ইশতেহার ও বাস্তবতার ফারাক

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

ইশতেহার ও বাস্তবতার ফারাক

আশেক মাহমুদ ৪:০০ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮

ইশতেহার ও বাস্তবতার ফারাক

নির্বাচনী ইশতেহারের দিকে মানুষের আগ্রহের অভাব বেড়েই চলছে বরং মানুষের ঝোঁক প্রবণতা নির্বাচনী পরিবেশ নিয়ে। রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে শুধু রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারে না। এর জন্য দরকার প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বস্ততার জায়গা তৈরি করা। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে মানুষ শুধু স্বৈরাচারী শাসন প্রক্রিয়াকেই দেখেনি, নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ধারণার অভাব দেখা দিয়েছে।

জনগণের অধিকার ও নিরাপত্তার স্বার্থেই তারা রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার প্রতি আস্থা রাখতে চায়। থমাস হবসের মতে, মানুষ নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থেই রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি আস্থাবান থাকে। কিন্তু ব্যক্তি মানুষের মতে, সরকার ব্যবস্থা যখন স্বৈরাচারী হয়ে পড়ে তখনি মানুষের অধিকার শৃঙ্খলিত হয়। সে কারণে জ্যাকস রুশোকে বলতে হয়েছিল, ‘Men are born free, but everywhere are in chains.’ রুশো তখন জনগণের সাধারণ ইচ্ছা বা অধিকার প্রতিষ্ঠায় গণমুখী জনপ্রিয় সরকার ব্যবস্থা কায়েমকে গুরুত্ব দেন।

জনগণের সাধারণ ইচ্ছা বাস্তবায়নের প্রধান উপায় তাদের সামষ্টিক অধিকার আদায়কে গুরুত্ব নিশ্চিত করা। সেই চিন্তায় নির্বাচনী ইশতেহার তৈরি করা হলে তা সানন্দ্যে গৃহীত হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু দেশের মানুষ মনে করে বাজেটের মতো ইশতেহারও মনোরঞ্জনের একটা হাতিয়ার হয়ে গেছে।

ইশতেহারে সব দলেরই একটা চেষ্টা থাকে এটা বুঝানো যে, আমরা জনগণের অধিকার বাস্তবায়নে ও তাদের সমস্যা সমাধানে বদ্ধপরিকর। কিন্তু এখন কেন জানি জনগণ সেই ইশতেহারে কি আছে তা জানতে তেমন আগ্রহ প্রকাশ করছে না-এটা রাষ্ট্র ও জনগণের জন্য একটা বড় সংকট।

এরূপ সংকটের কারণ হলো ইশতেহারে অনাস্থা। সব ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, নির্বাচিত হলে সরকার দুর্নীতি, লুটপাট ও মাদকের আগ্রাসন থেকে দেশকে রক্ষা করবে; এ ছাড়া কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ, শিল্প ক্ষেত্রে ব্যাপক উন্নতি করবে, দারিদ্র্য বিমোচন করবে, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসমুক্ত করবে, সরকারকে জবাবদিহির আওতায় আনবে, বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। অথচ এরকম প্রতিশ্রুতি জনগণকে আর আকৃষ্ট করতে পারছে না। কারণ দুর্নীতিবাজ, লুটপাটকারী, ঋণখেলাপিরা যদি নির্বাচিত হয় তাহলে এক নিমিষেই সব প্রতিশ্রুতির কবর হয়।

এখানে প্রশ্ন হলো, কি করে একটা দেশ দুর্নীতিমুক্ত হবে যদি এমপি, মন্ত্রীরা সেই দুর্নীতির নেতৃত্ব দিতে থাকে? কি করে মাদকমুক্ত হবে যদি মাদক সম্রাটরাই ক্ষমতাসীন হয়? কি করে কৃষি স্বাস্থ্য খাতে উন্নতি হবে যদি কৃষক ন্যায্য মূল্য না পায়, স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নতি কি করে হবে যদি তা দুর্নীতি আর পুঁজিবাদের শিকলে বন্দি হয়ে পড়ে? উন্নয়ন পরিকল্পনা কি করে হবে যদি বিশ্বব্যাংক, আইএমএফের পরিকল্পনা অগ্রাধিকার পায়? দারিদ্র্য বিমোচন কি করে হবে যদি দারিদ্র্য নিয়ে এনজিওরা অবাধ ব্যবসা করতে পারে? আর তাই ইশতেহার যতটা গুরুত্বপূর্ণ তার চেয়ে অধিক গুরুত্বপূর্ণ হলো আস্থা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া। এ কাজটি না হলে মনোমুগ্ধকর ইশতেহারে কোনো লাভ নেই।

জন লক তার সামাজিক চুক্তি তত্ত্বে বলেছেন, ‘সরকার ব্যবস্থার লক্ষ্য হবে মানুষের প্রাকৃতিক অধিকার রক্ষা করা। যদি সে লক্ষ্য সরকার পূরণ করতে না পারে তখনি আইন ও সরকার ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ে।’ এরূপ সংকটের সমাধানে যে বিষয়টি সবার সামনে আসবে তা হলো গণমুখী নির্বাচনী পরিবেশ প্রস্তুত করা। গণমুখী পরিবেশ মানে যে কাউকে নির্বাচিত করা বা যে করেই হোক একটা নির্বাচন করা নয়।
উপযুক্ত পরিবেশ মানে নির্বাচন হতে হবে উচ্চমানের নীতিমালার ওপর ভিত্তি করে যা বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকবে নিরপেক্ষ সৎ ও সুযোগ্য নির্বাচন কমিশনের। প্রথমত, এ নীতিমালায় কোনো ক্ষমতালোভী, দুর্নীতিবাজ, ঋণখেলাপি, পেশিশক্তিধারীরা মনোনয়ন পাবে না। সে ক্ষেত্রে দরকার স্বাধীন নিরপেক্ষ দুর্নীতি দমন কমিশনের সহযোগিতা। দুর্নীতি দমন কমিশন যদি দুর্নীতিগ্রস্ত থাকে, তাহলে মনোনয়নে দুর্নীতির ছাপ পড়বে-এটাই স্বাভাবিক।

দ্বিতীয়ত, এমন প্রার্থী যেন মনোনয়ন পায় যারা চরিত্রগতভাবে সৎ, জ্ঞানী, বিচক্ষণ এবং সর্বোপরি জনগণের প্রতি রয়েছে অকৃত্রিম দরদ ও ভালোবাসা, কিন্তু তারা হবে ক্ষমতার প্রতি নির্লোভ। তৃতীয়ত, মানসম্পন্ন স্বাধীনচেতা সিভিল সোসাইটির কার্যকর ভূমিকা নিশ্চিত করা। সমাজবিজ্ঞানী গ্রামসি সিভিল সোসাইটির ভূমিকাকে উন্নত রাষ্ট্র ব্যবস্থার অন্যতম শর্ত হিসেবে উপস্থাপন করেন।

এ ক্ষেত্রে গ্রামসি দায়িত্বশীল জ্ঞানীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে বিশেষভাবে উল্লেখ করেন। এ বুদ্ধিজীবী শ্রেণি যখন ইন্টারেস্ট গ্রুপের মধ্যে পড়ে যায় তখনি স্বৈরাচারী রাষ্ট্র ব্যবস্থা শক্ত ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে যায়। মূলত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মধ্যে যদি উচ্চমানের জ্ঞান ও উচ্চমানের নৈতিকতাবোধের বিকাশ না ঘটে, জনগণ তখন শাসন প্রক্রিয়ায় আস্থার জায়গা খুঁজে পায় না। এ অনাস্থার জায়গা থেকে জনগণ ভোটকে মুক্তির উৎস মনে করে না। আর তাই মুক্তমনের উন্নত সিভিল সোসাইটি ছাড়া মানসম্পন্ন নির্বাচনী পরিবেশ কল্পনা করা যায় না। এটি অবশ্যই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ।

আপাতত নির্বাচন কমিশন যে কাজটি করতে পারে তা হলো জনগণ যাতে উন্মুক্ত পরিবেশে ভোট প্রদানে উৎসাহিত হয় সেই ব্যবস্থা করা। সঙ্গে সঙ্গে জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সেনাবাহিনী ও মিডিয়ার সক্রিয়তাকে পাকাপোক্ত করা এ কমিশনের নৈতিক দায়িত্ব। কোনোভাবেই যেন ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি না হয় সেই জায়গাটা নিশ্চিত করতে হবে।

সে ক্ষেত্রে সিভিল সোসাইটির ওপরও দায়িত্ব বর্তায়। মনে রাখতে হবে, একটি সমাজ ও রাষ্ট্র তখনি দুর্বল হয়, যখন সিভিল সোসাইটি জ্ঞান ও নৈতিকতার ভিত্তি হারিয়ে বিজাতীয় ও বস্তুর শিকলে আবদ্ধ হয়ে পড়ে। সেই জায়গা থেকে উত্তরণ না হলে জাতির মুক্তি সুদূরপরাহত।

আশেক মাহমুদ : সহকারী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
[email protected]