রাজনীতিকের প্রতিশ্রুতি সত্য হোক

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

রাজনীতিকের প্রতিশ্রুতি সত্য হোক

নূরুজ্জামান ১:৪২ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮

রাজনীতিকের প্রতিশ্রুতি সত্য হোক

‘তোরা যে যা বলিস ভাই, আমার সোনার হরিণ চাই’ রবি ঠাকুরের মতো সোনার হরিণের স্বপ্ন সবাই দেখে। যাদের কাছে সোনার হরিণ মানে টাকা-কড়ি, গাড়ি-বাড়ি তারা যে কোনো উপায়ে এগুলো পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে। ভালো কথা, যারা ব্যবসা করে বা চাকরি করে সোনার হরিণ ধরার জন্য চেষ্টা করছেন, তারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে দেশের উন্নয়নে বিরাট ভূমিকা রাখছেন। কিন্তু যারা চাঁদাবাজি করে, সন্ত্রাস করে, দুর্নীতি করে, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সোনার হরিণ ধরছেন তারা দেশ ও গণতন্ত্রের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছেন।

ধনতান্ত্রিক অর্থনীতিতে ব্যক্তির উন্নয়নের মাধ্যমেই দেশের উন্নয়ন হয়। ব্যবসায়ীরা মেধা শ্রম ও বিনিয়োগের মাধ্যমে নিজেদের উন্নয়নের জন্য কাজ করছেন। ব্যবসায়ীদের ভাগ্যের উন্নয়নের মাধ্যমে দেশে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষের মেধা ও শ্রমের ব্যবহারের ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে। মেধার বিকাশ ঘটছে। সুতরাং ব্যবসায়ীরা দেশের উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি। তাই তো বিভিন্ন দেশ বিদেশি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি করে দিচ্ছে। যাতে করে দেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়, দেশের মানুষের মেধার বহুমুখী ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি হয়। এতে করে দেশের মেধা সম্পদের উন্নয়ন ঘটে, দেশের রপ্তানি আয় বাড়ে, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়, দেশের উন্নয়ন হয়। 

কোটি কোটি মানুষ ব্যবসায়ীদের সৃষ্ট কর্মক্ষেত্রে কাজ করে নিজেদের ভাগ্যের উন্নয়ন ঘটান। দেশ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে উচ্চ হারে কর্পোরেট কর পায়। তাদের কর্মচারীদের কাছ থেকে ব্যক্তি শ্রেণির আয়কর পায়। সুতরাং ব্যবসায়ীরা যাতে করে আরও নতুন নতুন ক্ষেত্রে বিনিয়োগে উৎসাহ পান, সুযোগ পান সেই ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এখন সেই ব্যবসায়ীরা যদি চাঁদাবাজির শিকার হন, দুর্নীতির গ্যাঁড়াকলে আটকে যান তাহলে দেশের উন্নয়ন বহুলাংশে বাধাগ্রস্ত হয়। 

এ ছাড়া যানজট, জলজটে আটকে কর্মজীবী মানুষের বিপুল পরিমাণ কর্মঘণ্টার অপচয় হয়, তাদের শ্রমের অপচয় হয়। এতে করেও দেশ তার মেধাশক্তির পরিপূর্ণ ব্যবহার ও ফলাফল থেকে বঞ্চিত হয়। তাতেও দেশের উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হয়। 

যদিও ঢাকাসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কগুলোকে যানজটমুক্ত করার জন্য বিপুল কর্মযজ্ঞ চলছে তথাপি আমাদের আকাক্সক্ষা সেই কর্মযজ্ঞ বেগবান করা হোক। দেশ পরিচালক নেতারা যদি যোগ্য হন তবে দেশের কাক্সিক্ষত উন্নয়ন ঘটবেই। সেই ধরনের উন্নয়ন ধারায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই প্রবেশ করেছে এবং বিশ্বদরবারে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এখন প্রয়োজন এ উন্নয়ন ধারাকে আরও গতিশীল করার মতো সুযোগ্য নেতৃত্ব নির্বাচিত করা। 

অন্যদিকে যারা কাজ না করে মানুষকে ভয়-ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি করে, মাদকের ব্যবসা করে, খাদ্যে ভেজাল করে টাকা নামের সোনার হরিণ ধরার চেষ্টা করে তারা দেশের ব্যবসায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। যুব সমাজকে ধ্বংস করার কাজ করছেন, সাধারণ মানুষকে রোগাক্রান্ত করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছে। সুতরাং এদের যে কোনো মূল্যেই হোক থামাতে হবে। 

রাষ্ট্র যাদের দায়িত্ব দিয়েছে কানাকে পথ দেখানোর, কানাকে তার লাঠি ধরে রাস্তা পার করে দেওয়ার, তারা যদি কানাকে হাইকোর্ট দেখিয়ে টাকা নামের সোনার হরিণ ধরার কাজে লিপ্ত থাকেন, তবে তা হয় বেড়ায় ক্ষেত খাওয়ার মতো অবস্থা। সুতরাং ক্ষেত খাওয়া বেড়াগুলো ভেঙে ফেলতে হবে। ফাইলের সমস্যা সমাধানের জন্য সাহায্য না করে, ফাইল আটকে বিনিয়োগ বিলম্বিত করার মতো সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মচারী থাকলে তাদের বিরুদ্ধেও শক্ত অবস্থান নিতে হবে। রাষ্ট্রের উন্নয়নের গতিকে তরান্বিত করতে হলে ফাইল আটকে কানাকে হাইকোর্ট দেখানোর মতো লোকদেরই হাইকোর্ট দেখাতে হবে। রাজনীতিকরা হয়ে থাকেন কানাকে তার লাঠি ধরে রাস্তা পার করে দেওয়ার মতো জনসেবক। সেই জনসেবকদের কানার লাঠি কেড়ে নেওয়ার মানসিকতাসম্পন্নদের প্রতিপক্ষে শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে।

মধ্যম আয়ের দেশকে উন্নত দেশে পরিণত করতে হলে এসব অসভ্যদের কবল থেকে দেশ ও দেশের মানুষকে মুক্ত করার বিকল্প নাই। কানাকে হাইকোর্ট দেখালে ধোঁকাবাজি করা হয়, দেশের মানুষ যদি ধোঁকাবাজদের কবলে ঘুরপাক খায় তবে দেশের উন্নয়নও সেই ঘোরপাকের বৃত্তে আটকে থাকে। অন্যদিকে কানাকে পথ দেখালে পুণ্যের কাজ করা হয়। কানাও পথ চলতে চেষ্টা করতে পারে। কানার ভাগ্যের উন্নয়ন হয়। সেই সঙ্গে দেশেরও উন্নয়ন হয়। আমি মনে করি সেই দায়িত্ব সফলভাবে পালন করার যোগ্যতা তারাই রাখেন, যাদের জনগণ ভোট দিয়ে নির্বাচিত করেন। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মানসিক শক্তি থাকে, তাদের সঙ্গে জনগণ আছে। এ শক্তি সমাজে আর কারোই থাকে না। 

গণতন্ত্র! গণতন্ত্র! গণতন্ত্র! শুধু ভোটের গণতন্ত্র দিয়ে কী হবে যদি গণতন্ত্র জনতন্ত্র না হয়? নির্বাচনে জয়লাভের জন্য যদি জনগণকে ধোঁকা দেওয়া হয়, মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয় তবে তা কী গণতান্ত্রিক হয়? বাকস্বাধীনতা মানে কী মিথ্যা বলার স্বাধীনতা? মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে যেমন মিথ্যা তথ্য প্রকাশের স্বাধীনতা নয় তেমনি বাকস্বাধীনতা মানে মিথ্যা বলা বা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়ার স্বাধীনতা নয়। গণতান্ত্রিক অধিকার যেমন ফুটপাত দখল করে দোকান দেওয়া নয়, তেমনি ফুটপাতের দোকানদারদের কাছ থেকে চাঁদা নেওয়াও গণতান্ত্রিক অধিকার নয়। গণতান্ত্রিক অধিকার যেমন রাস্তায় যত্রতত্র গাড়ি পার্কিং নয়, তেমনি যেখানে সেখানে গাড়ি দাঁড় করিয়ে জানজট সৃষ্টি করাও নয়। গণতান্ত্রিক অধিকারগুলো হতে হবে ‘অন্যের অধিকার খর্ব না করে নিজের অধিকার ভোগ করা।’ ফুটপাত পথচারীদের হাঁটা চলার জন্য। ফুটপাত দিয়ে হাঁটা চলা করা পথচারীদের গণতান্ত্রিক অধিকার। সেই অধিকারে বিঘ্ন ঘটিয়ে ফুটপাতে দোকান বসানো মানে পথচারীদের অধিকার খর্ব করা। আবার ফুটপাতের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদাবাজি করা ঘৃণিত অপরাধ। বৈধ ব্যবসা করা যেমন ব্যবসায়ীদের তথা সব মানুষেরই গণতান্ত্রিক অধিকার, তেমনি সেই অধিকারের সহায়ক শক্তিগুলোর সেবা পাওয়াও ব্যবসায়ী তথা সব মানুষেরই গণতান্ত্রিক অধিকার। অন্যায়ভাবে ফাইল আটকে রাখা, ঘুষ চাওয়া ও নানা অজুহাতে ব্যবসায়ীদের কাজে বিঘ্ন সৃষ্টি করা মানে ব্যবসায়ীদের সেবা পাওয়ার অধিকার খর্ব করা। দেশের মানুষের মেধার বিকাশে, দেশের উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করা। আবার মাদকের ব্যবসা করা যেমন গণতান্ত্রিক অধিকার নয়, তেমনি মাদক সেবন করা, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবীদের সাহায্য করাও গণতান্ত্রিক অধিকার নয়। 

সমাজের প্রতিটা স্তরে চর্চার মাধ্যমে প্রকৃত গণতন্ত্রের উন্নয় ঘটে। রাস্তায় হাঁটারও একটা নিয়ম আছে। নিয়মানুযায়ী রাস্তায় চলাচল করতে শেখাও গণতান্ত্রিক শিক্ষারই অংশ। তেমনি নিজ সংসার থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানে, কর্মক্ষেত্রে, রাজনীতি ইত্যাদি সবখানেই গণতন্ত্রের চর্চার প্রয়োজন হয়। সেই চর্চার পথ ধরে গণতান্ত্রিক উন্নয়ন ঘটে। ভোট দেওয়া-নেওয়ার চর্চা প্রকৃত গণতন্ত্রে উত্তরণের পথে একটি প্রধান সিঁড়ি। আবার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশিত নির্বাচনী ইশতেহার যদি কেবলমাত্র ভোট পাওয়ার জন্য জনগণকে লোভ দেখানোর ইশতেহার হয় তবে সেই ধোঁকাবাজির প্রভাব সমাজে স্থায়ী অবক্ষয়ের পথ তৈরি করে। 

সুতরাং রাজনৈতিক দলগুলোকেও তাদের প্রতিশ্রুত নির্বাচনী ইশতেহার অনুযায়ী কাজ করতে হবে। রাজনৈতিক বক্তব্য বলে কথায় কথায় মিথ্যা কথা বলে জনগণকে ধোঁকা দেওয়া সবচেয়ে বড় অপরাধ। কারণ নেতাদের ধোঁকাবাজির কথাবার্তা সমাজে বিরাট প্রভাব ফেলে, জনগণ তা অনুসরণ করে। তাতে সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটে। যে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার কোনো বিকল্প নাই। তাই রাজনীতিতে সত্য বলার সংস্কৃতি চালু করা গণতন্ত্রের জন্য ও সমাজের সার্বিক কল্যাণের জন্য খুবই জরুরি। রাজনীতিকরা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি ও রাজনৈতিক বক্তব্যের নামে মিথ্যাচার থেকে যত দ্রুত বেরিয়ে আসবেন, তত দ্রুত দেশ সত্যিকার গণতন্ত্রের পথে এগিয়ে যাবে। তাই রাজনীতিকদের প্রতিশ্রুতি ও বক্তব্য সত্য হওয়া বাঞ্ছনীয়। 

নূরুজ্জামান: কলাম লেখক।

[email protected]