নির্বাচনী উত্তাপ সীমা ছাড়াচ্ছে না তো?

ঢাকা, সোমবার, ২৫ মার্চ ২০১৯ | ১১ চৈত্র ১৪২৫

নির্বাচনী উত্তাপ সীমা ছাড়াচ্ছে না তো?

জ্যোতির্ময় নন্দী ১২:২৫ পূর্বাহ্ণ, ডিসেম্বর ১৪, ২০১৮

নির্বাচনী উত্তাপ সীমা ছাড়াচ্ছে না তো?

১০ ডিসেম্বর নির্বাচন কমিশন প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুরোদমে শুরু হয়ে গেছে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা। প্রতীক বরাদ্দের পর ইসি সচিবালয়ের নির্বাচন ব্যবস্থাপনা শাখার যুগ্ম সচিব ফরহাদ আহাম্মদ খান প্রচার-প্রচারণাকালে নির্বাচনী বিধিমালা লঙ্ঘন না করতে এবং সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ অক্ষুণ্ন রাখতে প্রার্থীদের আহ্বান জানিয়েছেন।

কিন্তু ইসির এ আহ্বানে কজন প্রার্থী শেষপর্যন্ত সাড়া দেবেন, কজন চোরা শুনবে ধর্মের কাহিনী, সে ব্যাপারে প্রচারণার প্রথম দিন ১১ ডিসেম্বরই যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ দেখা দেয়। প্রচারণা শুরুর দিনেই নিহত হয়েছেন নোয়াখালীর এক যুবলীগ নেতা।

একই দিন ঠাকুরগাঁওয়ে নিজ নির্বাচনী এলাকায় যাওয়ার পথে হামলা ও ভাঙচুর হয়েছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের গাড়িবহরে। অভিযোগ পাওয়া গেছে, নোয়াখালীতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের প্রচার মিছিলে হামলা চালিয়েছে ছাত্রলীগ-যুবলীগের ক্যাডাররা। আক্রমণ চালানো হয়েছে চুয়াডাঙ্গা-১ আসনে ধানের শীষের প্রার্থী শরীফুজ্জামার শরীফের গাড়িবহরেও। দুই প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর কর্মী-সমর্থক-ক্যাডারদের মধ্যে গোলাগুলির খবর এসেছে চট্টগ্রাম থেকে।

একই দিনে ভোলা-৩ আসনে বিএনপি প্রার্থী মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমদ ইসিকে অভিযোগ জানান, রাজধানী থেকে সন্ত্রাসীরা তার আসনভুক্ত এলাকায় গিয়ে ঘাঁটি গেড়েছে এবং তাদের ভয়ে তিনি নির্বাচনী প্রচার চালাতে সেখানে যেতে পারছেন না। এসব সন্ত্রাস অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে রাস্তাঘাটে টহল দিচ্ছে এবং তার দলের নেতাকর্মীদের ভয়-ভীতি দেখাচ্ছে বলে হাফিজউদ্দিন তার অভিযোগে উল্লেখ করেন।

প্রচারণার প্রথম দিনেই এসব অপ্রীতিকর ঘটনা আমাদের দাঁড় করিয়ে দিচ্ছে অতীতের অসংখ্য তিক্ত স্মৃতির মুখোমুখি। আলামত দেখে মনে হচ্ছে, প্রতিহিংসা ও প্রতিশোধের, সন্ত্রাস ও সহিংসতার অপরাজনীতির অন্ধ বলয় থেকে এখনো আমরা বেরিয়ে আসতে পারিনি।

অথচ দীর্ঘ ১০ বছর পর সব দলের অংশগ্রহণের মধ্যে দিয়ে একটা সুষ্ঠু, সুন্দর, পরিচ্ছন্ন নির্বাচন দেখার জন্য জাতির আগ্রহ এখন তুঙ্গে। ভোট উৎসব বারুদের ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হোক, রক্তের দাগে কলঙ্কিত হোক, ভোটার জনসাধারণ এটা কিছুতেই চায় না।

 

 

নির্বাচনী প্রতীক বণ্টনের দিনই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কে এম নূরুল হুদা রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবন মিলনায়তনে সুষ্ঠু নির্বাচন পরিচালনার জন্য নিয়োজিতব্য জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটদের ব্রিফ করতে গিয়ে বলেছেন, নির্বাচনী উত্তাপ যাতে কিছুতেই উত্তপ্ত হয়ে উঠতে না পারে, সে ব্যাপারে তারা যেন সর্বশক্তি নিয়োগ করেন। নির্বাচনী প্রচারকালে যাতে শান্তি বিঘ্নিত ও নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন না হয়, তা দেখার জন্য ইসি ইতোমধ্যেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

এ ছাড়াও নির্বাচনী মাঠে রাখা হচ্ছে ১২২টি নির্বাচনী তদন্ত কমিটি। কোনো প্রার্থী বা দল নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন করলে যে কেউ এ কমিটির কাছে অভিযোগ জানাতে পারবেন, এবং অভিযোগের সত্যতা পেলে কমিটি অভিযুক্তের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবে।

কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণার প্রথম দিনেই উদ্ভূত অবস্থা দেখে আশঙ্কা হচ্ছে, কাজির গরু শেষ পর্যন্ত শুধু কেতাবেই থেকে যাবে না তো? বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন দাবি করেছেন, মাঠ পর্যায়ে কর্তব্যরত পুলিশ ইসির কোনো নির্দেশে কানই দিচ্ছে না। পুলিশের ওপর ইসির কোনো নিয়ন্ত্রণই নেই বলে দাবি করেছেন তিনি। এর আগে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের সমন্বয়ক কর্নেল (অব.) অলি আহমদ চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, পরিস্থিতি ক্রমশ রক্তপাতের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেছেন, কোনো অভিযোগ-অনুযোগ জানাতে ফোন করলে নির্বাচনী দায়িত্ব পালনকারী কর্মকর্তারা বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমস্যরা তা ধরছেন না। বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকায় বিরোধীদলীয় ঐক্যজোটের নেতাকর্মীদের হয়রানিমূলকভাবে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করা হচ্ছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

অন্যদিকে আবার আরেক শীর্ষ বিএনপি নেতা মির্জা আব্বাস নির্বাচনী প্রচারণায় নামার আগে সংবাদ সম্মেলন করে বলেছেন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা যেভাবে তার বাড়ির চারপাশে অবস্থান নিয়েছে, তাতে তিনি নিরাপদবোধ করার বদলে নিরাপত্তাহীনতাতেই ভুগছেন।

সরকারি দল ও জোটের প্রার্থী, মুখপাত্ররা অবশ্য বলছেন, লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা হয়েছে। বলছেন, বিরোধীদলীয়রা প্রার্থিতা নিয়ে যে বাণিজ্য করেছে, তারই জের হিসেবে এসব হামলা-সংঘাত হচ্ছে। এভাবে তারা আসলে এস্কেপ রুট খুঁজছে বলেও মন্তব্য এসেছে।

এসব অভিযোগ, পাল্টা-অভিযোগ, মন্তব্য ইত্যাদির ব্যাপারে মন্তব্য করার সময় হয়তো এখনো আসেনি। তবে নির্বাচনে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার গুরুদায়িত্ব যে সরকারি দল-জোটের ওপরই বেশি বর্তায়, তাতে দ্বিমতের কোনো অবকাশ নেই।

নির্বাচনী প্রচারাভিযানকালে দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলীয় প্রার্থীর মধ্যেকার সৌজন্য, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির একটা উজ্জ্বল নিদর্শন সৃষ্টি করেছেন চট্টগ্রামের কিংবদন্তিতুল্য জননেতা, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মরহুম মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে, চট্টগ্রাম-৯ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ও চট্টগ্রাম-১০ আসনে বিএনপি প্রার্থী প্রাক্তন মন্ত্রী আবদুল্লাহ আল নোমান। চট্টগ্রামের শাহ সুফি আমানত খান (রহ.)-এর মাজার জিয়ারত শেষে পরস্পর কোলাকুলি ও কুশল বিনিময়ের মধ্যে দিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার শুভারম্ভ করেন এ দুই হেভিওয়েট প্রার্থী।

নোমান-নওফেলের এ দৃষ্টান্ত দেশের সব প্রার্থীর অনুসরণীয়। প্রতিটি আসনে যদি এ দৃষ্টান্তের সৃষ্টি হয়, তবে নির্বাচনী পরিবেশ যে অনেক শান্তিপূর্ণ ও সহনীয় হয়ে উঠবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। একটা সুষ্ঠু শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের মধ্যে দিয়ে মনমতো যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করে জাতিও তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেরতে পারবে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি মাত্র দল নিয়ে কোনো গণতন্ত্র হয় না। বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রথম কথাই হলো সরকারি-বিরোধী সব দলের, এমনকি নির্দলীয় স্বতন্ত্র প্রার্থীদেরও নির্ভয়ে, অবাধে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়া। সব প্রার্থীর মন থেকে যদি শঙ্কা, সন্দেহ, সংশয় দূর করা না যায়, সমআচরণ ও সমান সুযোগের ভিত্তিতে যদি তারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারেন, তবে গণতন্ত্রের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হবে।

 

জ্যোতির্ময় নন্দী : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

[email protected]