জাল কিংবা ছেঁড়া নোট

ঢাকা, রবিবার, ১৬ জুন ২০১৯ | ২ আষাঢ় ১৪২৬

জাল কিংবা ছেঁড়া নোট

রিয়াজুল হক ৯:২৪ অপরাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৯, ২০১৮

জাল কিংবা ছেঁড়া নোট

অনেক দেশের মুদ্রাবাজার জাল নোটে ভরপুর। জাল এবং কালো টাকা বেশ কিছু দেশের মুদ্রাবাজারে এমনভাবে ছড়িয়ে রয়েছে, সরকার পর্যন্ত সেটা নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে। এ সমস্যা দূরীকরণসহ মূল্যস্ফীতির লাগাম টেনে ধরার জন্য ভেনিজুয়েলা দেশটির বহুল ব্যবহৃত ১০০ বলিভার নোট বাতিল করেছে। ভারত তার মুদ্রাবাজারের সর্বোচ্চ দুটি মানের রুপি বাতিল করেছে।

মূলত, যে তিনটি কারণে ভারত নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তার একটি হচ্ছে বাজার থেকে জাল নোট মুক্ত করা।

জাল নোট আমাদের দেশের জন্যও হুমকিস্বরূপ। জাল টাকা যেহেতু ছড়িয়ে রয়েছে, তাই আমাদের জানা উচিত আসল টাকার কিছু বৈশিষ্ট্য। অন্যথায় কষ্টের উপার্জিত টাকা কখন যে জাল টাকায় রূপ নেবে, তা আদৌ বলা যায় না। সাধারণ মানুষের কিছুটা সচেতনতার অভাব এবং জাল নোটকারবারিদের নিত্যনতুন প্রযুক্তির উদ্ভাবন এ সমস্যা সবাইকেই ভাবিয়ে তুলেছে। প্রত্যেকেরই জানা উচিত আসল নোটের বৈশিষ্ট্যগুলো। বড় নোটের ক্ষেত্রে জাল করার বিষয় জড়িত থাকে। এ জন্যই বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক নির্ধারিত ১০০, ৫০০, ১০০০ টাকা মূল্যমানের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর প্রতিকৃতি সংবলিত আসল ব্যাংক নোটের কিছু সহজ বৈশিষ্ট্য, যা খালি চোখে দ্রুত বোঝা যায়, আমাদের জেনে রাখা প্রয়োজন। 

নোটটি সিনথেটিক ফাইবার মিশ্রিত অধিক টেকসই কাগজে মুদ্রিত হবে। নোটের ডানদিকে আড়াআড়িভাবে ইন্টাগ্লিও কালিতে ৭টি সমান্তরাল লাইন আছে। নোটের সামনের দিকে ইন্টাগ্লিও কালিতে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি মুদ্রিত আছে। ১০০০ টাকার নোটের ডানদিকে অন্ধদের জন্য ৫টি ছোট বিন্দু;  ৫০০ টাকার নোটের ডানদিকে অন্ধদের জন্য ৪টি ছোট বিন্দু এবং ১০০ টাকার নোটের ডানদিকে অন্ধদের জন্য ৩টি ছোট বিন্দু রয়েছে যা হাতের স্পর্শে উঁচু-নিচু অনুভূত হবে। নোটের বাম পাশে ৪ মিলিমিটার চওড়া নিরাপত্তা সুতা; যাতে বাংলাদেশ ব্যাংকের লোগো ও ১০০, ৫০০, ১০০০ টাকা লেখা আছে; সরাসরি দেখলে লোগো ও ১০০, ৫০০, ১০০০ টাকা সাদা দেখাবে; কিন্তু পাশ থেকে দেখলে বা ৯০ ডিগ্রিতে নোটটি ঘুরালে তা কালো দেখাবে। কাগজে জলছাপ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিকৃতি; প্রতিকৃতির নিচে অতি উজ্জ্বল ইলেক্ট্রোটাইপ জলছাপে ১০০, ৫০০, ১০০০ লেখা আছে এবং জলছাপের বাম পাশে বাংলাদেশ ব্যাংকের উজ্জ্বলতর ইলেক্ট্রোটাইপ জলছাপ রয়েছে। ১০০, ৫০০, ১০০০ টাকার নোটের সামনের দিকে পটভূমি বা ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা অফসেটে জাতীয় স্মৃতিসৌধ রয়েছে। ১০০০ টাকার নোটের পেছনের দিকে ইন্টাগ্লিও কালিতে জাতীয় সংসদ ভবন মুদ্রিত আছে যা হাতের আঙ্গুলের স্পর্শে অসমতল অনুভূত হবে। ৫০০ টাকার নোটের পেছনের দিকে ইন্টাগ্লিও কালিতে বাংলাদেশের কৃষি কাজের দৃশ্য মুদ্রিত আছে যা হাতের আঙ্গুলের স্পর্শে অসমতল অনুভূত হবে। ১০০ টাকার নোটের পেছনের দিকে ইন্টাগ্লিও কালিতে ঢাকার তারা মসজিদ মুদ্রিত আছে যা হাতের আঙ্গুলের স্পর্শে অসমতল অনুভূত হবে। ১০০, ১০০০ টাকার ডানদিকের কোণায় ১০০, ১০০০ লেখাটি সরাসরি তাকালে সোনালি এবং তির্যকভাবে তাকালে সবুজ রং দেখা যাবে। ৫০০ টাকার ডানদিকের কোণায় সরাসরি তাকালে ৫০০ লেখাটি লালচে এবং তির্যকভাবে তাকালে সবুজ রং দেখা যাবে।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ফেসবুক পেজে ‘সহজেই জাল টাকা শনাক্ত করবেন যেভাবে’ বিষয়ক একটি প্রতিবেদনে কিছু সহজ উপায় উল্লেখ করা হয়েছে। জাল টাকার টাকার নোটগুলো নতুন হবে কারণ জাল টাকার নোটগুলো সাধারণ কাগজের তৈরি; তাই পুরাতন হয়ে গেলে সেই নোট নাজেহাল হয়ে যায় বা তা অতি সহজেই বোঝা যায়। জাল টাকার নোট ঝাপসা দেখায়। আসল নোটের মতো ঝকঝকে থাকে না। জাল নোট হাতের মধ্যে নিয়ে মুষ্টিবদ্ধ করে কিছুক্ষণ পর ছেড়ে দিলে তা সাধারণ কাগজের মতো ভাঁজ হয়ে যাবে। আর আসল নোট ভাঁজ হবে না। যদিও সামান্য ভাঁজ হবে তবুও তা জাল নোটের ক্ষেত্রে তুলনামূলক অনেক বেশি। টাকা সবসময় দুটি অংশ দিয়ে তৈরি হয়। টাকার দুই পাশে দুটি নোট জোড়া লাগানো থাকে এবং এটা হরিণের চামড়া দিয়ে তৈরি বলে পানিতে ভেজালেও খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে যাবে না। আর জাল নোট পানিতে ভেজানোর সঙ্গে সঙ্গেই তা ভেঙে যাবে। আসল নোট সবসময় খসখসে হবে।

এরপর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আসা যাক। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না একটা নোট কতটুকু ছেঁড়া থাকলে তার সম্পূর্ণ কিংবা আংশিক মূল্যমান পেতে সমস্যা হয় না। যদি নিজের কাছে রাখলে মনে হয় সেই নোটের কোনো বিনিময় মূল্য পাওয়া যাবে না, তবে যে কোনো ব্যাংকের শাখা থেকে টাকা পরিবর্তন করে নিতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক (নোট রিফান্ড) রেগুলেশন্স অ্যাক্ট-২০১২-এর আলোকে ছেঁড়াফাটা নোট ব্যাংক শাখায় গ্রহণ এবং উহার বিনিময় মূল্য প্রদান প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংক ১৪-০১-২০১৩ তারিখ একটি পরিপত্র জারি করে। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক কর্মকর্তা মূলত, দুটি বিষয় নিশ্চিত হয়ে অল্প ছেঁড়াফাটা ও ময়লা নোটের বিপরীতে সম্পূর্ণ বিনিময় মূল্য দিয়ে থাকবেন। (ক) উপস্থাপিত নোটটিতে সম্পূর্ণ নোটের ৯০%-এর বেশি অংশ বিদ্যমান থাকবে এবং আসল নোট হিসেবে শনাক্ত হতে হবে। (খ) উপস্থাপিত নোট একাধিক খণ্ডে খণ্ডিত নয় এবং খণ্ড দুটি একই নোটের অংশ হতে হবে। খণ্ডিত নোটের ক্ষেত্রে নোটের একদিকে হালকা সরু কাগজ দিয়ে এমনভাবে জোড়া লাগাতে হবে, যেন আসল নোট সহজেই বোঝা যায়। দুই খণ্ডে বিচ্ছিন্ন হয়নি, কিন্তু সামান্য নাড়াচাড়ায় নোটটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে পারে এমন জীর্ণ নোটের ক্ষেত্রেও এক পিঠে হালকা সরু কাগজ লাগাতে হবে, যেন নোটটি পরীক্ষা করতে কোনো অসুবিধা না হয়।

অনেক সময় নোটের অবস্থা বেশি খারাপ হয়ে থাকে, অর্থাৎ অত্যধিক জীর্ণ, আগুনে পোড়া, ড্যাম্প বা সম্পূর্ণ নোটের ৯০ ভাগ বা তার চেয়ে কম থাকলে, নোট গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে তার মূল্য প্রদান করা হয় না। এ ক্ষেত্রে, নোটের মূল্যমান, সিরিজ নম্বর, জমাদানকারীর নাম ও পূর্ণ ঠিকানা সংবলিত আবেদনপত্রের সঙ্গে ব্যাংক নোটটি গ্রহণ করবে। জমাদানকারীর আবেদনপত্রসহ গৃহীত নোট শাখার ফরওয়াডিং পত্রের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের জারিকৃত পরিপত্রের বিধি মোতাবেক বাংলাদেশ ব্যাংকের নিকটস্থ শাখায় নোটটি প্রেরণ করবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের নোটটি পাওয়ার আট সপ্তাহের মধ্যে নোট রিফান্ড রেগুলেশন্সের আওতায় নোটটির মূল্য প্রদানের বিষয়ে সিদ্ধান্ত জানাবে এবং মূল্য প্রদানযোগ্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের হিসাবে প্রদান করবে।

টাকায় কোনো সমস্যা মনে হলে অবশ্যই নিকটস্থ যে কোনো ব্যাংকের শাখায় যোগাযোগ করা প্রয়োজন। প্রতিটি ব্যাংক গ্রাহকদের সেবা দেবে। সব শ্রেণির মানুষকে ব্যাংকিং সেবার আওতার আনার কর্মসূচির আওতায় কৃষকদের জন্য ১০ টাকা দিয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সেই আমানতের বিপরীতে তাদের শস্য ঋণ দেওয়া হচ্ছে। স্কুল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব খুলতে উৎসাহিত করা হচ্ছে এবং এ ধরনের আমানত হিসাবের বিপরীতে সার্ভিস চার্জ নেই। হিজড়া সম্প্রদায়ের জন্যও ব্যাংক হিসাব খোলার কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছে। সবাই যেন ব্যাংকের সেবা পেতে পারে, সে জন্যই সব আয়োজন। এ কারণে ব্যাংক যেসব সেবা প্রদান করে, সে সম্পর্কে সবাইকে অবহিত হতে হবে। অনেকেই অজ্ঞতাবশত সামান্য ছেঁড়াফাটা বা ময়লা নোট চলবে কি না, এ সন্দেহে কষ্টে উপার্জিত টাকা বিভিন্ন মধ্যস্বত্বভোগী দালালের কাছে কম মূল্যে বিক্রি করে দেয়। অথচ বিভিন্ন দুষ্ট চক্র থেকে পরিত্রাণ পেতে একটু কষ্ট করে ব্যাংকে গেলে, বিনিময় মূল্য হিসাবে পুরো টাকা বা যথাযথ পরিমাণ টাকা ফেরত পেতে পারত।

সাধারণ মানুষের কাছে বিষয়টি সহজ ও বোধগম্য করার জন্য, বাংলাদেশ ব্যাংকের জারিকৃত পরিপত্র অনুযায়ী, ব্যাংকের প্রত্যেক শাখায় জনসাধারণের সহজে দৃষ্টিগোচর হয় এমন স্থানে ‘ছেঁড়াফাটা ও ময়লা নোট গ্রহণ করা হয়’, এই মর্মে নোটিস স্থাপন করতে হবে। নোটিসে উল্লেখ থাকবে, ময়লা অবিকৃত নোটের বিনিময় মূল্য জমাদানের সঙ্গেই প্রদান করা হয়। ছেঁড়া নোটের কোনো অংশ যদি অনুপস্থিত থাকে এবং বিদ্যমান অংশ যদি ৯০%-এর অধিক হয়, তবে সেরূপ নোটের সম্পূর্ণ বিনিময় মূল্য সরাসরি কাউন্টারের মাধ্যমে প্রদান করা হয়। কোনো নোট যদি একাধিক খণ্ডে খণ্ডিত না হয় এবং নোটের সম্পূর্ণ অংশ বিদ্যমান থাকে তাহলে সে নোটের সম্পূর্ণ বিনিময় মূল্য কাউন্টারেই প্রদান করা হয়। একই সঙ্গে, জাল নোট উপস্থাপনকারীকে এবং একাধিক নোটের বিভিন্ন অংশ সংযোজন করে (বিল্ট আপ) নোট উপস্থাপনকারীকে আইনপ্রয়োগকারী কর্তৃপক্ষের কাছে সোপর্দ করা হয়, বিষয়টি নোটিসে উল্লেখ থাকবে।

নোট জাল করা ও জাল নোট লেনদেন শাস্তিযোগ্য অপরাধ। ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে জাল নোট কারবারির যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ১৯৮৭ সালে আইন সংশোধন করে জাল নোটের সঙ্গে জড়িতদের মৃত্যুদণ্ড বা ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডসহ অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ড দেওয়ার বিধান রাখা হয়। জাল নোটের সঙ্গে জড়িত প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনতে হবে। এ ছাড়া, আমাদের অনেকেই ছেঁড়া নোটের বিনিময় হার সম্পর্কে সচেতন নয়। এই সুযোগে বাট্টায় টাকা বিনিময় কর্মকাণ্ডে জড়িত দালাল শ্রেণি ফায়দা লুটে নিচ্ছে। ভুক্তভোগী হচ্ছে সাধারণ মানুষ, যারা সচেতনতার অভাবে নিজেদের প্রাপ্য অর্থ পেতেও বঞ্চিত হচ্ছে। অথচ দেশের প্রত্যেকটি উপজেলায় একাধিক ব্যাংকের শাখা রয়েছে। এখন প্রয়োজন আমাদের সচেতনতা। সেটা জাল শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে হোক কিংবা ছেঁড়া নোটের বিনিময় হারের প্রাপ্যতা সম্পর্কে হোক।

রিয়াজুল হক : উপ-পরিচালক, বাংলাদেশ ব্যাংক
[email protected]