‘জল পুলিশের আন্ডারে’

ঢাকা, রবিবার, ২০ জানুয়ারি ২০১৯ | ৬ মাঘ ১৪২৫

‘জল পুলিশের আন্ডারে’

মাসুদ কামাল হিন্দোল ৩:৫৫ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ২৬, ২০১৮

‘জল পুলিশের আন্ডারে’

যে দেশে বহু মতপ্রকাশের সুযোগ রয়েছে এবং ভিন্নমতের রাজনৈতিক দল ও সামাজিক সাংস্কৃতিক ধর্মীয় সংগঠন মতপ্রকাশ করতে পারে স্বাধীনভাবে, মোটাদাগে সেসব দেশকে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে অভিহিত করা হয়। সে হিসেবে বাংলাদেশকে একটি গণতান্ত্রিক দেশ বলা যায়(?) কি না তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। যদিও কোনো কোনো আন্তর্জাতিক গবেষণায় স্বৈরাচারী দেশ বলা হয়েছে বাংলাদেশকে। স্বৈরশাসনের যে ৮টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে তার সবকটিই এ মুহূর্তে বাংলাদেশে বলবৎ আছে-এমন তথ্য প্রকাশিত হয়েছে আন্তর্জাতিক মিডিয়াতে।

এ অবস্থায় গণতন্ত্র এসে থমকে দাঁড়িয়েছে টিভি পর্দায়। ফেরারি গণতন্ত্রকে টিভি পর্দায় দেখা যাচ্ছে মাঝে মাঝে। অনেকেই মনে করেন, বাংলাদেশ এখন মধ্যরাতের টকশোর গণতন্ত্রের দেশ। শুধু টকশোতেই কথা বলা যায়। তাও সেলফ সেন্সরশিপের চাদরে মোড়া সব চ্যানেলে নয়। সেটাও নির্ভর করে সরকারের মেজাজ-মর্জির ওপর।

একটা গণতান্ত্রিক দেশে নানা মত-পথের মানুষ থাকেন। বিভিন্ন ইস্যুতে তারা তাদের মতামত প্রকাশ করেন স্বাধীনভাবে। একজন মানুষের কোনো একটি বিষয়ে একটি মত থাকতে পারে, এটাই স্বাভাবিক।

কোনো একটি বিষয়ে তিনি পক্ষে-বিপক্ষে থাকতে পারেন বা মতামত দিতে পারেন। আবার নিরপেক্ষও থাকতে পারেন। এটা তার সাংবিধানিক অধিকার। আমাদের সংবিধানের ৩৯ ধারায় মতামত প্রকাশের সে অধিকার দেওয়া হয়েছে রাষ্ট্রের নাগরিকদের। কিন্তু ইদানীং আমরা দেখছি একজনের একটি মত না। অনেক মত। শত মত। তিনি একেকটা পরিচয়ে একেক ধরনের মতামত দেন। একই ব্যক্তি একাধিক পদে থাকেন। তাই তারা একাধিক মতামতও দেন। নিজের সুবিধামতো পদবি ব্যবহার করে বিভিন্ন মাধ্যমে কথা বলে যাচ্ছেন অবিরাম।

রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন এমন ব্যক্তির কোনো মন্তব্য নিয়ে যখন বিতর্কের সৃষ্টি হয় তখন বলা হয় এটা তার ব্যক্তিগত মতামত। এমন অবস্থা দেখেছি একজন নির্বাচন কমিশনারের একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে (এ ধরনের অবস্থা আগেও হয়েছে বিভিন্ন ঘটনায়)। এ ধরনের অবস্থায় বলা হয় এটা কমিশন বা সরকারের মতামত নয়। তাই এটা তারা ওন করবেন না। এ বক্তব্যের দায়-দায়িত্ব তারা নেবেন না। এ ধরনের আচরণ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান ও সরকারের পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোও করছে তাদের যার যার সুবিধামতো। একই দলের নেতারা তিন-চার রকমের কথা বলেন একই ইস্যুতে। তাদের নির্দিষ্ট কোনো স্পোক পারসনও নেই, যেটা আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশসহ অনেক দেশেই রয়েছে। যারা দলের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেন।

একজন ব্যক্তি যখন কোনো রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বপূর্ণ পদে থাকেন তখন তার ব্যক্তিগত মতামত প্রকাশের সুযোগ আছে কি না, এমন প্রশ্ন উঠেছে জনমনে? রাজনৈতিক দলের নেতা-নেত্রী ও সুশীল-নাগরিক-বুদ্ধিজীবী সমাজ যে মতামত দেন তাতে পরোক্ষ জনমত গড়ে ওঠে। সেখানেও সেই একই সমস্যা। বাংলাদেশের জনমত এখন চরম বিভ্রান্ত। এমন কিছু ব্যক্তি আছেন একই সঙ্গে সাংবাদিক তথা সম্পাদক, সাংবাদিক নেতা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, নেতা-নেত্রীর উপদেষ্টা। কোনো একটি রাজনৈতিক দলের ব্যানারে নির্বাচন করে পরাজিত হয়েছেন বা আগামীতে নির্বাচন করার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা যখন মতামত দেন তখন কোনো পদবির প্রতিনিধিত্ব করেন?

তারা তাদের রাজনৈতিক পরিচয়টাকে আড়াল করেই কথা বলেন অনেক সময়। সাবেক সচিব, রাষ্ট্রদূতরাও রাজনৈতিক পরিচয় গোপন করতে তৎপর, রাজনৈতিক পরিচয় থাকা সত্ত্বেও। আবার একই সঙ্গে একাধিক জোটেও থাকছে রাজনৈতিক দলগুলো। এমনকি কোনটা তাদের নিজ দলের বক্তব্য আর কোনটা জোটের সেটাও বোঝা যায় না। তারা একেক ফোরামে গিয়ে একেক কথা বলেন।

তাদের কোনটা বাত আর কোনটা সিরিয়াস সেটা বোঝা দায় হয়ে যাচ্ছে দিন দিন। পরিস্থিতি অনুযায়ী বদলে যায় কথার ধরনও। টকশোতে আলোচনায় বিশিষ্ট আলোচকদের কাউকে কাউকে দেখেছি সরকারবিরোধী বলে পরিচিত প্রাইভেট টিভি চ্যানেলে সরকারের বিপক্ষে কথা বলেছেন। একই দিন বাংলাদেশ সরকার নিয়ন্ত্রিত বিটিভিতে (বাংলাদেশ টেলিভিশন) সরকারের পক্ষে কথা বলতে। আবার অন্য আরেকটি টিভি চ্যানেলে সেদিনই নিরপেক্ষ অবস্থানে তাকে দেখা গেল। একই দিন একজন মানুষের একটি বিষয়ে তিন ধরনের মত কীভাবে হতে পারে? সত্যিই সেলুকাস।

এটা আমাদের দেশেই সম্ভব। মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে তিন রকমের মতামত প্রকাশ করলেন তিনটি টিভি চ্যানেলে। মাঝে মাঝে তারা আবার সাধারণ নাগরিক হিসেবেও কথা বলেন। মতপ্রকাশে যেন রংধনুর ছটা লেগেছে। তাদের এই একাধিক মতামতে সাধারণ জনসাধারণ বিভ্রান্ত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। তারা আসলে কি বলতে চান অনেক সময় সাধারণ মানুষ তা বুঝতে পারেন না। আমাদের মাতৃভাষা বাংলায় বলার হওয়ার পরও। তারাও পরিষ্কার করে বলেন না। মতামতের প্রকাশ ভঙ্গিও জটিল হয়ে পড়েছে। একেই কি বলে একই অঙ্গে কত রূপ? তাহলে তারা কি বহুরূপী? তাদের আসল রূপ জনসাধারণের কাছে খোলাসা হচ্ছে না অনেক ক্ষেত্রে। পরিষ্কার হওয়াটা অনেক বেশি জরুরি ছিল এ ক্রান্ত্রিলগ্নে।

দুর্গার হাতের মতো তাদেরও অনেক মতামত। একজন ব্যক্তির একাধিক মতামত আমাদের মতো সমাজে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আমরা এখন বিভ্রান্তির বেড়াজালের মধ্য দিয়েই গুরুত্বপূর্ণ সময় অতিবাহিত করছি। সাধারণ মানুষের মতামত একটাই। কথায় বলে না, ভদ্রলোকের এক কথা। তাদের এত কথা বা এত মত কেন? তাদের এই রূপ দেখে পুরনো সেই জোকসটির কথা বারবার মনে পড়ছে। ভারতের কলকাতায় পুলিশ এক আসামিকে ধরতে গেছে। আসামি পুলিশ দেখে দৌড়ে পানিতে নেমে পড়ে। পুলিশ যখন তার হাতে হাতকড়া পরাচ্ছে তখন আসামি বলছেন, ‘খবরদার আমাকে গ্রেপ্তার করবেন না? আমি এখন জল পুলিশের আন্ডারে’।

লেখক : সাংবাদিক ও রম্যলেখক
hindol_khan@yahoo.com