একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের গল্প

ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মার্চ ২০১৯ | ৫ চৈত্র ১৪২৫

একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের গল্প

ডা. এ কে মাহবুবুল হক ৯:২৯ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৮

একটি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের গল্প

নাম আব্দুল গফুর মাস্টার। এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে ১৯১২ সালের ৩ মার্চ জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বি-বাড়িয়া জেলার বাঞ্ছারামপুর থানার মাছিমনগর গ্রামের রহিম উদ্দিন সরকারের সর্বকনিষ্ঠ সন্তান। ব্রিটিশ শাসনামলে শ্রেণি-বৈষম্যের কারণে বেশিদূর লেখাপড়া করতে পারেননি। ১৯৩০ সালে রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মেট্রিক পাস করেন। পাস করার পর তিনি ভাবলেন, নিজ গ্রামের লোকগুলোকে অশিক্ষা, কুসংস্কার ও দারিদ্র্যের অভিশাপ থেকে মুক্ত করতে হলে শিক্ষার কোনো বিকল্প নাই। সে লক্ষ্যে দুলালপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার পেশায় যোগদান করেন।

আব্দুল গফুর মাস্টার এলাকার শিক্ষার হার বাড়ানোর জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে লোকদের বুঝিয়ে স্কুলগামী করতে লাগলেন। একসময় কাঞ্চনপুর গ্রামের মুন্সি রোসমত আলী সরকারের মেয়ে রাবেয়া বেগমের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আব্দুল গফুর মাস্টারের ৪ ছেলে, ২ মেয়ে। বড় ছেলে একে ফজলুল হক, দ্বিতীয় ছেলে একে মোজ্জাম্মেল হক, মেজো ছেলে এ কে মাহবুবুল হক, ছোট ছেলে এ কে এনামুল হক। বড় মেয়ে মন্নুজান বেগম, ছোট মেয়ে ফরিদা আক্তার। বেশ সুনামের সঙ্গে ব্রিটিশদের সব বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে এলাকায় শিক্ষার আলো জ্বালাতে শুরু করলেন। 

১৯৭১ সালে রেডিওতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার হলে আব্দুল গফুর মাস্টার এলাকার ঘরে ঘরে গিয়ে তা প্রচার করতে থাকেন এবং পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্য সবাইকে আহ্বান জানান। গফুর মাস্টারের বড় ছেলে এ কে ফজলুল হক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এম কম এবং এ কে মোজাম্মেল হক তখন বিএসসির ছাত্র। এ কে মোজাম্মেল তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে উপস্থিত থেকে বঙ্গবন্ধুর ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ শুনেন। ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে দুই ভাই যুদ্ধে যাওয়ার জন্য মরিয়া। গফুর মাস্টারও দুই ছেলেকে ভারতের আগরতলায় ট্রেনিং সেন্টারে পাঠান। ইচ্ছা থাকার পরও বার্ধক্যজনিত কারণে তিনি মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করতে পারেননি। 

তারপরও গফুর মাস্টার বসে থাকেননি। এলাকার বিভিন্ন লোকদের মুক্তিবাহিনীতে যোগদানের প্রেরণা দিতে লাগলেন। সহধর্মিণী রাবেয়া খাতুনের বড় ভাই মুন্সি রুসমত আলী সরকারের বড় ছেলে আব্দুল ওয়াজেদ সরকার ও অন্যরা মিলে এলাকার অনেককে মুক্তিবাহিনীতে যোগদান করান। নভেম্বরের প্রথম সপ্তাহে মাছিমনগর ও কাঞ্চনপুর গ্রামে মুক্তিবাহিনী আসেন। এ সময় গফুর মাস্টার, আব্দুল ওয়াজেদ সরকার ও এলাকাবাসী মিলে মুক্তিবাহিনীদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। 
আব্দুল গফুর মাস্টারের দুই ছেলে আসাম প্রদেশের হাফলং ক্যাম্পে বিএলএফের (মুজিব বাহিনী হিসাবে পরিচিত) ট্রেনিং শেষ করে ২ ও ৯নং সেক্টরে বর্তমান আখাউড়া, বি-বাড়িয়া, আশুগঞ্জ, নবী নগর ও তৎকালীন কুমিল্লা জেলার বিভিন্ন জায়গায় পাক হানাদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করেন। মোজাম্মেল হক ছিলেন খুবই সাহসী। তার সবচেয়ে বড় অপারেশন ছিল নবীনগর থানাকে পাক বাহিনী, ইপিআর ও রাজাকারদের হাত থেকে মুক্ত করা। সময়টি ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে প্রথম দিকের। 

মোজাম্মেল হক ও তার সহযোদ্ধারা একসঙ্গে থানায় আক্রমণ করার পরিকল্পনা করেন। তার জবানিতেই শোনা যাক- ‘কমান্ডারের নির্দেশে গভীর রাতে আমরা থানার দিকে অগ্রসর হতে থাকি। আমাদের উপস্থিতি টের পেয়ে পাক বাহিনী থানার ভেতর থেকে আমাদের লক্ষ্য করে বেপরোয়া গুলিবর্ষণ করতে শুরু করে। আমরাও পাল্টা গুলিবর্ষণের মাধ্যমে প্রতিরোধ গড়ে তুলি। ঘণ্টাখানেক গোলাগুলির পর থানায় অবস্থানরত রাজাকারা আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়। কিন্তু পাক বাহিনী ও ইপিআর সদস্যরা আমাদের কাছে আত্মসমর্পণ করতে রাজি হয়নি। আমরা তখন ২নং সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশারফের অধীনে ছিলাম। হাত মাইকে বারবার আত্মসমর্পণের কথা বললেও তারা রাজি হয়নি। কোণঠাসা হয়ে একপর্যায়ে তারা কেন্দ্র থেকে আসা যৌথবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। ওই সম্মুখযুদ্ধে অনেক মুক্তিযোদ্ধা আহত হন। আমিও আহত হই। অপারেশন পরে আমরা থানা থেকে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করি।’

১৯৭১ সালের ডিসেম্বর মাসের প্রথম দিকে আব্দুল গফুর মাস্টারের দুই ছেলে এ কে ফজলুল হক ও এ কে মুজ্জাম্মেল হক যুদ্ধ শেষে ফিরে বাড়ি ফিরে আসে। তৃতীয় ছেলে এ কে মাহবুবুল হক দুই মুক্তিযোদ্ধো ভাইয়ের কাছে পাক বাহিনীকে পরাজিত করার গল্প শুনতেন। তখন থেকেই বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিবাহিনীর অনুপ্রেরণায় এ কে মাহবুবুল হক দেশ সেবার লড়াকু সৈনিক হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলতে শুরু করেন। তিনি কাঞ্চনপুর ফ্রি প্রাইমারি স্কুলে শিক্ষাজীবন শুরু করেন। ১৯৭৯ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুর রূপসদী বৃন্দাবন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ১৯৮১ সালে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন।

১৯৮৮ সালে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস করার পর ১৯৯০ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে সরাসরি ক্যাপ্টেন পদে আর্মি মেডিকেল কোরে যোগদান করেন। সফলভাবে কমিশন লাভ করে পার্বত্য চট্টগ্রামে ২ বছর কর্মরত ছিলেন। ১৯৯৪ সালে মেজর, ২০০৯ সালে লে. কর্নেল, ২০১১ সালে কর্নেল ও ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি লাভ করেন। তিনি জাতিসংঘ মিশনের অধীনে ১৯৯৬-১৯৯৯ সালে ৩ বছর ৩ মাস কুয়েত ও ২০১১ সালে সুদানে ১ বছর কর্মরত ছিলেন। ২০০৬ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমপিএইচ ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০০৯-২০১১ সাল পর্যন্ত সাভার ক্যান্টনমেন্টে দুটি ইউনিটের অধিনায়ক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ২০১১ সালে প্রমোশন পেয়ে ঢাকা ও জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট এবং পরে সিলেটে কর্নেল পদে কর্মরত ছিলেন। ২০১৩ সালে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি) থেকে এমফিল ডিগ্রি অর্জন করেন। ২০১৬ সালে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পদে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পরিচালক হিসেবে কাজ করছেন। 

ডা. এ কে মাহবুবুল হক : পরিচালক, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল