লিঙ্গবৈষম্যে সমতায়ন ও বাংলাদেশ

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯ | ৫ চৈত্র ১৪২৫

লিঙ্গবৈষম্যে সমতায়ন ও বাংলাদেশ

আবু আফজাল মোহা. সালেহ ১:৩৩ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮

লিঙ্গবৈষম্যে সমতায়ন ও বাংলাদেশ

সম্প্রতি ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের (ডব্লিউইএফ) গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ রিপোর্ট-২০১৮ প্রকাশ করেছে। এখানের চিত্রে বাংলাদেশের কিছু আশার খবর আছে। কিছু নিরাশার খবরও অবশ্য আছে। তবে আশার খবরগুলোর অগ্রগতি বেশি। লিঙ্গবৈষম্য প্রতিবেদনে নারী-পুরুষের সমতার দিক দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় সব দেশের ওপরে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ। চারটি ক্ষেত্রে আবার বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে।

এই চারটি ক্ষেত্র হলো- ছেলে ও মেয়ে শিশুদের বিদ্যালয়ে ভর্তি, মাধ্যমিকে ছেলে ও মেয়েদের সমতা এবং সরকারপ্রধান হিসেবে একজন নারীর অবস্থানকাল, জন্মের সময় ছেলে ও মেয়ে শিশুর সংখ্যাগত সমতা। অবশ্য শেষেরটির ক্ষেত্রে আমাদের কিছুই করার নেই। তাই বলা যায়, এ সূচকটি না আনা ভালো ছিল। এটা এ প্রতিবেদনের দুর্বল দিক বলে মনে করি।

ডব্লিউইএফের প্রদিবেদনটিতে ১৪৯টি দেশের নারী-পুরুষের সমতার চিত্র তুলে ধরা হয়। এতে মোট চারটি মূল সূচকের ওপরে দেশের অবস্থান নির্ধারণ করা হয়। এগুলো হলো- নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগ, শিক্ষায় অংশগ্রহণ, স্বাস্থ্য ও আয়ু এবং রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন। এর ভেতরে আবার ১৪টি উপসূচক আছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত এক যুগে নারী-পুরুষ সমতার ক্ষেত্রে বেশ ভালো উন্নতি হয়েছে বাংলাদেশের।

সার্বিক বৈশ্বিক র্যাঙ্কিং অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান ৪৮তম। ২০০৬ সালেও বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৯১তম। নারী-পুরুষ সমতায় দক্ষিণ এশিয়ায় প্রতিবেশী দেশগুলো বাংলাদেশের চেয়ে অনেক পিছিয়ে আছে। বাংলাদেশের পরে রয়েছে শ্রীলঙ্কা, অবস্থান ১০০তম। নেপাল ১০৫, ভারত ১০৮, মালদ্বীপ ১১৩, ভুটান ১২২ ও পাকিস্তান ১৪৮তম অবস্থান পেয়েছে। র্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষ পাঁচে রয়েছে- আইসল্যান্ড, নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড ও নিকারাগুয়া। সবার শেষে ১৮৯তম স্থানে রয়েছে ইয়েমেন।

তবে প্রতিবেদনে দেখা যায়, এক যুগের হিসাবে বেশ এগোলেও বাংলাদেশের সামগ্রিক অবস্থান অবশ্য গতবারের তুলনায় এক ধাপ অবনতি হয়েছে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ ৪৭তম হয়েছিল। চারটি মূল সূচকের মধ্যে এ বছর দুই দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবনতি হয়েছে। নারীর অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ ও সুযোগের ক্ষেত্রে পিছিয়েছে বাংলাদেশ। শিক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ একটু পিছিয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে দেখা যায়। নারী শিক্ষার দিক দিয়ে পাঁচ ধাপ পিছিয়ে এবার অবস্থান হয়েছে ১১৬তম। অন্যদিকে স্বাস্থ্য ও আয়ুর ক্ষেত্রে ৮ ধাপ এগিয়ে ১১৭ ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে দুই ধাপ এগিয়ে ৫ম হয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের একটি আশাবাদের দিকগুলো আমরা দেখলাম। এসব অর্জন অবশ্য এক দিনে হয়নি। দেশে গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর এসব ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি হয়েছে। দেশের প্রায় অর্ধেক অংশ নারী। তাই সর্বক্ষেত্রে নারীর প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করেই লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্য কমিয়ে আনতে পারে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণে অগ্রাধিকার দিতে হয়। এসব বিষয়ে সরকার সদা তৎপর।

মূল বিষয় হচ্ছে, শিক্ষাক্ষেত্রে নারীর অবস্থান। নারী শিক্ষার প্রভাব সব ক্ষেত্রে পড়ে থাকে। অর্থনীতি উন্নয়ন, শ্রমবাজারের বৃদ্ধি, রাজনীতির উন্নয়ন বা সার্বিক সমতায়ন বা অন্যান্য সূচকের বৈষম্য কমাতে নারী শিক্ষা চালিকাশক্তি হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে। আর নারী শিক্ষা অগ্রগতি আর সহজতর করার জন্য নারীর জন্য চাকরি বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে কোটা সিস্টেম নারী-পুরুষের মধ্যে বৈষম্য কমাতে সাহায্য করছে।

আর একটি বিষয় লক্ষণীয়, সরকারের এসব নীতিমালা বাস্তবায়নের প্রোগ্রাম/প্রকল্পে বেসরকারি খাতের ভূমিকা অনেক বেশি রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি সংস্থা-জনগণের ত্রিমুখী চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করার প্রবণতা এ ক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করছে।

তবে আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার জন্য আমাদের আরও কিছু ক্ষেত্রে জোর দিতে হবে। বাল্যবিয়ে কমানো, নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও দক্ষতার দিক দিয়ে মানোন্নয়নের ওপর বিশেষ নজর দিতে হবে। সেক্টরভিত্তিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। মানোন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। এসব ক্ষেত্রে আরও বরাদ্দ দিতে হবে। বেসরকারি সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। মনিটরিং ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। সরকারি সংস্থাগুলো শক্তিশালী করতে হবে। বিআরডিবিকে শক্তিশালী করে এ ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে পারে সরকার।

এ ক্ষেত্রে বিআরডিবিভুক্ত বিভিন্ন প্রকল্পের জনবলকে রাজস্ব খাতে আনতে পারে সরকার। তাহলে এসব জনবল কাজে লাগিয়ে সরকারের বিভিন্ন প্রোগ্রাম বাস্তবায়ন করতে পারে। প্রাচীন সরকারি এ সংস্থার তৃণমূল পর্যন্ত কার্যক্রম বিস্তৃত। জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে এ সংস্থার বিকল্প খুবই কম আছে বলে মনে করি। প্রধানমন্ত্রী অনেক ভালো কাজ করেছেন। তিনি এ বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন।

বাংলাদেশ সবচেয়ে ভালো করেছে রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের সূচকে। এই সূচকে সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। অর্থাৎ পৃথিবীতে যেসব দেশে নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তাদের মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম।

এই সূচকে বাংলাদেশ প্রায় অর্ধেক বৈষম্য কমিয়ে এনেছে। রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের তিনটি উপসূচক রয়েছে প্রতিবেদনে। সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্বের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৮০তম এবং নারী মন্ত্রীর সংখ্যার দিক থেকে ১২৬তম। শিক্ষায় অংশগ্রহণের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৬তম।

এ ক্ষেত্রেও কিছু উপসূচক আছে। এর মধ্যে সাক্ষরতার হারের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান ৯৯তম। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েদের সমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে ১ নম্বর অবস্থান পেলেও উচ্চশিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১২১তম। এরপর স্বাস্থ্য ও আয়ুর সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১১৭। এর উপসূচক আছে দুটি। ছেলে ও মেয়ে শিশু জন্মের সমতায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ১ নম্বরে। আর আমৃত্যু সুস্থ জীবনযাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৫তম।

দেখা যাচ্ছে, জীবনের শুরুতে নারীদের ইতিবাচক সূচকে অগ্রগতি থাকলেও পরবর্তী জীবনে তা ধরে রাখতে না পেরে পিছিয়ে পড়ছে। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় বা অন্যান্য কুসংস্কার, পুরুষতান্ত্রিক মনোভাব ও বিভিন্ন ঝামেলা এড়াতে নারীদের এগিয়ে না আসা প্রভৃতি কারণ রয়েছে। জনসচেতনতা বৃদ্ধি এ ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ ভূমিকা পালন করতে পারবে। এসব বিষয়গুলোতে আমাদের বিশেষ নজরদারি বাড়াতে হবে। প্রয়োজনে বিশেষ কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।

প্রতিবেশী দেশগুলোর চেয়ে অনেক ক্ষেত্রে বাংলাদেশের পজেটিভ অগ্রগতি হয়েছে। ভারত ২০০৬ সালের তুলনায় এখন আরও পিছিয়েছে। নারী-পুরুষ সমতার দিক দিয়ে ২০০৬ সালে দেশটির অবস্থান ছিল ৯৮তম। এখন ১০ ধাপ পিছিয়ে ১০৮তম অবস্থানে ভারত। নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে ১৯তম, শিক্ষায় ১১৪, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে ১৪২ ও স্বাস্থ্যে ১৪৭তম অবস্থানে রয়েছে ভারত। এক যুগে পাকিস্তান পিছিয়েছে ৩৬ ধাপ। সার্বিকভাবে ১৪৮তম হলেও নারীর ক্ষমতায়নে দেশটির অবস্থান ৯৭, শিক্ষায় ১৩৯, স্বাস্থ্যে ১৪৫ ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণে ১৪৬তম।

ওপরের প্রতিবেদনের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, বৈশ্বিক লিঙ্গবৈষম্যে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধিত হয়েছে গত এক যুগে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে পিছিয়েছে। অগ্রগতির ধারা বজায় রেখে পিছিয়ে পড়া সূচক/ক্ষেত্রগুলোতে সরকার বিশেষ নজর দিতে হবে। বেসরকারি সংস্থাগুলোকে আরও অংশগ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে। বিআরডিবি, মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর, শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো, ট্রেনিংসংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। সর্বোপরি জনসচেতনতা বাড়াতে হবে।

জনসম্পৃক্ততা বা নারী সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে। নারীসংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডে নারী কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে পুরুষ কর্মকর্তা-কর্মচারীর কাছে নারীরা বাস্তব অবস্থা তুলে ধরতে কুণ্ঠাবোধ করেন। এসব বিষয়গুলো সরকার বিশেষ নজর রাখছে। তবে আরও তীক্ষ্ন নজর বাড়াতে হবে বলে মনে করি।

আবু আফজাল মোহা. সালেহ : কবি, প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট

[email protected]