তাই হতে চলেছে? গতবার দলটির চেয়ারম্যান এরশাদ হয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত৷ এই ৫ বছরে দূত হিসাবে তিনি কী কাজ করেছেন তা কেউ জানেনা৷ তবে দলটির বিরোধী দলীয় নেতা হিসাবে রওশন এরশাদের ভূমিকাও দেখেছে মানুষ৷ আরও দেখেছে আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, মুজিবুল হক চুন্নু ও মশিউর রহমান রাঙ্গার মন্ত্রীত্বের ভূমিকা৷

কে হচ্ছেন একাদশ সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা? নির্বাচনের আগে মানুষ ভেবেছিল এবার বিরোধী দল হবে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট৷ এমনটি হলেই গণতন্ত্র তার যথার্থ রূপ পেতো৷ সরকারি দল, দেশ, জনগণ ও গণতন্ত্রের জন্য এমনটিই বিদগ্ধজনের কাম্য ছিল৷ কিন্তু নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত ও অবিশ্বাস্য ভরাডুবি ঘটলো দলটির৷ তারা নির্বাচনের ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে সংসদ সদস্য হিসাবে শপথ গ্রহণ করলো না৷ নির্বাচনের মধ্য দিয়েই বিরোধী দলের সৃষ্টি হওয়ার কথা৷ কিন্তু সেটি হলো না অথবা হতে দেওয়া হলো না৷

সরকারকেই নিয়ম রক্ষার জন্য বিরোধী দল খুঁজতে হচ্ছে৷ প্রয়োজনে মহাজোটে বিভাজন ঘটিয়ে বিরোধী দল সাজিয়ে নিতে হবে৷ সুতরাং এখানে সাধু সেজো না, হও কথাটি প্রযোজ্য হতে পারলো না৷ এমনই সময়ে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হোসেইন মোহাম্মদ এরশাদ তার উত্তরসূরী ঠিক করলো ছোট ভাই জি, এম কাদেরকে৷ তবে কি তিনি তাকে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করে অবসরে যাচ্ছেন? নির্বাচনী ফলাফলের পরপরই কেন তার এই সিদ্ধান্ত?

সরকার দলের পাশাপাশি শক্তিশালী বিরোধী দল না পেলে গণতন্ত্র কি এগোয়? তবে কেন বিরোধী দল নির্মূলের পন্থা নেয়া হল? হামলা, মামলা ও অন্যের ব্যালটে সিল মারার অগণতান্ত্রিক রীতি দৃশ্যমান না হলে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট বিরোধী দল হতে পারতো বলেই অনেকের ধারণা৷

নেত্রকোনা-৪ এর ঐক্যফ্রন্ট প্রার্থী নির্বাচনের দিন পর্যন্ত মোহনগঞ্জ খালিয়াজুরীতে যেতে পারেন নি৷ মোহনগঞ্জে এ প্রার্থী ছিল নিষিদ্ধ সংগঠনের প্রার্থীর মতো। বাচ্চারাও ভয়ে ধানের শীষ বলেনি৷ কেন্দ্রগুলোতে প্রকাশ্যে টেবিলের উপর ভোট দিতে হয়েছে ভোটারদের৷ কেউ ভয়ে সবার সামনে নৌকা ছাড়া অন্য প্রতীকে ভোট দিতে সাহস পায়নি৷ কেন্দ্রগুলোতে ছিলো না কোনো ধানের শীষের এজেন্ট৷ শত শত মানুষের অভিযোগ তারা কেন্দ্রে গিয়ে ভোট দিতে পারেনি৷ তাদের ভোট অন্যেরা দিয়ে দিয়েছে৷

আরও একটি চমকপ্রদ বিষয় হলো ধানের শীষের যেসব সমর্থক মামলার আসামি হয়ে পুলিশের ভয়ে কেন্দ্রে যায়নি তাদের ভোটও চলে গেছে নৌকায়৷ এই পদ্ধতি আজকে ঐক্যফ্রন্টের উপর প্রয়োগ করল ১৪ দল৷ কিন্তু ক্ষমতা কি চিরস্থায়ী? একদিন যে ১৪ দলের উপর ঐক্যফ্রন্ট অথবা অন্য কেউ প্রয়োগ করবেনা তার কি গ্যারান্টি আছে? গণতন্ত্রের শুভ্রতায় এই অগণতান্ত্রিক কালো রীতিটা সবার জন্যে আতংকের বিষয় নয় কি?

মানুষ এবার এমন প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন চায় নি৷ এবার তারা সরকার দল ও প্রতিদ্বন্দ্বী বিরোধী দল দুটোই চেয়েছিল৷ ঐক্যফ্রন্ট কমপক্ষে ষাট সত্তুরটি আসন পেয়ে সংসদে গিয়ে গণতন্ত্রকে প্রাণবন্ত করবে এমনটাই প্রত্যাশিত ছিল৷ কিন্তু তা হলো না৷ ঐক্যফ্রন্টের ৭ সংসদ শপথ না নিয়ে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে পুনর্নির্বাচন দাবী করছে৷ পুনর্নির্বাচনের দাবীতে রাস্তায় নেমেছে বামগণতান্ত্রিক জোটও৷ জাতীয় পার্টি একবার বলছে সরকারে থাকবে আরেকবার বলছে বিরোধী দলে থাকবে৷ রওশন এরশাদ বলছেন বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের এমন অবস্থা হবে জানলে তারা আলাদা নির্বাচন করতে যেতো৷ কেন বাংলাদেশের রাজনীতিকদের আকাঙ্ক্ষা কেবলই সরকার দলের এমপি হওয়া? সরকারি দলেরও আকাঙ্ক্ষা বিরোধী দলকে নির্মূল করে সংসদীয় রাজনীতিতে বিরোধী দলের সংকট সৃষ্টি করা? যেটি এখন বাংলাদেশে দৃশ্যমান হল৷ যথার্থ বিরোধী দল বিহীন গণতন্ত্র কি গণতান্ত্রিক ধারায় থাকতে পারবে ও পেরেছে কোথাও?