মানবিক মূল্যবোধের ‘মায়াবী জানালা’

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯ | ৫ চৈত্র ১৪২৫

মানবিক মূল্যবোধের ‘মায়াবী জানালা’

শহীদ ইকবাল ১:৩৬ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮

মানবিক মূল্যবোধের ‘মায়াবী জানালা’

কথাটি ব্রিটিশ কবি কিটসের। আমরা যারা এ ভূগোলের বাসিন্দা-তারা ‘মায়াবী’। কিটস তার সময়ে ‘[email protected]’-বিশ্ব ও মানবের সম্পর্কের গুরুত্বে এমনটা বলেছিলেন। যা হোক, আমাদের এ দেশের উত্তরে আছে হিমালয়, দক্ষিণে সমুদ্র; এটা মৌসুমি বায়ুর দেশ। বৃষ্টিপাতের দেশ। নাতিষীতোষ্ণ তার আবহাওয়া। ষড়ঋতুতে এখানে ফুল ফোটে, বায়ু পরিবর্তন হয়, বিচিত্র বর্ণের-ধর্মের-আচারের মানুষ এখানে নানাভাবে, নানা চিন্তায় বসত করে। কেউ কাউকে আঘাত দেয় না।

ধর্ম অনেক কিন্তু দেশ সবার। এই তো চল হয়ে আসছে কতকাল! কেউ কারও দখলি নেয় না। কত ভাষা কত সংস্কৃতি এদেশে-সেজন্যই বাউল-পীর-মুর্শিদ-দরবেশ-ফকির এসেছেন অনেককাল। তাদের অধ্যাত্মদৃষ্টি সৃষ্টিতে তুলে ধরেছে অপার ঐশ্বর্য। লালন-হাছন-আবদুল করিম বা বিজয় সরকার সবার হয়ে গান বেঁধেছেন।

তাতে ধর্মচর্চায় ছেদ পড়েনি। বাধাও হয়নি। তার ভেতর দিয়েই একাত্তরে মুক্তির ঐক্য গড়ে উঠেছিল। ভাষার ঐক্য, বিভিন্ন জাতির ঐক্য, সব শ্রেণির মানুষের ঐক্য অন্তর্লীন। এ ঐক্যের লক্ষ্য ছিল মুক্তি। স্বাধীন ভূখণ্ডে মুক্তি। সব ধর্মের মানুষই এ ঐক্যের প্রশ্নে অভ্রান্ত লক্ষ্যে পৌঁছেও যায়। আগে কী এমনটা ছিল? ছিল না, কারণ সর্বদা ক্ষাত্রশক্তির দ্বারা আমরা শোষিত হয়েছি। এগিয়ে যাওয়ার জন্য প্রতিরোধ করেছি। প্রতিরোধী শক্তির বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। তারপর সফলতা এসেছে। ঐক্য হয়েছে, পরাজিত হয়েছে প্রতিরোধী শক্তি।

রাষ্ট্র ও সংবিধানে তখন তার দায়িত্বও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ফলে আইনের শাসন, বিচারের স্বাধীনতা সবটুকু একটি রাষ্ট্রে নির্ধারিত হয়। লাল সবুজের পতাকায় মানবমুক্তির স্বপ্ন গড়ে ওঠে। বাঙালিত্ব নিয়ে বা ধর্ম নিয়ে তো কোনো প্রশ্ন নাই। কেউ প্রশ্নও তোলেনি। প্রয়োজনও পড়েনি। অনেকেরই মনে আছে, হিন্দু-মুসলমান-বৌদ্ধ-ক্রিস্টিয়ান-সাঁওতাল-মগ-চাকমা পাশাপাশি সবাই ছিল, স্বভাবমতো। কেউ কারও ওপর হামলে পড়েনি, আক্রান্তও হয়নি। পারস্পরিক সহাবস্থান কিংবা খাওয়া-থাকা-গুজব করা কোনোটাতেই কারও সমস্যা হয় নাই। বিশ্বাসটাই ছিল ওরকম। প্রাত্যহিক আচার-আনুষ্ঠানিকতা, প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক সে বিশ্বাসের ভেতরেই প্রতিষ্ঠা ছিল। কিন্তু এখন কী দেখা যায়? মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ তো ক্রমশই ফ্যাকাশে হয়ে পড়েছে। পরস্পরের বিরুদ্ধে অভাব অভিযোগ অনেক।

এ ভূখ-কে স্বাধীনভাবে পেয়ে, আমাদের ঐক্য অভেদ হয়নি। আটচল্লিশ বছরের যে ইতিহাস তাতে আমরা বিচ্ছিন্ন হয়েছি, আলাদা হয়েছি-যুক্তি-তর্কে-প্রশ্নে-জিজ্ঞাসায়-আস্থায়-অনাস্থায় ক্রমেই বিভেদ তৈরি করেছি। আর সেই পৃথক হওয়ার সুযোগে অপশক্তির অনুপ্রবেশ ঘটেছে তীব্রভাবে-সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে। সভ্যতা, সংস্কৃতি তো আর স্থির কিছু নয়। তা চলমান ও পরিবর্তনশীল। গত কয়েক দশকে তার গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। ওপর-কাঠামো ও ভেতর-কাঠামোতেও রূপান্তর হয়েছে। সে রূপান্তরের পথ ধরে এই পৃথিবী হয়ে উঠেছে টেনিসনকথিত ‘নিষ্ঠুর রক্তলাঞ্ছিত দন্তনখরময়’। 

তাই তো আমাদের জীবনে বিপর্যস্ততা, অপমান এত বেশি। চলাফেরায় বাধা অনেক। মুক্তির পর্যায়গুলো বাধাপ্রাপ্ত। বিপরীত ধর্মের নামে ব্যক্তি-জাতি-সমাজ-গোষ্ঠী-সংঘ আলাদা। পরিবারে পরিবারে ভেদ। একে অন্যকে, চেনায়-বলায় কিংবা পরিচয়ে পার্থক্য করে। বন্ধুত্বে দোটানা, অপচয়। সুবিধার আশ্রয়ে সবটুকু গড়া। পরিবারও তাই। প্রযুক্তির অভিশাপ পরিব্যাপ্ত। ফলে সহজপাচ্য ধর্মের নামে জিঘাংসা বাড়ে। তাই অনেক ক্ষেত্রে পরাস্ত হয় মানবতা। ছাত্র শিক্ষককে নৃশংসভাবে খুন হয়। প্রতিবেশীকে চেনা যায় না। রক্ষণশীলতার বেড়াজালে অসাম্য বঞ্চিত করে সবাইকে। দারিদ্র্য সৃষ্টি হয়েছে। দারিদ্র্যের সুযোগে ধর্মব্যবসা বেড়েছে।

ক্রমাগত গরিব শ্রেণিই নয়, ধনীরাও সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। অবসাদ, ক্লান্তি, প্রাচুর্য, অর্থের অনর্থ, অসম্ভব আকাক্সক্ষা উন্নাসিক প্রজন্ম গড়িয়ে ফেলে। শেকড়-অস্তিত্ব অচেনা হয়ে যায়। নিজ ভাষার চেয়ে পরভাষা হয় আপন। হিন্দি, ইংরেজি, ফরাসি, স্প্যানিশ শিখে বাংলা-বাঙালিপনা ভুলে যায়। সংশ্রব নেই। কারণ, ওই অসাম্যের তারে সবকিছু বাধা। উঁচুস্তরের শ্রেণি তৈরি হয়েছে, সেখানে নীচু পরাস্ত, অপরিচিত। মধ্যখানে মধ্য শ্রেণি অনিকেতপরায়ণ, দোদুল্যমান। এ সুযোগে ধমান্ধ মওকা বৃদ্ধি। মনে আছে, আশি-নব্বইয়ের দশক থেকে যে ধর্মীয় ইউটোপিয়া সাম্রাজ্যবাদের বিপরীতে তৈরি হয় তার প্রথম আঘাত মার্কিনিরাই অবলোকন করে, ওয়ান ইলাভেনে। গ্রেট ম্যাসাকার। সেটি আর কোনো অঞ্চলে কিন্তু থেমে থাকেনি। এমকি লাদেন হত্যার নামে এ উপমহাদেশে যা হয়েছে-তাও ভয়ঙ্কর।

এখন বাংলাদেশের মানুষ তো ধর্মান্ধ নয়; ধর্মপ্রিয়, ধর্মের প্রতি সহানুভূতিশীল। একাধারে তারা অনেকাংশে দরিদ্রও। বিদ্যা, পড়াশোনা, সংস্কৃতিচর্চা, মুক্তচিন্তার চর্চা করা (ধর্মচর্চা ছাড়া) সবই বলা চলে প্রথম প্রজন্ম ধরে চলছে। আধুনিকতার চর্চাও করছে ওই প্রথম প্রজন্মই। সেখানে সংস্কার, কুসংস্কার, মূল্যবোধের প্রথা ভাঙা এবং উৎকর্ষ সাধনের জায়গাটি যে খুব শক্ত তাও বলা যায় না। ফলে আবেগের বশে কেউ অধিক বিপ্লবী হয়ে যেতে পারে, কেউ বা জঙ্গি হতেও আটকায় না। সাধারণত, এ সমাজ স্তরের ধনীর ছেলেদের ইহজীবনের চাওয়া পাওয়া ও প্রাচুর্যের অধঃক্ষেপ যখন শেষ হয়ে যায় তখন তাদের শান্তির জায়গা আর কী থাকে! কীভাবে বা কোথায় তারা শান্তি খুঁজবে? তখন কোনো শিক্ষকের প্ররোচনায় কিংবা স্বর্গীয় সুধা লাভের আকাক্সক্ষায় দ্রুত সহজপথে ঝুঁকে পড়ে। এ জন্য খুব বেশি শ্রম ব্যয়ের তো প্রয়োজন পড়ে না। প্রাচুর্য থেকেই অনর্থ আসে।

এ বাংলাদেশকে, আমাদের স্বীয় ঐতিহ্যকে, স্বতন্ত্র পরিচয়ে ফিরিয়ে আনতে হবে। পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মানবিক সম্পর্ককে আমলে আনা জরুরি। যোগসূত্র তৈরি করতে হবে। পরস্পরের মধ্যে খুলে দিতে হবে কিটসকথিত ‘মায়াবী জানালা’। এর বিকল্প কী? ‘নতুন প্যারাডাইম’ সৃজন করা! আমরা জানি, অনেকের ভোগসামগ্রী যখন সীমাহীন তখন সে ধর্মকেই আঁকড়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। কারণ, তাতে যুক্তির চেয়ে ভক্তির গুরুত্ব বেশি। তা সরল আবেগে নিঃশঙ্ক কমিটমেন্ট তৈরি করে। এখন যে মীমাংসাহীন রহস্যময় অদৃশ্য পারলৌকিক জীবন সেখানে মীমাংসা বা আশ্রয়েয় পরিণতি কী? আবার ঠিক বিপরীতে যে দরিদ্র, যার কিছুই নেই-সেও সহজভাবে নিয়তির বিশ্বাসের কাছে নিজেকে সর্বস্বত্ব ভেবে সমর্পণ করছে। তার মধ্যেই শান্তি খুঁজে পাচ্ছে। সম্পদ-প্রাপ্যতার বিচারে যে এক্সট্রিম অবস্থা সেখানে ধর্ম কী ইক্যুয়াল নয়! 

এ জন্যই এ উঠতি নতুন প্রজন্মের মাঝে অন্ধতার ভক্তিপ্রাণতা আমরা লক্ষ করি। সেখানে পারিবারিক শিক্ষা, সামাজিক শিক্ষা, রাষ্ট্রীয় শিক্ষা কোনোটাই তেমন গুরুত্ব পায় না। চিন্তা ও যুক্তির বিবেচনা সেখানে যেন পরাস্ত। বিপরীতে আবেগ আর ভক্তির কমিটমেন্টই সত্য। সত্যিকার অর্থে, তারা বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসটাও ঠিকমতো চেনে না। সে শিক্ষা পায়ওনি। এর ফলে সঠিক সাংস্কৃতিক প্রবাহটি ধরতে পারছে না। ভোগবাদ আর প্রযুক্তির ঝলসানিতে বিছিন্ন হতে হতে অনেকেই সহনশীলতার সংস্কৃতি হারিয়ে ফেলেছে। পরাস্ত হয়েছে যৌক্তিক জীবনের কাছে। এ উদাসীনতায় ম্যাথু আর্নল্ডের ‘ডেভার বিচ’ কবিতায় কথা ভাবি : ‘অপসৃয়মান স্রোতের পেছনে ধাবমান/প্রিয়তমা এ প্রতারক উদাসীন বিশ্বে/কোনো ভালোবাসা নেই, শান্তি নেই/নেই বেদনায় কোনো সান্ত্বনা।’ 

এখন এ উদাসীনতার পরিণতি একটু ভিন্নরকম হলেও তো আমরা দেখতেই পাচ্ছি। এখানে মেধার যৌক্তিক বা সুচারু প্রসার ঘটেনি। তখন তো প্রশ্ন আসে কীভাবে প্রকৃত সত্যে ফেরানো যাবে? কীভাবে আমাদের চৌকস প্রজন্মের জন্য মায়াবী জানালা খুলে দেওয়া সম্ভব? পরিবার-সমাজ এ ক্ষেত্রে কতটুকু ভূমিকা রাখতে পারে? সরকার রাষ্ট্র কতটুকু আইন শাসন বিচার ব্যবস্থা দিয়ে সত্যিকারের সংস্কৃতিকে ফিরিয়ে দিতে পারে? ধর্মবিরোধিতা নয়, ধর্মান্ধতা নয়, জঙ্গি নয়, প্রগতিশীল আধুনিক উন্নয়নশীল সত্যিকার বাংলাদেশ তো আমাদের প্রয়োজন। এটা কীভাবে সম্ভব? পারিবারিক শিক্ষার পাশাপাশি শিক্ষাঙ্গনে নৈতিক শিক্ষার দিকে জোর দেওয়াটা তো খুব জরুরি। 

প্রসঙ্গত, স্কুল-কলেজের পাঠ ও পাঠদানের নির্ভেজাল মনিটরিং নাই। তৃণমূল পর্যায়ে অনেক স্কুল আছে কিন্তু লেখাপড়ার অবস্থা ভালো নয়। থানা ও জেলা শিক্ষা-কর্মকর্তারা অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক দায়িত্ব পালন করছেন না। দুর্নীতির রাহুগ্রাস তো সর্বত্র-তার কী হবে! রাষ্ট্রের দুর্নীতি রোধ কবে হবে। আসলে ‘কান টানলে মাথা আসার’ মতো সব ব্যাপার। 

শুধু মোটিভেশনে কাজ হবে না। বিদ্যাচর্চায় মানবিক মূল্যবোধ ফিরিয়ে আনতে হবে। শিক্ষা সহায়ক কার্যক্রমকে গতিশীল করতে হবে। মুখস্থ বিদ্যা-হোক তা ইংরেজি বা বাংলা কোনো কাজেই আসবে না। প্রশ্নশীল, যুক্তিশীল প্রজন্মের কোনো বিকল্প নেই। অন্য বিভাগের কথা বাদ দিই, শিক্ষা বিভাগে দুর্নীতি দূর করতে হবে। এটা রোধ করে জবাবদিহি কায়েম করতে হবে। প্রতিষ্ঠান তো অনেক, সরকার অর্থ দিচ্ছে কিন্তু কাজ হচ্ছে না। শিক্ষকতা তো ব্রত। সেটি কেউ ভাবে না। এ বিভাগে প্রশাসনিক, একাডেমিক দুর্নীতি বেশুমার পর্যায়ের। 

পাশাপাশি সরকারের সর্বদলীয় উদ্যোগ, স্থানীয় থেকে বিভিন্ন পর্যায় পর্যন্ত প্রশাসনিক মোটিভেশন জরুরি। আর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নিরপেক্ষ থেকে কাজ করতে হবে। আরও যুগোপযোগী করে তুলতে হবে। এসব কঠিন প্রতিজ্ঞা ছাড়া কিছুই সহজ নয়। সাফল্যও আসবে না। সর্বস্তরে ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজটা করতে হবে। রাষ্ট্রকে কাজকর্মে সক্রিয় করে তুলতে হবে। সেটাই মানুষের দাবি। সেখানে দুর্নীতি তাড়িয়ে জবাবদিহি ও আইনের শাসনের সংস্কৃতি রক্ষা করাটা জরুরি। শিক্ষা-শিক্ষক-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষার্থী এক অভিমুখ হতে হবে। এ মূল্যবোধের ‘মায়াবী জানালা’ আমাদের খুলে দিতে হবে। 

সবাই মিলে দেশের কাজ করতে হবে। আর সেখানে ন্যায় প্রতিষ্ঠাটা সবার আগে না হলে সবকিছুই ভেস্তে যেতে পারে। আবার সদ্যপ্রয়াত নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তীকে স্মরণে নিয়ে বলি : ‘দুই কল্পের, দুই ভাবনায়, একই জন্মে দুই জীবনের/মিলনলগ্নে আমরা দাঁড়িয়ে আছি।/দেখতে পাচ্ছি-আমাদের এক দিকে আজ পূর্ণগ্রাস, অন্যদিকে পূর্ণিমা।’ 

শহীদ ইকবাল : অধ্যাপক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

[email protected]